ডালি বিছানায় কেবল এপাশ ওপাশ ফিরেই রাত কাটাচ্ছে। কোনো ভাবেই ঘুম আসছেনা তার। মিথ্যে বলেছিল কারনাইন কে, দেখতে সে ওতোটাও খারাপ না। চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ছে তার সেই কথাটি। এমনভাবে চোখে চোখে তাকিয়ে রইলে যে কারোই হৃদয় স্পন্দন মিস হওয়ার কথা। ঐ সময় ডালি ভীষণ চেঁচিয়ে ছিল, কারনাইন তাকে ওভাবে ধরেছে বলে কিন্তু পরে সে নিজেই চমকে উঠেছিল পায়ের পাশে একটি সাপ যেতে দেখে। এখন প্রশ্ন হলো, ডালি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা কারনাইন কোনো দেশের রাজকুমার কিংবা রাজা হতে পারে। কারণ একজন ছদ্মবেশী রাজা নিশ্চয় কখনো নিজের পরিচয় বলে বেড়াবেনা, তাও আবার শত্রু দেশের অপরিচিত একটি মেয়েকে?
আর তাছাড়া লোকটি কেন তাকে নিজের সাথে নিতে চায়ছে?তবে কি কারনাইন ---
"উফ এতো কথা কেন ভাবছি আমি?এখানে চিরকাল নিশ্চয়ই থাকবনা। সুতরাং এতো রহস্য উন্মোচনের ও দ্বায় পড়েনি আমার। উলটে যাক দুনিয়া, যুদ্ধে কেউ না বাঁচুক তাতে আমার কি?"
:
:
:
:
রাজকুমারী লিলেক বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে চেয়ে আছে। ফুলে ফুলে ভরা চারপাশ। সন্ধ্যার আকাশে এতো বড় চাঁদ দেখেও তার মন খারাপ।
এই মন খারাপের গল্প সে ছাড়া আর কেউ জানে না। বাবা জোসেফার জানিয়েছেন । অনুষ্ঠান কয়েকদিনের জন্য পেছানো হয়েছে শুধুমাত্র একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে।
আর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেওয়া ই একজন আদর্শ রাজকুমারীর দ্বায়িত্ব। রাজ পরিবারে জন্ম গ্রহন করাও যে এতোটা কষ্টের হতে পারে, এই প্রথমবার উপলব্ধি হচ্ছে লিলেক এর।
লিলেক ভীষণভাবে চায় তার একটা সাধারণ জীবন হোক। কোনো পারিবারিক চাপ নেই যেখানে। চাইলেই উড়তে পারা যায় মুক্ত হয়ে। দৌড়ে যাওয়া যায় সমুদ্র পারে।
আদৌ কি এই আশা পূরণ হবে তার? কখনোই না কখনোই না প্রতিবাদী মন এমনটায় বলে উঠলো।
:
:
::
::
স্নানঘরে হাউজের উপর উষ্ণ পানিতে ডুবে আছে একজন শক্তপোক্ত যোদ্ধা পুরুষ।খানিকবাদে মাথা উঠিয়ে, ঘাড় অব্দি আসা ভেজা চুল দুহাতে সড়ালো, দেহের উপরিভাগে হাতের স্পর্শে ধুয়ে নিচ্ছে। তখনই পর্দার আড়ালে উপস্থিত হলো জিসান। মেরুদণ্ড টান টান করে দাঁড়িয়ে বলল"মহামান্য একটা দুর্দান্ত খবর পেয়েছি। "
স্নানরত পুরুষ বলল"বলতে থাকো। "
জিসানের মুখে পুরো ঘটনা শুনল "তবে যাওয়া যাক অনুষ্ঠানে।দ্রুত পরিকল্পনা তৈরি কর। "গম্ভীর কন্ঠে এইটুকু বলেই আবার নিজের কাজে মনোযোগী হলো।
"সবটা আমার উপর ছেড়ে দিন মহামান্য।"কথা শেষে জিসান চলে না গিয়ে একটু ইতস্ততভাবে বলল " আপনি ডেলসি রোজের সাথে সাক্ষাত করেছেন,তবে কী সে সত্যিই মারা যায়নি? "
কারনাইন ঠোঁটের কোণে হাসলো "তুমি দেখেছিলে আমায়?"
জিসান মাথা নত করে বলে "জ্বি মহামান্য। দুঃখিত নজর রাখতে গিয়ে। "
জিসানের কথা থামিয়ে দিয়ে হাতের ইশারা করে বলল"ঠিকাছে ।"
"সে কী রাজি হয়েছে?"
"চেহরা একই হলেও, মেয়েটি খুব আজব। " কারনাইন গভীরভাবে ভেবে বলল।
"আজব মানে?" জিসান কৌতুহল নিয়ে ফের প্রশ্ন করল।
"অর্থাৎ, আমি এখনো নিশ্চিত নই, সে ডেলসি রোজ কি না।তার কিছুই মনে নেই, এমন কি আমাকেও না!"
জিসান দৃঢ় গলায় বলে উঠলো "মহামান্য আদেশ করলে, আমি এক্ষুনি তাকে নিয়ে আসতে পারি।"
"না, এখন কিছুই করো না।"কারনাইন নরমস্বরেই
বলল।
জিসান চলে যাওয়ার পর কারনাইন বেশ কিছুক্ষণ ডালি কে ভেবে একা একাই হাসলো।
মেয়েটির চুল বেঁধে দেওয়ার পর সে প্রশ্ন করেছিল" আপনি সেলুন এ কাজ করেন?
"মানে?"
"মানে, হেয়ার ড্রেসার, কাটিং ফাটিং, মেকাপ আর্টিস্ট কিংবা স্টাইলিস্ট?
:
:
:
:
:
লেবানন ছিল ওসমানীয়(অটোমান) সাম্রাজ্যের অংশ, সিরিয়ার অন্যান্য অংশের সাথেই শাসিত হতো।
এ সময় এটিকে আলাদা করে "লেবানন" নামে তেমন একটা বলা হতো না; বরং এটি ছিল "মাউন্ট লেবানন মুতাসসারিফাত" নামে পরিচিত একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যেখানে খ্রিস্টান মারোনাইটদের বসবাস ছিল বেশি।এবং এর আগে ছিল বাইজেন্টাইনরা।
অঞ্চলটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারসাম্য বজায় রেখে পরিচালিত হতো।
বড়সড় করে দাওয়াত আয়োজন করা হয়েছে জাবাল লুবনান পর্বতের প্রাসাদে,গণ্যমান্য অনেক রাজঘরানার নারী-পুরুষ উপস্থিত হবে আজ এইখানে। দুপুরের ভোজন হবে বলে কর্মচারীরা নিজ নিজ বিভাগের কাজে ব্যস্ত।সেবিকারা ও করছে কাজ নিয়ে ছুটাছুটি। কোনো কাজ ই যে দুনিয়ায় সহজ না, তা ডালি এখন হারে হার টের পাচ্ছে আর তাই তো কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য লুকিয়ে আছে মস্ত বড় ডাইনিং এর নিচে।
আজ ভোজনালয়ে খাবারের কমতি নেই, ডালি অনেক ঘুরেছিল কিন্তু সুযোগ পায়নি।এতো ভোরে তাকে উঠতে হয়েছে তাছাড়া ঘুম ও হয়নি রাতে।
একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্যই সে এমন হাস্যকর জায়গা খুঁজে নিয়েছে ।বসে বসে পা টিপছে আর ভাবছে"ইশ তার চাইতে ভালো আমি কোনো রাজকুমারী হতাম। খেতাম আর ঘুমাতাম, স্বপ্নে অন্তত পরিশ্রম করতে হতো না।
"যে সৎকর্ম করে সে তার নিজের জন্যই তা করে। আর যে অসৎকর্ম করে তা তার উপরই বর্তাবে। তোমার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যালিম নন।হা-মীম সেজদাহ্:৪৬"
এমনই একটি আয়াত মনে পড়লো তার।জানেনা কীভাবে মনে এসেছে।
১৬০০ সালের এই সময়ে মাউন্ট লেবাননে খ্রিষ্টানরা (বিশেষ করে মারোনাইটরা) ছিল একটি শক্তিশালী ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী, কিন্তু তখনও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব মূলত দ্রুজদের হাতে ছিল। তবে এই সময় থেকেই তাদের উত্থানের ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল।
লেবাননে তখনও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় (দ্রুজ, মারোনাইট খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলিম) একসাথে বসবাস করত। তবে মাঝে মাঝে এই সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বা উত্তেজনা তৈরি হতো, বিশেষ করে ক্ষমতার দখল নিয়ে।
শাসক জোসেফার তার প্রাসাদের এই বিশেষ আয়োজনে সব ধর্মের নেতা ও অঞ্চলের প্রতিনিধি দের আমন্ত্রণ করেছেন।তাদের মধ্যে হেরিস্টন এর সাথে এসেছে তার পুত্র প্যাট্রিক নিলসন যারা উত্তরে মাউন্ট লেবানন এ বেশ শক্তিশালী স্থানে মর্যাদা পেয়েছেন।
একটি সুন্দর গাউন পড়ে নিচে নেমে এলো লিলেক অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। সাজসজ্জা আছে তবে মুখে কোনো হাসি নেই।
আরসালান এগিয়ে গেল বোনের দিকে। "তোমাকে খুব পঁচা দেখাচ্ছে লিলেক।"
"আমি জানি।" মনমরা হয়েই উত্তর দিল সে।
আরসালান অবাক হলো, লিলেক তার মজা করা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ ই করল না? তারওপর এতো ঠান্ডা উত্তর?
"কি হয়েছে লিলেক?"
"কিছু না ভাই।"
:
:
:
একে একে সকল মেহমান চলে এসেছে। তাদের মধ্যে ছদ্মবেশে জিসান এবং কারনাইন ও আছে।
সব সেবিকারা অতিথিদের সেবায় নিয়োজিত। নানান রং বেরঙের শরবত। মিষ্টান্ন খাবার নিয়ে আপ্যায়ন করছে তারা। ডালি ও একই কাজে লিপ্ত তবে সুযোগ পেলে নিজ পেটেও খাবার চালান দিচ্ছে সে।
ঘন্টাখানেক হচ্ছে দাওয়াতের পরিবেশ জমজমাট। নারী পুরুষ আলাদা আলাদা করে যে যার মতো কথোপকথনে ব্যস্ত। হুট করে ডালির পেছন থেকে একজন বলে উঠলো। শুধু কি নিজেই খেতে থাকবে?
ডালি চমকে উঠলো পরিচিত স্বরে, পেছনে ফিরে বলল "কি চাই আপনার? "
ডালির হাতে থাকা থালা থেকে এক গ্লাস শরবত নিয়ে কারনাইন বলল" সময় হলে বলবো। "
তাকে দেখে চিনতে পারলো না সরল মেয়েটি,লোকটিও মুচকি হেসে চলে গেল তার পাশ কাটিয়ে।
সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে জোসেফার ডেকে নিলো প্যাট্রিক নিলসন এবং লিলেক কে। একে অপরের পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে, এখন সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু তারাই।
জোসেফার জানালো"আজ থেকে হ্যারিস্টন এবং সে আত্মীয়ের সম্পর্কে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। তাদের ছেলে মেয়েদের বাগদান এর মাধ্যমে।
তখনই দুটো আংটির বক্স আনা হলো।লিলেক এক পলক চেয়ে দেখলো অদূরেই থাকা মার্সেল এর দিকে।আরমর পরিহিত অবস্থায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারই সামনে। চেহারায় কোনো অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে না।
লিলেক এর আঙ্গুলে আংটি পড়িয়ে চুমু খেল নিলসন। করতালির আওয়াজ এ মুখরিত সভা। সাথে সাথেই গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা চোখের জল সেই অনুভূতিহীন মানবের চোখ থেকে।
লিলেকের মনে এলো অভিমানী প্রশ্ন"আমার তো একটাই দেহ। একজনই যথেষ্ট ছিল অভিভাবক হিসেবে তাই নয় কি?"
মার্সেল দূর থেকে সেই চাহনির উত্তরে বিরবির করে বলল"আমি কেবল তোমার পাশেই থাকতে পারি, সাথে নয়।"
কথাটি বলেই ফিরে গেল সে। আর তার যাওয়ার পানে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লিলেক।