আফিয়া চৌধুরী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
তার যেনো বিশ্বাস ই হলো ওইটুকু ফুটফুটে বাচ্চা এতো বড়ো অসুখ নিয়ে ঘুরছে।
ঋদ্ধ মাথা নেড়ে বলল,
"হ্যাঁ মম।কিছুদিন আগেই চ্যাকআপ করানো হয়েছে তাড়াতাড়ি অপারেশন করাতে হবে।তাই মেহুপাখি চাচ্ছে বিয়ের কাজটা তাড়াতাড়ি হলে কিউটিপাই এর অপারেশন হবে।নাহলে পরে গুরুতর কিছু হয়ে যেতে পারে।আর আমি আমার মেয়েকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাই না। যদিও এখন মেডিকেল সায়েন্স অনেক উন্নত, অপারেশন হলে ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু যত দ্রুত করা যায় ততই ভালো।
" কি তোমার মেয়ে তোমার মেয়ে করছো ঋদ্ধ ও তো তোমার রক্তের কেউ না ,,
ব্যাস এই একটা কথাই ঋদ্ধ র মতো ঠান্ডা মাথার মানুষের রক্ত গরম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
টেবিলে সজোরে বাড়ি মারলো ঋদ্ধ। উপস্থিত তিনজনেই চমকে উঠলো ,,
"তানিশার মুখটা ভয়ে একটুখানি হয়ে আসলো ,,
হিংস্র রক্তলাল চোখে তাকিয়ে ঋদ্ধ বলে উঠলো --
যে কথা আজ তুমি মুখ থেকে বের করেছো দ্বিতীয় বার বের হলে তোমার জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো আমি।
কথাটা ঋদ্ধ র মুখে এতোটাই ভয়ংকর শোনালো যে আফিয়া চৌধুরী নিজেও ভয় পেয়ে গেলেন।
" শান্ত হও বাবা তানিশা শুধু , ,
"প্লিজ মম নিজের আদরের ভাগ্নিকে নিজের কাছে রাখতে চাও রাখো কিন্তু আমার পার্সোনাল বিষয় এ তাকে দুরে থাকতে বলবে।
" এবার আফিয়া বেগম ও কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠলেন --
ও ভুলটা কি বলেছে ঋদ্ধ মানছি তুমি মেহেরিন কে ভালোবাসো।তাকে অনেক অপেক্ষার পর পেয়েছো কিন্তু মায়রা সে তো তোমার নিজের রক্ত নয়।মেহেরিন এর আগের স্বামী র সন্তান। আমি মেহেরিনকে মানলেও মায়রাকে মানতে পারছি না।
"ঋদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেলো নিজের মায়ের কথায়। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।তার মা এধরনের কথা বলেছে তার বিশ্বাস ও হচ্ছে না।
ঋদ্ধ কিছুক্ষণ চুপচাপ নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময়, কষ্ট আর গভীর হতাশা।
তারপর ধীরে ধীরে বললো—
"তুমি জানো মম, ছোটবেলায় আমি যখন পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়িয়ে ফেলতাম, তুমি বলতে
"রক্তের সম্পর্ক বড় নয় বাবা, ভালোবাসার সম্পর্ক বড়।' আজ সেই তুমিই এসব বলছো?
আফিয়া চৌধুরী একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।
" ছেলের ব্যাথা বুঝলেও তিনি নরম হলেন না।
আবেগ দিয়ে জীবন চলে না ঋদ্ধ। কাল যখন তোমার আর মেহেরিন এর সন্তান হবে তখন তুমি নিজেই তাকে সহ্য করতে পারবে না।
ঋদ্ধ চুপ রইলো কিছুক্ষণ ঠোটের কোনে তৃপ্ত হাসি ফুটে উঠলো নিজের মায়ের এমন পরিবর্তন তার মানতে কষ্ট হচ্ছে
"তোমার কাছে মায়রা মেহেরিনের আগের স্বামীর সন্তান। কিন্তু আমার কাছে?
সে এক মুহূর্ত থামলো।
"আমার কাছে ও আমার মেয়ে। আমার কিউটিপাই। আমার পৃথিবী।
মেহেরিন আমার প্রান হলে মায়রা সেই প্রানভম্রা।আমার কিউটিপাই না থাকলে আমার মেহুপাখি ও থাকবে না মম।আর আমার কাছে মায়রা অন্য কারোর রক্ত নয়।ও আমার কাছে আমার মেহুপাখির অংশ অস্তিত্ব।
ঋদ্ধ আবার বললো—
"জানো মম, আমি প্রথম দিন থেকেই ওকে নিজের মেয়ে ভেবেছি। ও যখন আমাকে প্রথম 'বাবা' বলে ডেকেছিল, সেদিন থেকে ও আমার হৃদয়ের অংশ হয়ে গেছে।
কথাটা বলতে গিয়েও গলাটা কেঁপে উঠলো তার।
"রক্তের সম্পর্ক দিয়ে যদি বাবা হওয়া যেত, তাহলে পৃথিবীতে এত এত অনাথ শিশু কখনো বাবা-মায়ের ভালোবাসা পেত না।
আফিয়া চৌধুরী চুপ হয়ে গেলেন।
ঋদ্ধর প্রতিটা কথা যেন উপস্থিত তিনজনের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে।
"তুমি মেহেরিনকে মেনে নিয়েছো, কিন্তু তার সন্তানকে নয়। তাহলে কি সত্যিই তুমি মেহেরিনকে মেনে নিয়েছো?
প্রশ্নটার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না আফিয়া চৌধুরী।
কারণ তিনি নিজেও জানেন, একজন মাকে তার সন্তান থেকে আলাদা করে মেনে নেওয়া যায় না।
ঋদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
"একটা কথা পরিষ্কার করে শুনে রাখো মম। মেহুপাখিকে দ্বিতীয় বার আমার জীবনে ফিরে পেয়েছি শুধুমাত্র মায়রার জন্য। ও আমার মেয়ে।যদি বলো আমার সন্তান নেওয়ার কথা দরকার হলে আমি আর কোনো সন্তান নেব না।মায়রা আমার একমাত্র সন্তান হয়ে থাকবে।আর যে ওকে অন্যের মেয়ে অন্যের অংশ মনে করবে আমি ঋদ্ধ তার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবো না।
সে আমার মম হোক না কেন।
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
"যদি কোনোদিন আমাকে বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় ওদেরই বেছে নেবো।
কথাটা শুনে আফিয়া চৌধুরীর বুকটা ধক করে উঠলো।
"ঋদ্ধ!
"হ্যাঁ মম। কারণ ওরা আমার পরিবার।আমার জীবন আমার সবকিছু।
হঠাৎই ঋদ্ধ র ফোন বেজে উঠল স্ক্রিনে র দিকে তাকাতেই ভেষে উঠলো " মেহুপাখ "নামটা।সাথে সাথে ঋদ্ধ র চোখমুখ নরম হয়ে আসলো।ফোন এর ক্যামেরা সামনে ধরতেই মায়রার হাসি মুখটা ভেষে উঠলো।
ঋদ্ধ র মুখেও এক চিলতে হাসি দেখা গেলো যেনো একটু আগের এতবড় একটা ঘটনার কিছুই তার সাথে ঘটেনি।
কথা বলতে বলতে একসময় উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো ঋদ্ধ।
আফিয়া চৌধুরী র চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে তখনও। তিনি ভাবতে পারেন নি তার ছেলে এমন আচরন করতে পারে।ভেবেছিলেন সামান্য রাগ করবে হয়তো। তাই বলে তার ছেলেটা তাকে ছেড়ে চলে যাবে এটা তিনি সইতে পারবেন না।
" আমি তোমাকে বলেছিলাম আফিয়া নিজের যেদ ছাড়ো।যে ছেলে দীর্ঘ সাতটা বছর নিজের বাবার সাথে কথা তো দুরে থাক তার মুখটা পর্যন্ত দেখেনি তাবুও তুমি বুঝলে না।
নিজের স্বামী র তাচ্ছিল্য মাখা কন্ঠ শুনে অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে চাইলেন আফিয়া।হ্যা তাকে রিচার্ড অনেকবার বুঝিয়েছে যে ঋদ্ধ মেহেরিন এর জন্য ঠিক কতোটা অবসেসড কিন্তু তিনি মানতে নারাজ ছিলেন।তার বিশ্বাস ছিলো ঋদ্ধ নিজের মাকে কখনো ভুল বঝবে না।
কিন্তু একন তার সত্যি ভয় হচ্ছে মেহেরিন যদি ঋদ্ধ কে বলে দেয় যে সাত বছর আগে তার জন্য মেহেরিন তাহসিন কে বিয়ে করেছিলো।তবে ঋদ্ধ কখনো নিজের মায়ের মুখ দেখবে না।ভেবেই তিনি অনবরত চোখের জ্বল ফেলতে লাগলেন।
"তানিশা নিজেও অবাক হয়েছে সে কথাটা কতকিছু ভেবে বলেনি।তবে সে নিশ্চিত হলো আজ ঋদ্ধ র মেহেরিন এর প্রতি ভালোবাসা ঠিক কতোটা গভীর।
তার বুকের কোথাও একটা তিব্র জ্বালা অনুভব হলো শ্বাস আটকে আসতে চাইলো যেনো।
---------------------------------
"পাপা!
" বলো কিউটিপাই ,,
"পাপা তোমাল আল মাম্মাল বিয়ের ড্রেস সিলেক্ট কলেচি আমি।
টুমি দেকবে না?
" মেয়ের উচ্ছসিত কন্ঠ শুনে হাসলো ঋদ্ধ।
দেখবো তো কিউটিপাই ,, আগে বলো তুমি ডিনার করেছো?
"উমম ,, হ্যা পাপা আমি ডিনার করেছি। টুমি কলেচো পাপা?
" হুমম ,,
তোমার মাম্মা কোথায় কিউটিপাই?
এইযে৷বলেই মায়রা মেহেরিন এর দিকে ক্যামেরা ধরলো।
মেহেরিন পাশেই ছিলো বাবা-মেয়ের কথা শুনছিলো এতক্ষণ।
তোমার মেয়ে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে ঋদ্ধ। সে নাকি তোমার আমার ড্রেস সিলেক্ট করবে।ও কি বোঝে বলে তো এসব।
"উমমম ,, দেখো পাখি আমার মেয়ে যা বলবে যা সিলেক্ট করবে সেটাই হবে।
" হ্যা মাথায় তোলো তোমার মেয়েকে।
এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ কথা চললো বাবা মেয়ের মাঝে।এক পর্যায়ে অ্যানি এসে মায়রাকে নিয়ে গেলো।
"তোমার কিছু হয়েছে ঋদ্ধ?
মেহেরিন এর বেশ অবাক হলো ঋদ্ধ ,,
" কেন?
"আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু নিয়ে আপসেট।
"ঋদ্ধ বাকা হাসলো ,,
বাহ পাখি আজকাল তুমি আমার মুড ও বুঝো?
থতমত খেলো মেহেরিন।লজ্জা ও পেলো খানিকটা।
" দুষ্ট হাসলো ঋদ্ধ ,, ইম্প্রেসিভ পাখি ,,
আমার জন্য তাহলে তোমার মনে একটু হলেও ফিলিংস আছে বলো ,,
"তুমি থামবে ঋদ্ধ ..
মুখ ফুলিয়ে বলে উঠলো মেহেরিন
ঋদ্ধ এবার শব্দ করে হাসলো।
আারও কিছুক্ষণ কথা বললো দুজনে।
কল কেটে দিলে মেহেরিন ফোনটা বুকে চেপে ধরলো --
তোমার প্রতি আমার ফিলিংস সবসময় ছিলো ঋদ্ধ।