--" কে আপনি? আপনি মাহমুদ কে কিভাবে চিনেন?"
শুভ্রতার ভর্য়াত কন্ঠ শুনে রৌদ্দুর ওর দিকে তাকালো। শীতের মাঝে ও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে শুভ্রতার কপালে। বেলি কে খামচে ধরে রেখেছে বুকের সাথে। চাঁদের আলোতে তা বেশ বুঝতে পেরেছে রৌদ্দুর। শুভ্রতা তাকে ভয় পাচ্ছে, এই কথা বুঝতে পেরে কিছু টা পিছিয়ে গেলো রৌদ্দুর।
--" আমাকে এখনো তুমি চিনতে পারোনি শুভ্রতা?"
--" না, "
--" আমি মাহমুদের বন্ধু রৌদ্দুর।"
--" মেজর রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ?"
--" হুমমম "
--" তাহলে আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন কেনো? আমি বুঝতে পারছি না আপনার কথা।"
--" আমি তোমাকে ভালোবাসতাম শুভ্রতা। এমন কি এখনো বাসি; এবং সারাজীবন বাসবো। পাঁচ বছর আগে, আমার সাথে বেইমানি করে মাহমুদ আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিয়েছিলো।"
রৌদ্দুরের কথায় শুভ্রতার কপালে দু'স্তরের ভাঁজ পড়লো। অবাক কন্ঠে সুধালো সে;-
--" কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না। এমন কি কোনো দিন দেখেছি বলে ও মনে পড়ছে না।"
--" তুমি আমাকে দেখোনি। কিন্তু আমি তোমাকে দেখেছিলাম। মাহমুদের চেম্বারে। তুমি ডক্টর দেখাতে গিয়েছিলে। আমি তখন ওর পাশের চেয়ারটাতে বসে ফোন স্ক্রল করছিলাম। তখন হঠাৎ তুমি হুড়মুড়িয়ে কেবিনে ঢুকে পড়েছিলে। মাহমুদ তখন ওয়াশরুমে ছিলো। তুমি ডাক্তার ভেবে প্রথমে আমার কাছেই এসেছিলে। তখন তোমার মুখে রেশ হয়ে ছিলো।"
রৌদ্দুরের অন্যমনস্ক কথায় কৌতূহলী কন্ঠে শুভ্রতা প্রশ্ন করলো;-
--" তখন তো আমার ফেইস ভর্তি এলার্জি ছিলো। পুরো মুখ লাল হয়ে ফুলে উঠে ছিলো। তাহলে আপনি কিভাবে পছন্দ করেছিলেন আমাকে?"
এইবারে রৌদ্দুর মিটিমিটি হাসলো।
--" জানি, কিন্তু কেন যেনো আমার মনে ওই রেশ ভর্তি মুখটাই গেঁথে যায়। আমি তোমার হিস্ট্রি গেঁটে বাসার ঠিকানা বের করেছিলাম। তোমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর জন্য। হিস্ট্রিতে বাসার ঠিকানা দেওয়া ছিলো, কারণ তুমি এর আগে দু'বার হসপিটালে ভর্তি হয়ে ছিলে। পেটে ব্যথা, আর শ্বাস কষ্ট নিয়ে।"
--" তারপর?"
--" হের্ডকোয়াটার থেকে কল এসেছিলো। জরুরী তলব; দুইদিনের মধ্যেই ফিরতে হবে। একটা মিশন ছিলো। সেইবারে আর তোমার বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলো না। সিলেট ফিরে গিয়েছিলাম আমি।"
রৌদ্দুর থামলো, শুভ্রতা কোনো কথা বললো না। নীরব প্রকৃতির মাঝে এক জোড়া মানব - মানবীর ছায়া কে বড্ড অদ্ভুত দেখালো। গাছের আড়ালে কোনো এক পোকা ডাকছে। রৌদ্দুর বাকি কথা গুলো বলতে উদ্যত হতেই; বৃদ্ধ লোকটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। ওদের দুজন কে এতো দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন তিনি;-
--" এই ছেরা ছেরি ওইহানে কিতা করো? এদিক পানে আহো।"
রৌদ্দুর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।
--" আপনি ঘরে যান চাচা। আমরা একটু পর আসছি।"
বিরক্ত হলেন বৃদ্ধ লোক টা,
--" পালাবার পাঁয়তারা করতাছো?"
--" রৌদ্দুর পালায় না চাচা।"
--" তোমাগো গুজুর গুজুর শেষে দুয়ারে টোকা দিও। আমি জাগনা আছি।"
লোক টা ঘরে ঢুকে পড়লো। রৌদ্দুর আশে পাশে তাকালো। কতো রাত হয়েছে এখন, কে জানে? শীত ও করছে শুভ্রতার। জলদি কথা শেষ করতে হবে।
--" সেবার সিলেট যাওয়ার পর একদিন বিকেল বেলায় মাহমুদ ফোন করে ছিলো। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে।"
এইবারে রৌদ্দুরের কন্ঠ কিছুটা কেঁপে উঠলো।
--" মেয়ে টা কে জানো? তুমি, আমার শুভ্রতা। মাহমুদ জানতো আমি তোমাকে পছন্দ করি। কিন্তু তারপর ও আমার সাথে বেইমানি করেছিলো। অনেক লম্বা কাহিনী। আমি তোমাকে পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম শুভ্রতা। কিন্তু আবার যখন বিধাতা আমাকে সুযোগ দিয়েছে। এইবারে আমাকে আর ফিরিয়ে দিও না শুভ্রতা।"
শুভ্রতা চুপ থেকে সবটা শুনলো। পর পর নীচু মস্তকে জবাব দিলো সে;-
--" রৌদ্দুর আপনি বাচ্চামো করছেন!"
--" মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?"
--" আমি সবে ডির্ভোস দিয়েছি মাহমুদ কে। এখনি আবার বিয়ে, সম্পর্ক এসব সম্ভব না। ইসলামে নেই রৌদ্দুর। আশা করছি আপনি বোঝার চেষ্টা করবেন।"
--" কয়দিন সময় প্রয়োজন তোমার?"
--" আমি বিয়ে করতে চাইছি না রৌদ্দুর! চাইলে ও আর সব টা ভোলা সম্ভব না।"
মানুষের সহ্য সীমা ছাড়িয়ে গেলে নিজের শক্ত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে। যা সে কোনোদিন কল্পনা ও করতে পারে না। তাও মানুষ করতে দ্বিধা বোধ করে না। তেমনি রৌদ্দুরের কি হলো কে জানে? হুট করে সে শুভ্রতার পায়ের সামনে; হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো। দু'হাতে শুভ্রতার পা জড়িয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে সুধালো সে;-
--" আমাকে ফিরিয়ে দিও না শুভ্রতা। আমি এইবারে রিজেক্ট হলে শেষ হয়ে যাবো। তোমার যতদিন ইচ্ছে সময় নাও। প্রয়োজনে আমি বছর ধরে অপেক্ষা করবো। তবুও ফিরিয়ে দিও না, দয়া করো! আরে পাপ করলে আল্লাহ্ ও তো দ্বিতীয় বার সুযোগ দেন। তুমি তো মানুষ শুভ্রতা।"
শুভ্রতা পিছিয়ে গেলো।
--" কি করছেন আপনি? আমার পা ছাড়ুন।"
--" আমি আর পারছি না শুভ্রতা। বার বার আমি ই কেন তোমাকে ছেড়ে দিবো? তোমার তিন মাস সময় লাগবে? নাও, কিন্তু তিন মাস পর আমাকে তুমি ফেরাতে পারবে না। প্রয়োজনে আমি আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমাকে আমার করে নেবো। মাইন্ড ইট,"
রৌদ্দুরের ধীর কন্ঠের হুমকি শুনে ও বিচলিত হলো না শুভ্রতা। সে শক্ত কন্ঠে সুধালো;-
--" আমি আর বিয়ে করবো না।"
--" আমি তোমায় কোন বাঁধনে বাঁধবো শুভ্রতা? কীভাবে তোমাকে রাখবো?বলো না?? এই বয়সে এসে আমার এসব বাচ্চামো ভালো লাগছে না।"
শুভ্রতা বেলি কে নিয়ে ঝুঁকলো। এই প্রথম আলতো হাতে সে ছুঁয়ে দিলো রৌদ্দুর বাহু। শুভ্রতার করা কাজে চমকে নিজের বাহুর দিকে তাকালো রৌদ্দুর।
--" বিধাতা এক জীবনে সবাই কে সবটা দেয় না রৌদ্দুর। আমাকে দেখুন না। স্বামী - সংসার সবটা দিয়ে ও কেড়ে নিয়েছেন। আমার আর ইচ্ছে করছে না এসব মায়া জালে জড়াতে। বড্ড কষ্টে একবার সব ছাড়িয়ে এসেছি। সেখানে নতুন করে কিছু ঘটা সম্ভব না।"
রৌদ্দুর আলগোছে শুভ্রতার হাতটা মুঠোয় নিলো। তার কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে। কথারা খৈই হারাচ্ছে। শত শত মানুষের সামনে ইন্টার ভিউ দিয়েছে সে। কিন্তু আজ তার কন্ঠ , স্বর সব তার সাথে বেইমানি করছে। কান্না জড়ানো কন্ঠে রৌদ্দুর আওড়ালো;-
--" থেকে যাও না শুভ্রতা। আমার তপ্ত মরুভূমিময় জীবনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে। আমার ধু ধু জীবনে শান্তির ফোয়ারা হয়ে।"
রৌদ্দুরের কান্নারা বাঁধ ভাঙলো। শুভ্রতার ছোট্ট শরীর কেঁপে উঠলো। পুরুষরা নাকি সহজে কাঁদে না। তবে কি রৌদ্দুর সত্যিই তাকে ভালোবাসে? শুভ্রতার চোখ জোড়া টলমল করে উঠলো।
--" আপনি বুঝতে চাইছেন না কেন রৌদ্দুর?"
--" আমি তোমাকে হারাতে চাই না শুভ্রতা। তোমাকে আটকানোর জন্যে আমার খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। ই...ইচ্ছে করছে, সমাজের সব নিয়ম ভেঙে তোমাকে আর বেলি কে নিয়ে পালিয়ে যাই। না হলে তোমাকে জোর করে বুক খাঁচায় বন্দীনি করি।"
--" রৌদ্দুর ,"
--" আমাকে ফিরিয় ও না শুভ্রতা।"
শুভ্রতা চুপ হয়ে গেলো। রৌদ্দুরের মুঠো থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো সে।শুভ্রতা হাত ছাড়াতেই রৌদ্দুর উঠে পড়লো। দু'হাতে চোখ মুখ মুছে। কোমরে হাত বেঁধে বড় করে দম নিলো। বড় বড় কদমে দরজার কাছে গিয়ে দু'বার টোকা দিতেই দরজা খুলে দিলো লোকটা।
--" শুভ্রতা কে আজ রাতটুকু আপনার কাছে রাখুন চাচা। সকালে ও কে বাসের একটা টিকেট কেটে দিয়েন।"
--" তুমি কই যাইবা? বিয়া করবা না?"
রৌদ্দুর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
--" আমার কপালে বিয়ে নেই চাচা। সবার কপালে সব কিছু থাকে না। তেমন রৌদ্দুরের কপালে ও বিয়ে নেই।"
--" কি এই মাইয়া তোমারে না কইরা দিছে?"
--" জ্বি চাচা, আমি তার যোগ্য না।"
শুভ্রতা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। রৌদ্দুরের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে,বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে সুধালো;-
--"মেজর সাহেব কে একবার সুযোগ দেওয়াই যায়; তাই না চাচা?"