পাহাড়ের ঢালে এখনও পড়ে আছে নিস্তব্ধতার ছায়া।
লিলেকের অনুপস্থিতি যেন প্রাসাদের প্রতিটি ইট-কাঠেও শোক বয়ে এনেছে।
আরসালান চুপচাপ বসে থাকে, পাথরের মতো অনড়।
ডালি দূর থেকে দেখে এক সময়কার হাসিখুশি ভাইটা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে।
জোসেফার নিজেও বুঝতে পারে, কিছু একটা ভেঙে গেছে তাদের মাঝে, চিরতরে।মেয়ের শোক হলেও সে প্রকাশ করছেনা কারণ তার মনে তীব্র রাগ, সমাজের সামনে থু থু হবে, যদিও সবাই এখনো মূল ঘটনা জানেনা।তবে নিলসন আর তার বাবার সামনে একেবারে মাথা নত হয়ে গেছে।লজ্জায় জীবন দিতে মন চাচ্ছে, এমন করে মেয়ে তার ইজ্জত ডুবিয়ে দিয়ে গেল।
সন্ধ্যার ঝরা আলোয় ডালিকে ডেকে পাঠালেন জোসেফার।
চুপচাপ, শীতল স্বরে বললেন,
"তুমি বুঝতেই পারছো, ডেলসি রোজ। রাজপরিবারে শোক দীর্ঘদিন চলতে পারে না। সময় তার নিয়মে এগোতেই হবে।"
ডালি নীরবে শুনছিল।
জোসেফার এগিয়ে এসে বললেন,
। লিলেক চলে যাওয়ার পর, তোমার হাত ধরেই ছেলেটি ফিরে আসতে পারে স্বাভাবিক জীবনে।
ডালির চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।
ভেতরে কিছু একটা মুচড়ে যায়, ব্যথায়।
কিছু বলার আগেই জোসেফার নরম স্বরে যোগ করলেন,
"তুমি একা নও, ডেলসি। আমরা তোমার পাশে আছি।"
প্রাসাদের অন্ধকার করিডোরে ফিরে যেতে যেতে ডালি ফিসফিস করে নিজের মনে বলল —
"কেউ কি কখনো সত্যিই পাশে থাকে?"
:
:
:
সেই রাতে ::::::
চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করা জঙ্গলে একা হাঁটছিল ডালি।হাতে লন্টন, এখন আর কিছুতেই ভয় লাগেনা ডালির। সে ভেবেছিল আগেরকার দিন গুলোতে বোধ হয় মানুষের মনে মায়া মমতা ছিল বেশি কিন্তু এখানে এসে অনুভব করল "না মানুষ সব সময় সব প্রাণীর চাইতে নিষ্ঠুর ছিল এবং আছে। সমাজ, পরিবেশ, শৃঙ্খলা কোনো কিছুই মানুষের নিষ্ঠুরতা কমাতে পারেনি। কোনো কালেই মানুষ মনুষ্যত্বের ধর্ম পালন করেনি এবং করবে ও না।
যেহেতু ডালি এখানকার নয়, তাই সে নিজের মনকে বুঝিয়েছে এসব সবই ছলনা, লিলেক কে নিয়ে তার এতো ভাবনার কিছুই নেই। এত শোক এত মায়া এসবের আদৌ কোনো মূল্য আছে কিনা তার জানা নেই। তাই সে ভেবে নিয়েছে এখানে যাই হোক না কেন সে মন খারাপ করবে না কিন্তু একটা জায়গায় তার মন আটকে যায় বারবার, সে কিছুতেই একজনের প্রতি আবেগ কমাতে পারছে না। এই ঐতিহাসিক দুনিয়ায় সেই মানুষটাকে ছাড়া আর কিছুই বিশ্বাস হয়না।
হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে কারনাইন এগিয়ে এলো, নিঃশব্দে।
চোখে এক অদ্ভুত টান,
ঠোঁটে না বলা হাজার কথা।
ডালি তাকিয়ে আছে তার দিকে, অবাক হয়ে।
কারনাইন এগিয়ে এসে খুব আস্তে, প্রায় ধরা স্বরে বলে,
"একা এসেছো কেন, ডালি ?"
ডালির চোখ ভিজে ওঠে অজান্তে।
কোনো কথা নেই।
শুধু দুজনের মাঝখানে বাজে অদৃশ্য এক কাঁপা সুর।
আকাঙ্ক্ষার, না বলা ভালোবাসার।
হাওয়ার দোলায় ডালির চুল উড়ে আসে কারনাইনের কাঁধে।
কারনাইন হাত বাড়িয়ে থমকে যায় — ছুঁতে চায়, কিন্তু থেমে যায়।
ডালির ঠোঁট কাঁপে।
"তোমার খোঁজেই এসেছি"
কারনাইন হঠাৎ নরম স্বরে বলে,
"মন খারাপ তোমার?
" না।"
কারনাইন ডালির উত্তরে অবাক হলো। ছুটে এসেছিল ডালিকে সান্ত্বনা দিতে কিন্তু ডালির মধ্যে বিশেষ কোনো প্রভাব দেখছেনা ঘটনার।
ডালি হাটতে হাটতে বন পেরিয়ে মাঠে যাচ্ছে, জ্যোৎস্নায় ভাসছে জঙ্গল আর মাঠ। ঘাসের উপর হঠাৎ বসে পড়লো আর তার পিছে পিছেই চলছিল কারনাইন।
ডালি বলল"ইশ কী সুন্দর চাঁদরাত। মোবাইল টা পাশে থাকলে এক্ষুণি ছবি তুলে নিতাম।আশেপাশের জোনাকি গুলো ও যেন আজ অনেক খুশি। ডালি আস্তে করে শুয়ে তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে বলল। আজ আর বৃষ্টি হবেনা, দেখো কতো তারা।এই পরিবেশে বসে পপকর্ণ কিংবা চটপটা কিছু খেতে পারলে ভালো লাগতো।
কারনাইন এক পাশ হয়ে শুয়ে হাতের কনুই তে ভর দিয়ে রাখল"তুমি ভীষণ অদ্ভুত। "
"হ্যাঁ জানি।তোমারা ও আমার জন্য অদ্ভুত। "
"মানে?"
"বললে বিশ্বাস করবেনা। "
কারনাইন অনড় চোখে বলল"কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে বিশ্বাস করতে। "
ডালি আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকালো।"এগুলো সব সত্যি! না কি একটা কল্পনা আমি জানিনা। তবে এ সময় টা খুব সুন্দর, আমার ভালো লাগছে কেন যেন।"
"তুমি অদ্ভুত, তবুও সুন্দর। "
ডালি ঠোঁটের কোনায় হাসলো।" আর তুমি ছদ্মবেশী পাগল। "
কথাটা শেষ হতে দুজনেই হাসলো মৃদু স্বরে।
তুমি জানো না, তুমি কত গুরুত্বপূর্ণ? কেন একা একা প্রাসাদের বাইরে ঘুরছো?"আরসালান বেশ রাগ করেই বলল ডালিকে।
"শুধু শুধু চিন্তা করো না, আমি এতটাও জরুরী প্রাণ নই।"
"ডেলসি! ওরা তোমায় তন্নতন্ন করে খুঁজছে। কোনোভাবে যদি ওদের হাতে পড়ে যাও ছাড় নেই তোমার।"
"মানে,কারা?"
দামেস্ক শহরের আমির "আল ফখরুদ্দীন " সে চাই পুরো এই লুবনান পাহাড় নিজের করে নিতে। ক্ষমতার লোভে তোমার পরিবারের সব সদস্য কে হত্যা করেছিল সে।এখনও তারা তোমাকে চায়।"
"জায়গা তো দখল করে নিয়েছে, তাহলে আমাকে কেন চাই?" ডালির অবিশ্বাস্য চোখের প্রশ্ন।"
আরসালান খুব গুরুত্ব নিয়ে বলল"নকশার জন্য, তোমার বাবার বানানো নকশায়, এমন কিছু ছিল যা একবার হাতে পেলে তারা পুরো রাষ্ট্রই দখল করে নিতে পারবে, সেই সূত্র জয় করতেই যুদ্ধে নেমেছে তারা। আর তোমার হাতেই দিয়েছিল সেই নকশা মৃত্যুর আগে তোমার বাবা।জানি তোমার কিছু মনে নেই কিন্তু এটা শতভাগ সত্যি তারা শীঘ্রই তোমার কাছে আসবে, সেই নকশা উদ্ধারের জন্য।
ডালির বুকের ভেতর যেন কিছুর চিড় ধরল।
"শুধু নকশার জন্য?
শুধু পরিকল্পনার জন্য?"
আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হতে লাগলো, তবে কি কারনাইন সেই নকশার খোঁজে বারবার তার সামনে এসেছিল?
তার চোখে কেবল রাজ্যের দায়িত্বের ভার যেটা ডালি ভুল করে প্রেম ভেবেছে?
---
ডালি ফিরতে ফিরতে ভাবে,
"আমি ছিলাম কেবল একটি নকশা?
একটি পরিকল্পনার খুঁটি?"
ডালির মনে পড়ে যায় পবিত্র কোরানের বাণী —
"তোমরা কখনও হতাশ হয়ো না আল্লাহর রহমত থেকে।"
(সূরা আয্-যুমার : ৩৯ : ৫৩)
সে ফিসফিস করে বলে,
"ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তা ফিরে আসবে... যদি না হয়, তবে এও ছিলো আমার নিয়তি।"
ভাবনায় পেছনে ফেলে আসা জঙ্গল, আলোছায়ার ভেলা।
ভেতরে রেখে যায় একটি ম্লান হাহাকার,
একটি একতারা মনখারাপের সুর...
::
::
::
::
আরসালান ঠান্ডা মুখে দাঁড়িয়ে ছিল দরবার কক্ষে। তার মন ভেঙে খানখান। তবুও রাজ্য তো থেমে থাকে না। রাজ্যের দায়িত্ব, পরিবারের সম্মান—সবকিছুর ভার যেন আজ তার একার কাঁধে।
জোসেফার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"ডালি, রাজপরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য, আমার ইচ্ছা তুমি আরসালানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও।"
ডালি স্তব্ধ হয়ে রইলো। চোখে জল জমেছিল, কিন্তু সে মুছে ফেলল তা।
একটা সময় ছিল যখন সে বিশ্বাস করতো ভালোবাসা চিরকালীন। এখন বুঝে গেছে,ভালোবাসা কেবল আঘাতের নাম।
কারনাইন... তার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হাহাকার উঠলো।
সে মৃদু কণ্ঠে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
"আমি রাজি।"
সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। জোসেফার চোখে মৃদু তৃপ্তির ছায়া।
:
:
:
কারনাইন এর মনটা ভালো কিছুদিন ধরে কারণ ডালি তাকে কাছের ভাবে, বেশ আপন করে কথা বলে।, বসে বসে একটা ছক দেখছিল,তখনই অনুমতি নিলো
জিসান, আজ ভয়ে ভয়ে বলল"মহামান্য, লুবনান পাহাড়ে বিয়ের আয়োজন চলছে।
বিশেষ পাত্তা না দিয়ে প্রশ্ন করল "কার বিয়ে?"
"ডেলসি রোজের সাথে আরসালান এর"
বিস্ফোরিত চোখে তাকাল কারনাইন। জিসানের ভয় আরো বেড়ে গেল কারণ সে তার মহামান্য এর মন বুঝতে পারছে কিছুটা। ডেলসি রোজের প্রতি সে আগে কখনো আগ্রহী না থাকলেও এখন বেশ ভাবে মেয়েটিকে নিয়ে। তা না হলে জিসান কবেই তাকে তুলে এনে নকশার রহস্য উন্মোচন করে ফেলত।
:
:
:
সবকিছু ঠিকঠাক এগোতে লাগল। বিয়ের আয়োজন শুরু হলো। ব্যস্ততা, সাজসজ্জা, অতিথিদের আগমন—সবকিছু যেন কোনো মহোৎসবের পূর্বাভাস।
কিন্তু ডালির মন ছিল ঝড়ের মুখে নীড়ের মতো,ভাঙার অপেক্ষায়।
বিয়ের দিন::
সোনার মুকুটে সুসজ্জিত আরসালান দাঁড়িয়ে আছে মঞ্চে। চারদিকে মানুষের ভিড়। গম্ভীর পরিবেশ।
ডালি ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল মঞ্চের দিকে, গায়ে অপূর্ব রূপকথার মতো সাজ, কিন্তু চোখের ভাষা বলছিল—সে এখানে নেই, তার মন কোনো অজানা আঘাতের ভেতর হারিয়ে গেছে।
ঠিক তখন...
বাতাসে একটা গর্জন!
"থামো!"
প্রাসাদের বিশাল দরজা গড়িয়ে খুলে গেল।
ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশ করলো কারনাইন!
কালো পোশাক, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,এক অদম্য শক্তির আবহ তাকে ঘিরে। যেন কোনো দূতের মতো, কোনো রাজ্যের চাবিকাঠি হাতে এসেছে সে।
সবাই স্তব্ধ। কেউ নড়ছে না।