সকাল ৮টা বাজার আগেই জরুরি তলবে হাজির হয়েছে অ্যানি আর পিটার।
হঠাৎ কী এমন হলো যে ছুটির দিনেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হলো তাদের—তার কিছুই তারা ভেবে পাচ্ছে না।
ড্রয়িংরুমের একটা আরামদায়ক সোফায় বসে আছে ঋদ্ধ আর মেহেরিন। আরেক পাশের সোফায় নিজের আঁকাআঁকির জগত নিয়ে ব্যস্ত পুচকে মায়রা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বাড়ির সবাই আজ বাসায়, থমথমে তো নয়ই, বরং বেশ আড্ডার একটা পরিবেশ।
পুরো বিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। পিটার আর অ্যানি কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলেও ঋদ্ধর সেদিকে ভ্রূক্ষেপই নেই!
সে পরম মনোযোগে মেয়ের ড্রয়িংয়ে লাল-নীল রঙ মেলাতে ব্যস্ত। পিটার আর অ্যানির বিরক্তির পারদ তখন তুঙ্গে। অগত্যা সহ্য করতে না পেরে পিটারই নীরবতা ভাঙল—
"স্যার...
ঋদ্ধ ড্রয়িং খাতা থেকে চোখ না তুলেই জবাব দিল,
"হুম, পিটার?
"স্যার, হঠাৎ এত সকালে কেন ডেকেছেন আমাদের?
প্রশ্নটা বলেই পিটার টেরা চোখে অ্যানির দিকে এক নজর তাকাল। অ্যানিও একই উত্তরের আশায় ঋদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে।
ঋদ্ধ মুখ তুলে বেশ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"পিটার, চোখ দুটো কি কই রেখে এসেছ? দেখতে পাচ্ছ না আমি আমার কিউটিপাইয়ের সাথে ভীষণ ব্যস্ত?
পিটার ফোস করে একটা লম্বা দম ছাড়ল। এ আর নতুন কী! ঋদ্ধ স্যারের সব হিসাব একদিকে, আর মায়রা-মেহেরিন অন্যদিকে। এই দুজন সামনে থাকলে পৃথিবীর আর কোনো কিছুই ঋদ্ধর চোখে পড়ে না।
মেহেরিন এতক্ষণ চুপচাপ এই নাটক দেখছিল। এবার পিটার আর অ্যানির বেচারা মুখ দেখে আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে ঋদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
"তোমরা বাবা-মেয়ে মিলে কী শুরু করলে বলতো? বেচারারা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে, কেন ডেকেছ বলেই দাও না!
নিজের ‘মেহুপাখি’র কথায় ঋদ্ধ অবশেষে মেয়ের খাতা রেখে গম্ভীর হলো। নিজের চিরাচরিত বস-লুকে ফিরে এসে একবার পিটার আর অ্যানির দিকে তাকাল।
"বুঝলে পিটার, আজ সন্ধ্যায় একটা বিয়ে আছে। সবকিছুর ব্যবস্থা করো।
পিটার যেন আকাশ থেকে পড়ল! চোখ-মুখ গোল গোল করে মুখ ফসকে বলেই ফেলল, "স্যার... আপনি আবার বিয়ে করবেন?!
কথাটা শোনামাত্রই ঋদ্ধ এমন এক অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল যে পিটারের কলিজা পানি হওয়ার জোগাড়! পাশে বসা মেহেরিন আর অ্যানি নিজেদের সামলাতে না পেরে ফিক করে হেসে দিল।
"ব্যাটা গাধা!
ঋদ্ধ তেড়ে উঠল,
"আমার এত রূপসী বউ থাকতে আমি আবার কেন বিয়ে করতে যাব? তার ওপর আমার একখানা মিষ্টি বাচ্চাও আছে! যাদের বিয়ে হয়নি, আজ তাদের বিয়ে হবে।
পিটার যেন আরও বড় ধাঁধায় পড়ে গেল, "মানেহ...?
"মানেটা একবারে পানি-ভাত!ঋদ্ধ হালকা হেসে বলল,
"আমার এই বাসায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় ওদেরই চার হাত এক হাত করা হবে। যাও, ধামাকা আয়োজনের বন্দোবস্ত করো!
"ওকে স্যার... কিহহহ?!
অ্যানি আর পিটার দুজনেরই চোখ এবার কপালে উঠল! মনে হলো যেন ভুল শুনল।
অথচ ঋদ্ধ আর মেহেরিনের মুখে মিটিমিটি রহস্যের হাসি—পুরো নির্বিকার!
পিটার ঢোক গিলে বলল,
"স্যার, কিন্তু...
"থাম ব্যাটা! চুপ একেবারেই!
ঋদ্ধ ধমকের সুর তুলে বলল,
"সারাজীবন কি আইবুড়ো হয়ে থাকার ইচ্ছা? নাকি বিয়ের বয়স পার হলে আমপারা পড়বে? চুপচাপ বর সাজো গিয়ে!
সাথে সাথে পিটারের কথা বন্ধ হয়ে গেল। সে একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে মেহেরিনের দিকে তাকাল, কিন্তু মেহেরিন ঠোঁট চেপে হাসি সামলাতে ব্যস্ত। পিটারের এখন সত্যি সত্যি ইচ্ছে করছে সোফাকুশনে মুখ গুঁজে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে!
আর অ্যানি? তার মুখের অবস্থা তখন পিটারের চেয়েও করুণ! ছুটির দিনের সকালে এমন একখানা 'বিয়ের বোমা' ফুটবে, তা অ্যানি আর পিটারের কল্পনারও বাইরে ছিল।
অ্যানি তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বুকের মধ্যে এক অজানা ঝড় তোলপাড় করছে তার। সেদিনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর অনেকগুলো মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু পিটারের সাথে তার কোনো কথা হয়নি। অ্যানি মনে মনে ভীষণ চেয়েছিল—পিটার এসে অন্তত একবার সবটা তাকে বলুক, পুরো সত্যিটা নিজের মুখে ব্যক্ত করুক।
পিটারের প্রতি অ্যানির একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে, এটা সে কোনোদিনই অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু পিটারের মনে কী আছে? সে কি আদৌ অ্যানিকে পছন্দ করে? নাকি পুরোটাই অ্যানির একতরফা আবেগ? পিটার নিশ্চয়ই তাকে ভালোবাসে না—ভাবতেই বুকটা অভিমানে ভারী হয়ে এলো অ্যানির। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা উপচে পড়ার আগেই সে মাথা নিচু করে নিলো।
ওদিকে পিটারও কিছু বলতে পারছে না। হাজার হলেও পৃথিবীতে ঋদ্ধ ছাড়া তার আপনার বলতে আর কেউ নেই। ঋদ্ধ তার বসের চেয়েও বেশি কিছু, আবার তার প্রতি পিটারের একটা প্রগাঢ় ভয় ও শ্রদ্ধাও কাজ করে। তাই ঋদ্ধর সিদ্ধান্তের ওপর 'না' বলার কোনো সুযোগই তার নেই। মন খারাপ আর রাজ্যের দ্বিধা চেপে রেখেই সে আদেশের তামিল করতে চলে গেল।
পিটার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ড্রয়িংরুমে মেহেরিন এগিয়ে এলো অ্যানির দিকে। অ্যানির ছলছল চোখের জল মেহেরিনের তীক্ষ্ণ নজর এড়ায়নি। অ্যানির কাঁধে আলতো করে হাত রেখে সে পরম মমতায় ডেকে উঠল—
"ম্যাম...
অ্যানি ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলল।
মেহেরিন নরম গলায় ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"ম্যাম নও অ্যানি, তুমি আমার ছোট বোনের মতো। শোনো, আমি বা ঋদ্ধ—আমরা কেউই তোমার জীবনের জন্য কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেবো না, সেই বিশ্বাসটুকু অন্তত রাখতে পারো। তারপরও বলছি, আমি বা ঋদ্ধ কেউ তোমাকে জোর করছি না।"
অ্যানি চোখ তুলে তাকাল। মেহেরিনের চোখে-মুখে কেবলই একজন বড় বোনের স্নেহের ছায়া।
মেহেরিন একটু থেমে মিষ্টি হেসে আবার বলতে শুরু করল,
"যদি তোমার মনে হয় তুমি এই বিয়েটা করতে চাও না বা তুমি পিটারকে নিয়ে নিশ্চিত নও, তবে সন্ধ্যার আগেই আমাকে জানিয়ে দিও। আমি নিজে ঋদ্ধকে বুঝিয়ে সব বন্ধ করে দেবো, ঋদ্ধ কিচ্ছু বলবে না। তবে মনে রেখো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তোমার কাছে সময় শুধু আজ সন্ধ্যা পর্যন্তই।
কথাটা বলেই মেহেরিন অ্যানির গালে একটা হালকা হাত বুলিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল। অ্যানি একাই দাঁড়িয়ে রইল থমথমে ড্রয়িংরুমের মাঝে—হাতে মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা, আর সামনে সারাজীবনের এক বিরাট সিদ্ধান্ত!
------------------------------
সন্ধ্যা নামতেই ঘরোয়া কিন্তু ভীষণ ছিমছাম আর সুন্দর এক পরিবেশ তৈরি হলো।
একপাশে পাঞ্জাবি পরে একদম নার্ভাস ভঙ্গিতে বসে আছে বর পিটার।
কিছুক্ষণ আগেও যার মুখে রাজ্যের চিন্তা ছিল, কাজী সাহেবকে সামনে বসতে দেখে তার বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করেছে।
তবে মনে মনে কি আছে তা বোঝা মুসকিল।
মেহেরিন যখন নতুন কনে অ্যানিকে সাজিয়ে নিয়ে এলো, পিটার এক নজর তাকিয়েই একদম হা হয়ে গেল! হালকা রঙের শাড়িতে অ্যানিকে যেন ঠিক এক টুকরো পরী লাগছে। অ্যানিও লজ্জায় চোখ নিচু করে পিটারের পাশে এসে বসল।
কাজী সাহেব বিয়ের বাক্যগুলো উচ্চারণ করতে বললেন।
পিটার একটুও দেরি না করে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল—"কবুল।"
অ্যানির গলাটা লজ্জায় খানিকটা কেঁপে উঠলেও, মনের সব গভীর অনুভূতি ঢেলে দিয়ে সেও বলল—"কবুল।"
ব্যস! চার চোখের মিলন আর কয়েকটা মাত্র শব্দে বাধা পড়ে গেল দুটো পথ হারানো মন।
বিয়ে শেষ হতেই ছোট মায়রা হাতে ফুলের পাপড়ি নিয়ে এসে ওদের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি গলায় বলে উঠল,
"হ্যাপি ম্যারেজ পিটার আঙ্কেল!
ঋদ্ধ এগিয়ে এসে পিটারের কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল,
"অভিনন্দন পিটার! এবার থেকে কিন্তু শুধু আমার কথা শুনলে চলবে না, বউয়ের কথাও শুনতে হবে।
কথাটা শুনে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠল। পিটার লজ্জায় মাথা নিচু করে হাসল, আর পাশে বসে থাকা অ্যানি পিটারের দিকে তাকাল।
--------------------------------
ঘড়িতে তখন রাত প্রায় বারোটা। মেহেরিন নিজ হাতে অ্যানিকে নিয়ে এসে পিটারের রুমে দিয়ে গেছে।
বেশ বেশি আড়ম্বর নেই, তবে ঘরের প্রতিটি কোণ খুব সিম্পলভাবে সুবাসিত তাজা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।
কিছুক্ষণ পরেই দরজায় শব্দ হলো। পিটার রুমে প্রবেশ করতেই খাটে বধূবেশে বসে থাকা অ্যানির দিকে তার নজর গেল। লালটে আভা আর ফুলের মাঝে অ্যানিকে দেখে মুহূর্তেই পিটারের সারাদিনের ক্লান্তি আর মনের তোলপাড় উবে গিয়ে চোখ দুটো শীতল হয়ে এলো।
তবে বুকের ভেতরের অপরাধবোধটা এখনো পুরো মোছেনি। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অ্যানির মুখোমুখি দাঁড়াল।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে পিটার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে বসল,
"একজন খুনিকে বিয়ে করতে রাজি হলে কেন, অ্যানি?
কথাটা শুনে শিউরে উঠল অ্যানি। ছলছল চোখে মাথা তুলে তাকাল পিটারের দিকে।
পিটার কষ্ট লুকিয়ে একটা তিতা হাসি হেসে বলল,
"বুঝেছি, স্যার আর ম্যামের কথা ফেলতে পারোনি, তাই তো?
চিন্তা করো না, আমি সুযোগ বুঝে তোমায় এই বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে দেবো। একজন খুনির সাথে তোমায় সারা জীবন সংসার করতে হবে না।
পিটারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অ্যানি।
মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল পিটার! তার হাত দুটো বাতাসের মাঝেই জমে রইল। অ্যানি তার বুকে মুখ গুঁজে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।
"আই এম সরি পিটার... অ্যান্ড আই লাভ ইউ!
অ্যানির ভেজা কণ্ঠ পিটারের বুকের ভেতর ঝড় তুলল।
"হ্যাঁ, আমি তোমায় ভালোবাসি পিটার! আমি কোনো মুক্তি চাই না, আমি তোমার সাথে সারা জীবন সংসার করতে চাই...
পিটার নিজের থুথু নিজেই একটা বড় ঢোক গিলল। যে অনুভূতি সে এতদিন বুকের গহীনে লুকিয়ে রেখেছিল, তা আজ এভাবে সত্যি হয়ে সামনে আসবে—সে বিশ্বাসই করতে পারছে না! ইতস্তত আর প্রচণ্ড দ্বিধা নিয়ে সে ধীরে ধীরে তার হাত দুটো অ্যানির পিঠে রাখল। অ্যানি আরও এক ধাপ এগিয়ে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন আর কখনোই ছেড়ে যাবে না।
কিছুক্ষণ সেভাবেই কেটে গেল। তারপর অ্যানি পিটারের বুক থেকে মুখ তুলে একটু অভিমানী চোখে তাকাল।
"এখনো কিন্তু উত্তর পেলাম না!
পিটার একটু থতমত খেয়ে বলল,
"ম... মানে?
"মানে আমি যে তোমায় এত ভালোবাসার কথা বললাম, তার কোনো উত্তর দিলে না তো!
অ্যানির চোখে তখন একরাশ অভিযোগ আর ভালোবাসা।
পিটারের চোখের কোণও ততক্ষণে ভিজে উঠেছে। জীবনের সব অন্ধকার দূর করে পাওয়া এই আলোটুকুকে সে আর হাতছাড়া করতে চাইল না। অ্যানিকে নিজের বাহুডোরে আরও একটু নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল,
"আমিও তোমায় ভালোবাসি অ্যানি... আই লাভ ইউ সো মাচ!
ঘরের মৃদু আলোয়, ফুলের সুবাসে দুটো অতৃপ্ত হৃদয় অবশেষে খুঁজে পেল তাদের কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা।