রাজকুমার আরসালান, প্রাসাদের ঠিক পেছনের দিকটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার সাথে কোনো সৈনিক কিংবা রক্ষী রাখেনি।ধনুক,বর্শা চালানো কিংবা ঘোড়ার পিঠে চড়ার চায়তেও তার একটি অন্যতম শখ হলো মাছ ধরা।কিন্তু রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ হওয়ায় সে কী করবে না করবে সবই যেন সীমাবদ্ধ। চায়লেও পছন্দের সব করতে পারে না। তাই কখনো কখনো কাউকে সাথে না নিয়েই বেরিয়ে পরে নিজের গন্তব্যে। আজ ও সে সকল ব্যস্ততা কাটিয়ে নিজের জন্য সময় বের করে নিয়েছে।
বরাদ্দকৃত ঘোড়ায় উঠতে যাবে তার আগেই দ্রুতগতিতে আসা কারো সাথে ধাক্কা লাগলো। রাজকুমারের স্থান নড়েনি একটুও তবে অপরজন সামলাতে না পেরে মাটিতেই পড়ে গেল।
রাগান্বিত স্বরে বলল"উফফ আজ যে পারছে সে ই আমাকে মাটিতে মিশাচ্ছে।বলি কি তোমরা কী শুধু আমাকেই দেখছ চোখে?
আরসালান দ্রুত বসে ডালিকে তোলার চেষ্টা করল।
"দুঃখিত আমি আপনাকে লক্ষ্য করিনি।"
ডালি কাঁদো কাঁদো চোখে থমথমে মুখ বানিয়ে বলল"সব দোষ আপনার।
ভেংচি কেটে আবার দৌড়ে পালালো সে।
কিন্তু আরসালান আগের স্থানেই বসে রইলো , সে অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে ডালির দিকে। মুখে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো "ডেলসি রোজ?"
:
:
:
:
ডালি ময়লা কাপড় চোপড় পালটে বসে আছে পাতানো শক্ত বিছানায়। দু হাটুর উপর হাত রেখে ধীরে ধীরে মুখের ভার রাখল। সে যে গভীর চিন্তায় মগ্ন সেটা তার মুখ দেখে যে কেউ বলতে পারবে।
পাশের একজন বলে উঠলো "কী ভাবছ এতো?
শোন ডালি তুমি কিন্তু ভীষণ কাজ চোর। "
"জানি, মা ও বলেন।"
"পাগল মেয়ে, ঘুমিয়ে পড়।"
ডালি সেই আগের মতই বসে আছে। সে এখনও বুঝতে পারছেনা, কী হচ্ছে এসব তার সাথে? এই মানুষ গুলোর ভাষা সে বুঝতে পারে এবং বলতেও জানে।
কিন্তু তার মনে হয় না এই দুনিয়ায় এর আগে তার কোনো অস্থিত্ব ছিল।ছোটবেলার কোনো স্মৃতি নেই, না আছে পরিচিত কেউ, এই জীবন যাত্রা,সংস্কৃতি, রীতি নীতির সাথেও অভ্যস্ত নয় সে। তাহলে এখানে কীভাবে এলো?
:
:
:
:
হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে সব উৎকৃষ্ট বস্তু বৈধ করেছেন, সে সকলকে তোমরা অবৈধ করো না। এবং সীমালংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।(আল-মায়িদাহ :৮৭)
চার-পাঁচদিন এদিক সেদিক ঘুরেই কেটে গেছে। হঠাৎ করে একদিন সবার সাথে বেরিয়ে গেছে কাজে, সেখানে একদল রান্নার জন্য কাঠ কাটছে আবার অনেকেই ফলমূল, সব্জি সংগ্রহ করছে রাজবাগান থেকে।ডালিও কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে সবজি তুলছে। মনোযোগ দিয়ে অনেক্ক্ষণ কাজ করার পর তাকে পেছন থেকে কেউ বার কয়েক টোকা দিয়ে ডাকল।
"কী হয়েছে?"বলে ফিরতেই এক আঙ্গুল দিয়ে তার ঠোঁট চেপে কেউ ফিসফিস করে বলল " চলো আমার সাথে? "
ডালি কোনো রূপ প্রতিবাদ করার আগেই, হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঘন জঙ্গলের দিকে।
পেছনে ফিরে বেশ কয়েকবার তাকালো, কেউ তাকে লক্ষ্য করছে কিনা এরপর হাঁটতে হাঁটতে বলল "আপনি কে বলুন তো? "
পুরুষটি বলল"কেন সেদিনই তো বলেছিলাম। আমি তোমার রক্ষক।"
গাছের ঘনত্ব কমে গিয়ে পরিষ্কার পাহাড়ের মাঠে এসে পড়েছে তারা।
"ওহ হো, আমি তা জিজ্ঞেস করিনি। বলছি আপনার পরিচয় দিতে। "
মাথায় পাগড়ীর মতো প্যাঁচানো কাপড়ের অংশে তার মুখ ও বন্ধ। কেবল দেখা যাচ্ছে চোখ দুটো।তীক্ষ্ণ চোখ জোড়ায় কৌতুহল স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে।
"তুমি কী আমায় চিনতে পারোনি? "
ডালি বিস্ময় নিয়ে বলল "আমার কী আপনাকে চেনার কথা? "
"অবশ্যই "
"কিন্তু কীভাবে?আপনার চেহারা অব্দি দেখিনি আমি। "
সাথেই সাথেই মুখ থেকে পর্দা সরিয়ে বলল "কারনাইন, এবার চিনতে পেরেছ? "
ডালি আরো জোড়ে মাথা নাড়ালো " উহু, একটুও না। "
"ডেলসি রোজ, তোমার কি স্মৃতি লোপ পেয়েছে? "
ডালি এবার সহসা উত্তর দিল "আমি ডালি আহমেদ, গোলাপ,জবা এসব আমাকে ডাকবেন না। আমি শুধু ডালি নামটায় ভালোবাসি।"
"কিন্তু"বিশেষ কিছু একটা ভেবেও মুখে কিছু বলল না কারনাইন।
ফের বলল" ঠিকাছে মানলাম।তা বিপদ থেকে একটু দূরে থাকার চেষ্টা করো।
কে বলেছে আমি সব সময় বিপদে পড়ি? সেদিন আপনার কারণে চোরাবালিতে পড়তে হলো" ডালি একটু চটে গিয়ে বলল।
যে বিপদে ফেলে সে কি করে সব কৃতিত্ব নেই বলুন তো? আপনি আমাকে বাঁচাননি কেবল প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।
কারনাইন কম কথা বলে তবে খুব শান্ত স্বরেই প্রতিটি কথার উত্তর দেয় "সেদিন জঙ্গলেই তো বন বাসীদের খাবার হয়ে যেতে। ঠিক সময়ে না এলে।"
"বন বাসীদের খাবার?" ডালির মনে পড়লো প্রথম দিনের ব্যাপারটা। চমকে উঠে বলল ওরা মানুষ খায়?
"হ্যাঁ হয়তো, তবে মেয়ে মানুষদের একটু বেশিই খায়।"
কথাটা শুনে ডালির কেমন লজ্জা পেল "ছিঃ" অসভ্য। "
"হ্যাঁ সেটায় তো বলছিলাম। "
"ওদেরকে নয় আমি আপনাকে বলেছি। " ডালির কথাটি শুনে কারনাইন অবাক হল "আমি অসভ্য?"
"জ্বি হ্যাঁ। তাছাড়া আপনিও তো দেখতে ওদের মতই হঠাৎ চমকে তাকালো পুরুষটি।
ডালির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলো একধ্যানে। কিছু একটা ভাবছে হয়তো কিন্তু কি ভাবছে তা বুঝা মেয়েটির কল্পনার বাইরে।
ডালির কিছুটা মনে পড়লো সেদিন জ্ঞান হারানোর আগে কেউ একজন র|ক্তাক্ত করেছিল ওই বন বাসীদের। ঘটনা মনে পড়তেই বসা থেকে উঠে পড়লো সে।এতক্ষণ তারা দুজনেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল ঘাসের উপর কিন্তু এমন একটা ভয়ংকর দৃশ্য ভাবতেই ডালির মনে আতংক ছড়িয়ে পড়ল। সে কার সাথে বসে আছে এই মুহূর্তে জানেনা।
ঝুড়ি কাঁধে উঠিয়ে কিছু না বলেই দৌড়ে ফিরে যাচ্ছে সেই জঙ্গলের পথে।
কিছুটা পথ যেতেই ডালির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল কারনাইন।দ্রুত গতিতে চলা শ্বাস প্রশ্বাসের সাথেই বলল" এভাবে দৌড়াচ্ছ কেন হঠাৎ? "
ডালির চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ বুঝা যাচ্ছে। পাশ কাটিয়ে আবার জোরে হাটতে লাগলো সে।
পেছন থেকে হাত টেনে ধরলো কারনাইন।কী ব্যাপার, তুমি আমায় ভয় পাচ্ছো?কিন্তু আমি তো তোমার ক্ষতি করিনি! "
ডালি কাঁপা কন্ঠে চোখে চোখ রেখে বলল "আমি জানি এটা বাস্তব নয়। "
সে যেন নিজেকেই সান্ত্বনা দিল। কারনাইন কিছুটা বিষ্মিত চোখে দেখল"আমি তোমার ক্ষতি করতে চাইনা। বিশ্বাস রাখো।"
"কিন্তু আপনি আমার পিছু কেন নিয়েছেন বলুন তো?"
"উহু, পিছু নেইনি বরং তুমি আমার সামনে চলে এসছো বার বার।"
"আমি?" ডালি কিছুটা অবাক হলো।
কিন্তু আপনি কি আমায় চিনেন? "
"হ্যাঁ, তুমি ডেলসি রোজ, দক্ষিণের আরমেনীয় বংশের রাজার মেয়ে, তবে এখন সেই পরিবারে আর কেউ নেই। জায়গাটি দখল করে নিয়েছে আয়ুবিদ রা।
ডালি ভ্রু জোরা তুলে বলল" ওহ তাই নাকি? ইশ খুব খারাপ হলো। বিশেষ পাত্তা না দিয়ে সে হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল, এবার আমাকে যেতে দিন।"
"তুমি না হয়, আমার সাথেই চলো।এখানে থাকলে বাকি সবার সাথে তুমিও রক্ষা পাবেনা।"
"মানে? আপনি কী বলতে চায়ছেন, কী হবে এখানে? "কন্ঠে গভীরতা এনে প্রশ্ন করল ডালি।
" যুদ্ধ।"
ভয়ে অন্তর কুঁকড়ে উঠলো যুদ্ধ শব্দটি শুনেই।আর তার মনে একটি ধারণা জন্মালো "তবে কী আপনি অন্য কোনো রাজ্যের গুপ্তচর?অর্থাৎ শত্রু দেশের?"
ডালির প্রশ্নে সরলভাবেই বলল"আর যদি বলি আমি সেই শত্রু দেশের রাজা। তবে কী যাবে আমার সাথে?"
কারনাইন ভেবেছিল ডালি হয়তো ভীষণ ভয় পাবে কিংবা অবাক হবে কিন্তু তাকে ছাপিয়েই সে বলে উঠলো "মিথ্যে কথা, আপনি কোনো ভাবেই রাজপুত্র কিংবা রাজার মতো নন।আমাকে বোকা বানানোর দরকার নেই, আমি রাজা রাণির অনেক নাটক-সিনেমা দেখে বড় হয়েছি ।রাজকুমারদের পোশাক, গায়ের রং, কথার স্টাইল,হাটার সৌন্দর্য সবই আমার জানা আছে বুঝলেন? এক কথায় তারা অসাধারণ হয়, এই যেমন কয়েকদিন আগেই আমি একজনের সাথে ভুলবশত ধাক্কা খেয়েছিলাম। তাকে এক নজর দেখেই বুঝতে পেরেছি সে নিশ্চিত ঐ প্রাসাদের রাজকুমার হবে।আর আপনাকে দেখে মনে হয় না বিশেষ কেউ হবেন। মানলাম লম্বা-চওড়া আছেন কিন্তু তাই বলে রাজা? হাহ্!সেনাপতিও নেবেনা কেউ, কি ময়লা কাপড় চোপড় পড়ে থাকেন সব সময়।আর ঐ রাজকুমার এর চেহেরাটা, ইশ! কী যে সু,,,
বাকি কথা বলার আগেই মুখ চেপে ধরলো কারনাইন" বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। "
কোমর পেঁচিয়ে এক ঝটকায় কাছে টেনে চোখেচোখ রেখে বলল "সময় বলে দিবে কে তোমার প্রিয় হবে,,,,,,"
ডালি যেন শ্বাস নিতেই ভুলে গেল।আচমকা খোপা খুলে লম্বা চুল গুলো এলোমেলো ভাবে দুলতে লাগলো।
কারনাইন চট করে দুহাতে চুল গুলো পেঁচিয়ে একটি শলাকা পিন নিয়ে গেঁথে দিলো কীভাবে যেন।
ডালি কেবল আশ্চর্য হলো।