ছাদ থেকে সারা শরীর হেলে পড়লো ডালির।
কারনাইন তখন বিদ্যুৎবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে ছাদের নিচে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
তার কণ্ঠ ফেটে চিৎকার বের হলো
"ডালি! ডালি! থামো!"
কিন্তু সময় ছিল নিষ্ঠুর।
ঘোড়ার সর্বোচ্চ বেগও থামাতে পারলো না সেই অনিবার্য পতনকে।
ডালি আকাশ চোখে বাতাসের বেগ ছিন্ন করে নেমে এলো মাটির দিকে।
একটুর জন্য, একটিমাত্র মুহূর্তের জন্য, হয়তো কারনাইন তার হাত ছুঁতে পারতো,
কিন্তু না, সে পৌঁছাতে পারলো না।
এক বিকট শব্দে ডালির দেহ আছড়ে পড়লো রাজপ্রাসাদের পাথুরে মেঝেতে।
সারা আঙিনা স্তব্ধ।
শুধু কারনাইনের বুকফাটা চিৎকার ভেসে আসছিল।
"ডালি! না—!"
সবই যেন স্বাভাবিক কিন্তু খনিকের মধ্যেই গল গল র|ক্তের দেখা মিললো।
ডালিকে কোলে তুলে নিলো কারনাইন।
সে মাটিতে বসে হাহাকার করতে লাগলো।
তার চোখের পানি, রক্তমাখা মাটির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
তার কণ্ঠ থেমে থেমে, ভারী, ভাঙা হয়ে উঠছিল
"তুমি আমার পৃথিবী... তুমি আমার জীবন...ডালি...!"
ডালি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কারনাইনের মুখের দিকে তাকালো।
অস্পষ্ট দৃষ্টি।
অর্ধভাঙা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলল—
"তুমি...তা-ই... যা আমি চেয়েছিলাম..."
শেষ শব্দগুলো থেমে গেলো।
ডালির দেহ নিস্তেজ হয়ে কারনাইনের বুকে ঝুলে রইলো।
---
ঘোড়া ছুটিয়ে এসে পৌঁছাল আহত আরসালান আর জিসান।
দূর থেকে তারা এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখলো।
আরসালানের চোখ ছলছল করছিল।
সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না ঠিকঠাক।
আর জিসান মনেমনে ফিসফিস করে বললো,
"ঠিক এমন করেই সেদিন লিলেক অসহায় হয়েছিল কিন্তু কারনাইন তার কষ্ট অনুভব করেনি। আজ, নিজের ভালোবাসা হারিয়ে, সে বুঝতে পারছে হারানোর বেদনা।হয়তো ব্যাথা যার কষ্ট ও তার। আজ একই পরিস্থিতি তে মহামান্য।
ভালোবাসা মানুষকে সত্যিই এভাবে নিঃস্ব করে দেয়।সবাই দূর্বল প্রিয় মানুষের প্রতি,নিজের আবেগের প্রতি।"
::
::
সারা প্রাসাদ যেন নিস্তব্ধ র|ক্তপাতের সাক্ষী হয়ে রইলো।
জুলকারনাইনের কান্নায় আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছিল।
কারও কোনো শব্দ নেই।
কেউ সাহস করেনি এক পা এগিয়ে আসতে।
আজ ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেলো"
রাজা জুলকারনাইনের অবিনশ্বর কান্না।"
:
:
:
হালকা আলো।
মৃদু ঝাপসা ভেসে আসছে চোখের কোণে।
ডালি ধীরে ধীরে চোখ পিটপিট করে খুলছে।
ডালি দম নিতে নিতে আবছাভাবে অনুভব করলো,
সে যেন ফিরে এসেছে।
বর্তমানে।
নিজের পরিচিত জগতে।
কিছু একটা টিপ টিপ শব্দ করছে। ডালির চোখের পাতায় আলো পড়ে। সে আবারও আস্তে করে চোখ খুলে দেখে,
সাদা সিলিং, হাসপাতালের মন্থর বাতাস।
পাশে মা বসে আছে, চোখে পানি।মিসেস তানিশা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে "তুমি ফিরে এসেছো মা!"
ডালি ধীর গলায় বলল" কী হয়েছে?"
এক্সিডেন্টের পর তোমার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। ডাক্তার বলেছে এটা ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি (TBI), সেই থেকে তুমি তিন মাস দুই দিন কোমায় ছিলে।"
ডালির মাথায় ঝিম ধরে। কোনদিনের কথা?কার কথা? কিছুই মনে পড়ে না স্পষ্ট করে।
…
সম্পূর্ণ চেকাপের পর,
ডালি বাসায় ফিরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এই কি তার ঘর?
ছোট্ট বারান্দাটা নেই, দেওয়ালে নেই তার শৈশবের ছবিগুলো।
ঘরের গন্ধটাও অচেনা। যেন তার চেনা জগত ভেঙে নতুন এক অজানা রাজ্য তৈরি হয়েছে।
মা কাছে এসে বলে " এখন নতুন এই বাড়ি আমাদের ঠিকানা।"
ডালি জানে না কেন?কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও একটা শূন্যতা জন্ম নেয়। স্বপ্নের মতো হারিয়ে গেছে তার সবকিছু।
নিজের বরাদ্দ কামরায় থাকে সে, রাতে দিনে তার সেবার জন্য একজন মহিলা আছে।মিসেস তানিশা ও ডিউটি থেকে ফিরে এলে, মেয়েকে সময় দেয়।
ডালি বই পড়ে, কুরআনের তেলওয়াত শুনে।নিয়মিত ওষুধ খায়।ছোটবেলা থেকেই তার মা একটি রুলস করে দিয়েছিল। রোজ যেন দুই লাইন হলেও বাংলা আয়াত পড়ে, যেটা তাদের চলার পথে গাইড করবে।
সে আর হামীম তখন বিরক্তবোধ করতো কিন্তু এখন ডালির সত্যিই ভালো লাগে।
ডালি প্রায় কামরা থেকে বের হলে ঘরের মাঝখানে উঠে যাওয়া সিড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে।একদিন জিজ্ঞেস করেছিল তার সেবিকা মহিলাটিকে," উপরে কে থাকে? "
কিন্তু মহিলা বলতে পারলো না নিশ্চিত করে "হয়তো একজন ডাক্তার।"
সপ্তাহখানেক পর চেকআপে যাওয়ার সময় ডালি হস্পিটালের করিডোরে দেখতে পায় তাকে — ডক্টর জুলকার।
অবচেতন একটি টানে, কোনো যুক্তি ছাড়াই, সে ছুটে যায় এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে।
ডক্টর জুলকার থমকে দাঁড়িয়ে যায়, বিস্ময়ে তাকায় ডালির দিকে। আস্তে করে মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলে
"ডালি?"
ডালি জানে না কেন?কিন্তু তার মনে হলো এই মানুষটা খুব আপন, না পাওয়া কোনো কিছু, কন্ঠটা ও পরিচিত হয়তো তার স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া কেউ।
জুলকারের চেহারায় ফুটে ওঠে আবেগ আর বিস্ময়ের মিশেল।
আর ডালি মনে মনে বলে
"আমি জানি না তুমি কে কিন্তু তোমাকে হারাতে ইচ্ছে করে না।"
মিসেস তানিশা সাক্ষী হয় এই দৃশ্যের কী আশ্চর্য? ডালি এক্সিডেন্ট এর আগে কতটা চঞ্চল, ঘাড়ত্যাড়া ছিল কিন্তু এখন যেন হঠাৎ করেই খুব পরিপক্ক হয়ে গেল।
জুলকার সেই দিন থেকেই ডালির খেয়াল রাখছে যেদিন তারা দেশে ফিরেছিল।ডালির মা ও হাতে পায়ে বেশ ব্যাথা পেয়েছিল।
জুলকার এই তিনমাসে কীভাবে ডালিকে একটু একটু যত্ন করে ভালোবাসতে শুরু করেছে তা অচেতন ডালি না দেখলেও পুরো হস্পিটালের সবাই দেখেছে।
ছেলেটা শুধু চেয়েছে ডালি দ্রুত ফিরে আসুক। রোজ ডালির সাথে সময় করে গল্প করতো, হাসতো,গাইতো, বিভিন্ন ভাবে ডালির খেয়াল রাখতো।
"ডালি একটি গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পায়। সেই আঘাতের কারণে তার মস্তিষ্কে ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি (Traumatic Brain Injury - TBI) হয়।
এই ইনজুরির ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা তাকে প্রলম্বিত কোমা (Prolonged Coma) বা দীর্ঘ সময় অচেতন অবস্থায় নিয়ে যায়।
জুলকার ডাক্তার হওয়ার কারণে পরিস্থিতির গুরুতর অবস্থা বুজতে পেরেছিল। সে নিজেও দেশে ফিরে অপেক্ষা করছিল, ডালির সাথে মিশবে, একে অপরকে জানবে কিন্তু ভাগ্য যেন পুরো দৃশ্যই পালটে দিয়েছে ।
এখন জুলকার নিজের বাড়িতেই তাদের নিয়ে উঠেছে। ডালি জানেনা কিন্তু সেই সিড়ির উপরের ঘরটিতে জুলকার থাকে।রোজ রাতে কাজ সেরে ঘরে ফিরতেই ডালিকে সে একবার দেখে যায়। ডালি ঘুমে থাকে বলে জানেনা।
আজ নিজের সাথে জড়িয়ে থাকা ডালিকে দেখে তার মনে হচ্ছে, কোমায় থাকা রোগীরা রেস্পন্স করতে না পারলেও অনেক কিছু শুনে এবং বুঝে হয়তো জুলকারের উপস্থিতিও সে অনুভব করতে পারতো।
কিন্তু আসলেই ডালির সাথে কি হয়েছিল? তা কেউ জানিনা আমরা হতে পারে কল্পনা কিংবা কোনো ঐতিহাসিক সত্য!
সব প্রশ্নের যে উত্তর হয়না।
"তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আর্শে সমাসীন হন। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তার ‘ইবাদত কর। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না ?
(সূরা : ইউনুস : ৩)
লেখিকার নোটঃ জানিনা কি হয়েছে হঠাৎ করে সবাই পিছু হটেছে কেন। তবে আমি একটুও হতাশ হইনি কিংবা তাড়াহুড়ো করিনি, যেমনটা সাজিয়েছি ওভাবেই লিখে শেষ করেছি।