রিসেপশনের জমকালো আলো আর মানুষের কোলাহল যেন তাহসিনের চারপাশে একটা দমবন্ধ করা দেয়াল তৈরি করেছিল। মেহেরিনের সেই শীতল উপেক্ষা আর ঋদ্ধর বিজয়ী হাসি তার বুকের ভেতরটা তছনছ করে দিয়েছে।নিজের সন্তান অন্য একজনকে বাবা বলে ডাকছে এটা যেনো তাহসিন মানতে পারছে না।হঠাৎই মনে হলো তার সাথে যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে সে তো ওই বাচ্চাটার মুখ ও দেখেনি তাহলে সে কেনো তাকে বাবা ডাকবে।
এসব ভাবতে ভাবতে আবারও স্টেজের দিকে চাইলো সেখানে তখনও ঋদ্ধ র কোলে মায়রা পাশে অপরুপ সুন্দরী মেহেরীন।তারা বিভিন্ন গেস্ট দের সাথে পরিচিত হচ্ছে।
মা আর তুলিকে নিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই সে প্রায় পালিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।
দম আটকে আসছিলো তার। কেন যেনো মনে হচ্ছিল ওখানে সবাই তার দিকে উপহাসের চোখে তাকিয়ে ছিলো।
মৈনাক যখন তাহসিন কে সেই পার্টিতে দেখে প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল তা স্পষ্ট দেখেছে তাহসিন কিন্তু ঋদ্ধ তা সামলে নিয়েছে নিরবে।
কোম্পানির ডিলের বিষয় টা আজকে ক্লিয়ার করার কথা থাকলেও তাহসিন সাহস করে উঠতে পারেনি ডিল নিয়ে কথা বলার।তার বোঝা হয়ে গেছে সে তার বাবার শখের কোম্পানি টা আর বাচাতে পারবে না।
ঋদ্ধ মূলত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে ওই পার্টিতে ইনভাইট করেছিলো।
"ইউ ডিজার্ভ ইট তাহসিন আহমেদ ,, ইউ ডিজার্ভ ইট ,,
অনবরত বিরবির করে চলছে তাহসিন।
" তীক্ষ্ণ হাসির শব্দে নিজের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসলো সে।
তুলি কে এমন জঘন্য ভাবে হাসতে দেখে কপাল কুচকালো সে।
কপমন লাগছে তাহসিন নিশ্চয়ই খুব আফসোস হচ্ছে। আমি মূলত এর জন্যই তোমার সাথে যেতে রাজি হয়েছিলাম।তোমার এই মুখটা দেখে আমার যে কি ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না।কোথায় তুমি ভেবেছিলে ডিলটা পেয়ে তুমি রাজা হবে সেখানে বিরহ পাচ্ছো।
তুলির হাসিতে শরীরটা বারবার দুলপ দুলে উঠছে তবুও হাসি থামছে না তার।
তাহসিন নিজের রাগ সমাল দিতে পারলো না।তিব্র বেগে তুলির গলাটা চেপে ধরলো দেওয়ালের সাথে।
হিসহিসিয়ে বলে উঠলো --
তোদের মতো লোভী আর কুৎসিত মানসিকতার মানুষই সুন্দর করে গড়ে ওঠা সংসার ভেঙে দেয়। তোদের মতো মানুষের কারণেই সমাজে আজও বলা হয়—একজন নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু আরেকজন নারী। অথচ সত্যি হলো, শত্রু কোনো লিঙ্গ নয়; শত্রু হলো মানুষের নীচ মানসিকতা।
তুলির চোখ দুটো ভয়ে আর অক্সিজেনের অভাবে বড় বড় হয়ে গেল। সে দুই হাত দিয়ে তাহসিনের শক্ত হাতটা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে গোঙানির মতো শব্দ করল, কিন্তু তাহসিনের ওপর যেন তখন কোনো ভূত ভর করেছে। তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে, চোখের মণি দুটো জ্বলছে হিংস্রতায়।
দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে যাওয়া তুলি কোনোমতে তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মুখ থেকে ফুসফুসের আটকে থাকা বাতাসটুকু বের করে অস্পষ্টভাবে বলল,
"ছা ,, ছারো আমায়৷
কিন্তু তাহসিনের কানে তখন কোনো যুক্তি, কোনো মিনতি পৌঁছানোর মতো অবস্থা ছিল না।
" কি করছিস তাহসিন ছেড়ে দে ওকে মরে যাবে মেয়েটা।
আতঙ্ক নিয়ে তাহসিন কে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো তার মা।
এক পার্যায়ে এসে তাহসিন ছেড়ে দিলো তুলিকে।
সাথে সাথে কাশতে শুরু করলো মেয়েটা আরেকটু হলে প্রানটা বেড়িয়ে যেতো তার।
রাগে তুলির পুরো শরীর কাঁপছে। চোখ দুটো রক্তিম, ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। নিজের সমস্ত ক্ষোভ এক নিঃশ্বাসে উগরে দিয়ে সে বলে উঠল—
"আমি যদি নষ্টা, সংসারভাঙা, লোভী মেয়ে হয়ে থাকি, তাহলে তুমিও কোনো ধোয়া তুলসী পাতা নও, তাহসিন আহমেদ।
ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে অফিসের সহকর্মীর সঙ্গে রাত কাটাতে তোমার একটুও লজ্জা করেনি?
তার সঙ্গে মিলে নিজের স্ত্রীকে প্রতারণা করতে বিবেকে বাধেনি? নিজেকে ভীষণ সৎ আর আদর্শ মানুষ ভাবো, তাই না?
কিন্তু সত্যিটা হলো --
তুমি একজন কাপুরুষ!
এক মুহূর্ত থেমে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আবার বলল,
"তুমি যেমন আমার শরীরে মজেছিলে, আমিও তেমনি তোমার টাকায় মজেছিলাম।আর এখন সব দোষ তুমি আমাকে দিচ্ছো বলে তাচ্ছিল্য হাসলো।
আজ তোমার টাকা নেই, তাই তোমারও আর কোনো প্রয়োজন নেই আমার।
কথাগুলো বলেই পার্স খুলে একটি কাগজ বের করল সে। পরের মুহূর্তেই সেটি ছুড়ে মারল তাহসিনের মুখের ওপর।
"ডিভোর্সের কাগজ। সই করে দেবে। আর যদি সই না করো, তাহলে তোমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করব।
দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থামল তুলি। পেছনে না তাকিয়েই ঠান্ডা, নির্দয় কণ্ঠে বলল—
"আর হ্যাঁ --
তোমার সেই তথাকথিত সন্তানও আমার চাই না। ওকে তুমি নিজের কাছেই রেখো।
কথা শেষ করেই আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তুলি।
রুমজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
তুলির কথাগুলো অনবরত কানে বারি খাচ্ছে যেনো।ধপ করে বসে পরলো সে।
তাহসিন এর মা কেঁদে চলেছে সেই থেকে ছেলের এই অবস্থা তার নাতিটাও অসুস্থ।কান্নার শব্দে আবারও নাতির কাছে গেলেন তিনি। রুম থেকে বেড়িয়ে নাতিকে কোলে নিলো সে।।
ঠিক তখনই তাহসিনের মা লাগেজ হাতে তুলিকে বেরিয়ে যেতে দেখে তড়িঘড়ি করে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
"এমন করো না মা...
অন্তত একবার নিজের সন্তানের কথাটা ভাবো।
কিন্তু তুলির রাগ তখন সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। চোখেমুখে জ্বলছিল তীব্র বিদ্বেষ। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে জোরে ধাক্কা দিল তাহসিনের মাকে।
প্রস্তুত না থাকায় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন। তার কোল থেকে ছিটকে পড়ল পাঁচ মাসের শিশুটি। মুহূর্তেই ঘরজুড়ে ভেসে উঠল শিশুটির বুকফাটা কান্না।
তবু সেই নিষ্ঠুর মুহূর্তেও একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকাল না তুলি। নিজের সন্তান কাঁদছে কি না, সেটুকুও যেন তার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করছিল না। লাগেজ হাতে গটগট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে।
শিশুর কান্নার শব্দ শুনে দৌড়ে বেরিয়ে এল তাহসিন। সামনে দৃশ্যটা দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল।
"মা!
এক ঝটকায় ছেলেকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে নিল সে। তারপর তাড়াতাড়ি মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসতেই তার বুক হিম হয়ে গেল। কপালের একপাশ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে বলল,
"মা... তোমার অনেক রক্ত পড়ছে! এক মিনিট, আমি এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
এক হাতে নিজের কাঁদতে থাকা সন্তানকে শক্ত করে আগলে রেখে, অন্য হাতে মাকে উঠানোর চেষ্টা করতে লাগল তাহসিন। মুহূর্তের মধ্যেই তার চারপাশটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
----------------------------------
অনুষ্ঠানের ধকলে বেশ কাহিল অবস্থা সবার।
রিসিপশনের ঝলমলে আলো আর মানুষের ভণ্ডামিপূর্ণ শুভেচ্ছা থেকে মুক্তি পেয়ে অবশেষে মেহেরিন এসে দাঁড়িয়েছে ঋদ্ধর বিশাল বেডরুমে।
কিছুক্ষণ আগেই অ্যানি তাকে এই রুমে দিয়ে গেল।
মায়রাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে সে।
চারপাশটা রজনীগন্ধা আর দামী পারফিউমের তীব্র মিষ্টি গন্ধে মাতাল হয়ে আছে। বিছানাময় ছড়ানো লাল গোলাপের পাপড়ি।
মেহেরিনের বুকের ভেতরটা কাঁপছে অদ্ভুত ভাবে। অতীত তাকে পুরুষ জাতটার ওপর ভরসা করতে দেয়নি, কিন্তু সে জানে ঋদ্ধ তার সবথেকে বড়ো ভরসার স্থল।
হঠাৎ খট করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। মেহেরিন চমকে পেছনে তাকাল।
ঋদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
তার পরনের সেই ব্লজার সেট তবে ব্লেজারটা হাতে গাশে শার্ট জরানো।ওপরের দুটো বোতাম খোলা, চুলগুলো সামান্য উসকোখুসকো।অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে এ অবস্থাতেও।
মেহেরিন নিজের ভাবনা ছেড়ে বেড়িয়ে আসলো ঋদ্ধ দরজা আটকে ঘুরে দারালে তাকে সালাম করতে নিলো মেহেরিন।সাথে সাথে খপ করে তাকে ধরে ফেললো।
" কি করছো?
শীতল গলা তার।
"আব এটা নিয়ম
নিজের কথা শেষ করতে পারলো না মেহেরিন তার আগেই ঋদ্ধ তাকে নিজের বুকে জরিয়ে নিলো শক্ত করে।
নিজের কথা শেষ করার সুযোগই পেল না মেহেরিন। তার আগেই ঋদ্ধ এক ঝটকায় তাকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল।
আকস্মিক ঘটনায় থমকে গেল মেহেরিন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার শরীর যেন অবশ হয়ে এলো। তবে পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্থির থাকার চেষ্টা করল।
মেহেরিনের চুলে মুখ গুঁজে গভীর নিশ্বাস নিয়ে ঋদ্ধ ফিসফিস করে বলল,
"জানো, পাখি... এই দিনটার জন্য আমি কতটা অপেক্ষা করেছি? দীর্ঘ সাতটা বছর আমার জীবনে কোনো বসন্ত আসেনি। প্রতিটা দিন শুধু তোমাকে হারানোর শূন্যতা নিয়েই বেঁচে ছিলাম। কিন্তু সেদিন, হঠাৎ করেই মায়রা—
আমার ছোট্ট কিউটিপাই আমার জীবনে নতুন করে বসন্তের আগমনের বার্তা হয়ে এলো। ও-ই আমাকে আবার তোমার কাছে ফিরিয়ে এনেছে।
একটু থেমে আরও শক্ত করে মেহেরিনকে আগলে নিয়ে সে বলল,
তোমাকে না পাওয়ার যে হাহাকার এত বছর ধরে বুকে পাথরের মতো চেপে ছিল, আজ সেই শূন্যতাটা পূরণ করতে চাই। আর কোনো দূরত্ব নয়, আর কোনো হারিয়ে যাওয়া নয়... এবার শুধু তোমাকে নিয়েই বাঁচতে চাই, পাখি।
মেহেরিন কেঁপে উঠল তার প্রতিটি কথায় ঋদ্ধ তাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসে তা নিজের প্রতিটি কথায় উপলব্ধি করছে মেহেরিন।
আচমকা নিজের কাধে ভেজা অনুভব করলেই চমকে উঠলো সে।
ঋদ্ধ কাঁদছে হ্যা তার মেহুপাখি কে পেয়ে কাদছে সে।
ঋদ্ধর মতো একজন শক্তপোক্ত, গম্ভীর পুরুষকে এভাবে শিশুর মতো কাঁদতে দেখে মেহেরিনের ভেতরের সব জড়তা এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
এত কঠোর মানুষটা আজ শুধু তাকে পাওয়ার আনন্দে, তাকে হারানোর ভয়ে এভাবে কাঁদছে!