ডালি কে এমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে, ছেলেটি বলল"আমি আরসালান "
ভয় পেয়ো না। তোমাকে গত দেড় মাস যাবৎ খুঁজেছি আমরা কিন্তু কোথাও পাইনি, শেষমেশ তুমি কি না, আমাদের প্রাসাদেই।
"আমাকে খুঁজছো?" ডালি বোকার মতো প্রশ্ন করল।
"হ্যাঁ"
"কিন্তু কেন?আমি কি করেছি?"
আরসালান বলল"তোমাকে বাঁচানোর জন্য খুঁজেছি, শুনেছিলাম তুমি তাদের হাতে ধরা না দিয়ে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়েছিলে।"
ডালি মনে মনে ভাবলো"কী সব কল্প কাহিনী!আমি কেন মরতে যাব শুধু শুধু। "
তারপর গণ্যমান্য সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, আজ থেকে ডালি এই প্রাসাদেই থাকবে তাও তার পূর্বের পরিচয়ে অর্থাৎ একজন রাজকুমারী হিসেবে।যেহেতু ডেলসি রোজের বাবা জোসেফার এর ভালো বন্ধু ছিল সেহেতু বন্ধুর মেয়ের দ্বায়িত্ব নিতে তার কোনো আপত্তি নেই।
ডালি সমস্ত কিছু শুনে ভাবলো, রাজকুমারীর ট্রিটমেন্ট পেতে গেলে চুপ থাকায় শ্রেয়।কী দরকার অত সত্যি বলার?
তাছাড়া ঐ দাসী গুলোও তাকে কবে বন্ধু ভেবেছিল।ভালো কথা এবার তাদের কে ও দেখে নিবে সে।
"আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বৈ আর কিছুই নয়। আর যারা সাবধানতা অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না?(সূরা আল আনআম:৩২)"
ডালি এই কথা মনে করে আবার দমে গেল।
:
:
:
:
আস্তাবলে ঘোড়ার দেখভাল করছে মার্সেল ভেনকো।বাগদানের পর থেকেই তার সাথে কথা হয়নি লিলেক এর।রোজকার দায়িত্ব সে পালন করে যাচ্ছে তবে আগের মতো মনে কোনো ফুর্তি নেই। লিলেক ও তার সাথে কোনো কথা বলেনা।
এমনকি আজ সকালে সে গির্জায় গিয়েছিল কিন্তু লিলেক তাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছে।
হয়তো নিজের হবু স্বামীর ভাবনায় ব্যস্ত বলে।এসব চিন্তা ভাবনায় বিভোর মার্সেল কে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল লিলেক, ফিরে যাবে তখনই হঠাৎ ধাক্কা লাগলো ডালির সাথে।
কাচুমাচু করে বলল "তুমি এখানে কী করছ?"
ডালি উত্তর না দিয়ে লিলেক এতক্ষণ কি দেখছিল সেই দিকে দৃষ্টি দিল।
লিলেক নজর এড়িয়ে বলল"ডেলসি চলো তোমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাই।"
"হ্যাঁ ঠিক বলেছ, আমার ও ভালো লাগছেনা। "ডালি বলল।
কিছুদিন কেটে গেল এভাবেই আজকাল ডালির সাথে বেশ সখ্যতা হয়েছে আরসালান এবং লিলেক এর। ডালির মতে আরসালান খুবই সভ্য পুরুষ, যার দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যায়।আর লিলেক একজন বিশ্বাসী বন্ধু কিন্তু তারপরেও সে নিজের সত্যটা কাউকে বলেনি।সে যে ডেলসি রোজ না, সেটা প্রকাশ করা খুবই জটিল ব্যাপার ।তাই ডালিও বাকিদের কথায় সুর মিলিয়েছে, তার হয়তো স্মৃতি মুছে গেছে পাহাড় থেকে পড়ে আঘাত পাওয়ার ফলে।
কিন্তু মাঝেমধ্যে ডালিকে এটাও ভাবায় আসলেই কি তার স্মৃতি মুছে গেছে কোনো ভাবে?
:
:
:
:
বেশ অনেকদিন কেটে গেছে, কারনাইন এর সাথে আর দেখা হয়নি তার। তাই তো জঙ্গলের ভেতর গিয়ে ভাবলো হয়তো খুঁজলে পেয়ে যাবে।
চুলের পিন টি নিয়ে এক ধ্যানে চেয়ে আছে ডালি। সবাই বলে এটা খুবই মূল্যবান বস্তু দিয়ে তৈরি, রাতের অন্ধকারেও জ্বলে উঠে অনেকটা রেডিয়ামের মতো।
আচ্ছা কারনাইন কী তাকে পছন্দ করে? তা না হলে কেন সে সবসময় বিপদে পড়া ডালিকে বাঁচাতে আসে?
খুব সুন্দর একটি বট গাছ আছে এই দিকটায় ডালি ভাবলো সেখানে উঠেই বসে থাকবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার পালা, শীত শীত লাগছে বেশ ডালি ভাবলো কারনাইন হয়তো দূরে কোথাও গেছে, এবার সে নেমেই যাবে। একটি ডালে খুব সুন্দর করে বাসা বেধেছে পাখি। ডালি দেখতে পেয়ে হাত বাড়ালো সেদিকে।
মুহূর্তেই ফোস করে উঠলো কিছু একটা।
"ও মাগো লতা সাপ।এটা কোত্থেকে এলো?"
সাপ দেখে যে কারোই গা শিরশির করে, ঠিক তেমনটাই অনুভব হচ্ছে ডালির, তাও আবার গাছের উপর।
তড়িঘড়ি করে নামতেই নিচ্ছিল কিন্তু পা পিচলে পড়ে গেলো একেবারে উপর থেকে, আজ বোধহয় হার গোর ভেঙেছে, তবে পরক্ষণেই কেউ এসে ধপ করে ধরে ফেললো, মাঠে পড়ার আগে।
ডালি ধরফর করা বুকে, চোখ মেলেই ছিল। এমন আকস্মিকভাবে বেঁচে যাওয়াতে সে চোখ আরো বড় করে মেলে রয়েছে।
বুঝতে পারলো একজন পুরুষ তাকে আস্তে করে নামিয়ে দিয়েছে।
ডালি ধুরে সরে গেল দ্রুত।পুরুষটি বলল" ভয় পাবেন না আমি জিসান "
"জিসান? "
"জ্বি"
ডালি তাকে এড়িয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু জিসান থামিয়ে বলল"মহামান্য বলেছিল, আপনার কোনো অসুবিধা হলে যেন আমি সাহায্য করি। "
ডালি তাও কোনো কথা বলল না।
জিসান আবার জিজ্ঞেস করল "মিস, আপনার কি কোনো সাহায্য দরকার ? "
ডালি এবার বিরক্ত হয়ে বলল"আমি আপনাকে কিংবা আপনার মহামান্য কে চিনি না। তাই আপনার কাছ থেকে সাহায্য চাইবার ও প্রশ্ন আসছেনা।
জিসান বোকা বনে গেল,মহামান্য কে চেনেনা?অথচ এই মহামান্যর বদৌলতে দাসী থেকে রাজকুমারীর জীবন যাপন করছে মেয়েটি।
ডালি হনহন করে চলে গেল জঙ্গল ছেড়ে।
লিলেক সারাদিন হাসিখুশির মুখোশ পড়ে থাকলেও রাতের বেলায় সবার অনুপস্থিতিতে চোখের মুক্ত ঝরায় ঘরের এক কোণে বসে।
আজ হঠাৎ ডালির আগমনে ভরকে গেল।নিজেকে সামলাতে পারলো না সে। আমতা আমতা করে বলল"তুমি এসময়ে? কিছু বলবে?"
ডালি অবাক নয়নে এগিয়ে গিয়ে বলল"আমি ভবতাম রাজকুমারীরা কেবল গল্পে দুঃখী থাকে বাস্তবে নয় কিন্তু তুমি তো দেখছি সত্যিই গল্প।
"মানে?"
"ছোটবেলা থেকে যত গল্প শুনেছি সব গল্পে একটা ডাইনি থাকতো কিংবা সৎ মা কিন্তু তোমার তো এমন কেউ নেই, তাহলে কাঁদছো কেন? "
"এমনি,মায়ের কথা ভেবে।"
"যদি বলি মিথ্যে বলছো? " ডালি তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে বলল।
লিলেক তার দৃষ্টি লুকালো"কেন বলছ এমন করে?"
" সাধারণত আমরা কোনো কিছু নিয়ে বেশি দুঃখিত হলেই,মৃত মা-বাবাকে মনে করি। আমার মনে হচ্ছে তুমিও কিছু একটা নিয়ে দুঃখিত কিংবা চিন্তিত। "
ডালির এ কথায় লিলেক এর মন যেন আরও খারাপ হয়ে গেল। সে এবার প্রকাশ্যে কেঁদে দিলো।
ডালি লিলেক কে শান্ত হতে বলে হাল্কা করে জড়িয়ে ধরল"দুঃখিত, আমার কথায় যদি কষ্ট পেয়ে থাকো। "
"সত্যি বলতে আমি এই কথা কাউকে বলিনি আগে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আর লুকিয়ে রাখতে পারছিনা "লিলেক কাঁদো স্বরেই বলল।
"কি ব্যাপারে? আমি কি তোমার কোনো সাহায্য করতে পারি? "
"না পারো না।আমার মনে হয় না কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারে এ ব্যাপারে। "লিলেক বেশ দুঃখিত হয়েই বলল।
"তুমি যদি চাও আমাকে মনের কথা বলে হালকা হতে পারো। তুমি কি কোনোভাবে, মার্সেল কে নিয়ে ভাবছ?"
লিলেক চমকে গেল ডালির এমন সহজ কথায়।
"আমি ঠিক ধরেছি তাই না? "
"কীভাবে বুঝলে? " লিলেক প্রশ্ন করলো।
তোমাকে এর আগেও আমি আস্তাবলের সামনে লুকিয়ে থাকতে দেখেছিলাম। শুনেছি ওখানে যে দুটো ঘোড়া আছে ওগুলো কেবল মার্সেলই দেখাশোনা করে, তাই মনে হলো তুমি হয়তো ওকেই দেখো।ঘোড়া নিশ্চয়ই লুকিয়ে দেখার জিনিস নয়?"
"শুধুই কি তুমি বুঝতে পেরেছ? নাকি প্রাসাদেরও অনেকেই জানে? এখন তো আমার সন্দেহ হচ্ছে। "
"হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। "ডালি উত্তর দিল
লিলেক হিচকি তুলে কেঁদেই যাচ্ছে । ডালি বলল" সমস্যা কি বলো তো? "
"বাবা বলেছে পনেরো দিন পরেই আমার বিয়ে নিলসনের সাথে। "
"ওহ, বিয়ে করতে চাওনা এক্ষুণি তাই তো?আসলে অমতে বিয়ে করা আমারও পছন্দ না। "
লিলেক নাক টেনে কান্নারত গলায় বলল"চাই তবে নিলসন কে না। "
"তাহলে কাকে? " ডালি হুট করে বলে ফেলার পর, তার মাথায় ব্যাপারটা টোকা দিল।
"তুমি কি মার্সেল কে? "
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে একে অপরকে চেয়ে রইল। তারপর ডালি আবার বলল "ও এম এ, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? কী করে এটা ভাবলে তুমি?
আমাদের সমাজে তো অহরহ ধনী গরীব রা লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে। প্রথমে মেনে না নিলেও, পরে পরিবার তা মেনে নিতে বাধ্য হয় কিন্তু ঐতিহাসিক যুগে আমার মনে হয় না আজ অব্দি কোনো রাজকুমার বা রাজকুমারী এমন কোনো কাজ করে পার পেয়েছে।
"আমি জানতে চাই এমন অঘটন ঘটিয়েছো কিভাবে?
লিলেক এতোক্ষণ ডালির পায়চারী দেখছিল সে এতো উত্তেজিত হয়ে কথা গুলো বলছিল তাই।
এবার মাথা নিচু করে এক হাতে নিজের পায়ের নখ খুটিয়ে খুটিয়ে বলল"ছোটবেলায় যখন মা ছিল, তখন আমি বেশ খেলতাম। মার্সেল ও এখানে আসতো তার মা বাবার সাথে। ওর পরিবার খুব বিশ্বস্ত ছিল আমাদের প্রতি। ওর সাথে ছোট ছোট অনেক মজার স্মৃতি আছে আমার। এক সময় বড় হয়ে গেলাম সাথে শৈশবের সবও ভুলে গিয়েছিলাম।
একদিন হঠাৎ করে আবার সেই পরিচিত বন্ধু ফিরে এলো পূর্ণ যুবক হয়ে তাও আমার দেহরক্ষী হিসেবে।
ডালি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল সব। লিলেক এর চোখে মুখে পুরোনো দিনের আনন্দ গুলো ভাসছে।
লিলেক বলতে থাকলো " মার্সেল খুবই শান্ত, আমি যা বলি তা ই শোনে। আমি যা চাই তা এনে দেওয়ায় যেন ওর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য । আমার সব ছোট বিষয় ও খেয়াল করে।আর বড় কিছুতে তো ভীষণ গম্ভীর ও ঐকান্তিক।
আস্তে আস্তে আমি কখন ওর উপর এতটা নির্ভর হয়ে পড়েছি জানিনা।এতোদিন বুঝতে না পারলেও আমার এখন মনে হচ্ছে ওকে ছাড়া আমার চলবেই না।পাশে কেউ থাকুক আর না থাকুক মার্সেল কে আমার চাই।আমি, আমি হয়তো ওকে ভালোবেসে ফেলেছি।
ডালি লিলেকের কাছে গিয়ে বসল"তবে কী এভাবেই ভালোবাসা হয়? মনের অগোচরে?
লিলেক দৃঢ় চোখে বললো "হ্যাঁ হয়।"
ডালির মনে কথাটি গভীরভাবে দাগ কাটলো।