প্রাসাদের বিশাল দরজা গড়িয়ে খুলে গেল।
ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশ করলো কারনাইন!
কালো পোশাক, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,এক অদম্য শক্তির আবহ তাকে ঘিরে। যেন কোনো দূতের মতো, কোনো রাজ্যের চাবিকাঠি হাতে এসেছে সে।
সবাই স্তব্ধ। কেউ নড়ছে না।
কারনাইন সোজা এসে দাঁড়াল মঞ্চের সামনে। তার দৃষ্টিতে আগুনের ঝলক।
তারপর গলা উঁচিয়ে বলে উঠল,
"ডালি আমার। তার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি ছাড়া কেউ নেবে না!"
চমকে উঠল সবাই। জোসেফার এর মুখ কালো হয়ে গেল।
ডালি অস্ফুট গলায় বলল,
"কা-র-না-ই-ন"
তার চোখে জল, অভিমানের ঢেউ।আজকাল বড্ড আবেগি হচ্ছে সে, নিজের অনুভূতি দমাতে পারেনা ।
কারনাইন ঘোড়া থেকে নেমে এলো দ্রুত। সামনে এসে ডালির হাত ধরলো।
"তুমি চাইলেও আমি তোমাকে যেতে দেবো না।"
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ যেন কম্পিত হচ্ছিল, কিন্তু দৃঢ়তাও ছিল তাতে।
ডালি মাথা নাড়ল, পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু কারনাইন কোনো সুযোগ দিল না।
সে শক্ত হাতে ডালিকে তুলে নিল ঘোড়ার পিঠে! সবাই দেখতে পেল রাজকীয় দম্ভ ভেঙে ভালোবাসার নির্ভীক প্রকাশ।
ডালি বাধা দিতে চাইল, কিন্তু কারনাইনের কঠিন কণ্ঠ বলে উঠলো,
"আমায় না জানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস কিভাবে হলো তোমার? "
জোসেফার চিৎকার করে বলল"জুলকারনাইন,ছেড়ে দাও ডেলসি রোজ কে।নিরীহ একটি মেয়ের উপর জুলুম করতে চাইছ? ওর পুরো পরিবারকে শেষ করেও তোমার সাধ মিটেনি?"
"জুলকারনাইন " ডালির কানে খুব প্রভাব ফেলল নামটা। আস্তে আস্তে মস্তিষ্কে চাপ পড়ছিল, কানে বারি খেল একটি পুরোনো কথা। হস্পিটালের কাজী যখন জিজ্ঞেস করেছিল "মোঃ জুলকার এহসানের সাথে বিয়েতে আপনার সম্মতি আছে কি?কবুল বলুন।
কবুল বলুন মা।
মূহুর্তেই কথাটা টা ঝাপসা হয়ে আবার ঘটনায় ফিরে এলো কারনাইন এর আওয়াজে" বেশি কথা বলোনা জোসেফার শীঘ্রই তোমার পরিবার ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।"
আরসালান বলে উঠলো "ডেলসি আমার হবু স্ত্রী, তুমি কি করে তাকে নিতে পারো?"
"আমি বলেছি সে আমার নারী অর্থাৎ তার প্রতি এখন কারো অধিকার নেই।"ডালির চুলের খোপা থেকে তার দেওয়া সোলজেড পিন খুলে নিয়ে বলল " আমি প্রথম থেকেই তাকে পছন্দ করে নিয়েছি, এটা নিশ্চয় তুমি আগেও দেখেছ?"
আরসালান চিন্তিত হয়ে পিনের দিকে তাকাল, এটা সত্যি সে সবসময় ডেলসির খোপায় পিনটি দেখেছে।
কারনাইন ঠোটের কোণে হেসে বলল "তোমার অভিব্যক্তি বলছে, আমি সঠিক। তাছাড়া জানোই তো আমি বৈরুতের রাজা। তোমাদের যদি তাতেও সন্তুষ্টি না হয়, সবার সামনে বলছি আমি এই মেয়েকে এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রার মোহরানায় স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করছি।
জোর করে একটি কালো কাপড়ের থলি ডালির হাতে দিলো সে।
আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না।
ঘোড়া ছুটে চলল পাথুরে পথের দিকে—
ডালি, কারনাইন আর বাতাসের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেল কোনো দূর নীলাভ অসীমে।
সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
জোসেফার এর দম্ভচূর্ণ হলো, আরসালানের চোখে ম্লান অভিমান।
ডালি তার হৃদয় খুঁজে পেল নতুন করে।
ভালোবাসা আজ ভয় পায়নি আর,সে নিজেকে প্রকাশ করলো বজ্রের মতো।
:
:
:
:
প্রাসাদের বাতাস যেন আগুনে ঝলসে উঠল।
জোসেফার রাগে কাঁপছিলেন।
তার চোখে যেন আগুনের ঝিলিক।
"অপমান! দ্বিতীয়বার সবার সামনে অপমান!" গর্জে উঠলেন তিনি।
আরসালান হতাশ দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর কেবল কাঁটার মতো বিঁধে আছে ডালির চলে যাওয়ার স্মৃতি।
অন্যদিকে,
কারনাইনের বাসস্থানে ডালি চুপচাপ বসে আছে।
তার মুখে কোনো কথা নেই, চোখে ঝাপসা বিসর্জন।
কারনাইন বারবার তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, মৃদু কণ্ঠে বলছে,
"আমি তোমাকে নকশার জন্য চাইনি, ডালি... তোমাকে সত্যিকারের ভালোবেসেছি। তুমি যখন আমার সামনে এসেছিলে, আমি বুঝেছিলাম, তুমি ডেলসি রোজ নও... তুমি আমার পৃথিবী।"
ডালি চোখ মুছে নিচ্ছে বারবার, কিন্তু কিছু বলছে না।
ভেতরের রাগগুলো জমাট বেঁধে আছে কণ্ঠের গভীরে।
কারনাইন তার সামনে হাটু গেরে বসে আলতো করে দুহাত ধরে বলল"ডেলসি রোজ চাইলেও কখনো তোমার মতো হতে পারবেনা।তুমি সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে অসাধারণ।
:
:
::
::
হতভম্ব ভালোবাসার মাঝেই অন্য এক দুর্যোগ এগিয়ে আসছিল।
দামেস্কের আমির অর্থাৎ কারনাইনের বাবা—ডেলসি রোজের খবর পেয়ে খুশি হয়েছিল।
সে সৈন্যদল পাঠাল ডালিকে আটক করতে।
:
:
:
"সত্যি বলছ?তুমি! তুমি আমাকে ভালোবাসো? "ডালি সরল চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল।
" হ্যাঁ শুধুই তোমাকে। "
"তুমি কি জানো তোমাদের এসব রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আমার সাথে যায় না? এসবের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই? "
কারনাইন অবাক হলো" কিন্তু কেন?"
কারণ আমি এখানকার নই, কীভাবে এসেছি তাও মনে নেই। তবে আমার মনে পড়ে, আমি একদিন সৃষ্টকর্তার কাছে চেয়েছিলাম "যদি আমি অতীতে ফিরে যেতে পারতাম, আমার সতেরো বছর বয়সে, তাহলে হয়তো বাবা-মার পছন্দে বিয়ে না করে, আমি আমার সত্যিকারের ভালোবাসা, আমার সোলমেট কে খুঁজে নিতে পারতাম।
এখন আমি বুঝতে পেরেছি এই বাণীর মর্মকথা :
"যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকেই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ।সূরা ইব্রাহীম : ৩৪"
:
:
:
:
বাবার ষড়যন্ত্রে কারনাইন বাধা হতে পারল না—এক জরুরি কাজে তাকে দূরে পাঠানো হচ্ছে রাজ্যের সীমানায়।যাওয়ার আগে ডালিকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমি ফিরে এসে তোমাকে প্রাসাদে নিয়ে যাব। সেখানে তুমি হবে আমার একমাত্র রাণী। কপালে গভীর চুমু এঁকে না চাইতেও বিদায় নিলো কারনাইন।
ডালির মন ও বেশ খারাপ গত দুইদিন কারনাইন তার এতো যত্ন করেছে। সে নিশ্চিত এটাকেই নিস্বার্থ ভালোবাসা বলে। কোনো চাওয়া পাওয়া নেই সব সত্য জেনেও কারনাইন তাকে মূহুর্তেই মেনে নিয়েছে।বিপদজনক না হলে সে ডালিকেও সঙ্গে নিয়ে যেত।
ডালি জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে তাকিয়ে বুঝে গিয়েছে, সময় ফুরিয়ে এসছে।
সে সিদ্ধান্ত নেয় পালানোর।
তাকে আটকাতে এসে দাঁড়াল জিসান।
কারনাইন তাকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল ডালির রক্ষণাবেক্ষণের ।
ডালি নরম গলায় বলল, "আমাকে যেতে দাও কারণ একজন বন্ধুর জীবন এখন আমার কাছে ঋণ হয়ে আছে।কথা দিচ্ছি ফিরে আসবো। "
জিসান কিছু বলার আগেই অতর্কিতে হামলা চালাল দামেস্কের সৈন্যরা।
ডালিকে মাঝপথেই ধরে ফেলে তারা।
জিসান রুখে দাঁড়ায়, কিন্তু আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
মহারাজার সৈন্যরা কোনো বাধা না মেনে ডালিকে টেনে নিয়ে চলে যায় অজানা গন্তব্যে।
ডালি ঝাপসা চোখে পেছনে তাকায়।
হঠাৎ মনে পড়ে আগের এক রাত—
যখন সে আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছিল জিসান আর কারনাইনের গোপন কথা:
লিলেক আর মার্সেল কে খোঁজ করছে তারা। ডালি বুঝতে পারলো, কারনাইন জড়িত আছে এই ভয়ংকর দুর্ঘটনার সাথে ।
ডালির হৃদয়ে গভীর কষ্ট জমে গিয়েছিল সেরাত।
তবে সে কিছুই বলেনি কারনাইনকে, যতক্ষণ তার সাথে ছিল হাসিমুখেই ছিল।
আজ, সব কিছু ছাপিয়ে, সে কেবল নিজের বন্ধু আরসালানকে,বাঁচাতে চায়। ডালি জানে এখানের কিছুই তার যায়ে আসে না। তবে যদি পারে একবার আরসালান কে বলবে, সে যেন সবকিছু ছেড়ে গিয়ে অন্তত কোথাও বেঁচে থাকে। না হয় যে অকালেই মৃ|ত্যু হবে তার ও।
---
তীব্র কষ্টের মাঝেও আরসালান পৌঁছেছিল ঠিক সময়মতো।
ডালিকে সৈন্যরা টেনে নিয়ে যাচ্ছে—
সেই মুহূর্তে র|ক্তমাখা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আরসালান পথ আটকাল।
ত|লোয়ার হাতে যু|দ্ধের ডাক দিল।
তীব্র লড়াই শুরু হয়।
একাই বহু সৈন্যের মুখোমুখি দাঁড়ায় আরসালান।
তার প্রত্যেক কো|প যেন বজ্রাঘাতের মতো।
কিন্তু সৈন্য সংখ্যা ছিল বিপুল, শক্তি ছিল অসম।
ডালির চিৎকার ভেসে আসে
"আরসালান, থামো! প্লিজ থামো!"
কিন্তু বন্ধুত্বের টানে, সম্মানের জন্য, আরসালান থামল না।
শেষ পর্যন্ত, আ|ঘাতে আ|ঘাতে সে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
র|ক্তে ভিজে গেল পথের ধুলো।
ডালির চোখ ফেটে জল নেমে এলো।
সে ছুটে যেতে চাইলো আরসালানের কাছে।
কিন্তু সৈন্যরা তাকে বেঁধে ফেলেছিল শক্ত করে।
---
ডালিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো দামেস্কের আমিরের সামনে।
গোটা রাজদরবার নীরব।
মহারাজ রুদ্রদৃষ্টি মেলে বললেন,
"নকশা কোথায়?"
ডালি দৃঢ় গলায় বলল,
"আমার কাছে কোনো নকশা নেই।"
আঁখিতে ভয় ছিল, কিন্তু কণ্ঠ ছিল অটল।
তার একটুও গলা কাঁপেনি।
মহারাজ দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন।
"তাহলে তোমার আর কোনো প্রয়োজন নেই।"
সবাইকে অবাক করে দিয়ে ডালি থু থু ছুড়লো মহারাজের উদ্দেশ্যে "আমার নয়, তোর মতো পিশাচের দরকার নেই পৃথিবীতে।জানোয়ার কোথাকার, মরে যাস না কেন? তোদের মতো শাসক দের কোনো প্রয়োজন নেই সাধারণ মানুষের জীবনে।ক্ষমতা লোভী নেকড়ে যাদের কাছে প্রাণের কোনো মূল্য নেই । তোর ধ্বংস ও শীঘ্রই হবে।
দাঁড়িয়ে গেলেন মহারাজ " আমাকে কারনাইন ভেবেছিস? তোদের সব কটা কে মে|রে পুরো রাজ্য আমি দখল করে নিবো।তবে তোর চোখ দুটো তা দেখার সুযোগ পাবে না।
তিনি সৈন্যদের আদেশ দিলেন—
ডালিকে ছাদ থেকে ফেলে হ|ত্যা করো।
ডালি শান্তভাবে চোখ বন্ধ করল।
হয়তো আজ তার শেষ দিন।
কিন্তু তার মনে কেবল একটিই কথা বাজছিল
"ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তা হারায় না। আমি হারালেও আমার ভালোবাসা থাকবে।"
ছাদের কিনারায় তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো।
চারদিক নিস্তব্ধ।
নদীর মতো বয়ে চলা বাতাস কেবল ডালির কান্না চাপা ফিসফাস নিয়ে এলো।এতো উঁচু থেকে ডালি দেখতে পেল দূরে কেউ তুফানের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
সৈন্যরা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে আরো কিনারায় নিয়ে গেল ডালি কে।
নিচের ঘোড়াটি ছুটতে ছুটতে আরেকটু কাছে আসতেই ডালি চিনতে পারলো কারনাইন কে।
হাত বাড়িয়ে জোরে জোরে নাম ধরে চিৎকার করতেই কারনাইন উপরে তাকালো।
সঙ্গে সঙ্গে কারনাইন পাশের দুজনের উদ্দেশ্যে তীর ছুড়তেই ছিটকে পড়ে গেল তারা কিন্তু আচমকা আরো দুজন সৈন্য ছুটে এসে ধাক্কা দিলো ডালিকে।