সে আমার আপন জন

পর্ব - ১

🟢

স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে বুকে নিয়ে ঘর ছেড়ে ছিলো শুভ্রতা। অনাকাঙিক্ষত ভাবে ভীষণ বিপদে পড়েছে সে। আপাতত রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াচ্ছে শুভ্রতা। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতে চলেছে। এখনো মাথা গোঁজার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থল সে পায় নি।

ছুটো ছুটি করার মাঝেই আচানক কারো সাথে ধাক্কা লাগলো শুভ্রতার। পড়তে পড়তে ও বেঁচে গেলো শুভ্রতা আর বেলি। অচেনা পুরুষটি তার বলিষ্ঠ হাতের আলিঙ্গনে দুজন কে ধরে নিলো যত্ন সহকারে। যেনো তার বহুদিনের আপন কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আর পুরুষটি পণ করেছে সেই মানুষ গুলো কে পড়তে দিবে না। হুঁশ ফিরতেই, পুরুষটির হাত ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো শুভ্রতা। মেয়ে টা ভয়ে কান্না শুরু করেছে। পিঠে ও বোধ হয় কিঞ্চিত ব্যথা পেয়েছে। আলতো হাতে পিঠে ঝাপড়ে বেলি কে শান্ত করার প্রয়াস চালালো শুভ্রতা। কিন্তু মেয়েটা থামলো না। বরং কান্নার শব্দ বাড়লো তার।

--" এভাবে মাঝ রাস্তায় ছুটো ছুটি করছেন কেন?"

লোকটার প্রশ্নে চোখ তুলে তাকালো শুভ্রতা। পূর্ণ দৃষ্টিতে পুরুষটিকে একবার দেখে চোখ নামিয়ে নিলো সে। পুরুষ মানুষে যে তার ঘৃণা। সহ্য হয় না এদের। দেখলেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। মনের তিক্ততার রোষানলে পড়ে উত্তর দিলো না শুভ্রতা।

--" হ্যালো, আপনাকে ই জিজ্ঞেস করছি!"

--" আমি যা ইচ্ছে করছি। আপনার কি? রাস্তায় মেয়ে দেখলেই কি এমন যেচে পড়ে খবর নেন?"

বেলির কান্না বাড়তে দেখে পুরুষ টা শুভ্রতার কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো বাচ্চাটাকে। তার প্রশস্ত বলিষ্ঠ ঘাড়ে মাথা রেখে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো সে। মেয়ের হাতে টান বসাতে নিতেই শুভ্রতার কব্জি চেপে ধরলো মানুষ টা। অধরে আঙুল চেপে চুপ করার নির্দেশ দিলো তাকে। শুভ্রতা চুপ করে দাঁড়ালো। বেলি থামতেই লোকটা সুধালো;-

--" গন্তব্যে ঠিক করেছেন? নাকি ছন্নছাড়া বেশে বেরিয়েছেন?"

পুরুষটির এমন অদ্ভুত প্রশ্নে থমকালো শুভ্রতা। সে যে ঘর ছেড়েছে এই লোক জানে কিভাবে? মাহমুদের লোক নাকি? শুভ্রতার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সচেতন করলো। মস্তিষ্ক বললো মেয়ে কে নিয়ে পালা শুভ্রতা। কিন্তু ইন্দ্রিয় আর মস্তিষ্কের মাঝে মন বললো অন্য কথা। শেষ বার বিশ্বাস করাই যায় অচেনা পুরুষটি কে। এই বিশ্বাসে যদি যদি ভাগ্যে মৃত্যু লেখা থাকে, তবে তাই সই। কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো শুভ্রতা।

--" আমি পালিয়েছি ঘর ছেড়ে। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কাউকে চিনি না। সেই সকাল থেকে ছুটে এতোটা এসেছি। রাস্তা ও শেষ হচ্ছে না।"

--" আমি তানভি, আপাতত নামটুকু জেনে রাখুন। বাকি টা পথ চলতে চলতে জেনে নিবেন কেমন!"

--" পথ চলতে চলতে মানে?"

মুচকি হাসলো রৌদ্দুর। টপ করে বেলির গালে একটা চুমু খেলো সে।

--" আমরা তো এখন সফর সঙ্গী, তাই না?"

--" কে বলেছে আপনাকে?"

--" আমার সিকসেন্স, সঙ্গী না হলে উপরোক্ত কথা গুলো আমাকে বলতেন না আপনি।"

চুপসে গেলো শুভ্রতা। কিন্তু এখন তো আর তার কিছু করার ও নেই। অবিশ্বাস করে ছোটার থেকে; বিশ্বাস করে নিঃশেষ হওয়া ভালো। সে একা হলে চিন্তা ছিলো না। তার সাথে যে তার বুকের ধন টাও আছে। শীতের দিন, ঘন্টা না পেরোতেই হাত হয়ে যায়।

--" বাই দ্য ওয়ে, সন্ধ্যায় শেষ বাস টা ছাড়বে এখান থেকে। গন্তব্য সোজা সিলেট। টিকেট কাটবো? এই বাস ছাড়া আর কোনো বাস নেই। নইলে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।"

চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবলো শুভ্রতা। পর পর মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো সে। রৌদ্দুর বেলি কে কোলে নিয়ে হাঁটা দিলো বাস কাউন্টারের দিকে। কাউন্টার থেকে দুটো টিকেট কেটে ওয়েটিং চেয়ারে বসলো সে। বেলি ঘুমিয়ে পড়েছে রৌদ্দুরের ঘাড়ে। মিষ্টি বাচ্চাটাকে সযত্নে বক্ষ ভাঁজে আগলে রাখলো রৌদ্দুর। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মাঝের চেয়ার টা ফাঁকা রেখে বসলো শুভ্রতা।

সে আমার আপন জন পর্ব ১