মায়রা ততক্ষণে সবটাই ভুলে গেছে। এখন সে অপেক্ষায় আছে --
কখন মাম্মা-পাপা বাসায় ফিরবে।
অ্যানি আর পিটার দুজনেই মায়রার সঙ্গে আছে। পিটারের আবার অফিসে যাওয়ার কথা থাকলেও, সে যায়নি। সেও অপেক্ষা করছে ঋদ্ধ আর মেহেরিনের ফেরার।
অ্যানি আর মায়রা দুজনে মিলে তাদের মাম্মা-পাপার জন্য পাস্তা রান্না করছে। মায়রা রান্নাঘরে এসেই অ্যানির কাছে বায়না ধরেছে, সেও রান্না করবে তার মাম্মা পাপার পছন্দের খাবার।মাম্মা পাপাকে সারপ্রাইজ দিবে সপ। অ্যানিও তার বায়না রাখতে খুন্তি হাতে রান্নায় ব্যস্ত, আর মায়রা পাশে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তার রান্না করা দেখছে।
অন্যদিকে সোফায় বসে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছিল পিটার।
হঠাৎই কলিংবেলের শব্দে তার মনোযোগ ভাঙল। সে দ্রুত উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই সামনে ঋদ্ধ আর মেহেরিনের হাসিমুখ দেখতে পেল।
"কিউটিপাই কোথায়, পিটার?
ঋদ্ধ চটপট প্রশ্ন
পিটারের মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
"স্যার, ম্যাম—আপনারা আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন। আপনাদের জন্য বেবি একটা সারপ্রাইজ রেখেছে।
কপাল কুঁচকে ঋদ্ধ মেহেরিনের দিকে তাকাল। মেহেরিনের প্রতিক্রিয়াও একই। দুজনেই কিছু না বুঝে অবশেষে ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুমের দিকে চলে গেল।
এদিকে মায়রাও বুঝে গেছে—তার মাম্মা-পাপা ফিরে এসেছে।
"আন্তি, তাড়াতাড়ি কলো! মাম্মা-পাপা তো এসে পড়েছে!
অ্যানি খুন্তি নাড়াতে নাড়াতেই বলল,
"এই তো, বেবি, এসে গেছে। চলো এবার তোমায় ফ্রেশ করিয়ে দিই। গরমে কেমন ঘেমেছ দেখো! কত করে বললাম পিটার আংকেলের কাছে বসো, আমি সব রেডি করছি।
অ্যানির কথা শুনে মায়রা নিজের কোমরে দুহাত রেখে মুখ ফুলিয়ে বলল,
"উফ, আন্তি! তুমি দেখছি কিছুই বুজো না। মাম্মা-পাপাকে তো আমি সারপ্রাইজ দিবো! তাহলে তুমি কেন লান্না কলবে?
তার ভাবখানা এমন, যেন এতক্ষণ রান্নাঘরে পাস্তা রান্না করেছে অ্যানি নয়, সে নিজেই।
মায়রার কিউট ভঙ্গিমা দেখে অ্যানি আর হেসে থাকতে পারল না।
"আচ্ছা বাবা, বুঝেছি। এবার চলো তো, তুমি ফ্রেশ হবে। তারপর আমরা দুজন মিলে মাম্মা-পাপাকে সারপ্রাইজ দেব।
মায়রা সঙ্গে সঙ্গে সায় জানাল।
অ্যানি তার হাত ধরে তাকে নিয়ে চলে গেল ফ্রেশ করাতে।
-----------------------------------
"মাম্মা!
মেহেরিন সবে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়েছে। ঋদ্ধ তখনও ওয়াশরুমের ভেতরে। মেয়ের ডাক শুনে মেহেরিনের মুখে মুহূর্তেই প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
"ইয়েস, প্রিন্সেস?
পরক্ষণেই মায়রা ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজের মাম্মার কোলে। মেহেরিনও মেয়েটাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল।
মায়রা তার গাল, মুখ, ঠোঁট আর চোখে পরপর কতগুলো চুমু দিতে লাগল। মেহেরিন শান্ত মুখে মেয়ের সেই আদর উপভোগ করতে লাগল। যেন সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তির শেষে এই একটুকরো প্রশান্তিই তার কাছে ধরা দিয়েছে। মেয়ের ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসার ছোঁয়ায় যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল সারাদিনের সব ক্লান্তি।
মায়রা আবারও আদুরে গলায় ডাকল,
"মাম্মা...
"ইয়েস, প্রিন্সেস?
মায়রা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মিষ্টি স্বরে বলল,
"মায়রা মিসড ইউ সো মাচ, মাম্মা।
কথাটা শুনে মেহেরিনের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মেয়েকে আরও একটু শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
"মাম্মাও মিস ইউ সো মাচ, সোনা।
দৃশ্যটা দেখে মেহেরিনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুখানি হাসি।
এদিকে ঋদ্ধ এতক্ষণ ওয়াশরুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মা-মেয়ের এই দুষ্টু-মিষ্টি ভালোবাসার মুহূর্তটা নীরবে উপভোগ করছিল। তার চোখেমুখেও ফুটে উঠেছিল তৃপ্তির ছাপ।
"বাহ মায়রার সব ভালোবাসা শুধু তার মাম্মার জন্য পাপাকে তো কেউ ভালোবাসে না।
বেশ অভিমানী কন্ঠে সুর টেনে বললো ঋদ্ধ ,,
মেহেরিনের কোল থেকে মুখ বাড়িয়ে মায়রা তাকাল ঋদ্ধর দিকে।
পাপাকে অহেতুক অভিমান করতে দেখে তার ছোট্ট মুখে ফুটল দুষ্টুমিতে ভরা এক চিলতে হাসি।
মেহেরিনের গলা থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে সে দুই হাত বাড়িয়ে দিল ঋদ্ধর দিকে, যেন এখনই পাপার মন গলানোর ভার তার!
"পাপাপাপাপাপ্পা! মায়রার কিউট পাপা!
ঋদ্ধর শক্ত বুকে লাফিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল মায়রা। ঋদ্ধও এক হাতে মেহেরিনকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে অন্য হাতে মেয়েকে কোলে তুলে নিল।
মায়রা ঋদ্ধর চিবুক ধরে নরম গাল দুটো তুলে ধরে পাপার নাকে নিজের নাক ঘষে দিল আদর করে। তারপর ঋদ্ধর দু-গালে আর কপালে একের পর এক আদুরে চুমু আঁকতে আঁকতে বলল,
"পাপা একটুও পচা কথা বলবে না! মায়রা পাপাকে মিস করে নাই?
মায়রা তো পাপাকে মাম্মার চেয়েও ইত্তুউউউ বেশি ভালোবাসে! কিন্তু পাপা যদি এমন পচা অভিমান করে, তাহলে কিন্তু মায়রা আর একদম কথা বলবে না!
মেহেরিন খিলখিল করে হেসে উঠে ঋদ্ধর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল,
"শুনলে তো তোমার মেয়ের ডায়লগ? এখন বোঝো ঠ্যালা!
ঋদ্ধ এবার নিজের সব বানানো অভিমান ভুলে হা-হা করে হেসে ফেলল। মায়রার তুলতুলে গালে নিজের মুখ গুঁজে আলতো করে সুরসুরি দিয়ে বলল,
"তাই?
আমার রাজকন্যা পাপাকে এত ভালোবাসে? তবে তো মাম্মাকে হিংসুটে বানিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই!
মায়রা সুরসুরি খেয়ে হাসতে হাসতে ঋদ্ধ আর মেহেরিন—দুজনের গলাতেই দুই হাত জড়িয়ে ধরল।
একই বন্ধনে আবদ্ধ তিনটি প্রাণ, আর ঘরের কোণে থমকে থাকা পরম ভালোলাগা—পুরো ঘরটাই যেন এক নিমেষে একবুক ভালোবাসায় মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে।
" ম্যাম আর স্যার কে দেখলে আমার কি মনে হয় জানো?
অ্যানির কথায় পিটার ঋদ্ধ মেহেরিনের থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকালো।
"কি মনে হয়?
" মেইড ফর ইচ আদার তিনজনকে দেখুন এদের বাবা মেয়ের বন্ডিং দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে স্যার বেবির স্টেপ ফাদার।
"হুম তুমি ঠিক বলেছো।
" একি আন্তি আনতেল তোমলা লুকি লুকিয়ে আমাদেল দেকচো কেনো?
মায়রার কথায় পিটার অ্যানি দুজনেই তাকালো।
মায়রার কথায় হেসে ফেললো দুজনে ,,
"ম্যাম খাবার রেডি চলুন নিচে খেতে।
"হুম চলো!
নিচে আসতেই মেহেরিন ঋদ্ধ জানতে পারলো মেয়ের সব কার্যক্রম। মেয়ে যে তাদের সারপ্রাইজ দেওয়ার নাম করে তার অ্যানি আন্টিকে জালিয়ে মেরেছে তা বেশ বুঝলো।
পাঁচ জনে ডিনার শেষ করলো আনন্দ সহকারে।
" স্যার আমার একটু কথা ছিলো!
ঋদ্ধ পিটার এর মনোভাব বুঝেই তাকে স্টাডি রুমে যেতে বললো।
----------------------------------
"বলো পিটার? তোমার কি বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে? লজ্জায় বলতে পারছো না তাই আলাদা ডেকেছো?
ঋদ্ধ র মজায় বলা কথায় থতমত খেয়ে গেলো পিটার।
" ক ,, কি বলছেন স্যার !
"ঠিকি তো বললাম বলো কাকে বিয়ে করতে চাও?
" উফ স্যার আমার জরুরি কথা আছে আপনি প্লিজ মজা বন্ধ করুন।
ঋদ্ধ এবার মজা ছেড়ে সিরিয়াস হলো --
"ওকে ,, ওকে বলো কি হয়েছে
পিটার একে একে মায়রার বলা সব কথা খুলে বললো তাকে।
ঋদ্ধ মুখ খুবি স্বাভাবিক সে কোনো প্রতিক্রিয়া জানালো না শুধু বললো আমি দেখছি।
পিটার মাথা নাড়ালো শুধু।
ঋদ্ধ রুমে আসলেই মেহেরিনকে জিজ্ঞেস করে --
" কিউটিপাই কোথায় পাখি?
"বেবি তো ঘুমিয়ে পরেছে ,,
"ওকে আমি আসছি একটু!
ঋদ্ধ মায়রার রুমে আসলে দেখলো মায়রা ঘুমিয়ে পরেছে। তার পাশে বসলো সে আদুরে মুখটাকে মনোযোগ দিয়ে কিছুক্ষণ দেখলো চোখ,নাখ,মুখের আদল সবটা মেহেরিন। সে আলতো করে ঘুমন্ত মুখে চুমু খেলো।বিরবিরিয়ে বললো --
" পাপা তোমায় অনেক ভালোবাসে কিউটিপাই ,, পাপাকে ভুলবুঝোনা কখনো তার দুনিয়া তুমি আর তোমার মাম্মা।
মেহেরিন দরজার পাশে দাড়িয়ে দেখলো সবটা।সে পানি নিতে যাচ্ছিলো তখনই ঋদ্ধ কে মায়রার রুমে ঢুকতে দেখে পিছু এসেছিলো।
হঠাৎ ঋদ্ধ র এমন কথার কারন বুঝলো না তবে তার অবচেতন মন বলে উঠলো কিছু একটা হয়েছে।
-----------------------------
“আর কখনো কোনো বাচ্চা মেয়ের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলার সাহস পাবি না তুই।
কথাটা শেষ করেই পরপর তিনটি গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ।
মুহূর্তেই ভেসে এলো প্রচণ্ড জোরে এক নারীকণ্ঠের চিৎকার।
চিৎকারটা শুনেই লোকটির হাত থেমে গেল। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার পুরো শরীর যেন পাথর হয়ে গেল।
চোখের সামনে যা দেখল, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সে।