শতাব্দী পেরিয়ে

পর্ব - ২

🟢

ডালির মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে তার কোথায় থাকার কথা ছিল!ঠান্ডায় আর বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারলো না, উঠে মাত্রই কাপড় ঝাড়া শুরু করল।এভাবে মাটিতে কী করে শুয়ে থাকতে পারে সে আশ্চর্য!

আশেপাশে আরেকটু ভালো করে তাকাল, গভীর জঙ্গলে আছে বলে মনে হচ্ছে।অদূরেই দুপাশ পাথরে ঘেরা একটি খাল বয়ে গেছে, সেখান হতেই কলকল ধ্বনি ভেসে আসছিল।

জঙ্গলের পথ ধরে হাটতে হাটতে একটা সময় হাঁপিয়ে উঠলো।

"উফফ আর পারা যায় না কোথায় আমি? "

আকাশ পানে চেয়ে আরো দুবার চিৎকার করে বলল"কোথায় আমি?"

একটু পরে খুব দ্রুত গতিতে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল কিছু একটা। ডালি অনুসরণ করতেই দেখতে পেল, গাছে গেঁথে গেছে একটা চৌখা তীর।পাতার মর্মর শব্দে চোখ বড় বড় করে পেছনে ফিরল, একদল লোক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ডালি হতভম্ব তাদের পোশাক আশাক দেখে। দেখতে ঠিক বন মানুষের মতো। নিজেদের মধ্যে ভুজুংভাজুং কি সব বলাও শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে ।

তাদের চোখের পরখে ডালি নিশ্চিত এখনই তাকে ধরতে আসবে এরা। দ্বিতীয়বার না ভেবে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে পালাতে হবে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে আর যাই হোক এই লোকগুলো সুবিধের নয়।

ছুটতে গিয়ে বনের আরো গহীনে চলে যাচ্ছে , সে ছোটবেলা থেকেই আত্মরক্ষার জন্য ক্যারাটে, তায়কোয়ান্দো ফ্লিপ ট্রেইনিং নিয়েছে কিন্তু সব জায়গায় সবকিছু চলেনা সেটা তার জানা আছে।তাছাড়া তার শক্তির তুলনায় এখানে মানুষ বেশি।

এক পর্যায়ে দৌড় থামাতে হলো তাকে, জোরে এক গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে।ডান হাতের বাহুতে ছোট একটা ফুলকো তীর এসে বিঁধল কখন যেন,তারপর থাকেই আস্তে আস্তে কেমন অবশ লাগছে সব। বন মানুষের দুজন সানন্দে মেয়েটিকে স্পর্শ করতে যাবে এমন সময় দাঁ এর মতো কিছু একটা উড়ে এসে সেই দুজনের একেবারে কব্জি ফালি করে দিয়ে গেছে। ডালির চোখে মুখেও র|ক্তের ছিটা এসে পড়লো ছলাৎ করে। এমন ভয়ংকর দৃশ্য যেন মেয়েটির মাথা আরো দুলিয়ে দিল।আগুন্তকঃ সামনে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটি ধীরেধীরে ঢোলে পড়লো তার শরীরের উপর।

:

:

:

:

সূর্য অস্ত যাচ্ছে, বিশাল এক কক্ষে অন্ধকার প্রবেশ করার আগেই সাজবাতি জ্বালানো শুরু করে দিয়েছে দাসীরা। তাদের সবাইকে সেই কক্ষ ছাড়ার আদেশ দিয়ে ভেতরে ঢুকলো একজন যুবক। মাথানিচু করে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর। যুবক সামনের দিকে না তাকিয়েই বলল "আপনি যা খুজঁছেন তা হয়তো পেয়ে গেছি মহামান্য। "

সামনে বসা আগুন্তকঃ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, কোনো রুপ প্রতিক্রিয়ায় জানালো না দেখে,যুবক কিছুটা অবাক হলো। তার মনে পড়ছে এই লোকটি কয়েকদিন আগেও তার কান খেয়েছে "আমার পছন্দের জিনিস, এখনো খুঁজে পাওনি?" এই এক কথা বলে বলে আর এখন কী না নিজ কল্পনায় ডুবে আছে?

দীর্ঘ দেড়মাস যুবক কেবল এই কাজেই ব্যস্ত ছিল। ভ্রুকুটি করে সে এখন আগন্তুককে পরখ করছে।

:

:

:

:

ডালির দুপাশে দুটো মেয়ে নিজের বিছানা গুচ্চাছে, তারা তাকেও তাড়া দিয়ে বলল"ঘুমিয়ে পড়,সকাল থেকেই অনেক কাজ করতে হবে।

ডালি এখনও ভাবনায় ব্যস্ত, দুইদিন আগে জ্ঞান ফেরার পর থেকেই সে নিজেকে এখানে আবিষ্কার করেছে।বড় একটা প্রাসাদের এক কোণে সবচেয়ে ছোট কক্ষ গুলোর একটির মধ্যে সে এখন অবস্থানরত। আর তারপাশে থাকা মেয়েগুলো সব দাসী হিসেবে নিয়োজিত। তাদের কাছে কথা বলার সময় খুব কম থাকে। জিজ্ঞেস করে শুধু জানতে পেরেছে জঙ্গলের পথে আসার সময় তাদের একদল যখন, কাজ থেকে ফিরছিল তখন ডালিকে আহত দেখে, নিজেদের সাথে তুলে এনেছে এবং এদের মধ্যে যিনি প্রতিনিধির ভারপ্রাপ্ত, সেই মহিলা তাকে চাকুরীতে যোগ দিতে বলেন, তাও একজন দাসী হিসেবে।

ডালি অনেক ভেবে চিন্তে নিশ্চিত হয়েছে সে স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে সবকিছু হয়, এই যেমন কেউ চায়লে দশ-বারো বার বিয়ে করতে পারে,যে কোনো ভাষায় কথা বলতে পারে। গায়িকা, নায়িকা সবই হতে পারে।উড়তে পারে, ঘুরতে পারে, এমনকি টম এন্ড জেরির মত হাজার দশেক পিশা খেলেও উঠে হাসতে পারে।

এর চেয়ে কত মারাত্মক কাল্পনিক স্বপ্ন সে আগেও দেখেছে তার কোনো হিসেব নেই।তবে এই মুহূর্তে এক সাংঘাতিক ইচ্ছা চেপে বসেছে ডালির মাথায় "বাস্তবে আমি কখনোই কারো মুখের উপর কথা বলতে পারিনি, বড়রা যেমন খুশি তেমন সাজোতে ও, নিজের মত কিছু করতে দেয়নি, ছিনিমিনি করে খেলেছে আমার জীবন নিয়ে। সবার জীবনে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় আসে, হয়তো বা আমারও সময় এসে গেছে । এখানে কেউ নেই অর্থাৎ আমি ভীষণ স্বাধীন, ভীষণ ভীষণ ভীষণ । "

ভাবনার সমস্ত বেড়াজাল দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে বেরিয়ে এসেছে এক নতুন স্বত্তা, সে এখানে কারো তোয়াক্কা করবেনা। ঐ জীবনে যা কিছু করতে পারেনা, সে সবটায় এখানে করবে। কোমল শান্ত ডালির মুখে ফুঁটে উঠলো দুষ্ট হাসি। তার একটায় লক্ষ্য দুনিয়া যেদিকে যাবে যাক যতক্ষণ সে এই স্বপ্নে আছে কেবল ফাটিয়ে উপভোগ করবে। টেনশন যাক চুলোয় তেল দিতে,সাসপেন্স যাক আচার খেতে। খুশি খুশি ভাব করে সে ঘুমিয়ে পড়লো। এই একটা প্রথম ক্ষণ যেটাতে তার আনন্দ অনুভব হচ্ছে।

Sotabdi periye, bangla golpo, story part 2

"আমারই নিকট আছে প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার এবং আমি উহা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।

আমি বৃষ্টি - গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, অতঃপর আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি এবং উহা তোমাদেরকে পান করতে দেই; আর তোমরা উহার ভাণ্ডার রক্ষক নও।

বিজ্ঞাপন

আমিই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।

তোমাদের মধ্য হতে পূর্বে যারা গত হয়েছে আমি তাদেরকে জানি এবং পরে যারা আসবে তাদেরকেও জানি।

তোমার প্রতিপালকই উহাদেরকে সমবেত করবেন; তিনি তো প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।

(সূরা হিজর: ২১,২২,২৩,২৪,২৫)"

ডালির কানে পরিচিত কন্ঠে কেউ আয়াত গুলো গুনগুন করে পড়ে যাচ্ছে।কথা গুলো শেষ হতেই ধপ করে শোয়া হতে উঠে বসলো সে।

নির্লিপ্ত গলায় বলে উঠলো "মা"

ডালির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে, আশেপাশে তাকাল,বুকের বা পাশে হাত রাখতেই মনে হচ্ছে কেমন মন পুড়ছে তার, মনে হয়েছিল এতোক্ষণ পাশে মা বসেছিল।

হঠাৎ দুজন কক্ষে প্রবেশ করে বললো "কি ব্যাপার তুমি এখনো বিছানা ছাড়ো নি? "

সে ঝটপট নিজেকে সামলে তৈরি হয়ে নিলো।অনেকটা হেটে যাওয়ার পর তার সাথের একজন বলল " রাজকুমারীর কক্ষে এসে পড়েছি। যতটুক প্রশ্ন করবে কেবল ততটুকুই উত্তর দিবে। আর হ্যাঁ উনার দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে থাকবেনা। যা হুকুম করবে তা ই করবে এবং দ্রুত করবে।

ডালি বেচারি মুখে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল।আর মনে মনে হাসলো "আমি ডালি আহমেদ বুঝলি,ওসব রাজকুমারীর চাইতে দ্বিগুন, উহু

চারগুন আহ্লাদ আমার।একবার নয়, এক হাজার বার তাকিয়ে থাকব, ড্যাব ড্যাব করে দেখব তোদের রাজকুমারী কে, হুহ । " দুষ্টু হাসিতে প্রবেশ করল ভেতরে।

বিশাল কক্ষে বিছানার সামনে পেতে রেখেছে অসংখ্য জামা,অলংকার, কসমেটিক্স কিন্তু কোথাও রাজকুমারী নেই।

ডালির সাথে সাথে অন্যারাও বলে উঠলো।

"কোথায় গেছে তিনি? সাত সকালে তৈরি না হয়ে উনি তো কখনো বের হন না! "

ডালির নজর পড়লো, রাজকুমারীর কক্ষে রাখা বিরাট আয়নার দিকে, নিজের দিকে তাকিয়ে সে ভীষণ অবাক হলো,বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা সে নিজেকে দেখছে। এক পা দু পা করে আয়নার সামনে আরো এগিয়ে যেতে, কক্ষে আগমন ঘটলো রাজকুমারীর বিশেষ দেহরক্ষী "মার্সাল ভেনকো" এর।

খুবই চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল "কোথায় গেছে রাজকুমারী? "

মার্সেল এর দিকে ফিরেই হা করে তাকিয়ে আছে ডালি।

"এটা কি আসলেই স্বপ্ন?না কী আমিই এখানে হারিয়ে গেছি?"কথাগুলো অনেকটা জোরেই বলে ফেলল সে।

দাসীদের সাথে সাথে মার্সেল এর কানেও গেল কথাটি

" কী বলেছ মেয়ে তুমি?"

বিজ্ঞাপন
শতাব্দী পেরিয়ে গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন গল্প