মেহেরিন তড়িঘড়ি করে ঋদ্ধর বুক থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল।
ঋদ্ধর দুচোখ বেয়ে তখনো নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।
মেহেরিনের বুকটা এক অজানা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
নিজের কাঁপতে থাকা নরম হাত দুটো দিয়ে সে ঋদ্ধর দুগাল আগলে ধরল। বুড়ো আঙুল দিয়ে পরম মমতায় চোখের জল মুছে দিতে দিতে অস্থির গলায় বলল --
"ঋদ্ধ!
একি... তুমি কাঁদছো কেন?
প্লিজ কাঁদবে না। আমি তো তোমার কাছেই আছি, সবসময় তোমার হয়ে থাকবো।
ঋদ্ধ কোনো কথা বলল না। সে কেবল লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে মেহেরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এবং কোমরে নিজের শক্ত হাতের বাঁধন আরও তীব্র করল; যেন একটু আলগা করলেই এই স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।
"আমি শুধু তোমার ঋদ্ধ,
আমার সবটা তোমার
ফিসফিসিয়ে বলল মেহেরিন।
মেহেরিনের মুখে এই স্বীকারোক্তি শুনে ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সে মেহেরিনের গাল আগলে ধরে থাকা হাত দুটোর ওপর নিজের হাত রাখল।
"এই কান্না কষ্টের নয়, পাখি
"এটা আমার আনন্দের কান্না,
ঋদ্ধর ভারী কণ্ঠস্বর আবেগে কাঁপছিল।
"এই কান্না তোমাকে নিজের করে পাওয়ার তৃপ্তির। এতগুলো বছর পর আজ আমার বুক থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেছে।
বলেই ঋদ্ধ মেহেরিনকে আরও জোরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। মেহেরিন ঋদ্ধর বুকের উষ্ণতায় চোখ বুজে ফেলল। তার সারা শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা অচেনা কাঁপন বয়ে গেল।
এতগুলো বছরের প্রতীক্ষা শেষে আজ মেহেরিনের মনে হচ্ছে, সে নতুন করে তার ভালোবাসা ফিরে পেয়েছে। ঋদ্ধ কি জানে, মেহেরিন এই বেপরোয়া মানুষটাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে?
না, জানে না
সে তো কখনো স্বীকারই করেনি।
ঋদ্ধর শক্ত দুজোড়া হাত মেহেরিনকে আলতো করে একটু সরিয়ে আনল। মেহেরিনের চোখের পাতায় তখনো অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে। ফর্সা মুখ আর তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখল ঋদ্ধ। পরম যত্নে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে সেই জল মুছে দিয়ে সে মেহেরিনের কপালে এঁকে দিল এক দীর্ঘ, তৃপ্ত চুম্বন।
আচমকাই ঋদ্ধর মনে হলো সে নিজেকে সামলাতে পারছে না, তার মেহেরিনকে আরও কাছে চাই যতোটা কাছে পেলে সে আর মেহেরিনকে হারানোর ভয় পাবে না। সে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। মেহেরিনের দৃষ্টি তখনও তার দিকে।
"তুমি সত্যি আমার তো, মেহেরিন?
ঋদ্ধর কণ্ঠস্বর গভীর এবং নিচু।
মেহেরিন কোনো কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল।
ঋদ্ধ আবারও একটা ঢোক গিলল --
কি আশ্চর্য, সে ভয় পাচ্ছে!
"আমার তোমাকে চাই মেহুপাখি।
ফিসফিসিয়ে গভীর স্বরে কথাটা বললো সে।
কি অনবদ্য এক আবদার!
মেহেরিন তার কথা বুঝতে পেরে ভীষণ লজ্জা পেল।তার সম্পুর্ন কায়ায় যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেলো।
"আ... আমি তোমারই...
"উহু, আরও কাছে
পুরোটা...
মেহেরিন অনেকটা সময় চুপ থাকলো।
ঋদ্ধ নিজের উত্তর না পেয়ে তার কাছ থেকে সরে আসতে নিলেই মেহেরিন বাধা দিলো।
ঋদ্ধ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলে।
মেহেরিন শুধু ঋদ্ধর শার্টের কলারটা মুঠো করে ধরে নিজের মুখটা আবার তার বুকে লুকিয়ে নিল।
ঋদ্ধর ঠোটে মৃদু হাসি খেলে গেলো বুঝল, এই মৌনতাই ছিল তার সম্মতি।
ঋদ্ধ মেহেরিনকে আলতো করে কোলে তুলে নিল। মেহেরিন চমকে উঠে ঋদ্ধর গলা জড়িয়ে ধরল। ঘরের মৃদু আলোয় তাদের দুজনের ছায়া দেয়ালে মিলেমিশে এক হয়ে গেল। বিছানায় মেহেরিনকে শুইয়ে দিয়ে ঋদ্ধ যখন তার ওপর ঝুঁকে এল, মেহেরিনের হৃদস্পন্দন তখন চড়াদাগে চড়ছে।
ঋদ্ধর হাতের আঙুলগুলো মেহেরিনের চুলের মাঝে বিলি কেটে দিল।
তার ঠোঁট নেমে এল মেহেরিনের গালে, চোয়ালে, চোখে আর সবশেষে ঠোঁটের ওপর। এক পরম আকুলতায় যেন কতদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে ঋদ্ধ।
সে খুব গভীরভাবে মেহেরিনের ঠোঁটে, গলায়, কাঁধে, চোখে ও মুখে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিল। যেখানে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল কেবল একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব করার এক অনন্ত তৃপ্তি।
মেহেরিন নিরবে সবটা অনুভব করছে শুধু।
বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামার শব্দ।
বেশ খানিকটা সময় পেরোলে আচমকাই ঋদ্ধ মেহেরিনের ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে তার দিকে তাকাল। মেহেরিন তখনও চোখ বুঁজে কাঁপছে, সমান তালে আন্দোলিত হচ্ছে তার বক্ষ। ঋদ্ধ তা খুব মনোযোগ দিয়ে অবলোকন করছিল।
মেহেরিন চোখ খুলেই দেখল ঋদ্ধ তাকে এমন গভীর দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে পরখ করছে।
লজ্জা যেন আরও বেড়ে গেল। ঋদ্ধ মেহেরিনের লজ্জা মাখা মুখ দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, মুখ ডুবিয়ে দিল তার বক্ষের খাঁজে।
মেহেরিন তীব্র উত্তেজনায় আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল।
"লা... লাইট বন্ধ করো প্লিজ...
কাঁপা কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করল সে।
ঋদ্ধ নিজের কাজে ব্যাঘাত ঘটায় একটু বিরক্ত হলেও।
মেহেরিনের নাছোড়বান্দা অনুরোধে বিছানা থেকে উঠে রুমের লাইট অফ করে দিলে।
মেহেরিন নিজেও উঠে দ্বরিয়েছে, সে লজ্জায় ঋদ্ধর দিকে তাকাতে পারছে না।
শরীর তখনও কাঁপছে।
হঠাৎ তীব্র বেগে এক ঝটকায় ঋদ্ধ মেহেরিনের কোমর ধরে নিজের সাথে লেপ্টে নিল। মেহেরিনের মুখ থেকে একটা অস্ফুট চিৎকার বের হতেই ঋদ্ধ তার এক হাত দিয়ে মেহেরিনের দুই হাত পিঠের পেছনে শক্ত করে চেপে ধরল। মেহেরিন অবশ হয়ে গেল ঋদ্ধর এই ডমিনেটিং রূপ দেখে। এতক্ষণের শান্ত রূপটা কেমন অশান্ত হয়ে উঠল।
"ঋদ্ধ, লাগছে...
মেহেরিনের চোখ সজল হয়ে উঠল।
ঋদ্ধ তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে মেহেরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। তার গরম নিঃশ্বাস মেহেরিনের কাঁপুনি বাড়িয়ে দিল। সে ফিসফিস করে বলল,
"আমার ভালোবাসা এমনই মেহেরিন বড্ড তীব্র, নিষ্ঠুর।
তোমাকে ভেঙে চুরমার করে আবার নিজের মতো করে গড়ব। তুমি শুধু আমার।
ঋদ্ধ তার অন্য হাত দিয়ে মেহেরিনের ভারী হিরের নেকলেসটা এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। মণি-মুক্তোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো। পরের মুহূর্তেই ঋদ্ধর ঠোঁট নেমে এলো মেহেরিনের নরম ঘাড় আর উন্মুক্ত কাঁধে।
কামড়ের মতো তীব্র আর ভালোলাগার মতো নরম সেই স্পর্শে মেহেরিন শিউরে উঠল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না, হাত-পা যেন ভেঙে আসতে চাইল।
পিঠের পেছনে আটকে থাকা হাত দুটো ঋদ্ধ আলগা করে দিতেই মেহেরিন ঋদ্ধর শার্ট খামচে ধরল।
ঋদ্ধ মেহেরিনের চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য করল। ঋদ্ধর চোখে তখন এক সর্বগ্রাসী নেশা।
"আজ রাতে তুমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে আমার মাঝে, পাখি।
এই দাগ, এই ক্ষত --
সব তোমার শরীরে আমার অধিকারের প্রমাণ হয়ে থাকবে। পুরোনো সব কষ্ট ভুলিয়ে দেবে, যেখানে তোমার জীবনে আমি ছাড়া কারো অস্তিত্ব থাকবে না।
বলতে বলতেই ঋদ্ধ মেহেরিনকে পাঁজকোলা করে তুলে নিল। বিছানার লাল গোলাপের পাপড়িগুলোর ওপর মেহেরিনকে শুইয়ে দিতেই ঋদ্ধর ভারী শরীরটা তার ওপর ছায়া ফেলল। ঘরের মৃদু নীল আলোয় ঋদ্ধর চোখের মণি দুটো যেন আরও গভীর আর রহস্যময় দেখাচ্ছে।
মেহেরিনের বুকের ওঠানামা তীব্রতর হচ্ছে। সে চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই ঋদ্ধ তার দুহাত মেহেরিনের মাথার দুপাশে লক করে দিল।
"আমার দিকে তাকাও, মেহেরিন
ঋদ্ধর কণ্ঠস্বর এখন এক অদ্ভুত মায়াবী ফিসফিসানিতে রূপ নিয়েছে, যাতে কোনো জোর নেই, কিন্তু এক তীব্র সম্মোহন আছে।
"আজ এই চওড়া বুকটার নিচে তোমার হৃদস্পন্দন আমি গুনতে চাই।
মেহেরিন বাধ্য হয়ে ঋদ্ধর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো হিংস্রতা নেই, আছে এক মহাসমুদ্রের মতো গভীর ভালোবাসা আর তীব্র আকুলতা।
"ভয় পাচ্ছো?
মেহেরিনের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই ঋদ্ধ পরম যত্নে তার ঠোঁট দিয়ে সেই জলটুকু মুছে নিল। সেই ছোঁয়া এতটাই নরম ছিল যে মেহেরিনের ভেতরের সব ভয় এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
ঋদ্ধ ধীরেসুস্থে মেহেরিনের কপালে তার ঠোঁট জোড়া ছোঁয়াল—এক দীর্ঘ, পবিত্র এবং গভীর চুম্বনে।
মেহেরিন চোখ বন্ধ করে এই অনুভূতির অতলে হারিয়ে যেতে লাগল। এত বছর ধরে যে একাকীত্ব সে সহ্য করেছে, ঋদ্ধর এই একটি স্পর্শ যেন তার সব ক্ষত ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিচ্ছে।
ঋদ্ধর আঙুলগুলো এবার মেহেরিনের লেহেঙ্গার ভারী ওড়নাটা আলতো করে সরিয়ে দিল। তার পরশ মেহেরিনের উন্মুক্ত কাঁধে আর গলায় এক হালকা শিহরণ তুলে গেল। মেহেরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না
তার হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ঋদ্ধর চওড়া কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
ঋদ্ধ মেহেরিনের এত কাছের আত্মসমর্পণ দেখে তার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল।
এই চম্বন নিষ্ঠুর ছিল না, ছিল অত্যন্ত ধীর, গভীর এবং আবেগে ঠাসা। যেন দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মা বছরের পর বছর অপেক্ষার পর একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।
বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে, আর ঘরের ভেতরে রজনীগন্ধার সুবাসের মাঝে মেহেরিন আর ঋদ্ধ এক সুতোয় বাঁধা পড়ে যাচ্ছে।
এক সময় মেহেরিন এর পুরো শরীর সম্পুর্ন উন্মুক্ত করে ফেলে ঋদ্ধ। লজ্জায় সরিয়ে দিতে চাইলে ঋদ্ধ তা হতে দেয় না।
শুরুর সেই ডমিনেটিং রূপটা কখন যে এক অতলান্ত ভালোবাসার সাগরে রূপ নিয়েছে, তা মেহেরিন নিজেও টের পায়নি।
ঋদ্ধর চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে সে কেবল তার দ্রুত হৃদস্পন্দন শুনছিল, যা তাকে এক পরম আশ্রয়ের জানান দিচ্ছিল।
ঋদ্ধ মেহেরিনকে আরও একটু নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে তার কানের কাছে মুখ ঠেকালো।
ভালোবাসার চরম মূহুর্তে এসে বলে উঠলো --
"কষ্ট হচ্ছে, মেহুপাখি?
ঋদ্ধর কণ্ঠস্বর এখন ভীষণ নরম।
মেহেরিন কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল ঋদ্ধর শার্টের হাতাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল এবং নিজের মাথাটা তার বুকের আরও গভীরে গুঁজে দিল। এই নীরবতাই ছিল তার পরম তৃপ্তির ও সম্মতির ভাষা।
বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। জানালার কাঁচ বেয়ে জলের ফোঁটাগুলো নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে, আর ঘরের ভেতরে রজনীগন্ধার সুবাস আর তাদের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
মেহেরিন অনুভব করতে পারল, এই তীব্র আর গভীর ভালোবাসার রাতে সে তার জীবনের সমস্ত শূন্যতা হারিয়ে ফেলেছে।
সে আজ থেকে সত্যি পুরোপুরি ঋদ্ধর অর্ধাঙ্গিনী,
তার বিবশ হৃদয়ে বসন্তের একমাত্র আগমনী বার্তা।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরের পরিবেশটা আরও শান্ত আর স্নিগ্ধ হয়ে এলো। মেহেরিন তখন ঋদ্ধর বুকের ওপর মাথা রেখে ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছে। চোখেমুখে তার তীব্র ক্লান্তি দেখে ঋদ্ধ আলতো করে মেহেরিনের কপালে আর একটি চুমু খেলো।
এক হাত দিয়ে মেহেরিনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল আর অন্য হাত দিয়ে তার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছিল।
বসন্তের এই প্রথম রাতটি তাদের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দিল,
যা চিরকাল তাদের হৃদয়ে অমলিন থাকবে।