সে আমার আপন জন

পর্ব - ৪

🟢

এখন প্রায় মধ্যে রাত। শীতের রাত হওয়াতে রাত শেষ হচ্ছে না। গাছের পাতা বেয়ে টপ টপ করে কুয়াশা ঝরছে।

একটা বন্ধ চায়ের দোকানের ছাউনির নিচে বেঞ্চিতে বসে আছে রৌদ্দুর, শুভ্রতা আর বেলি। শীতের তোপে রৌদ্দুর আর শুভ্রতার দুজনের শরীরের হাড় সুদ্ধু কাঁপছে। সামান্য পাতলা একটা শার্ট রৌদ্দুরের শীত নিবারণে ব্যর্থ। তার হুডি টা বেলির পরণে। বাচ্চাটার শীত করছিলো দেখে রৌদ্দুর নিজের হুডিটা খুলে দিয়েছিলো তাকে। হুডিটা বেশ বড় ই হয়েছে বেলির। যেকিনা বর্তমানে রৌদ্দুরের কোলে ঘুমিয়ে আছে। জড়োসড়ো অবস্থায় কলা পাতা রঙের শাড়ি টা আরেকটু শক্ত করে শরীরের সাথে চেপে ধরলো শুভ্রতা।

ঘন্টা ফেরিয়েছে তারা এখানে বসে থাকার। রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে বেরোতে বেরোতেই বাস টা মিস করে ছিলো রৌদ্দুররা। এখানে আশে পাশে থাকার মতো কোনো জায়গা ও নেই। তাই উপায়ান্তর না পেয়ে দুজনে ছাউনির নিচে বসে আছে।

--" আমার শীত করছে। এখানে এভাবে আর কতক্ষণ বসে থাকবো?"

--" যতক্ষণ পর্যন্ত না, দ্বিতীয় বাস টা আসছে। ততক্ষণ এখানেই বসে অপেক্ষা করা লাগবে।"

--" নেক্সট বাস কখন?"

--" ফজরের পরে।"

উঠে দাঁড়ালো শুভ্রতা। ছাউনির নিচ থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে সুধালো সে;-

--" আশে পাশে কোনো বাড়ি নেই? একটু এগিয়ে দেখি? বাড়ি থাকলে, ওনাদের কাছে সাহায্যে চাইলে যদি কেউ সাহায্য করে?"

বেলি কে কোল থেকে তুলে; কাঁধে শুইয়ে দাঁড়ালো রৌদ্দুর।

--" জানি না। চোর ভেবে বেঁধে ও রাখতে পারে।"

--" একবার চেষ্টা করে দেখতে তো সমস্যা নেই। আর আমাদের হাতে তো কোনো ব্যাগ নেই। তাহলে চুরি করবো কিভাবে?"

থামলো শুভ্রতা,

--" এখানে আর বেশিক্ষণ বসে থাকলে আমি শীতে মরে যাবো।"

--" আপনাকে নিয়ে কোনো বিপদে পড়লে? তখন কি করবো? সবাই তো আর আমার মতো ভদ্র লোক না।"

--" আগে আসুন তো।"

অন্ধকারের মাঝেই দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলো শুভ্রতা। হাঁটার আগে শাড়ির আঁচল টা মাথায় তুলে নিলো সে।

--" এই দাঁড়ান, আজব তো।"

চা দোকানের উল্টো পাশে একটা রাস্তা গেছে। রাস্তা টা মাটির তৈরি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওই দিকের জায়গা টা গ্রাম। চাঁদের হালকা আলোতে রৌদ্দুর আর শুভ্রতা হেঁটে চলেছে। বেলি এখনো ঘুমিয়ে আছে। এদিকটাতে তেমন একটা জন মানবের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা টিনের আটচালা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো দুজনে। বাঁশের কঞ্চি দ্বারা বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়ে রাখা। বাড়ি টা দেখে শুভ্রতার দিকে তাকালো রৌদ্দুর। মেয়ে টা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে।

নরম কন্ঠে রৌদ্দুর আওড়ালো,

--" আমি গিয়ে দেখছি। বাড়িতে কেউ আছে কিনা।"

তড়িঘড়ি করে রৌদ্দুরের হাত চেপে ধরলো শুভ্রতা। এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে লোকটার সাথে যাওয়াটাই ভালো। চারপাশ টা কেমন ভুতূরে হয়ে আছে। দূরে কোথাও নেড়ি কুকুর ডাকছে। তার সাথে বাতাসে কেমন একটা অজানা ফুলের সুভাষ ভেসে আসছে।

--" আমি যাই আপনার সঙ্গে।"

--" যাবেন? আসুন।"

বাঁশের বেড়া টা সরিয়ে মাটির বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করলো রৌদ্দুর আর শুভ্রতা। ঘরের ভেতর থেকে লালচে লাইটের আলো এসে উঠোনে পড়ছে। অন্ধকার হাতড়ে গিয়ে; টিনের দরজায় কড়া নাড়লো রৌদ্দুর। কড়ার শব্দে ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো এক বৃদ্ধ লোক;-

--" কে রে এতো রাইতে বিরক্ত করোছ?"

--" দরজা টা একটু খুলবেন? আমরা বিপদে পড়েছি খুব।"

--" পারতাম না। এইডা কোনো হোডেল না।"

লোকটার কড়া গলার না শুনে শান্ত চোখে শুভ্রতা দিকে তাকালো রৌদ্দুর।

--" এইবারে কি করবেন?"

--" আমি দেখছি আপনি সরুন।"

রৌদ্দুর কে সরিয়ে দরজা-তে এসে দাঁড়ালো শুভ্রতা। আলতো কন্ঠে বললো সে;-

--" আমাদের একটু সাহায্য করুন? আমরা খুব বিপদে পড়েছি। শীতের মধ্যে বাইরে ও থাকতে পারছি না। একটু তো দয়া করুন। শুনছেন?"

এইবার আর জবাব দিলো না লোকটা। কিছু সময় ফেরোতেই খট করে দরজা টা খুলে গেলো। চেরাগ বাতি হাতে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো পঞ্চাশ উধ্ব এক পুরুষ। পরণে তার সাদা লুঙ্গি আর সোয়েটার। বাতির লালচে আলোয় রৌদ্দুর আর শুভ্রতা কে ঝাপসা চোখে দেখলো লোকটা।

--" জামাই বউ নাকি তোমরা?"

রৌদ্দুর আর শুভ্রতা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। ওদের চুপ থাকতে দেখে তাড়া দিলেন উনি;-

--" কি হইলো কথা কও না কে রে?"

--" না।"

--" মানে? এই মাইয়া কি হয় তোমার?"

--" উনি আমার কিছুই হোন না। রাস্তায় বিপদে পড়ে ছিলো তাই সাহায্যে করেছি।"

--" ছিঃ ছিঃ, এই মাইয়া তোমার জামাই কই? বেগানা পুরুষ লোকের সাথে ঘুরতাছো কেরে?"

শুভ্রতা মাথা নামিয়ে নিলো। নিভে আসা কন্ঠে সুধালো সে;-

--" ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।"

--" জামাই ছাইড়া পর পুরুষের লগে ঘুরতাছো? এই ছেরা তুমি বিয়া করছো?"

--" না না, আমি এখনো সিঙ্গেল।"

রৌদ্দুরের কথায় ভ্রু কুঁচকে নিলো লোকটা। যার অর্থ রৌদ্দুর কি বলেছে তা বোঝেননি উনি।

--" তোমার ও ছাড়া ছাড়ি হইয়া গেছে?"

--" না না আমি অবিবাহিত।"

--" ওও,"

--" আমাদের একটু থাকতে দিবেন চাচা?"

--" না, এমন জোয়ান ডাগ্গর অবিবাহিত পোলা মাইয়া রে আমি আমার বাড়িতে থাকতে দিতে পারুম না। আমার পাপ হইবো। খোদা তালা পাপ দিবেন।"

লোকটার কড়া গলার কথা শেষ হতেই; ফোড়ন কাটলো রৌদ্দুর। উৎসুক কন্ঠে সুধালো সে;-

--" তাহলে আমাদের বিয়ে দিয়ে দিন?"

--" কি?"

অবাক কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো শুভ্রতা। তার চিৎকারে বেলি ও জেগে গেলো। ঘুম জড়ানো ফিচফিচে কন্ঠে বেলি বললো;-

--" কি হয়েতে মাম্মা। তোমি এমল তেঁতাতো কেনু?"

--" কিছু না মাম্মা। তুমি আমার কাছে আসো।"

বেলি শুভ্রতার কোলে এসে ফের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। লোকটা ওদের দুজন কে পরোখ করলো জ্ঞানী চোখে।

--" দেখে ভদ্র ঘরের পোলা মাইয়া ই লাগছে তোমাগোরে। এইডা ঠিক কইছো। তোমাগো বিয়া দিয়া দিলে আমার ও সোয়াব হইবো।"

--" এসব কি বলছেন আপনি? লাগবে না আপনার সাহায্য করা। আমি বাইরে থাকতে পারবো।"

--" কিন্তু আমি শীতের মধ্যে বাইরে থাকবো না।"

--" তানভি!"

--" চাচা আপনি বলুন?"

--" এই মাইয়া তুমি এতো কথা কও কেরে? এহনি তোমাগো বিয়া হইবো। আমি কাবিনের বই লইয়া আইতেছি। সোয়াব কামান লাগবো আমার।"

বাতি নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন লোকটা। রৌদ্দুর বাইরে রাখা পিঁড়িটাতে বসে পড়লো। তার মন টা আপাতত বেশ ফুরফুরে। অবশেষে অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটলো বলে। ভাগ্য সহায় থাকলে আর কিছুক্ষণ পর শুভ্রতা তার। রৌদ্দুরের শুভ্রতা, পৃথিবীর কেউ আর তাদের আলাদা করতে পারবে না।

শুভ্রতা এদিক ওদিক তাকিয়ে উল্টো ঘুরে দৌড় দিলো। বেশি দূর যেতে পারলো না সে। রৌদ্দুর মেয়েটার আচঁল খাবলে ধরলো। থামতে গিয়ে পায়ে বেশ ভালোই চোট ফেলো শুভ্রতা।

--" এই মেয়ে পালাচ্ছেন কেন?"

--" আমি আপনাকে বিয়ে করবো না।"

--" কেনো?"

--" আমি বিবাহিতা, পাগল আপনি?"

--" ডির্ভোস হয়ে গেছে আপনার। ভুলে গেছেন?"

--" তো? আমি কিছুতেই বিয়ে করবো না। পুরুষ মানুষ কেবল নারীদেহের লোভে ভালোবাসার নাটক করে। আমি ঘৃণা করে পুরুষদের।"

--" সবাই এক না শুভ্রতা। এক বার সুযোগ দিয়েই দেখতে পারো। রৌদ্দুর আর মাহমুদ এক না। জীবন বারে বারে সুযোগ দেয় না। শেষ বারে একবার ভরসা করে দেখো, প্লিজ!"

রৌদ্দুরের কন্ঠ অদ্ভুত শীতল শোনালো। যেনো বহু দিনের কষ্ট, আবেগের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কথাগুলো বলেছে সে। যেই কন্ঠে নেই কোনো ছলনার রেশ। থাকতে পারে ও না।

সে আমার আপন জন পর্ব ৪