শতাব্দী পেরিয়ে

পর্ব - ১

🟢

মা আমি তো ধেমার সাথে কোচিং এ এসেছি।"

"ওর নাম ধেমা নয় মেধা, তা কোন কোচিং এর মাস্টার ভোর ছয়টায় পড়ায় শুনি?তাও আবার বাসায় এসে? "

ধড়ফড়িয়ে উঠে সেল ফোনের স্ক্রিন দেখে ঢোক গিললো ডালি।"ইশ! মা মেরে ফেলবে আজ!"

"আমি নিচে অপেক্ষা করছি দ্রুত গাড়িতে এসো।"

মিসেস তানিশা খুব শান্ত গলায় কথা টুকু শেষ করে গাড়ির সিটে হেলান দিলো।

অন্যদিকে ডালির অবস্থা খারাপ চেহরা ফুলে গেছে, রাতভর জেগে পার্টি করছিল বান্ধুবিদের সাথে। মেধা কে বার কয়েক ধাক্কা দিয়ে প্রশ্ন করল"আমার ব্যাগ কই রেখেছিস?"

মেধা ঘুম ঘুম চোখে কেবল আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করল আলমারির দিকে।

ডালি টিশার্ট এর উপর একটা লং কোটি চেপে ব্যাগ হাতে দ্রুত নেমে গেল সিড়ি বেয়ে।

মেধার বাবা কে ধন্যবাদ জানাতে মন চায়ছে, ভাগ্যিস দোতলা বাড়ি করেছিল।

কারের দরজা খুলে বসতেই শীতল চাহনি দেখে ভয় পেল মেয়েটি, সে জানে মা যখন এমন শান্ত আচরণ করে তখনই আসন্ন বিপদ নিকটে থাকে।

মিসেস তানিশা নিজেই ড্রাইভিং করছে।পাশে থাকা ডালি এখনও নিজেকে গুছাতে ব্যস্ত, মুখ দিয়ে এক শব্দ বের হয়নি তার, হবেই বা কি করে সকাল সকাল মিথ্যে বলে ফেলেছে তাও আবার মায়ের সাথে যে কিনা, একেবারেই মিথ্যে সহ্য করতে পারেনা।

মিথ্যা বলা মহাপাপ তাই সত্য যতই অন্যায় এর হোক মিসেস তানিশা ক্ষমা করতে রাজি কিন্তু

আজ আবার নিয়ম ভঙ্গ করেছে ডালি।

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস তানিশা বলল"আমরা শীঘ্রই দেশে ফিরছি।

বড় চোখ করে স্লো মোশনে তাকাল ডালি। "কেন মা?"

"ইয়েমেন এ আমার কন্ট্রাক শেষ। "

"কিন্তু আমার পড়া!" চিন্তিত হয়ে বিড়বিড় করল ডালি।

"সমস্যা নেই অন্য যে দেশে যাব সেখানে ট্রান্সফার করিয়ে নিব।" মিসেস তানিশা সামনের দিকে চোখ রেখেই বললেন। "

ডালি মন খারাপ করে পাশের উইন্ডো তে মাথা ঠেকিয়ে ভাবছে।"মা ডাক্তার হওয়ার কারণে আজ অব্দি কোনো বন্ধুই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তিন বছর হয়েছে ইয়েমেনের রাজধানী" সানা" তে এসেছে তারা। ভালোই যাচ্ছিল দিনগুলো, বাঙালি অনেক বন্ধু জুটেছিল, যাদের সাথে সবে মজা করতে শুরু করেছিল সে।

আসল বিপদের কথা তো শোনায় হয়নি, মিসেস তানিশা তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে বলে উঠলো "তোমার খেয়ালিপনা শেষ হলে একটা জরুরি কথা বলার ছিল। "

ডালি ভীতু চোখে তাকাল মায়ের মুখের দিকে।

"সে দেশে ফিরেছে। "

মায়ের কথায় কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল"তাতে কি?"

"তুমি এক্সাইটেড নও?" মিসেস তানিশা মেয়ের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলেন।

ডালি মনে মনে ভাবল"যে মানুষটাকে সে জানেই না, তাকে নিয়ে এতো এক্সাইটেড হওয়ার কী আছে?"

মিসেস তানিশা আবার বলল"আমি জানি তুমি রেগে আছো কিন্তু সত্যি বলতে ঐ সময়টাতে এটাই তোমার জন্য ভালো ছিল। তুমি নিজেও একদিন বুঝতে পারবে আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। "

ডালি কেবল হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়াল।

:

:

:

তিন বছর আগে বৈশাখের এক রাতে হঠাৎ করেই ডালির বাবা হার্ট অ্যাটাক করেন। যার ফলে সুন্দর পরিবারে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। ডালি আপন মনে কতই না মানত করেছিল, তার বাবাটা যেন ঘরে ফিরে আসে দ্রুত। মা পুরো দুদিন ঘরে ফিরেনি, নিজে ডাক্তার হয়েও শরীরের যত্ন নিতে যেন ভুলে গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

নিজ জমজ ভাই হামীম কে নিয়ে ঘরে অপেক্ষা করছিল ডালি। বাইরের ঝমঝম তুফানি বৃষ্টি, মন কেমনের গান গাইছিল,ভয় করছিল খুব।

পরেরদিন চাচা-চাচীর সাথে জরুরি তলবে ক্লিনিকে গিয়ে দেখল, দাদাবাড়ী আর নানাবাড়ির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনেরা কেবিনের ভেতরে বসে আছে।

একজন বৃদ্ধ কাজীর মতো লোকের সামনে ডালিকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো, সে রাজি আছে কিনা। সবে ষোল পার হওয়া ডালি অবাক হয়ে আশেপাশে দেখছে। এমনটা তো মানুষ বিয়ে পড়ালে জিজ্ঞেস করে, আধুনিক মেয়ে হিসেবে এতুটুকু জ্ঞান তো ডালির আছেই।চাচার হাতে ফোনের ওপাশেও ভিডিও কলে কেউ আছে মনে হলো।

পাশ থেকে চাচি আর মামি উঠে এসে বলল"কবুল বলে দাও মা।

এক কোণে কেমন ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে বসে থাকা মায়ের দিকে তাকাল ডালি, মনে অনেক প্রশ্ন এলো হঠাৎ করে এসব কি হচ্ছে তার সাথে? অসুস্থ বাবা ও বেডে শুয়ে তার দিকে চেয়ে আছে।

ডালি টলমল করা চোখে মায়ের দিকে তাকাল। মিসেস তানিশা মলিন হেসে মেয়েকে আশ্বস্ত করল, সব ঠিক আছে।

এতো গুলো বড় মানুষের সামনে কিশোরী মনের সাহস হলোনা আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করতে, জীবনের দরকষাকষি করতে।

অকপটে মেনে নিলো, কবুল বলে নিজের অনাগত ভবিষ্যৎ কে। এরপর আশেপাশে কী হয়েছে না হয়েছে কিছুই মনে নেই, ছোট মন অত বড় কিছু যে ভাবতে চায়নি।

ঘরে পৌঁছে বেশ কান্নাকাটি করেছিল সেদিন। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ভয়ের কিছু নেই তোমার জহির আংকেল এর ছেলের সাথেই শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে দিয়েছি, জানোই তো তোমার বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড তিনি। "

"কিন্তু এখন কেন?"ভাঙ্গা মনে জানতে চায়লো ডালি।"

"ওসব তুমি ভেবোনা, ছেলে বাইরে পড়া লেখা করেছে, তাই তোমার সাথে দেখা হয়নি কখনো ।এখনো সে বিদেশেই আছে। তোমার বয়স কম বলে কাবিন করা হয়নি। আগে তুমি বড় হও, একে অপরের সাথে ঘুরবে ফিরবে তারপর না হয় কাবিন করে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম।শেষের কথাটা মিসেস তানিশা হেসে বললেও, ডালি যেন মানতে নারাজ।সে কেন অন্য কারো বাড়ি যাবে? ঢুকরে কেঁদে দিল আবার।

মা -মেয়ের আবেগ জড়ানো স্মৃতি তৈরি হলো অনেক কিন্তু পরেরদিন ভোরেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ক্লিনিক যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল মিসেস তানিশা তখনই ফোন বেজে উঠলো সে দুঃসংবাদ বহন করে।

সেসব ভুলে নতুন পরিবেশ তৈরি করতেই হয়তো বাবা হারা দুই সন্তান কে নিয়ে ভাইয়ের পরিবারের সাথে বিদেশ পারি দিয়েছিল মিসেস তানিশা।

Sotabdi periye, bangla golpo, story

ডালির সুপ্ত মনে এখনও কেবল একটায় প্রশ্ন, কেন তাকে এই যুগে এসেও ঐ অচেনা লোকটার সাথে সংসার করতে হবে? কী ফালতু কথা ভাবলেই গা জ্বলে উঠে। আজকাল সবাই নিজ পছন্দের মানুষ খোঁজে, ছোট্ট মিষ্টি একটা আপন গল্প হবে,প্রেম হবে,ঝগড়া হবে, মান-অভিমানের পোড়ন হবে।

এসব কি কেবল স্ক্রল করে করেই দেখে যাবে?ডালি কী দোষ করেছে? তার কেন এমন হবে না?দুপক্ষ বাসায় যখন ঝামেলা করবে, তার প্রেমিক জোর করে হাত চেপে বলবে" আমি তোমায় কোথাও যেতে দেবনা, প্রয়োজনে রণভূমি তৈরি হবে।কেউ মানুক আর না মানুক কিচ্ছু যায়ে আসেনা।ডালি ও সব ভুলে তখন তার প্রিয়র কাছে ছুটে যাবে, এই ছুটে যাওয়া কে বিশ্বাস বলে, উষ্ণ বিশ্বাস। "

ইশ ভাবতেই ডালির মুখে গোলাপি আভা ছড়িয়েছে।

ধ্যান ভাংলো মিসেস তানিশার কথায়।

"বাসায় গিয়ে লাগেজ গুছিয়ে নিও, টিকেট কনফার্ম হলেই আমরা এদেশ ছাড়বো।

:

:

:

পাঁচদিন পর::

আজ প্রায় পৌনে সাত ঘন্টা লম্বা একটা জার্নি শেষ করে ঢাকায় ফিরেছে মিসেস তানিশা আর সাথে দুই সন্তান । ডালি মুখ ভার করে কারে বসে আছে।ব্যাগপত্র গাড়িতে তুলে দিয়ে হামীম বলল " মা আমি চাচার গাড়িতে উঠছি, আমরা পেছনেই থাকব।

"ঠিকাছে যাও।মিসেস তানিশা গাড়ির পেছনের সিটে উঠে পাশে বসলো, দেখল ডালি কেমন মনমরা হয়ে আছে হয়তো বাবাকে মিস করছে।

মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল " চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।

ডালি এবার মুখ ফুটে বলেই ফেলল"কচু ঠিক হবে, জানি আমি কেন দেশে ফিরেছ।,ইশ যদি পারতাম আমি সেই সময়ে ফিরে যেতে, কখনও ঐ কাজটা মেনে নিতাম না, একবার অবশ্যই প্রতিবাদ করতাম।"

মেয়েকে বুঝার চেষ্টা করলেন মিসেস তানিশা।হয়তো এই বয়সে এটায় স্বাভাবিক। চঞ্চল আর প্রতিবাদী মন নিজের স্বাধীনতা খুঁজে।

:

:

:

" যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকেই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ।সূরা ইব্রাহীম : ৩৪"

গাড়ি চলছিল আপন গতিতে ডালির নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে। মনে হচ্ছে যেন কতকাল দেখেনি তার জন্মস্থানকে। বাবা থাকলে বোধহয় সবটা অন্যরকম হতো হঠাৎ চিন্তার মাঝেই পেছন থেকে দুটো গাড়ি স্পীডে এলোপাথাড়ি ভাবে এগিয়ে আসছে, একটি অন্যটিকে বেশ গুরুতর ভাবে ধাওয়া করছে। সাইড কাটার ফলে ডালিদের কার এলোমেলো ভাবে পথ হাড়াতে শুরু করলো। ভীষণ এক গন্ডগোলের সৃষ্টি হচ্ছে।মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ হারালো রাস্তায় এতক্ষণ শাড়িবদ্ধ ভাবে চলা গাড়ি গুলো। সব ড্রাইভার যেন ঘাবড়ে গেল, ঘটে গেল মারাত্মক কার এক্সিডেন্ট।

খানিক বাদে নিস্তব্ধ হল সবকিছু। আকস্মিক হওয়া এই ঘটনায় মিসেস তানিশা অর্ধেকটা ছিটকে বেড়িয়ে পড়লো জানলার কাঁচ ভেংগে আর উল্টে পালটে যাওয়া গাড়ির সীটে চেপে রইলো ডালি।পুরো দুনিয়াটা যেন কেউ হাতে উল্টো করে ধরেছে, ঝাপসা চোখে এমনই মনে হলো তার, ক্রমশে সুন্দর মুখখানা রক্তিম লোহুতে রাঙ্গা হতে লাগলো। নাকে মুখে কীসের এক ভেজা অনুভূতি নিয়েই চোখ বন্ধ হয়ে গেল ডালির।

:

:

:

ভীষণ শীত শীত অনুভব হচ্ছে । কোথাও হতে কানে ভেসে আসছে পানির কলকল শব্দ। দীর্ঘশ্বাস টানতেই বুনো লতাপাতার ঘ্রাণ পাওয়া গেল।সচকিত হয়ে উঠলো মস্তিষ্ক, সাথে সাথেই চোখ মেললো ডালি।লম্বা দানবীয় গাছের ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছে।চিরচির পোকার ডাকে কান ঝালাপালা হবে মনে হলো। শরীর নাড়াতে গিয়ে বুঝল মাটিতে শুয়ে আছে বিধায়, গাছ গুলো এমন অস্বাভাবিক লম্বা মনে হচ্ছে।প্রকৃতির ঘ্রাণ এতোটা জোড়ালো ভাবে নাকে আসেনি কভু কিন্তু মাটিতে কেন শুয়ে আছে সে?

বিজ্ঞাপন
শতাব্দী পেরিয়ে গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন গল্প