" 'বিধবা' শব্দটি অতিব সংকীর্ণ। অথচ যার নামের পাশে, এই শব্দ জুড়ে যায়। সে ই বুঝে এই ছোট্ট শব্দের ভার কতোটুকু।"
পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষ ই সোনায় বাঁধানো কপাল নিয়ে জন্মায়। যাদের পুরো জীবন শান্তিতে কেটে যায়। শুভ্রতার ভাগ্য তেমন নয়। বিধাতা তার কপালে স্বামী - সংসার ভাগ্যতে বড় দুঃখ লিখে রেখে ছিলেন। তা না হলে কি এই অল্প দিনের সংসারে মেজর সাহেব কে ও হারাতো মেয়েটি?
প্রতিদিনের মতোই সাধারণ একটি দিন। কিন্তু মেজর রৌদ্দুরের কোয়ার্টারে আজ বেশ ভীড় জমেছে। আর পাঁচ টা দিনের মতো শান্ত নেই তার কোয়ার্টার। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের সৈনিকরা আজ বেশ ব্যস্ত। "শহিদ মেজর রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ" এর শেষ বিদায় বলে কথা। একটু চাপ তো সহ্য করতেই হবে।
মেজর রৌদ্দুর শাহনাওয়াজের গুলিতে চিহ্ন বিচিহ্ন দেহটি কোয়ার্টারের বাইরে সযত্নে এম্বুলেন্সে রাখা।
পাশে দাঁড়ানো কিছু সৈনিক আর তুষার।
------------
সুগঠিত টানা বন্ধ আঁখি পল্লব কেঁপে উঠলো শুভ্রতার।
জেনিফার মৃধা বুঝলেন মেয়ের জ্ঞান ফিরছে। চিত্তে হাতুড়ির বাড়ি লাগলো ওনার। জেনিফারের ভয় কে সত্যি করে পিটপিট করে চোখ মেললো শুভ্রতা। চোখ জোড়া মেলে নিজে একটু ধাতস্থ হওয়ার সময় নিলো শুভ্রতা। পরমুহূর্তে কিছুক্ষণ আগে কানে লাগা এম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দের কথা মনে পড়তেই তড়িৎ বেগে বিছানায় উঠে বসলো শুভ্রতা। এদিক ওদিক তাকিয়ে মা কে পাশে দেখে ব্যস্ত কন্ঠে শুভ্রতা সুধালো;-
--" আম্মু তুমি? তুমি কখন এলে?"
জেনিফার মৃধা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালালেন। বিস্তীর্ণ হেসে মেয়ে কে বুকে টেনে নিলেন তিনি।
--" কিছুক্ষণ আগেই এলাম মা। তুমি শুয়ে পড়ো মামণি। আরেকটু ঘুমাও। ফ্রেশ লাগবে তবে।"
শুভ্রতা বাদ সাধলো।
--" না, আমি এখন আর ঘুমাবো না। মেজর সাহেব এসে পড়বেন। আমাকে রান্না বসাতে হবে। বাবা এসেছে?"
--" হ্যাঁ মা।"
--" তবে তো ওনার সাথে আজ দেখা হবে তোমাদের।"
মুখের কথা শেষ করে লাজুক হাসলো শুভ্রতা। মেয়ের সহজ সরল কথায় বুকের মধ্যে হু হু করে উঠলো জেনিফার মৃধার। তার অভাগা মেয়েটির জানা নেই। যে তার স্বামী ফিরে আর তার কাছে খাবার চাইবে না। শশুর শাশুড়ির সাথে হেসে পরিচিত ও হতে পারবে না। সে তো উড়াল দিয়েছে অজানায়। অজানায় উড়াল দেওয়া মুক্ত পাখিরা তো আর নীল নীড়ে ফিরে না। বহু কষ্টে জেনিফার বললেন।
--" তোমাকে এখন রান্না বসাতে হবে না মা। তুমি শুয়ে থাকো একটু। নাশতা করেছো ? তোমার জন্য একটু খাবার আনি আম্মু?"
মায়ের এমন ধারার কথায় বেশ বিরক্ত হলো শুভ্রতা। মায়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যস্ত পায়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো সে। জেনিফার মৃধা ও নেমে দাঁড়ালেন মেয়ের পাশে।
--" তোমরা সবাই আমাকে খাওয়াতে এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছো কেন বলো তো? আমার এখন খিদে নেই।"
এগোতে নিয়ে ও থেমে গেলো শুভ্রতা। কিছুর মনে পড়ার ভঙ্গিতে দ্রুত পায়ে সে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। রেলিং ধরে ঝুঁকে নিচে তাকালো শুভ্রতা। তাদের কোয়ার্টারের সামনে এম্বুলেন্স দাঁড় করানো। পাশেই তিন চার জন ডিউটি অফিসার দাঁড়িয়ে সৈনিকদের সাথে কথা বলছেন। অফিসাররা কিছু বলছেন। সৈনিকরা তাতে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাচ্ছে। দৃশ্যটা অবলোকনের পর পর; তখন তুষারের বলা কথা গুলো মনে পড়লো তার।
--" রৌদ্দুর একটু আঘাত পেয়েছে ভাবি। সেই নিয়ে কথা বলছিলাম। বেলি উঠেছে?"
ঘটনা বুঝতে উদভ্রান্তের ন্যায় চিৎকার দিয়ে উঠলো শুভ্রতা।
--" আম্মু কোয়ার্টারের সামনে এম্বুলেন্সে কেন? রৌদ্দুর কি তবে এসে পড়েছে? আমাকে ডাকোনি কেন?"
জেনিফার মৃধা কিছু বলবেন। তার আগেই দৌড় দিলো শুভ্রতা। রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো সে। কোয়ার্টারের ভেতর থেকে হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে এলো শুভ্রতা। দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়তে নিয়ে ও বাঁচলো সে। শুভ্রতা কে আসতে দেখে কথা রেখে তুষার আর আনিস মৃধা ছুটে এলেন। মেয়ে এম্বুলেন্সের কাছে যাওয়া আগেই শুভ্রতা কে ধরে নিলেন আনিস মৃধা।
--" এভাবে ছুটছো কেনো আম্মু?"
বাবা কে দেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো শুভ্রতা। হাপড়ের মতো শ্বাস নিয়ে দাঁড়ালো সে।
--" এম্বুলেন্সে কে বাবা? তোমার জামাই এসেছে?"
চোখ ঘুরিয়ে বাবার পেছনে দাঁড়ানো তুষারের দিকে তাকালো সে।
--" ভাইয়া? রৌদ্দুর এসেছে কি?"
--" রৌদ্দুর আসছে, আপনি উপরে যান ভাবি।"
শুভ্রতার মন ভরলো না তুষারের উত্তরে। বাবার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে মাটিতে গড়ানো আচঁল টেনে নিলো সে।
--" এম্বুলেন্সে কে আছে আমি তা দেখবো।"
--" ভাবি,"
তুষারের কথার মাঝেই তাকে থামিয়ে দিলো শুভ্রতা।
--" দয়া করে আমাকে আটকাবেন না তুষার ভাই। আপনি সকাল থেকে এমন অগোছালো উত্তর দিচ্ছেন আমাকে। আমার ভালো লাগছে না এসব।"
--" একটু কথা শুনুন ভাবি।"
--" পারবো না। সরুন পথ থেকে। বাবা তুমি ও সরো। দয়া করে আমাকে আটকাবেন না কেউ।"
আনিস মৃধা মেয়ে কে আটকাতে চাইলেন। কিন্তু তুষার পথ ছেড়ে দিলো। শুভ্রতার পথ আটকে রেখে কি লাভ? যাকে আটকানোর ছিলো। সে তো উড়াল দিয়েছে। তবে অন্যজন কে ধোঁয়াশায় রেখে কি হবে। এমনিতে ও এক ঘন্টা পর শুভ্রতা সব জানবে। বড় জোর এখন জানলে একটু বেশি কাঁদবে। এই যা, বাকি যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।
শুভ্রতার গগণ কম্পমান চিৎকারে ভাবনা ছেড়ে বাস্তবে ফিরলো তুষার। দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো সে। পুরুষদের কাঁদতে নেই বলেই। তার গলায় কান্নারা দলা পাকিয়ে বুকে গিয়ে পাথরে রূপ নিচ্ছে। অগোছালো কদমে এম্বুলেন্সের সামনে এসে দাঁড়ালো তুষার। শুভ্রতার আহাজারি সহ্য করা যাচ্ছে না। রৌদ্দুরের বুকের উপর আঁচড়ে পড়ে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে সে। আনিস মৃধা তাকে সামলাতে পারছেন না। তুষার তাকে ছুঁতে পারবে না। সে কথা মাথায় রেখে একজন নারী সৈনিক কে ডাক দিলো সে।
--" রুমাইসা ম্যাম কে ধরো।"
তুষারের আদেশে এম্বুলেন্সের ভেতরে ঢুকে শুভ্রতা কে টেনে ধরলো রুমাইসা। শুভ্রতা হাত ছিটকে রুমাইসা কে ছাড়িয়ে নিয়ে পুনরায় রৌদ্দুরের বুকে মাথা ঠেকালো। সাদা কাপড়ে ঢাকা রৌদ্দুরের সম্পূর্ণ শরীর। শুভ্রতা তার মুখের উপর থেকে কাপড় সরানোর সাহস পেলো না। হাহাকার মিশ্রিত করুণ কন্ঠে বলে উঠলো সে।
--" আপনি ওয়াদা ভেঙেছেন। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না মেজর সাহেব। আপনি তো কথা দিয়ে ছিলেন আমাদের জন্য ফিরে আসবেন। তবে যে বেইমানি করলেন! বেইমানদের দলে তো আপনার নাম ছিলো না মেজর সাহেব।"
মেয়ের এমন দশা দেখে ঝরঝরিয়ে কেঁদে দিলেন আনিস মৃধা। নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে চাইলেন ছোট্ট মেয়েটাকে।
--" এভাবে কাঁদে না আম্মাজান। মৃত দেহের কষ্ট হয়।"
শুভ্রতা আনিস মৃধার হাত কপালে ঠেকিয়ে আঘাত করলো নিজের কপালে।
--" আব্বু গোও আমি সামলাতে পারছি না নিজেকে। আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছে। আমার রোদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে আব্বু। আটকা ও তাকে।"
শুভ্রতার ধস্তাধস্তিতে রৌদ্দুরের মুখের উপর থেকে কাপড় সরে গেলো। জল টইটম্বুর চোখে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সিটকে সরে গেলো শুভ্রতা। তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে নিলো সে। রুমাইসা কে টপকে এম্বুলেন্স থেকে নেমে পড়লো।
--" এ তো আমার রৌদ্দুর না।"
মেয়ের কথায় চমকে উঠলেন আনিস মৃধা। কিছু টা সময় লাগলো ওনার শুভ্রতার কথা বুঝতে।
--" আমার রৌদ্দুরের সুন্দর চাঁদের মতো মুখ ছিলো। এই মুখ তো ঝলসে গেছে। তবে কি করে তোমরা তাকে আমার রৌদ্দুর বলছো?"
আনিস বুঝলেন মেয়ে তার নিজের মন কে স্বাত্বনা দিচ্ছে। এতো জন কি আর ভুল করবে রৌদ্দুর কে চিনতে? সবাই ভুল হলে ও তার বুকের নেম প্লেটের নাম! তা কি ভুল হতে পারে? এম্বুলেন্স থেকে নেমে এলেন আনিস। মেয়ে কে বাহুতে জড়িয়ে ভেতরে দিকে নিয়ে যেতে নিলেন তিনি। দশ মিনিটের কান্নায় চেহারা বদলে গেছে। এখনো ডুকরে কাঁদছে শুভ্রতা। ওনারা ভেতরে প্রবেশের আগে ভীড় ঠেলে মধ্যবয়সী এক নারী ডাক দিলো শুভ্রতা কে।
--" শুভ্রতা মা।"
পরিচিত কন্ঠ টা কর্ণকুহর প্রবেশ হতে থামলো শুভ্রতা। ভীড় ঠেলে সবাই জায়গা করে দিলো নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ আর মৌনতা কে এগোনোর। নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজের চোখে, মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে।