মাগরিবের আজানের পর ছাদ থেকে নেমে এলো শুভ্রতা আর বেলি।
সোজা নিজের ঘরে ফিরে বেলি কে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো শুভ্রতা। রৌদ্দুর তখনো ঘুমিয়ে আছে। হাত মুখ ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে টাওয়ালে মুখ মুছে বেডে তাকালো সে। উদোম হয়ে উপরের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে রৌদ্দুর। ফর্সা পিঠের অর্ধেকটা উন্মুক্ত। বাকি টা কম্পোটারে ঢাকা। শুভ্রতা এগিয়ে এসে রৌদ্দুরের কোলের কাছে বসলো।
কোমরের উপর থেকে কম্পোটার এনে কাঁধ অব্দি টেনে দিলো। আলতো হাতে বিলি কাটলো তার ছোটো করে ছেঁটে রাখা চুলের ভাঁজে। কারো হাতের শীতল ছোঁয়াতে রৌদ্দুরের ঘুম হালকা হয়ে এলো। ঘুম ঘুম চোখে ধপ করে শুভ্রতার হাত মুঠোয় ধরে নিলো রৌদ্দুর।
কাজ টা এতোটাই দ্রুত হয়েছে যে; শুভ্রতা থতমত খেলো। রৌদ্দুর মাথা উঠিয়ে শুভ্রতা কে দেখে। আচানক তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। শুভ্রতা স্বাভাবিক রইলো। আগের মতোই চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিলো সে। ঘুম জড়ানো কন্ঠে রৌদ্দুর আওড়ালো;-
--" হঠাৎ শীতল ছোঁয়াতে ঘুম ভাঙালে যে?"
--" কেনো? আপনাকে ছোঁয়ার অধিকার আমার নেই?"
রৌদ্দুর এক পশলা হাসলো। দু'হাতে শুভ্রতার কোমর ঝাপ্টে; উদোরে মুখ গুঁজে দিলো। মিনিট পেরোলে ও শুভ্রতার প্রশ্নের উত্তর দিলো না সে। যেনো এই প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন নেই। শুভ্রতা হাসলো। সে এতোটা ও অবুঝ না। যে রৌদ্দুরের নীরবতার মানে বুঝবে না। কিছু প্রশ্নের উত্তর নীরবতাতেই মানায়। সব কি আর মুখে বলে দিতে হয়? নীরবতা কাটিয়ে রৌদ্দুর বললো;-
--" অভয় দিলে একটা আর্জি পেশ করতাম মহাশয়া! যদি আপনি বলেন?"
--" এভাবে বলছেন কেন?"
--" ভালোবাসি যে, তাই।"
মুচকি হাসলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর তা টের পেয়ে ঘুরে শুলো। মুগন্ধ চোখে তাকালো শুভ্রতার গোলগাল মুখপানে। হঠাৎ বুকে হাত ঠেকিয়ে অবুঝ কন্ঠে রৌদ্দুর বলে উঠলো।
--" এভাবে হাসবেন না মিসেস। এই বোকা সোকা আমার বুকে ব্যথা হয়। হৃদয় আর হরমোন বেইমানি করার নিমিত্তে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।"
শুভ্রতার হাসি গাড়ো হলো। এক হাতে রৌদ্দুরের মুখ ঢেকে শব্দ করে হেসে উঠলো সে।
--" ফাজলামো করছেন মেজর সাহেব?"
--" মোটেই না। মন থেকে বলছি।"
--" আল্লাহ্!"
--" আমার মামনি টা কই?"
শুভ্রতা চোখের ইশারায় রৌদ্দুরের পায়ের পাশে দেখালো। মাথা উঠিয়ে সেদিকে তাকালো রৌদ্দুর। কম্পোটারের শেষ মাথা ছোট্ট শরীরটাতে জড়িয়ে রৌদ্দুরের পায়ের কাছে ঘুমিয়ে আছে বাচ্চা টা। হতাশ কন্ঠে মৃদ্যু চেঁচিয়ে উঠলো রৌদ্দুর।
--" আমার প্রিন্সেস জাহান ওইখানে কি করছে? মেয়ে টা পড়ে যেতো যদি? শুভ্র জান, তুমি আমাদের দুজনের প্রতি খুব উদাসীন হচ্ছো।"
রৌদ্দুর থামলো,উঠে বসে বেলি কে নিয়ে পাশে শুইয়ে দিয়ে চোখ টিপুনী কেটে বললো;-
--" অন্য কাউকে মনে ধরেছে নাকি?"
--" হ্যাঁ!"
চোখ ছোটো ছোটো করে নিলো রৌদ্দুর। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো সে;-
--" কি বলো? কাকে? কখন? আমার এই সর্বনাশ কোন শালা করলো? ক্যান্টনমেন্টের কেউ নাকি শুভ্র জান? আমার বউয়ের মনে আমার আগে জায়গা করে নিলো?"
--" মেজর রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ কে।"
--" দূর এতক্ষণ গালি দিচ্ছিলাম। বলোনি কেন যে আমিই সে!"
--" কেন বললে কি হতো?"
--" গালি দিতাম না।"
--" ভাবছি ওনাকে একবার শশুর বাড়িতে নিয়ে যাবো।"
--" মা - বাবার সাথে দেখা করতে যেতে চাও?"
--" আম্মু বলেছে যেতে। বাবা মন খারাপ করছেন বেলির জন্য।"
রৌদ্দুর আবার শুভ্রতার কোলে এসে শুয়ে পড়লো।
--" তাহলে বলি এইবারে?"
--" হ্যাঁ?"
--" আজ রাতে আমাকে একটা মিশনে যেতে হবে। ফিরতে ফিরতে কাল দুপুর পেরোতে পারে। আমার মামনিটাকে নিয়ে এই এক দিন। আপনি খুব সাবধানে থাকতে পারবেন ম্যাম? ফিরে এসে আবার আমি আমার আমানতের মানুষ আমার বুকে জড়িয়ে নিবো। কেমন? তারপর সব জায়গায় ঘুরতে যাবো।"
শুভ্রতার মুখের হাসি কমে এলো। রৌদ্দুরের মিশনের কথা শুনে কেমন মলিন হয়ে গেলো তার মুখাবয়ব। বহু কষ্টে ঠোঁট এলিয়ে বললো সে।
--" আচ্ছা।"
রৌদ্দুর লক্ষ্য করলো শুভ্রতার মুখের পরিবর্তন।
--" মেজরের মিসেস হয়েছেন শুভ্র জান। একটু তো দূরত্ব সইতেই হবে। তুমি জানো! আগে আরো বেশি মিশনে যেতে হতো।"
--" আচ্ছা?"
--" হুমম।"
--" কখন বেরোবেন আপনি?"
--" নয়টায়।"
--" ওহ।"
--" মন খারাপ করছে শুভ্র? কালকের মধ্যে ফিরে আসবো তো জান।"
--" না, চা পান করবেন?"
--" অবশ্যই! তুষার ফিরেছে?"
--" মনে হয়।"
রৌদ্দুর উঠে বসলো। শুভ্রতা শাড়ি ঠিক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। রৌদ্দুর স্লিপার পরে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। মিনিট দশেক পর সাদা টাওয়াল কোমরে জড়িয়ে সে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। কার্বাড থেকে সেনাবাহিনীর অলিভ গ্রিন মিক্সড কালারের পোশাক নিয়ে বিছানায় রাখলো। টাওয়াল ছেড়ে পোশাক জড়িয়ে নিলো। ড্রেসিং টেবিল থেকে পারফিউম নিয়ে বডিতে স্প্রে করে নিলো। চুলে চিরুনি করে।
সব শেষে রিভলবার পকেটে পুরে ক্যাপ হাতে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। অলগোছে বেলি কে বিছানা থেকে তুলে ঘাড়ে শুইয়ে দিলো। বাচ্চাটা চোখ ডলে রৌদ্দুরের গলা জড়িয়ে ধরলো। ডান হাতে বেলিকে বুকের সাথে চেপে ধরে। বাম হাতে ক্যাপ নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিলো রৌদ্দুর।
------------
ট্রে - তে চায়ের কাপ সাজিয়ে ট্রি - টেবিলে এনে ট্রে রাখলো শুভ্রতা। এক কাপ চা তুষার হাতে দিয়ে। রৌদ্দুরের কাপটা ফ্রিজ দিয়ে ঢেকে রাখলো।
--" রৌদ্দুর কোথায় ভাবি?"
--" ওনি উপরে। আপনাকে খাবার দিবো ভাইয়া?"
তুষার চায়ের কাপে চুমুক দিলো। পর পর টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখলো। টিভিতে খেলা চলছে। তুষার শান্ত কন্ঠে বললো;-
--" না ভাবি।"
শুভ্রতা কিচেনে চলে গেলো। রৌদ্দুর বেলি কে নিয়ে নেমে এলো। সোফায় বসে মেয়ে কে উরুতে বসিয়ে দিলো। বেলি ঘুম ঘুম চোখে রৌদ্দুরের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলো।
--" তোমি কুথায় তাবে পাপা?"
বেলির প্রশ্নে রৌদ্দুর চুমু খেলো তার কপালে।
--" আমার মিশন আছে মামনি। তাই পাপা কে যেতে হবে।"
--" লাতে আতবে?"
--" কাল ফিরবো মা।"
--" তবে বেলি কাল কুলে ঘুমাবে?"
--" আজ মাম্মামের বুকে ঘুমাও মামনি। পাপা কাল ফিরে তোমাকে অনেক আদর দিবে প্রিন্সেস নুরজাহান!"
--" তালা তালি ফিলে এতো পাপা। বেলি তোমাল জন্য তপ তপ করবে।"
--" আচ্ছা মাম্মা।"
বেলির সাথে কথা শেষ হতেই রৌদ্দুর কোল থেকে নেমে গেলো বাচ্চা টা। তুষারের পাশে এসে বসে ফিচ ফিচ কন্ঠে বললো;-
--" পাপা তো তলে যাবে তাত্তু। তোমি আমালে চককেট দিবে?"
--" দিবো আম্মু। সকালের চকলেট গুলো খেয়েছো?"
--" কেয়েছি।"
তুষার বেলি কে কোলে নিয়ে বসলো। রৌদ্দুর সোফা ছেড়ে কিচেনের দিকে গেলো। কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে খালি কাপটা রেখে বলে উঠলো।
--" হাসি মুখে বিদায় দেবে না শুভ্র জান? যদি মিশন থেকে আর না ফিরি। তখন তোমার কষ্ট হবে না?"
রৌদ্দুরের এমন কথায় বরফের মতো জমে গেলো শুভ্রতা। হাত থেকে পড়ে গেলো কাঁচের গ্লাস টা। তড়িৎ বেগে পিছনে ফিরে কাঠ কন্ঠে সুধালো সে;-
--" বেরোনোর সময় এমন কথা বললেন কেন মেজর সাহেব?"
--" প্রতিবার মিশনে যেতে আল্লাহ্ কাছে জীবন হেফাজত রেখে যাই। হঠাৎ, মনে হলো আল্লাহ্ এইবারে আর আমার আমানত আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না।"
--" মেজর সাহেব, আমার ভালো লাগছে না এসব কথা শুনতে।"
কোমল হেসে রৌদ্দুর বললো,
--" তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি?"
রৌদ্দুরের আবদারে হাত বাড়িয়ে দিলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর এগিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে নিলো তাকে। মাথা টা শক্ত করে চেপে ধরলো বুকের সাথে।
--" বেলি মাম্মা কে নিয়ে ভালো থাকবেন মিসেস শাহনাওয়াজ।"
শুভ্রতার গাল বেয়ে অশ্রুর ধারা বইলো। এই প্রথম সে শক্ত করে খামচে ধরলো রৌদ্দুরের পোশাক। কান্না জড়ানো স্বরে আওড়ালো।
--" আল্লাহ্ আপনাকে অনেকটা হায়াত দান করুক। মিস্টার শাহনাওয়াজ কে আমি এতো জলদি হারাতে চাই না। তার সাথে আমার এখনো সংসার করা বাকি। এই অল্প কয়েকদিনের সংসার আর ভালোবাসায় আমার মন ভরেনি। আমার আমৃত্যু তাকে লাগবে। আমার স্বামী এবং বাচ্চার বাবা রুপে।"
কথা শেষে শুভ্রতার মুখ তুলে ধরলো রৌদ্দুর। দুই চোখের ভেজা পাপড়িতে চুমু খেলো সে।
--" তোমার দোয়া উপওয়ালা কবুল করুক।"