চাঁদের আলোয় প্রাসাদের প্রাচীর গুলো যেন আরও বেশি নির্জন লাগছিল। সেই নীরবতার ভেতরেও ডালির মনে চলছিল দোলাচল।
লিলেকের মুখে অকপট স্বীকারোক্তি শুনে ডালি গভীর ভাবে ভাবছিল"ভালোবাসা এতই কি শক্তিশালী যে সমস্ত নিয়ম-নীতি ভেঙে ফেলে?"
পরদিন সকালে ডালি একা একা বাগানে হাঁটছিল। হঠাৎ কারও কণ্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ায়।
"আপনি এসব কী বলছেন,রাজকুমারী লিলেক?"
এই স্বরটা ছিল মার্সেলের। গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে ডালি দেখতে পেল, লিলেক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
"আমি জানি, আমাদের জন্য কোনো ভবিষ্যৎ নেই," লিলেক মৃদুস্বরে বলল, "তবুও,তুমি থাকলে সব ভয় কমে যায়, মার্সেল।"
মার্সেল চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, তারপর এগিয়ে এসে লিলেকের হাতে থাকা লকেট উপেক্ষা করে বলল"আপনি আমার ছোটবেলায় খেলার সাথী ছিলেন,এখন আর কিছু শৈশবের মতো নয়,সেই গণ্ডি অনেক আগে পেরিয়ে গেছি আমরা সাথে বদলে গেছি আমিও। তাছাড়া আপনার প্রতি, আমার কোনো বিশেষ অনুভূতি ও নেই।
"আবার "আপনি "করে বলছ?লিলেক আহত চোখে তাকাল।
ডালির বুকের ভেতর হালকা একটা কষ্টের ঢেউ উঠলো।
ভালোবাসা যে এতো কষ্টের হতে পারে, তা সে আগে কখনো কল্পনাও করেনি।
ঠিক তখনই প্রাসাদের দিক থেকে তাড়াহুড়ো করে ছুটে এলো এক দাসী।
"রাজকুমারী লিলেক! রাজকুমারী লিলেক! মহামান্য নিলসন এসেছেন, আপনাকে এখনই রাজদরবারে ডেকে পাঠিয়েছেন!"
চোরা চোরা চোখাচোখি হলো দুজনের মধ্যে। কিছু না বলেই লিলেক দাসীর পিছু নিলো।
ডালিও তাড়াতাড়ি ফিরে গেল তার নিজের ঘরে। মনে অজানা অস্বস্তি।
---
আর মাত্র তিন দিন বাকি বিয়ের। মনমরা হয়ে বসে আছে লিলেক। চারিদিকে চলছে তোরজোর আয়োজন। বিভিন্ন জায়গা থেকে সম্মানিত লোকজন আসবে এই বিয়েতে। জোসেফার তো অনেক পরিকল্পনা ও করে নিয়েছে রাজনৈতিক।
ধনীর ঘরে অনুষ্ঠান মানেই হলো নিজ নিজ সুযোগ সন্ধান করা।কীভাবে আরো লাভবান হবে সেই ফোন্দি আটছে সে।
"যারা আমার (আল্লাহর) আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে তারা বধির ও মূক, অন্ধকারে রয়েছে। যাকে ইচ্ছা আল্লাহ্ বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি সরল পথে স্থাপন করেন।
(সূরা আল আনাম: ৬ : ৩৯)
:
:
:
ডালির ও মন ভালো নেই। লিলেকের মুখ দেখলেই খারাপ লাগে আজকাল , মনের কথাগুলো প্রকাশ করার একটা মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না সে, কারনাইন ও যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
চাঁদের ম্লান আলোয় ডালির কক্ষ যেন স্বপ্নের রাজ্য হয়ে উঠেছিল। দরজার আড়াল থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো কারনাইন। বহুদিন পর।
ডালির নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামায় সে থমকে দাঁড়াল। এই মুখ যেন কোনো অজানা সুরের মতো শান্ত, কোমল।
কারনাইন নিচু গলায় ফিসফিস করে ডাকে,
"ডালি..."
ঘুমের ঘোরে ডালির চোখ কাঁপে, তারপর ধীরে ধীরে খুলে যায়।
আঁধার ছেঁকে ফুটে ওঠা পরিচিত মুখ দেখে ডালির চোখে বিস্ময়ের আভা।
কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়,ভয় পায় যেন স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
দুজনের মাঝে এক অদৃশ্য সুর বাজে।
কারনাইন এগিয়ে এসে ডালির কপালে স্পর্শ না করেই থেমে যায়।
শুধু গভীর দৃষ্টিতে বলে,
"তুমি ঠিক আছো তো?"
ডালি কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে,
"আপনি, এসেছেন?"
আর কিছু বলার সাহস হয় না।
কোনো শব্দ নেই, শুধু দুজনের ভেতর নীরব ভালো লাগার ঢেউ।
কারনাইন নীরবতা ভেঙ্গে বলল "তোমাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে, কিছু কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?"
"হ্যাঁ হয়েছে।"সরল স্বীকারোক্তি ডালির।
কারনাইন বেশ চিন্তিত হয়ে বলল" বলো আমাকে, আমি সব ঠিক করে দেবো।"
"কেন বলুন তো?সবসময় আপনিই কেন আমার চিন্তামুক্ত করবেন?"
এই কথার কোনো উত্তর খুঁজে পেলোনা কারনাইন। শুধু নির্লিপ্ত চোখে অবাধ্যভাবে চেয়ে রইলো।
কিন্তু সময় নির্মম।
একটি ধ্বনি দূরে কোথাও বাজতেই কারনাইন সরে দাঁড়ায়।
ডালির চোখের কোণে ঝাপসা আলো।
কারনাইন একবার ফিরে তাকিয়ে চলে যায়, রাজকীয় দায়িত্বের অদৃশ্য শিকলে বাঁধা পড়ে।
পেছনে থেকে যায় কেবল একটি শূন্যতা, আর অনুচ্চারিত অনুভূতির উষ্ণতা।
:
:
:
আজ সূর্যের আলো যেন লুকোচুরি খেলছে,মেঘের ভেলারা লুকিয়ে গিয়ে ঝরের আবাস দিচ্ছে, এ যেন আসন্নবর্তী বিপদ।
পাহাড়ের চূড়ায় সৈন্যের সমাবেশ তবে অল্প কিছু সংখ্যক । বিকেলের বাতাসে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
নিলসন দাঁড়িয়ে আছে ঘোরের মধ্যে, হাতে এক চকচকে রুপালি ছুরি। তার সামনেই বাঁধা মার্সেল ভেনকো,নিঃশব্দ, নির্বাক। মুখে কোনো অনুশোচনা নেই, কেবল নির্জীব সম্মানবোধ।
ডালি আরসালানের পাশে দাঁড়িয়ে। তার বুকের ভেতর কাঁপছে ভয়, কিছু একটা ভয়ঙ্কর ঘটতে চলেছে সেটা আঁচ করতে পারছে সে।
লিলেক একটু দূরে, ফর্সা মুখে যেন সমস্ত রক্ত শুকিয়ে গেছে। সে ও কাঁপছে, চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রু বাধভাঙার অপেক্ষায়।
নিলসন হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল,
"রাজকীয় নিয়ম ভঙ্গের শাস্তি মৃত্যুই! আজ এই বিশ্বাসঘাতক তার ফল ভোগ করবে!"
মার্সেল মাথা নিচু করে রেখেছে। কথা বলে কি আর লাভ আছে? নিজের প্রাণের চাইতেও লিলেকের সম্মান রক্ষাই তার কাছে বড়।
চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠে।
লিলেক কাঁপা কাঁপা গলায় অনেক সাহস সঞ্চয় করে বলল "মার্সেল এভাবে কেন বাঁধা আছে? ওর কী দোষ এমন? কী করেছে সে?"
এক মুহূর্ত দেরি না করে নিলসন ছুরি ছুড়ে মারে মার্সেলের দিকে।
ছুরি গিয়ে বিঁধে তার কাঁধের কাছে!
মার্সেল এক পা পিছলে যায়, পাথর গড়িয়ে পড়ে গা ঘেঁষে। ঠিক পাহাড়ের ধারে এসে দাঁড়ায় সে, মৃত্যুর কিনারায়।
"মার্সেল!" লিলেক চিৎকার করে ছুটে আসে। কারো বাধা দেওয়া বা আটকানোর সুযোগ নেই।
সে দৌড়ে এসে মার্সেলের হাত আঁকড়ে ধরে। মার্সেল ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে,
"ছাড়ো লিলেক... তোমাকে বাঁচতে হবে..."
কিন্তু লিলেক জেদে মাথা নাড়ে।
"তুমি ছাড়া আমার বাঁচার মানে নেই!"
ঘৃণা ভরা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো নিলসন। সে যেন একেবারেই নিশ্চিত হলো। সে সঠিক পথেই আছে এবং এদের শাস্তি পাওয়া উচিত।
হাতের মুঠো দুর্বল হয়ে আসছিল। পাহাড়ের বাতাস চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। পায়ের নীচে মাটি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
মার্সেল শেষ চেষ্টায় ফিসফিস করে বলল,
"তুমি আমার হৃদয়ের রাণী হয়ে থাকবে সবসময়, একটি নয় এমন কয়েকটি জীবন ও তোমার রক্ষায় কম পড়ে যাবে আমার।"
লিলেক অশ্রুসিক্ত হাসে। ধরা গলায় বলে,
"আজ প্রথমবার স্বীকার করলে তবে,,?"
মার্সেল ধাক্কা দিলো"ফিরে যাও,যাওও।"
"কখনও না।"
মুহূর্তের ভেতর ভারসাম্য হারায় দুই শরীর।
লিলেক আর মার্সেল একসাথে পড়ে যায় পাহাড়ের অতল গভীরে।
নিচ থেকে ভেসে আসে শুধু একটা শেষ চিৎকার—তারপর নিস্তব্ধতা।
আরসালান এর হাত ফসকে গেল লিলেক এর অবশিষ্ট কাপড়ের অংশ।
ডালি হাঁপিয়ে উঠল, ঠায় দাঁড়িয়ে, যেন সময় জমে গেছে।
আরসালান নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলো।চিৎকার করে বলল লিলেক এ তুমি কি করলে? লিলেক দয়া করে ফিরে এসো।তুমি যা চাইবে তা ই হবে, ফিরে এসো বোন আমার।
কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো সে।
নিলসন ছুরি ফেলে দিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল, বোঝার চেষ্টা করল কী হারালো সে আজ।এমন তো সে চায় নি।
ডালির মনে পড়ল পবিত্র কোরানের সেই বাণী,
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি "
(সূরা আল ইনশিরাহ:৭)
সে ফিসফিস করে বলল,
"ভালোবাসা হারায় না... ভালোবাসা শুধু রক্ত দিয়ে লিখে যায় নিজের ইতিহাস।"
পাহাড়ের গায়ে তখনও দোলা দিচ্ছে লাল সূর্যের শেষ আলো, ঠিক যেন কারও বিদায়বার্তা।
রাতের অন্ধকারে কারনাইনের সামনে সব ঘটনা ব্যক্ত করলো প্রত্যক্ষদর্শী জিসান।
কারনাইন বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল"বাহ! বেশ নাটকীয় হয়েছে, তবে এমন টা হবে ভাবিনি । জোসেফার ভালোই শিক্ষা পাবে। মুখ নিচু হয়েছে নিশ্চয় ওর?পরিকল্পনা কম করেনি সে মেয়ের বিয়ে নিয়ে।
"জানিনা মহামান্য তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে? "
"কি?"
"এতোটা ব্যক্তিগত ব্যাপার আপনি কি করে জানতে পারলেন?" জিসানের গভীর প্রশ্নবোধক চাহনি।
কারনাইন এর মনে পড়লো ডালি ঘুমের ঘোরে বলেছিল সে রাতে, তার মন খারাপের এই ব্যাক্তিগত কারণ।
কথাটির উত্তর না দিয়ে কারনাইন হঠাৎ বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো "ডেলসি রোজ কোথায় ছিল তখন?"
জিসান বলল "সেও উপস্থিত ছিল পাহাড়ে। জমে বরফ হয়েছে তার অনুভূতি, এতোক্ষণে নিশ্চয়ই কেঁদে কেটে একাকার ।"
কথা শেষ হতে না হতেই, কারনাইন কিছু না বলে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।জিসান ডাকল মহামান্য কোথায় যাচ্ছেন?
"এক্ষুনি যেতে হবে আমায়। বাকি সব সামলে নিও।"