তাহসিন আর দেরি করল না। পা এগিয়ে চলল, তখনই সামনে পড়ল মেহেরিন।
সে চোখ তুলে তাকাল, আবারও নামিয়ে নিল নিজের চোখ, যেন পালাতে চাইছে।
"জানো তো, আমার আর আমার মেয়ের ওপর তোমার করা অন্যায়ের শাস্তি আমি না দিলেও প্রকৃতি ঠিকই দিয়েছে তোমায়। কথায় আছে— Revenge of Nature। মানুষ হয়তো ক্ষমা করে দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি কখনো অন্যায়ের হিসাব ভুলে যায় না। সময় হলে সে নিজের নিয়মেই সবকিছুর প্রতিদান ফিরিয়ে দেয়।
মেহেরিন শান্ত, স্থির কণ্ঠে কথাগুলো বলল।
মেহেরিন আর দাঁড়াল না। সে সেখান থেকে চলে গেল। তাহসিন তখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎই ফোনের তীব্র শব্দে ভাবনার ঘোর কাটল। মায়ের কল দেখেই তড়িঘড়ি করে কল তুলল--
ওপাশের কথা কানে আসতেই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তীব্র বেগে ছুটে চলল।
--------------------------------
ঋদ্ধ এতক্ষণ মেয়ের সাথেই কথা বলছিল।
মেহেরিন দরজায় দাঁড়াতেই দেখল, ঋদ্ধর কোলের মধ্যে একদম গুটিসুটি মেরে বসে আছে মায়রা।
ঋদ্ধ তার চুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছে,
আর মায়রা বড় বড় চোখ করে পাপার দিকে তাকিয়ে আধো-আধো গলায় গল্প করছে।
ঋদ্ধ মায়রার নাকে আলতো করে টিপ দিয়ে বলে--
আমার কিউটিপাইটা আজ সারাটা দিন মাম্মা-পাপাকে মিস করেছে? অ্যানি আন্টিকে অনেক জ্বালিয়েছ, তাই না?
মাথা নেড়ে, মিষ্টি হেসে মায়রা বলে--
না পাপা, আমি তুবু (শুধু) খেলনা দিয়ে খেলেছি। অ্যানি আন্তিকে একতুও জালাইনি! বাত মায়লা অলসো মিস মাম্মা পাপা।
"তাই তাহলে তো আমার কিউটিপাই গুড গার্ল। আর পাপাও অলসো মিস ইউ, কিউটিপাই।
ঋদ্ধ কিছুটা থেমে আবার বলে--
পাপাকে এত মিস করেছ, কই তাকে তো একটা কিসি দিলে না!
মায়রা ঋদ্ধর গলা জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু খায়।
"এই নাও! পাপা, তুমি অনেক মিত্রি (মিষ্টি)। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাতি (ভালোবাসি)।
ঋদ্ধ মায়রাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
"ওরে আমার সোনা মেয়েটা! পাপাও তার কিউটিপাইকে অনেক ভালোবাসে।
মায়রা ঋদ্ধর বুকের বোতামগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে নিচু গলায় বলল,
"পাপা, একটু চকোলেট খাবো? বেশি না, পুতু (শুধু) একটা? অ্যানি আন্তি আর মাম্মা আমাকে চকলেট দেয় না।
ঋদ্ধর সাধ্য কী, মায়রার এই মিষ্টি অনুরোধ ফেলে দেয়! মেহেরিন দরজায় হেলান দিয়ে হেসেই খুন।
ক্যাবিনে ঢুকে বলল,
"বাহ্! বাবা-মেয়ের প্রেম তো আজ দেখার মতো! তা আমার প্রিন্সেস পাপার আদর পেয়ে মাম্মামকে একদম ভুলেই গেল?
মায়রা মেহেরিনকে দেখে দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি করে বলল,
"মাম্মাম! এসো, পাপাকে কিসি দাও। পাপা অনেক ভালো!
মেহেরিন মেয়ের কথা শুনে হেসেই আকুল। সে এগিয়ে এসে মায়রাকে কোল থেকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল।
ঋদ্ধর দিকে তাকিয়ে একটু চোখ টিপে হেসে বলল,
"তোমার পাপা তো ভালো হবেই!
যা আবদার করবে, সব এক ফুঁৎকারে হাজির।
আর মাম্মাম আর অ্যানি আন্টি তো ভিলেন, তাই না?
মায়রা মেহেরিনের গলা জড়িয়ে ধরে গাল ঘষে বলল,
"না মাম্মাম, তুমিও মিত্রি (মিষ্টি)! পুতু (শুধু) একটু চকোলেট দাও না?
ঋদ্ধ সোফায় হেলান দিয়ে দু হাত ছড়িয়ে আরাম করে বসল। মেয়ের এই মিষ্টি ওকালতি দেখে তার মনটা ভরে গেছে। সে মেহেরিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"শুনলে তো? আমার কিউটিপাই কিন্তু কাউকেই পচা বলেনি। আর সারাটা দিন ও আমাদের কত মিস করেছে! আজ একটা চকোলেটও পেতেই পারে, কী বলো মেহুপাখি?
মেহেরিন মায়রার নরম গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
"আচ্ছা বাবা আচ্ছা, আজ পাপার সুপারিশে একটা চকোলেট ছাড় দেওয়া গেল। তবে একটা শর্ত আছে!
মায়রা খুশিতে চোখ বড় বড় করে বলল,
"কী তত্ত (শর্ত), মাম্মাম?
"শর্ত হলো, চকোলেট খাওয়ার পর লক্ষ্মী মেয়ের মতো কিন্তু আমাদের সাথে বাসায় গিয়ে সব খাবার আর ঔষধ ফিনিশ করতে হবে। নো দুষ্টুমি!
মেহেরিন মায়রার নাকটা হালকা টেনে দিল।
মায়রা সাথে সাথে ঋদ্ধর দিকে তাকিয়ে সম্মতি খোঁজার চেষ্টা করল। ঋদ্ধ হেসে বলল,
"পাপার কিউটিপাই তো এমনিতেই গুড গার্ল। ও সব শর্ত মেনে চলে, তাই না মা?
মায়রা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল,
"হ্যাঁ পাপা। মায়রা কোনো দুষ্টুমি করবে না। এবার চকোলেট দাও!
ঋদ্ধ তার পকেট থেকে একটা ছোট ক্যাডবেরি বের করে মায়রার হাতে দিতেই মায়রার মুখে যেন চাঁদের আলো ফুটে উঠল। সে চকোলেটটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
"থ্যাংকু পাপা, থ্যাংকু মাম্মাম!
ঋদ্ধ আর মেহেরিন দু'জনেই হেসে ফেলল।
---------------------------------
তাহসিন দ্রুত পায়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছাল।
নিজের পাঁচ মাস বয়সী সন্তানের এমন করুণ পরিণতি দেখে তাহসিন যেন ভেঙে পড়েছিল। তার মা-ও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় আগের রাতেই দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শিশুটিকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
ছেলেকে একনজর দেখে মায়ের ক্যাবিনে গিয়ে বসল তাহসিন।
"কোথায় গিয়েছিলি বাবা সকাল সকাল?
"চৌধুরী কোম্পানিতে মা ,,
"সে কী! আবার কেন ওখানে গিয়েছিস? নিশ্চয় ওরা তোকে অপমান করেছে আর ডিলটা ক্যান্সেল করেছে, তাই না?
"না মা, ডিলটা আমি পেয়ে গেছি,,
অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন তিনি।
"তাহসিন মায়ের দিকে তাকিয়ে তাকে আশ্বাস দিল--
হ্যাঁ মা, মেহেরিন ডিলটা সাইন করেছে।
জানো মা, আজ আমার মেয়ের সাথে কথা বললাম। কী মিষ্টি করে কথা বলে সে! তাহসিনের কণ্ঠ কাঁপছে, সামনে বসে থাকা তার মা সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।
জানো, আমার মেয়ে আমাকে আংকেল ডেকেছে,,
টুপ করে একফোঁটা পানি পড়ল তাহসিনের চোখ থেকে। তাহসিনের মাও কাঁদছেন।
"আমরা অনেক বড়ো ভুল করেছি মা ,, মেহেরিনের মতো ভালো একটা মেয়েকে ঠকিয়েছি বলেই আজ আমার এই অবস্থা। আবার দেখো, সেই মেহেরিনের দয়াতেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছি। আমার খুব লজ্জা লাগছে মা।
ভাঙা গলা তাহসিনের।
"তবে অনেক হয়েছে। এবার আমার ভুল শুধরাব আমি।
বলেই উঠে দাঁড়াল সে।
"কোথায় যাচ্ছিস বাবা ,,
"নিজের ভুল শুধরাতে মা! হয়তো মেহেরিনকে কখনো আমার জীবনে ফিরে পাব না। আমার মেয়ে আমায় কোনোদিন চিনবে না। তবে আমার দুধের সন্তানের এই পরিণতির জন্য যে দায়ী,
তাকে আমি ছাড়ব না ,,
------------------------------
"ডার্লিং,, আমি তাহসিনকে ছেড়ে একেবারে চলে এসেছি।
"হোয়াট ,,!
তীব্র বেগে বসা থেকে উঠে পরলো লোকটি ,,,
"ইয়েস ডার্লিং ,, ডিভোর্স পেপারও দিয়ে এসেছি। কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স কমপ্লিট হবে। তুমি খুশি হওনি জান?
বলে লোকটির গলা জড়িয়ে ধরে তার কোলে বসে পড়ল তুলি।
লোকটি হাসার চেষ্টা করল।
তুলির কোমর ধরে টেনে আরও কাছে নিয়ে আসল। তার শরীরে লোভাতুর নজর আর হাত দিয়ে নিষিদ্ধ স্থানগুলো ছুঁয়ে দিতে শুরু করল লোকটি। তুলিও যেন তাতে বেশ মজা পাচ্ছে।
"ইয়েস ডার্লিং ,, খুব তাড়াতাড়ি আমার রাজ্যের রানি হবে তুমি।
তুলি বাঁকা হাসল। লোকটির কলার চেপে তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
দু'জনে মেতে উঠল তাদের নোংরামিতে।
-------------------------------
বিয়ের পরদিনই সকাল সকাল ঋদ্ধ মেহেরিনকে অফিসে নিয়ে গেছে জেনে আফিয়া চৌধুরী বেজায় চটেছেন। রাগে গজগজ করছেন তিনি।
এর মাঝেই মেহেরিন আর ঋদ্ধকে আসতে দেখা গেল। ঋদ্ধর কোলে মায়রা ঘুমিয়ে আছে।
তাদের দিকে এগিয়ে তীব্র রাগে কিছু একটা বলতে নিতেই,,
"হুসসস ,, মম , আস্তে। আমার কিউটিপাইয়ের ঘুম ভেঙে যাবে ,,
আমরা ফ্রেশ হয়ে কথা বলছি।
থেমে গেলেন আফিয়া চৌধুরী।
ঋদ্ধ নিজেদের রুমে নিয়ে গেল মায়রাকে। পরম যত্নে ধীরে মেয়েকে খাটে শুইয়ে দিল, যেন মেয়ের ঘুম না ভাঙে।
মেহেরিন মুগ্ধ হয়ে দেখল , ঋদ্ধ মায়রার ঠিক কতটা কেয়ার করে।
সে ফ্রেশ হতে চলে গেল। অনেকটা টায়ার্ড সে।