সে আমার আপন জন

পর্ব - ১৬

🟢

নিত্যদিনের তুলনায় আজ অস্বাভাবিক নীরব বেলি। জেনিফার মৃধার কোলে বসে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে।

সকালে উঠেছে থেকে কিচ্ছুটি মুখে নেয়নি বেলি। কেবল কাঁদছে সে। ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেলির নাক, চোখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। এখনো আঁখি টইটম্বুর জল নিয়ে; হেঁচকি তুলে কাঁদছে বাচ্চা টা।

ড্রয়িং রুমের ঠান্ডা মেঝেতে নিশ্চল হয়ে বসে আছে শুভ্রতা। তার সামনে স্টেচারে রাখা, রৌদ্দুরের আধপোড়া দেহ। তবুও শুভ্রতা কাঁদছে না। অদ্ভুত শান্ত চোখে সে তাকিয়ে আছে রৌদ্দুরের মুখের দিকে। বোমা বিস্ফোরণের আগুনে ঝলসে গিয়ে মুখশ্রী, বিকৃত আর বিভৎস রূপ ধারণ করেছে।

কিন্তু সেই বিকৃত মুখের প্রতিটা দাগ, পোড়া চামড়া গভীর মনোযোগে অবলোকন করছে শুভ্রতা। যেন শেষ বারের মতো মুখস্থ করে নিচ্ছে মানুষটার বদনখানা। মেয়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নাতনীর দিকে তাকালেন জেনিফার মৃধা। বেলির মায়াবী বদন দেখে হু হু করে উঠলো ওনার বুক। বেলি কে বুকের সাথে চেপে আর্তনাদ করে উঠলেন জেনিফার।

--" এ কি ভাগ্য নিয়ে জন্মালি নানু ভাই। জন্মদাতা পিতা তোকে কোনো দিন স্বীকার ও করলো না। যেই একজন নিজের সবটা দিয়ে তোদের মা - মেয়ে কে আগলে ধরলো। সেও তোদের ফাঁকি দিয়ে পালালো। আল্লাহ্ এই লিখেছিলেন তোদের ভাগ্যে!?"

মায়ের কথা শুনে বেশ বিরক্ত হলো শুভ্রতা। রৌদ্দুরের মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে। রাগী চোয়ালে জেনিফার দিকে তাকিয়ে সুধালো সে।

--" এমন অলক্ষুণে কথা বলছো কেন মা? এই দেহ যে তোমাদের জামাইয়ের তা কে বললো? তোমরা সবাই এভাবে উঠে পড়লে কেন তাকে মৃত প্রমাণ করতে?"

শুভ্রতা থামলো, পর পর শক্ত কন্ঠে আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠলো সে।

--" এই দেহ কে যে আর রৌদ্দুরের দেহ বলবে। তাকে আমি নিজ হাতে খুন করবো।"

শুভ্রতার এরূপ কথায় জেনিফার কাপড়ের আঁচলে মুখ গুঁজলেন। মেয়ের এমন পাগলামো সহ্য হচ্ছে না ওনার। পাগলামি টা সত্যিই হলে সবচেয়ে বেশি খুশি জেনিফার মৃধা ই হতেন। ওনার যে নিজের মেয়ে কে তবে; সাদা শাড়ি তে বিধবার বেশে দেখতে হতো না। মায়েদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে নিজের চোখের সামনে মেয়ে কে ধবধবে শাড়িতে দেখা। এই কষ্ট যে সহ্য করা যায় না। নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ শুভ্রতার পাশে বসা। তিনি কান্নার তোপে কথা বলতে পারছেন না।

বার বার বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। শাশুড়ির এমন কাজে ও বেশ শুভ্রতা বিরক্ত। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। তার মনে প্রাণে একটাই বিশ্বাস এই দেহ রৌদ্দুরের না। তার রৌদ্দুর মরতে পারে না। সে তো কথা দিয়েছিলো ফিরবে বলে। "আপন জন" বলে এখন পালানোর পায়তারা করলে চলবে? শুভ্রতা কোনো মতেই তা সহ্য করবে না।

------------

ছেলের অকাল প্রয়াণে শাহনাওয়াজ পরিবার নিস্তব্ধ। কারো মুখ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দ ও খসসে না। শেহরিশ আর তৈমুর শাহনাওয়াজ কোয়ার্টারের বাইরে। ওনাদের সাথে আনিস মৃধা ও আছেন। সবাই মিলে রৌদ্দুরের দেহ দাফনের ব্যবস্থা করছেন। শেহরিশ ছুটে ছুটে রৌদ্দুরের সব অফিসিয়াল কাগজ পত্র ঠিক করতে ব্যস্ত।

তুষার বাকরুদ্ধ। সে ছেলে বলে কাঁদতে ও পারছে না। পরিবার হারিয়ে রৌদ্দুর কে সে পরিবার ভেবে আঁকড়ে ধরেছিলো। রৌদ্দুর ও শেহরিশের অনুরূপ তুষার কে ভালোবাসতো। দুজনের বেশ ভাব ছিলো। অথচ আজ সেই রৌদ্দুরের দেহ দাফনের ব্যবস্থা করছে সে নিজে। তুষারের সব কল্পনা মনে হচ্ছে। যেনো এখনি ঘুম ভাঙলে সব ঠিক হয়ে যাবে। রৌদ্দুর ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে। বলবে,

--" আবার মেয়েদের মতো কাঁদছিস? তুই না সেনাবাহিনীর একজন মেজর। তবে এমন মরা কান্না জুড়লি কেন?"

তবে সে সব কিছুই হলো না। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিস্তেজ ভারী দেহ টেনে; রৌদ্দুরের গোসল দেওয়ানোর দিকটা দেখছে সে।

রৌদ্দুরের নিথর দেহ কোয়ার্টারে গোসল করানো হবে, তারপর নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকায়। সামরিক নিয়মে তাকে দেওয়া হবে শেষ সম্মান—অস্ত্র নত করবে সৈনিকরা। পতাকা ঝুঁকবে, আর এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে থাকবে তার বিদায়ের সাক্ষী হয়ে। এরপর জানাজা শেষে, পারিবারিক কবরস্থানে মাটির বুকে শুইয়ে দেওয়া হবে তাকে। সেখানে চিরনিদ্রায় সমাপ্ত হবে এক অসমাপ্ত জীবনের গল্প।

------------

মৌনতা কিচেনে দাঁড়িয়ে। বেলির জন্য দুধ দিয়ে ওটস বানাচ্ছে সে।

চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে তার। রৌদ্দুর কে নিজের ভাইয়ের মতোই ভালোবাসতো সে। আসলে মৌনতার কোনো ভাই নেই কি না। তাই রৌদ্দুর কে সেই আসনের বসিয়ে ছিলো সে। কিন্তু রৌদ্দুর এমন হুট করে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না মৌনতা। সারা রাস্তা সবাই কেঁদে ছিলো। সে কাঁদতে ও পারেনি শাশুড়ির সামনে। চামচের ক্যাবিনেট থেকে বেলিকে খাওয়ানোর চামচা টা নিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো মৌনতা। বর্তমানে ড্রয়িং রুমে মানুষ কম আছে। কিছু মহিলা অফিসার আর রৌদ্দুরের ফুফু - চাচিরা আছেন।

সবার মাঝে দিয়ে নিচু হয়ে গিয়ে; জেনিফার মৃধার কাছে এসে থামলো মৌনতা। বেলির পানে হাত বাড়িয়ে আদুরে কন্ঠে সুধালো সে;-

--" আম্মু টা বড়মার কাছে আসো তো। তোমার আর ভাইয়ার জন্য খাবার বানিয়েছি। দেখি কে বেশি খেতে পারে।"

বেলি অক্ষিপটে টইটম্বুর পানি নিয়ে মৌনতার দিকে তাকালো। মৌনতা চোখের ইশারায় ডাকলো। বেলির চোখে জমা পানির বিন্দু গুলো গাল বেয়ে নেমে এলো। ফিচ ফিচে স্বরে প্রশ্ন করলো সে;-

--" বেলি কেলে বাবা আতবে?"

মৌনতার হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করলো।

--" আসবে মা।"

--" ত্তত্ত্যি?"

মৌনতা এইবারে আর মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না। ছোটো বাচ্চাদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া পাপ। তাদের সাথে নাকি ফেরেশতা থাকে। সে মাথা নাড়ালো কেবল। বেলি ভাবলো সে খেলে সত্যিই রৌদ্দুর ফিরবে। সেই ভেবে ঝাঁপ দিয়ে মৌনতার কোলে চলে এলো বেলি।

----------

চোখের পাতা ভারি হয়ে, নাকের পাটাতন ফুলে ফেঁপে উঠেছে শুভ্রতার।

তুষার তার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে রৌদ্দুরের ডিউটি অন পোশাকের সেট, ক্যাপ, ব্যাজ সহ কত কি। তুষার নীচু মস্তকে বললো;-

--" গোসল করানোর জন্য। রৌদ্দুরের দেহ থেকে ড্রেসাপ গুলো খুলে নেওয়া হয়েছে ভাবি। আপনি,,,"

তুষার পুরো কথা শেষ করতে পারলো না। চোখ ভরে উঠলো তার। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলাতে চাইলো তুষার। তুষার কে কাঁদতে দেখে শুভ্রতা ও নিজেকে সামলাতে পারলো না। তার শেষ ভরসা ছিলো তুষার। ভেবেছিলো তুষার বলবে যে, ওই দেহ রৌদ্দুরের না। কিন্তু তুষার ও যে কাঁদছে। শুভ্রতা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলো।

--" ভাইয়া আপনি ও বিশ্বাস করছেন? যে ওই দেহ রৌদ্দুরের?"

তুষার শুভ্রতার সাথে দৃষ্টি মেলাতে পারলো না। সে কি জবাব দিবে? শুভ্রতার যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গেলো। হুট করে ধপাস করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো শুভ্রতা। তুষার পেছনে সরে দাঁড়ালো। নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ ছুটে এলেন। ছেলের বউ কে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। শুভ্রতা ও শাশুড়ির বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে উঠলো।

--" ও আম্মা গো! আপনি আমার জন্য এতো রঙিন শাড়ি কিনলেন! তার মধ্যে অর্ধেক শাড়ি ও আমার পরা হলো না। এখনো কার্বাডে তোলা। আপনার ছেলে যে এতো জলদি আমার রঙ নিয়ে পালালো। এইবার আমি শাড়ি গুলো পরবো কিভাবে আম্মা? রৌদ্দুর কে ডাকুন না আপনি। আপনার ছেলেকে ডাকুন না আম্মা।"

শুভ্রতার কথা জড়িয়ে এলো। জেনিফার মৃধা ও এগিয়ে এলেন। দুই মা কে এক সাথে পেয়ে শুভ্রতা যেনো আরো ভেঙে পড়লো। ফের চেঁচিয়ে উঠলো সে।

--" ও আম্মা। আমাকে ওর সাথে কবর দিয়ে দিন। আমার পাগল পাগল লাগছে আম্মা।"

শুভ্রতার বুক ফাঁটা কান্না দেখে নীলাঞ্জনা জ্ঞান হারালেন। মৌনতা বেলি কে সোফায় বসিয়ে দ্রুত কদমে এগিয়ে এলো। নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজের মাথাটা মেঝেতে ঝুঁকে পড়বার আগে তুষার ধরে নিলো। ওনাকে ধরে মৌনতার উদ্দেশ্যে তুষার বললো;-

--" আমি আন্টিকে দেখছি ভাবি। আপনি শুভ্রতা ভাবি কে ধরুন।"

--" জ্বি ভাই।"

মৌনতা শুভ্রতার পাশে বসে তাকে মেঝে থেকে তোলার প্রচেষ্টা চালালো। কিন্তু শুভ্রতা উঠলো না। বরং টেনে মৌনতা কে ও নিজের সাথে বসিয়ে নিলো। শুভ্রতার আহাজারি দেখে মৌনতা কেঁদে ফেলেছে। শুভ্রতা নিভে আসা গলায় বললো;-

--" সে কি আমার সাথে রাগ করেছে ভাবি? ও ভাবি কথা বলো না। এই তুষার ভাই! কই আপনি! আমার রৌদ্দুরের জন্য বানানো পিঠা। আমাকে আগে জোর করে খাওয়ালেন। তাই আমার রৌদ্দুর রাগ করে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে আপনারা আটকান। আল্লাহর কসম লাগে আটকান! তাকে ছাড়া আমি শ্বাস নিতে পারছি না।"

সকাল গড়িয়ে দুপুরের কোল ঘেঁষে এসেছে, তবুও আকাশের মন ভালো হয়নি।

ঘন মেঘে ঢেকে থাকা প্রকৃতি যেন নিজের ভেতরে শোকের ভার বহন করছে। টুপটাপ বৃষ্টির ক্ষুদ্র ফোঁটা গুলো কোয়ার্টারের বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোর উপর; নীরব শোকের অনুরূপ ঝরে পড়ছে। খাঁটিয়ার পাশে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে অনড় দাঁড়িয়ে আছেন আনিস মৃধা, তৈমুর শাহনাওয়াজ।

খাঁটিয়া থেকে একটু দূরে শেহরিশ দু’হাতে আঁকড়ে ধরে রেখেছে নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজকে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নীলাঞ্জনা আজ ভংগুর প্রায়। বরাবর শেহরিশের থেকে রৌদ্দুরের জন্য টান বেশি ওনার। সেই বুকের ধন আজ নিস্তেজ দেহে শুয়ে আছে খাঁটিয়ায়। কোনো বাবা মা ই তা সহ্য করতে পারবে না।

শুভ্রতাকে দুই পাশ থেকে সামলে রেখেছে জেনিফার মৃধা আর মৌনতা। তার শরীরটা আজ নিজের ওজন বহন করতে পারছে না। সাদা শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথার অর্ধেক ঢাকা। কিন্তু ঢাকতে পারছে না শুভ্রতার ভাঙা হৃদয়ের যন্ত্রণা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। শুভ্রতার কান্না বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে; ভারী করে তুলছে চারপাশের নিস্তব্ধতা।

তুষারের কোলে ছোট্ট বেলি। বাচ্চাটা মলিন মুখে তুষারের গলা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। আলতো হাতে বেলির পিঠে চাপড় কাটলো তুষার। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো সে;-

--" খিদে পেয়েছে মামনি?"

--" না তাত্তু।"

নিজের গালের সাথে বেলির গাল চেপে ধরলো তুষার।

--" কেঁদো না মামনি।"

প্রতিউত্তর করলো না বেলি। তুষারের বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে রইলো সে। তা দেখে তার সোয়েটারের টুপি তার মাথায় তুলে দিলো তুষার। জল টইটম্বুর চোখে শুভ্রতা তাকিয়ে রইলো নিজের হাতে ধরে রাখা রৌদ্দুরের অলিভ গ্রিন পোশাকের দিকে। বুকের বাম পাশে গুলির আঘাতে কাপড়টা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সবুজ রঙ ডুবে গেছে শুকনো রক্তের কালচে দাগে। মাত্র তিনটি বুলেট…

একটা মানুষ কে শেষ করে দিতে এতটুকুই যথেষ্ট?

এত হাসিখুশি প্রাণটা কি এভাবেই থেমে গেলো? শেষ মুহূর্তে কি বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে তাদের কথাই ভেবেছিল? চোখ বুজে যাওয়ার আগে কি আর একবার তাকে আর বেলিকে দেখতে চেয়েছিল? ভাবতে পারলো না আর। হঠাৎ বুক ফেটে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো শুভ্রতা। মায়ের হাত ছাড়িয়ে ছুটে গিয়ে খাঁটিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সে।

--" পালালেন রৌদ্দুর? আমার তো এখনো আপনাকে ভালোবাসি ও বলা হয়নি। স্বামীর অধিকার ও দেইনি। তবে কোনো অধিকার না খাঁটিয়ে ও যে আমায় নিঃস্ব করে দিলেন। এই কষ্ট আমি কোথায় রাখি?"

ঠোঁট কামড়ে চিৎকার আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলো সে। তবু বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার থামলো না।

কাফনের সাদা কাপড়ে মোড়ানো; রৌদ্দুরের দেহটার উপর কাঁপতে থাকা হাত রেখে বারবার ছুঁয়ে দেখতে লাগলো শুভ্রতা। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, তার মেজর আর সাড়া দেবে না। জেনিফার মৃধা এগিয়ে এলেন মেয়েকে সরাতে। তিনি শক্ত হাতে টানলেন শুভ্রতাকে। কিন্তু শুভ্রতা নড়লো না— বরং আরো জড়িয়ে ধরলো দেহটা। আনিস মৃধার দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো সে।

--" ও বাবা খুলে দাও না রৌদ্দুরের মুখের বাঁধন। দ্বিতীয় বার ঘর বাঁধলে যদি আল্লাহ রৌদ্দুর কে ও নিয়ে যাবেন। তবে তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখালেন কেন? এই পৃথিবীতে বুঝি আমার আর ভালো থাকা হলো না?"

আনিস মৃধা এগিয়ে এসে মেয়েকে সরিয়ে নিলেন দূরে। শুভ্রতার সাথে চোখ মেলাতে পারছেন না তিনি। সকাল থেকে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছেন আনিস মৃধা। মৌনতা এসে শুভ্রতাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। বাগানের ভেজা ঘাসের উপর শরীর ছেড়ে বসে পড়লো শুভ্রতা।

কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল প্রায় শুকিয়ে গেছে। গলা ভেঙে কর্কশ। বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছে। মুখটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে কান্নায়।

রৌদ্দুরের জন্য তার এই বুকফাটা আর্তনাদ রৌদ্দুর দেখলো না। দেখলে কী করতো সে? চুপচাপ বুকে টেনে নিতো? নাকি আগের মতো বলতো;-

--" কাঁদছো কেন শুভ্র জান? এইতো আমি আছি তো!"

কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। কেউ আর তাকে থামালো না। মুহূর্তের ভেতরই সব বদলে গেল। দু’পাশ থেকে এগিয়ে এলো সৈনিকরা। ভারী নীরবতায় তারা খাঁটিয়াটি তুলে ধীরে ধীরে উত্তর–দক্ষিণে স্থাপন করলো। পদ শব্দগুলো পর্যন্ত সংযত — যেন মাটির ও অসম্মান না হয়। অতঃপর শুরু হলো রাষ্ট্রীয় সম্মান।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এগিয়ে এসে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়ালেন। তার ইশারায় সযত্নে মেলে ধরা হলো বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, এবং সেনাবাহিনীর প্রতীকী পতাকা। পতাকা গুলো ঢেকে দিল রৌদ্দুরের নিথর দেহটি। ব্যক্তিগত পরিচয় মিলিয়ে গেল পতাকার আড়ালে। রয়ে গেল শুধু দেশের এক শহিদ মেজরের পরিচয়। যে কি না দেশের জন্য লড়াই করতে গিয়ে শহিদ হয়েছেন। খাঁটিয়ার সামনের নরম মাটিতে দুটো ফুলের ঢালা রাখলেন। পর পর রৌদ্দুরের বুকের উপর রাখা হলো তার ক্যাপ ও বেল্ট। পাশে রাখা সার্ভিস রাইফেল।

চারদিকে নিস্তব্ধতা আর ও ঘন হয়ে উঠলো। এক সারিতে দাঁড়িয়ে বন্দুক কাঁধে তুলে নিলেন সৈনিকরা। বন্দুক গুলো একসাথে তাক করলো আকাশের দিকে। ট্রিগারে আঙুল স্থির — চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠলো অব্যক্ত শ্রদ্ধা, সংযত বেদনা আর গর্বের এক কঠিন রেখা। আজ রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ কেবল কার ও প্রিয় মানুষ বা সন্তান নয়। সে আজ রাষ্ট্রের সন্তান।

নীরবতা ছেদ করে কমান্ড ভেসে এলো;-

“গার্ড… অ্যাটেনশন!”

মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সবাই।

--" শোল্ডার… আর্মস!"

আকাশের দিকে একসাথে তাক করা হলো অস্ত্র।

--" ফায়ার!"

আকাশ কেঁপে উঠলো গুলির শব্দে।

প্রথম… দ্বিতীয়… এবং শেষবার। একে একে তিনটি বুলেট ছুঁড়ে দেওয়া হলো আকাশের বুকে। প্রতিটি শব্দ যেন বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে শুভ্রতার।

বন্দুকের শব্দের মাঝে ও শুভ্রতার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। শেষে বাগলের করুণ সুর ভেসে উঠলো শেষ ডিউটির ডাক। একজন সিনিয়র অফিসার সামনে এগিয়ে এলেন। অত্যন্ত যত্নে খাঁটিয়ার উপর থেকে পতাকা দুটো ভাঁজ করে কাঁচের বক্সে পুরে শেহরিশের হাতে তুলে দিলেন তিনি। সৈনিকরা বন্দুক, তরোয়াল নিয়ে সরে গেলো।

-------------

রাতের শেষ ভাগ। একটু পর ফজরের আজান পড়বে ধরনীতে। ঢাকা শহরের অর্ধেক মানুষ ঘুমের ঘোরে নিমজ্জিত। শেষ রাতের নিস্তব্ধতা ছাড়িয়ে খালি পায়ে বাগানের শেষ মাথার দিকে এগিয়ে এলো এক মানবী।

পরণে তার সাদা শাড়ি। শীতের মধ্যেও গায়ে নেই কোনো শীত বস্ত্র। নতুন কবরটার মাথার কাছে এসে বসলো মেয়েটি। কুয়াশায় ভিজে আছে কবরের মাটি। বাগানের গাছে ঝুলতে থাকা ল্যাম্প পোস্টের সোনালি আলোয় শুভ্রতার মুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। কবর দিকে তাকাতেই তার চোখ জোড়া ফের ছল ছল করে উঠলো। আলতো হাতে কবরের মাটি ছুঁয়ে দিলো শুভ্রতা। মিনমিনে শব্দে সে সালাম দিয়ে উঠলো;-

--" আসসালামু ‘আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূর।"

নিজের কন্ঠের মৃদ্যু শব্দের সালাম নিজের কানে পৌঁছাতেই ঝরঝরিয়ে কেঁদে দিলো শুভ্রতা।

--" আপনার সাথে এভাবে দেখা হওয়ার কথা ছিলো না মেজর সাহেব। এই রাত আমাদের একান্ত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু দেখুন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আপনি তিন হাত কবরের মাটির নিচে। আর আমি,,,"

বাকি কথা শেষ করতে পারলো না শুভ্রতা। তার কন্ঠ রোধ হয়ে এলো।

--" আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরি মেজর সাহেব? আপনি হীনা এই পৃথিবী আর নিঃশ্বাস দুই ই আমার কাছে বিষাক্ত ঠেকছে। আল্লাহ্ আমাকে কেন নিয়ে গেলেন না? ও মেজর সাহেব! কথা বলুন না আপনি??"

সোজা হয়ে বসলো শুভ্রতা। হাতের মুঠো মেলে তাকালো চিঠিটার দিকে। একটু আগে রৌদ্দুরের ইউনিফর্মের পকেটে চিঠিটা পেয়েছিলো সে। দীর্ঘ শ্বাস চেপে, চোখের সামনে চিঠির ভাঁজ খুলে কাগজটা মেলে ধরলো শুভ্রতা। চিঠি টা রৌদ্দুরের লেখা। কালো কালিতে লেখা অক্ষর গুলো চকচক করছে। ঝাপসা চোখে চিঠিটা পড়া শুরু করলো শুভ্রতা।

--" আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কি জানেন মহাশয়া? আপনি আমার স্ত্রী! এই জগতে আপনার সাথে সংসার না করা হলে ও; জান্নাতে আমি আপনাকে পাবো। একান্ত আমার হবেন আপনি। হইকালে আপনাকে ভালোবাসতে না পারলে ও। পরকালে আমি আপনাকে খুব ভালোবাসবো। আজকের মিশন থেকে ফিরব কিনা জানি না। সারাজীবন পাশে থাকবো বলে ও, এই পৃথিবীতে একা ছেড়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত শুভ্র জান। ক্ষমা করে দিও আমাকে! একটা ছোট্ট আবদার রাখবে মিসেস শাহনাওয়াজ? এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কালীন। দয়া করে আপনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না। আপনি বিয়ে করলে যে, পরকালে ও আমি আপনাকে হারাবো। আমার ভালোবাসা টুকু ছাড়া আপনার আর কোনো অভাব হবে না এই পৃথিবীতে। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমার ভাগের সব সম্পত্তি আপনার আর বেলি মামণির নামে করে দিবে ভাইয়া। ডিপোজিটের টাকা গুলোর নমুনি ও আপনার নামে। এই অভাব টুকু মেনে কবরে আসিয়েন! অপেক্ষায় থাকবো আমি। সবশেষে আল্লাহর কাছে এটাই প্রার্থনা করবো। বেলি আর আপনি খুব সুখে থাকুন।

ইতি,

আপনার মেজর সাহেব!

কবরের উপর ঝুঁকে, পুরো কবরের মাটি সুদ্ধু রৌদ্দুকে বুকের ভেতরে টেনে নিতে চাইলো শুভ্রতা। তার গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো এক যন্ত্রণা, হাহাকার মিশ্রিত চিৎকার।

--" এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে বড় অভাব যে আপনার ভালোবাসা মেজর সাহেব। আপনি দেখে শুনে ওই অভাবটাই রেখে গেলেন আমার জন্য?"

মাথা তুললো শুভ্রতা। ঝাপসা চোখে ভেজা কবরটা ছুঁয়ে দিয়ে বিমর্ষ কন্ঠে সুধালো সে;-

--" কি আশ্চর্য, বাংলাদেশের এতো কোটি কোটি মানুষের মাঝে আপনি নেই। একটা গোটা রৌদ্দুর নেই। আর এই জঘন্য সত্যিটাই আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে মেজর সাহেব।"

চাঁদের ম্লান আলোয় চিঠিটা বুকে আগলে, রৌদ্দুরের কবরের বুকের কাছটায় শুয়ে পড়লো শুভ্রতা। তার পরণের সাদা শাড়িতে মাটি লেগে কাদায় রুপান্তর হলো। কুয়াশারা ছুঁয়ে দিলো শুভ্রতা সুদ্ধু রৌদ্দুরের কবরের মাটি। দূর মসজিদের মাইক থেকে ফজরের আজানের সুমধুর সুর ভেসে এলো। অধর এগিয়ে রৌদ্দুরের কবরের মাটিতে চুমু খেলো শুভ্রতার।

--" নিশ্চিতে ঘুমান আমার ভালোবাসা। পরকালে দেখা হলে আমি আবার আপনার হবো, ইনশাল্লাহ। তখন আর আমাদের বিচ্ছেদের ভয় থাকবে না। এই শুভ্রতা রৌদ্দুর ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো পুরুষের নামে আর কবুল পড়বে না। শুনলেন তো?"

সে আমার আপন জন পর্ব ১৬