অস্থির হয়ে রাজকুমারীর খোঁজ করছে মার্সেল, প্রাসাদের দ্বিতীয় ভবনে তালাশ করছে নিজেই আর অন্যরা খুঁজছে বাইরে।
হঠাৎ এক টুকরো পাথর কণা মাথায় এসে লাগলো তার। দ্রুত সচেতন হয়ে তলোয়ারের কোষ মুক্ত করল।দালানের এপিট ওপিট, উপর নিচে পরখ করে লম্বা কোরিডোরে এগিয়ে যাচ্ছে সে।
লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখে মুচকি হাসছে রাজকুমারী" লিলেক ওয়েস্টার্না "
মার্সেল যত এগিয়ে আসছে ততই তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য লিলেক উল্টো পথে পাথর ছুড়ছে।
লিলেক নিজের অবস্থান কিছুটা বদল করার পর মার্সেল কে খুঁজল কিন্তু আর দেখতে পেল না। ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে বলল "ছেলেটা আবার গেল কোথায়?"
আরেকটু পাশ বদল করে উঁকি দিতেই অনুভব হলো তার পেছনে কেউ আছে।
চট করে ফিরতেই দেখতে পেল মার্সেল এর সুন্দর মুখখানা।
ধক করে উঠা বুকে হাত রেখে বলেই ফেললো "ইশ!ভয় পাইয়ে দিয়েছ তুমি।"
আপনি হঠাৎ কোথায় চলে গিয়েছিলেন ইউর হাইনেস? মার্সেল নত মাথায় জিজ্ঞেস করল।
লিলেক ধরা যখন পড়েই গিয়েছে কদমে কদমে এগিয়ে বলল"আমার প্রিয় কাজ করছিলাম।"
"কেমন কাজ?আমাকে বলুন কিংবা কোনো সেবিকা কে।"
"ওহ হো, তুমি কিছু বুঝো না।"
"যেমন?"
লিলেক মুচকি হেসে বলল"আমি তোমাকে জালাচ্ছিলাম। আর তুমি কি না চাইছো কোনো সেবাকর্মি এই কাজ করুক?"
মার্সেল আর কোনো প্রতিউত্তর করল না।
" সেই ছোটবেলা থেকেই আমাকে জানো কিন্তু তুমি, তুমি নিতান্তই বোকা। "
লিলেক মুখ থমথম করে এগিয়ে যেতে থাকলো।
এতোক্ষণে চোখ তুলে তার যাওয়ার পানে দেখলো মার্সেল। ঠোঁটের রেখা খুব সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল তবে পরক্ষণেই তা বিলীন হয়েছে।
:
:
:
:
দীঘির জলে অণেক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে আছে ডালি,দু পা দুলিয়ে পাহাড়ের অর্ধ টিলা তে বসেছে সে ।নিজের গালে হাত বুলিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল "এটা কি করে সম্ভব? "
নিতম্বের কাছাকাছি লম্বা চুল গুলো সামনে এনে বার বার দেখছে আর ভাবছে। ঠিক সতেরো বছর বয়সে দেখতে অবিকল এমন ছিল সে,ফর্সা গোলগাল ভরাট মুখ খানায় ছোট ছোট লালচে ব্রন আর এই লম্বা চুল গুলোও কেটে ফেলেছে কলেজ শেষ হওয়ার পর পরই।মা কতই না বকে ছিল সেদিন।
আচ্ছা দৈহিক গঠনে সে যেহেতু এখন সতেরো বছর বয়সী তবে কী তার বুদ্ধি আর আবেগ ও পেছনে চলে গেছে?
অন্যসব সেবা কর্মীরা কাজ শেষে চলে যাওয়ার সময় ডালির উদ্দেশ্যে বলল"কেমন যাচ্ছে তোমার?ঘন্টা পেরিয়ে গেছে প্রাসাদে ফিরে এসো, আমাদের সাথে কাজে হাত লাগাও।
তারা চলে যেতেই ডালি একা একা বলল "ছাই লাগাবো হাত না।এইখানে একটা স্মার্ট ফোন ও নেই। কোন সাল, কোন রাষ্ট্র কিছুই বুঝতে পারছিনা।বড় এসেছে রাজা রানী সাজতে।
এর চাইতে ঢের ভালো আমাদের আধুনিক যুগ, কি নেই সেখানে।"উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক ঝাড়তে লাগলো ।
হুট করে পেছন থেকে পুরুষকন্ঠে কেউ বললো " আমাকেও নিবে সঙ্গে? "
আচম্বিত প্রায় পড়েই যাচ্ছিল দীঘির জলে। খেই হারানো হাত ধরে ফেললো সেই কন্ঠের মালিক।হেঁচকা টানে নিজের কাছে এনে দাঁড় করাল ডালি কে।
এতোটা কাছে পুরুষ কারো উপস্তিতি পেয়ে ডালি অস্বস্তি বোধ করল। নিজের হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে বলল"কে আপনি?"
আগুন্তকঃ কিছু না বলেই দূরে সরে গেল।ডালি কে আগাগোড়া একবার পরখ করে বলল"সবসময় কী বিপদে থাকো তুমি?"
ডালি বিশেষ পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে চাইলে পুরুষটি পেছন থেকে বলল"সাবধান সামনে বিপদ আছে। "
"থাকলে থাকুক তাতে আপনার কী?"ডালি অনেকটা দৌড়ে যেতে যেতে উত্তর করল
" আমার? হবে হয়তো কিছু একটা।"
পুরুষটির মুখ থেকে এমন কথা শুনে পিছু ফিরতেই ডালি অসাবধানতায় সামনে নরম কিছুতে পারা দিয়ে ফেলেছে।
"আরে আরেহ! আর কিছু বলতে না গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আগুন্তক ।
রাজকুমারী লিলেক আয়নার সামনে বসে তৈরি করছে নিজেকে, কানে ঝকঝকে পাথরের দুল পড়েছে। খয়েরী ঢেউ চুলে ফুল গেঁথেছে সেবিকা।
পেছন থেকে একজন অনুমতি নিয়ে বলল" রাজকুমার আরসালান এসেছেন আপনার খোঁজে, বলেছেন বাইরে অপেক্ষা করবে।"
লিলেক খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি কক্ষপথের দূরুত্ব কমালো, পেছন থেকে ডেকে উঠলে তার প্রিয় ভাই আরসালান হাসি মুখে কাছে ছুটে এলো।
"কবে ফিরেছ ভাইয়া?"
"গতকাল রাতে" হাসিমুখে উত্তর করল রাজকুমার আরসালান।"
"বাবা তোমাকে খুব কাজ দেয় তাই না?এবার কী খুব কঠিন ছিল?"
"কী সব বলছ তুমি, বাবার মতে আমি এই জাবাল লুবনান পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রাজা। এখন থেকে যাবতীয় রাজ্য পরিচালনার কাজ আমাকেই শিখতে হবে।"
"হ্যাঁ জানি তুমি সত্যিই খুব ভালো রাজা হবে কিন্তু ভয় হয়, শুনেছি বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য কে মুসলিম খলিফা শাসন করতে চাইছেন।" মুখে ছায়া নামিয়ে আনল লিলেক।
"দুঃখ করো না, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।পুরাতন পিছিয়ে গিয়ে নতুনের আবিষ্কার হবে সেটাই তো নিয়ম,ইতিহাস এভাবেই গড়ে উঠে তাই নয় কী?"
"হুম"
আরসালান কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল"ও হ্যাঁ, বাবা তোমায় যেতে বলেছিলেন।জানো তো, পরশুদিন একটা বড় আয়োজন আছে।অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকজন আসবে দাওয়াতে । তার আগে বাবা তোমার সাথে কথা বলতে চায়।
"ঠিক আছে, আমি দেখা করব আজই।"
:::
:::
:::
১৬০০ সাল(লেবানন দেশ গঠনের পূর্বে)
আধুনিক যুগের প্রথম দিকে অটোমানদের নিয়ন্ত্রণ অপ্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, কিন্তু লেবাননের উপকূল ভেনিস , জেনোয়া এবং অন্যান্য ইতালীয় নগর-রাজ্যের সামুদ্রিক প্রজাতন্ত্রগুলির সাথে যোগাযোগ এবং বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ছিল ।
মাউন্ট লেবাননের পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু এবং নির্যাতিত গোষ্ঠীগুলির আশ্রয়স্থল ছিল, যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ম্যারোনাইট খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ড্রুজ সম্প্রদায়। এটি অটোমান সাম্রাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ছিল।
পুরাতন লেবাননে খ্রিস্টীয় ধর্ম চর্চা হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ অব্দি।
ডালি ঠিক সেই শতাব্দীর মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে আছে।
:
:
:
ডালির মেজাজ বেশ চটে গেছে, লোকটির কারণেই সে এখন চোরাবালি তে ডুবে যাচ্ছে।প্রথমে বুঝতে না পেরে বেশ নড়াচাড়া করেছিল, ফলে বুক অব্দি ডুবে গেছে।
সামনে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বসে আছে পুরুষটি, প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছে সে। ডালিকে বলেছিল হাত বাড়াতে কিন্তু সে নিজ অহং এর কারণে সাহায্য নিবেনা।
কিন্তু ব্যাপার এখন ধীরে ধিরে মরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাই অহং সাময়িকভাবে পাশে রেখে ডালি বলল"এভাবে চোখের সামনে কাউকে মরতে দেওয়া একদম ঠিক না।
"আমাকে বলছ?"
বিরক্তিতে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিল সে, শেষমেশ না পারতে বলেই দিল "জ্বি আপনাকে। তাড়াতাড়ি তুলুন আমাকে না হয় চিৎকার করে মানুষ জড়ো করব আর আপনার কারণে পড়ে গিয়েছি সেটাও বলে দিব।
পুরুষটি অবাক হলো এমন বাচ্চাসুলভ কথায়। নিজের দাম্ভিকতা বজায় রাখার ফলে হাসলো না।" ভালোই হতো কেউ এলে "
আর কথা না বাড়িয়ে গাছের একটি শক্ত লম্বা ডাল এগিয়ে দিলো মেয়েটির দিকে।
বহু কষ্টে উঠে এলো ডালি। পোশাক তো নষ্ট হয়েছেই সাথে কেঁদে রেধে একাকার। নাকে মুখে পানি আর পানি।
পুরুষটি এক টুকরো কাপড় এগিয়ে দিল তার দিকে।
ডালি হঠাৎ ভেবে দেখল " সে একটু আগে পর্যন্ত যে কথাগুলো বলেছে সবটায় খুব অপরিণত কথা এবং ব্যবহার ছিল।ছিঃ এখন তার ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে কিন্তু সত্যি বলতে সে তো এমন বাচ্চা নয়।তাহলে এরুপ আচরণ কেন করছে?
হে মানবমণ্ডলী ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতেই সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তা হতে তাহার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাদের দুজন হতে বহু নর - নারী ছড়াইয়া দেন; এবং আল্লাহকে ভয় কর যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা কর, এবং সতর্ক থাক জ্ঞাতিবন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।
সূরা আন নিসা: : ১
ডালি হঠাৎ তার কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সে যেন আবার শুনতে পারছে কারো পরিচিত কন্ঠে কুরআন এর আয়াত।