ঋদ্ধ থামল।
অ্যানির চোখের কোণে তখন টলমল করছে জল। মাত্র দশ বছরের একটা শিশু—কতটা মানসিক যন্ত্রণা আর অসহ্য কষ্টের ভেতর দিয়ে গেলে একটা বাচ্চা নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অ্যানি ভেবেও কূল পেল না।
ঋদ্ধ আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
" আর সেই সতেরো বছরের ছেলেটার ছিল পিটার।
চমকে উঠল অ্যানি।
ঋদ্ধ শান্ত গলায় বলল,
"কাল তুমি যাকে খুন হতে দেখেছো, সেই মহিলাটা সবসময় মায়রাকে আমার ব্যাপারে ভুলভাল বোঝাত। কাল পিটার সেটা জানতে পেরেছিল। আর বিষয়টা সে সহ্য করতে পারেনি। তাই...
ঋদ্ধ কিছুক্ষণ থেমে গেল।
"তাই তাকে মেরে ফেলেছে।
অ্যানির বুকটা কেঁপে উঠল।
ঋদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
" হ্যাঁ, এখানে আমারও দোষ আছে। সতেরো বছরের পিটার আসলে খুনি হয়ে জন্মায়নি।
একটু থেমে সে জানাল,
"ড্যাড যখন তাকে আমার কাছে পাঠিয়েছিল, ততদিনে আমি বড় বড় মাফিয়াদের একজন হয়ে উঠেছি। অবশ্য সেটা পুরোপুরি গোপন ছিল। মানুষের সামনে আমি একজন ডক্টর, একজন ব্যার্থ প্রেমিক, কখনো বা নিছকই এক ভবঘুরে মানুষ। কিন্তু আড়ালে... আমি একজন মাফিয়া।
ঋদ্ধের কণ্ঠে কোনো অহংকার ছিল না। বরং কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখেমুখে ফুটে উঠছিল এক অদ্ভুত ভার।
"খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পিটার এসব কাজে আমার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।পিটার যে সেই বাচ্চা মেয়ের মৃত্যু সহজে মেনে নিতে পারেনি তা আমি সেদিন বুঝেছি।
আমার সেই ক্ষমতাকেই কাজে লাগিয়ে পিটার সেই ছোট্ট মেয়েটাকে যারা যারা বুলিং করেছিল, তাদের সবাইকে খুন করে ফেলেছিল।
অ্যানি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
"সবটাই আমার অজানা ছিল। একসঙ্গে দশজন মানুষকে খুন করেছিল সে। আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। পিটার বরাবরই শান্ত, একটু ভীতু স্বভাবের ছেলে ছিল। তাই এতগুলো খুন সে করতে পারে—এটা আমি বিশ্বাসই করতে চাইনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিজেই আমার কাছে সবকিছু স্বীকার করেছিল।আমার পা ধরে বাচ্চার মতো কেঁদে ছিলো সেই বাচ্চা মেয়ের কাহিনি খুলে বলেছিলো আমাশ।
ঋদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
"আমি নিজের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সব প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছিলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পিটারকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখব। কিন্তু সে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। তার কথা সে আমার সাথেই থাকবে।
শেষ পর্যন্ত বাবার ব্যবসার একটা বড় দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিলাম।যেহেতু আমি ব্যাবসার কাজে একদমই হাত লাগাইনা তাই কাজের চাপে সে ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
অ্যানি এবার আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। মুখ চেপে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল।
ঋদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
"জানো তো, মানুষ খারাপ হয়ে জন্মায় না। আশেপাশের পরিবেশ, মানুষের আচরণ আর জীবনের অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাকে বদলে দেয় খারাপ বানায়।
সে কিছুক্ষণ থামল।
"তারপর আর এতোগুলো বছর পিটার কোনো খুন করেনি রক্ত মাখেনি।কিন্তু মায়রাকে দেখার পর... আর মায়রা আর মেহেরিন যখন বারবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছিল, তখন পিটারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই পুরোনো সত্তাটা যেন ধীরে ধীরে আবার জেগে উঠছিল।মায়রাকে বুলি করেছে শুনলেই তার সেই বাচ্চা মেয়েটার পরিনতি মনে পরতো।
ঋদ্ধের চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল।
"সে আবার খুন করতে শুরু করল।মায়রাকে যারাই বুলি করতো তাদেরকেই শাস্তি দিতো। এবার আমি তাকে বাধা দিইনি। বরং আমিও তার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
অ্যানি নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ঋদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঋদ্ধ এবার খুব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"আমি কিউটিপাই আর মেহুপাখিকে ঠিক কতটা ভালোবাসি, তার কোনো আন্দাজই করতে পারবে না কেউ। ওদের দিকে কেউ আঙুল তুললে সেই আঙুল গুঁড়িয়ে দিতে আমার এক মুহূর্তও লাগবে না।
তার কণ্ঠ আরও কঠিন হলো।
"ওদের নিরাপত্তার জন্য যদি আরও একশোটা খুনও করতে হয়, আমি করব। আর আমি জানি, আমার পাশে পিটারও থাকবে।আমি চাইলেও ও দুরে সরে যাবে না।
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল।
তারপর ঋদ্ধ ধীরে ধীরে বলল,
"মেহেরিন হয়তো কোনোদিন এসব জানতে পারবে না। আর আমি জানি, তুমিও তাকে কখনো এসব বলবে না।আর আমি চাইও না সে এসব জেনে কষ্ট পাক।সে হয়তো বিশ্বাস করতে পারবে না।
" তোমাকে এই কথাগুলো বলার কারণ একটাই—পিটারকে ভুল বোঝো না। ও খারাপ নয়। পরিস্থিতি ওকে খারাপ হতে বাধ্য করেছে।ওই বাচ্চা মেয়ের পরিনতি মানতে পারেনি সে।
ঋদ্ধের কণ্ঠে এবার এক ধরনের দৃঢ়তা ছিল।
"তুমি পিটারকে ভালোবাসো, সেটা আমি জানি। আর পিটারও তোমাকে পছন্দ করে—সেটাও আমার অজানা নয়। পিটারকে যদি নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পাও, তাহলে তুমি কোনোদিন ঠকবে না। এই গ্যারান্টিটা আমি তোমাকে দিতে পারি।
কথাগুলো বলে ঋদ্ধ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
নিঃশব্দে সেখান থেকে প্রস্থান করল সে।
পেছনে রেখে গেল অ্যানিকে—ব্যথা, বিস্ময় আর গভীর অবাকতায় স্তব্ধ করে।
ঋদ্ধের বলা প্রতিটি কথা যেন অ্যানির মনের ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
পিটার কি সত্যিই খারাপ নয়?
নাকি পরিস্থিতির নির্মমতায় হারিয়ে যাওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটার ভেতর আজও কোথাও বেঁচে আছে তার পুরোনো, শান্ত স্বভাবের পিটার?
অ্যানি কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
শুধু বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো।
-------------------------------------
"অ্যানি... অ্যানি...
"আব হ্যা! ইয়েস ম্যাম!
মেহেরিন অবাক হলো। অ্যানি সাধারণত অফিসে কখনো এতোটা মনমরা হয়ে থাকে না।
"তোমার কী শরীর খারাপ লাগছে? তুমি বরং আজ ছুটি নিয়ে নাও।
"না ম্যাম... আব হ্যা ম্যাম, আমার আসলেই একটু শরীর খারাপ লাগছে। আমি বরং আজ বেবিকে নিয়ে বাসায় যাই।
"হুম, যাও। আমি এদিকটা সামলে নেবো।
অ্যানি বেরিয়ে গেলো।তার শরীর টা এবার সত্যি ভালোলাগছে না তবে শরীরের থেকে মনটা যেনো বেশি খারাপ তার আজ।
রাত প্রায় এগারোটা।
"মাম্মা... মাম্মা...
মেয়ের ডাকে মেহেরিন চোখ মেলে তাকালো।
"একি প্রিন্সেস! তুমি এখনো ঘুমাওনি কেন?
"মাম্মা, মায়রাল ঘুম পাচ্ছে না। মায়লা তোমাল সাথে ঘুমাবে।
মেয়ের আদুরে আবদার শুনে হেসে ফেললো মেহেরিন। পরম মমতায় তাকে কাছে টেনে নিলো।
"অবশ্যই আমার প্রিন্সেস তার মাম্মার সাথে ঘুমাবে। এতে বলার কী আছে?
মায়রাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো মেহেরিন।
হঠাৎ মায়রা বললো,
"মাম্মা, আমাল একটা ভাই চাই।
মেয়ের এমন কথায় বেশ অবাক হলো মেহেরিন।
"কী বলছো এসব, প্রিন্সেস?
"জানো মাম্মা, রিশার না একটা বেবি ভইয়া হয়েছে! কী মিষ্টি দেখতে। মাম্মা, আমালও চাই। রিশা আমায় বলেছে তোমাকে আর পাপাকে বললে তোমলা আমায় বেবি ভাইয়া এনে দিবে।
মেহেরিন মেয়ের এমন আবদারে কী বলবে ভেবে পেলো না।
"ও মাম্মা... বলোনা মাম্মা, আমাল বেবি ভাইয়াকে কবে আনবে?
"আব...
মেহেরিন কথা শেষ করার আগেই ঘরে ভেসে এলো তীব্র গম্ভীর কণ্ঠ ~~
"তোমার কোনো বেবি ভাইয়া আসবে না, কিউটিপাই।
ঋদ্ধের কণ্ঠ শুনে মায়রা আর মেহেরিন দুজনেই তার দিকে তাকালো।
মায়রা নিজের পাপাকে দেখার সাথে সাথেই শোয়া থেকে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার কোলে।
"পাপা...
ঋদ্ধ মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েও নিজের কথাই পুনরায় বললো,
"তোমার কোনো বেবি ভাইয়া আসবে না, কিউটিপাই।
পাপার এমন কথায় ছোট্ট মায়রা বেশ ব্যথিত হলো। ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
"কিন্তু কেনু পাপা? রিশার বেবি ভাইয়া আছে, আমালও চাই।
ঋদ্ধ মেয়ের গাল টিপে বললো,
"দেখো কিউটিপাই, বেবি ভাইয়া আসলে তো তোমার আদরে ভাগ বসাবে, তাই না? তার থেকে বরং তুমি একাই আমাদের সন্তান হয়ে থাকো।
মায়রা মোটেও বুঝতে পারলো না তার পাপা কী বোঝাতে চাইছে। সে শুধু ভাইয়া পাওয়ার আশাতেই মেতে আছে।
মেহেরিন হতবাক হয়ে ঋদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা কীসব বলছে!
অবশেষে সে দ্রুত এগিয়ে এসে মায়রাকে বোঝানোর স্বরে বললো,
"আমার বেবি যখন চেয়েছে, তারমানে মাম্মা-পাপা এনে দেবে। তাই না? এবার চলো, ঘুমাই।
সাথে সাথেই মায়রার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
"ইয়েই! মায়লাল বেবি ভাইয়া আসবে!
খুশি হয়ে সে নিজের শোয়ার জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।
মেহেরিনও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
কিন্তু ঋদ্ধ মোটেও খুশি হতে পারলো না।
মুহূর্তেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। গম্ভীর মুখে সে মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরিন ঋদ্ধের চোখের দৃষ্টি বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
"কী হলো?
ঋদ্ধ কোনো উত্তর দিলো না।
শুধু ধীর পায়ে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। তার চোখেমুখে এমন এক অদ্ভুত অস্বস্তি।