বেশ অনেকটা রাত হলে তবেই নিজের বাসায় ফিরলো ঋদ্ধ।
তার মা হয়তো ঘুমিয়ে পরেছে। তবে সে হাসফাস করছে। মুলত এ কয়দিনে মায়রা আর মেহেরিন তার অভ্যেস এ পরিনত হয়েছে তা বেশ বুঝতে পারছে।তাদের ছেড়ে থাকা ঋদ্ধ র পক্ষে সম্ভব নয়।
এমনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ ছটপট করতে করতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরলো সে।
------------------------------
"তানিশা যা তো মা এই কফিটা ঋদ্ধ কে দিয়ে আয়।
"তানিশার চোখ চকচক করে উঠলো।মূলত সে ছুতো খুজছিলো কোনোভাবে ঋদ্ধ র কাছে যাওয়ার।
"ঋদ্ধ র মা তার হাতে কফি দিতেই সে তা নিয়ে ঋদ্ধ র ঘরের দিকে গেলো।
আফিয়া চৌধুরী সেদিকেই চেয়ে আছে। তিনি তানিশা কে ছোটবেলা থেকে ঋদ্ধ র জন্য পছন্দ করে রেখেছিলেন। মেয়েটা তার বোনের মেয়ে তিনি বোনকে কথা দিয়েছিলেন তানিশাকে নিজের ছেলের বউ বানাবেন।
তবে ঋদ্ধ এ বিষয় কিছুই জানতো না।তিনি যখন জানতে পারেন ঋদ্ধ মেহেরিন কে পছন্দ করেন এবং তা পছন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে ভালোবাসায় রুপ নিয়েছে তখন মেহেরিনকে নিজের কথার জালে ফাসিয়ে ঋদ্ধ র জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।এমন না তিনি মেহেরিনকে অপছন্দ করতেন।বরং ভিষন ভালোবাসতেন।শান্তশিষ্ট মেয়েটা একটু ভালোবাসা পেলে গলে যেতো।মা না থাকায় তার কাছে যেনো একটু বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করতো।তিনিও বেশ আগলে রাখতেন।তবে ছেলের বউ হিসেবে তিনি তানিশাকেই চাইতেন।ভেবেছিলেন কিছুদিনের মধ্যে হয়তো ঋদ্ধ মুভঅন করবে।কিন্তু বিগত সাত বছরে একটা দিনের জন্য একটা মুহুর্তের জন্য মেহেরিনকে ভুলতে পারেনি ঋদ্ধ। মেহেরিন এর জন্য নিজের বাবাকে পর্যন্ত অস্বীকার করতো।
আফিয়া চৌধুরী বেশ ভয় হয় কোনোভাবে যদি ঋদ্ধ জানতে পারে তার জন্যই মেহেরিন ঋদ্ধ কে ছেড়ে দিয়েছিলো তবে তিনি ছেলেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন।
যেভাবেই হোক কিছু একটা করে মেহেরিনকে আবারও সরাতে হবে।তাইতো তিনি তানিশা কে এনেছেন।
" ঋদ্ধ বেশ খানিকটা রাত যাগায় এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রুমের দরজা ভিরানো অন্ধকার।
তানিশা এসেই রুমের একপাশের জানালা খুলে দিলে হালকা আলো আসলো ঘরের ভেতর। বিছানায় তাকাতেই তার চোখ আটকে গেলো।ঋদ্ধ র ফর্সা উন্মুক্ত পিঠের ওপর।ঋদ্ধ খালি গায়ে উপুর হয়ে মাথার ওপর একহাত রেখে ঘুমিয়ে আছে।কোমর পর্যন্ত ব্ল্যাংকেট দিয়ে ঢাকা।
তানিশা এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সেদিকে।তানিশাও ঋদ্ধ র থেকে চার-পাচ বছরের ছোট বয়সি হবে।এতো বছরেও বিয়ে না করার কারনটা ঋদ্ধ। সেই ছোটবেলা থেকে সে ঋদ্ধ কে পছন্দ করে। তার খালাও বলেছেন ঋদ্ধ কে তার সাথে বিয়ে দিবেন।কিন্তু হঠাৎ মেহেরিন মেয়েটা এসে সবকিছু তছনছ করে দিলো।তারপর অনেক কষ্টে যখন মেহেরিনকে সরিয়ে দিলো তখনও ঋদ্ধ তার বিরহ থেকে বেরোতে পারেনি।আর এখন-এখন আবারও সেই মেয়েটা।তানিশা চোখে পানি জমল ধীর পায়ে এগিয়ে এলো ঋদ্ধ র কাছে।কোনো শব্দ ছাড়া ধিরে টেবিলে তার কফি রাখলো।বসলো ঋদ্ধ র মাথার কাছে।
কাপা কাপা হাতটা রাখলো ঋদ্ধ র মাথায়।খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে অবলকন করতে লাগলো।ঋদ্ধ তখনও গভীর ঘুমে।
জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে কিছুটা ঝুকে পরলো ঋদ্ধ র দিকে।
"স্যার ,,আপনি ,,
চোখ বড়ো বড়ো করে চাইলো পিটার।
চট করে উঠে পরলো তানিশা হাতপা কাঁপছে ভয়ে।ঋদ্ধ জানতে পারলে এ বাড়িতে আজ তার শেষ দিন।
" ঋদ্ধ ফট করে চোখ খুললো কাচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সে বেশ বিরক্ত তার আরও খানিকটা ঘুমের প্রয়োজন।
সামনে তানিশাকে দারিয়ে থাকতে দেখে কপাল কুচকে নিলো সে।
শোয়া থেকে উঠে বসলো।পিটার তখনও শক্ত মুখে চেয়ে আছে।
"তুমি এখানে?
" আব ওই কফি দিতে এসেছিলাম ঋদ্ধ।
"ঋদ্ধ বেশ বিরক্ত হলো। কেন যে দরজাটা ভিরিয়ে শোয়নি সে।
তাহলে ডাকোনি কেন?
" ডাকতেই যাচ্ছিলাম তোমায়।
পিটার বড়ো বড়ো চোখ করে চাইলো।কতবড় মিথ্যাবাদি মেয়ে সে স্পষ্ট দেখলো মেয়েটা ঋদ্ধ কে কিস করতে যাচ্ছিলো।শাঁকচুন্নি দারা আমি ম্যামকে বলছি সব।আমার ম্যাম আর স্যারের সংসারে আগুন আমি কিছুতেই লাগতে দেবো না।
"তুমি স্ট্যাচুর মতো দারিয়ে কেন?
ভেতরে এসো।
" জী স্যার।
"আব,আমি এখন যাই।
" তো আমি কি তোমায় থাকতে বলেছি।
বিরক্ত কন্ঠ ঋদ্ধ র।
অপমানিত বোধ করলো তানিশা।ধীর পায়ে বেড়িয়ে যেতে লাগলো।
"তুমি কখনো আর এ ঘরে আসবে না।
গম্ভীর শান্ত কন্ঠের বানি শুনতে পেলো যেতে যেতে মেয়েটা।
চোখে আবারও পানি জমল।
" ঋদ্ধ নিজের বিরক্তি কাটিয়ে বলে উঠলো
যা বলেছিলাম এনেছো?
"জী এখানে সব ডিটেইলস আছে।
নিজের ট্যাব ঋদ্ধ র দিকে বাড়িয়ে দিলো পিটার।
-----------------------------
তানিশা কোনোমতে দরজাটা পেরিয়ে ছুটে চলে গেলো নিজের খালার রুমে।
তানিশা ধীর পায়ে দরজাটা পেরিয়ে বেরিয়ে এলো।
পেছনে ফেলে আসা রুমটার দিকে আর একবারও ফিরে তাকাল না সে।
সে ভেবেছিল
এতো বছরে হয়তো কিছুটা কাছে যেতে পেরেছে ঋদ্ধ র ।
একটু জায়গা তৈরি হয়েছে ঋদ্ধর জীবনে।
কিন্তু না…
সব আশা এক সেকেন্ডেই ভেঙে গেছে।
চোখের কোণে জমে থাকা জলটা আর ধরে রাখতে পারল না সে।
ধীরে ধীরে গাল বেয়ে নেমে এলো।
“সে কি এতোটাই তুচ্ছ যে তাকে দেখতেি পারে না ঋদ্ধ।যেনো ঋদ্ধ র কাছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
আফিয়া চৌধুরী বসে ছিলেন।তানিশাকে কাদতে দেখে বললেন
" একি মা কাদছিস কেন তুই?
"আমি এখানে থাকতে চাইনা খালামনি।
"সে কি কেন?
" তোমার ছেলে এতো বছরেও কোনোদিন আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি।আমি এতোগুলা বছর তার জন্য অপেক্ষা করে আছি অথচ সে তা জানেওনা।সবসময় আমায় অপমান তুচ্ছতাছ্যিল্য করে।আমার কি দোষ বলো আমি তো শুধু ভালোবেসেছি।
ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা। আফিয়া বেগম পরম মমতায় জরিয়ে নিলেন নিজের সাথে। এই মেয়েটার কষ্ট দেখলে তারও কষ্ট হয় ছোটবেলা থেকে নিজের আরেক সন্তানের মতো স্নেহ করেন তিনি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোঝাতে লাগলেন।
-------------------------------
মাম্মা আমাল পাপা কই?
"পাপা তার বাসায় আছে প্রিন্সেস।
" তুমি আমাল পাপা এনে দাও।
অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো মেহেরিন মেয়ের দিকে। তার মেয়ে ঋদ্ধ ছাড়া এখন কিছুই বুঝে না।সকাল থেকে অ্যানি সে রুপাসা,মৈনাক,মিহির মির্জা এতো করে বোঝাচ্ছে তবে সে তার জেদে অটল।
"মায়রা আম্মু আমরা পরে পাপার কাছে যাবো শোনা এখন একটু খেয়ে নাও পাখি।
মায়রা নাকচ করে দেয়।পাপা তাকে ফাকি দিয়ে চলে গেছে। তার পাপা তো বলেছিলো তাকে রেখে কোথাও যাবে না।কিন্তু কই নেই তো তার পাপা।এসব ভেবেই মায়রা একদফা কেদেছে সকালে।বাড়ির একটা মানুষ ও তাকে সমলাতে পারছে না।
" মায়রা বেবি মামু তোমায় অনেক চকলেট দিবে সোনা চলো খেয়ে নাও।
না মায়রার পাপা চাই এক্ষুনি চাই।মায়রা তার পাপাকে প্রটেক্ট কলবে।
"উপস্থাপন সবাই অবাক চোখে চাইলো মায়রার দিকে প্রটেক্ট করবে মানে কি।কার থেকে প্রটেক্ট করবে।
কার থেকে পাপা কে প্রটেক্ট করবে সোনা?
মৈনাক কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন টা করেই বসলো।
" তুমি জানোনা মামু।পাপাল বাসায় একটা সাতচুন্নি আছে সে শুধু পাপার আসেপাশে ঘুরাঘুরি করে। পাপাকে মায়রার আর তার মাম্মার থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়।
মায়রার বেশ গম্ভীর হয়ে কথাগুলো বললো।
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে রয়েছে মায়রার দিকে তাকিয়ে।
মেহেরিন ঠোট টিপে হাসলো।মেয়ে যে ঋদ্ধ র খালাতো বোনের কথা বলেছে তা বেশ বুঝেছে সে।তবে সে ভেবে পাচ্ছে না তার মেয়ের মাথায় এতো বুদ্ধি কোথা থেকে আসলো।
আর সাতচুন্নি কথাটা শিখলো কোথা থেকে।
"এমন পচা কথা বলেনা আম্মু।
মেহেরিন মেয়েকে নিজের কাছে টেনে বললো।
" আমি পুচা কতা বলতে চাই না কিন্তু আমাল পাপাকে প্রোটেক্ট কলতে হবে তালাতালি পাপাল কাতে নিয়ে তলো আমায়।
মৈনাক বোনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে মেহেরিন তনিশার কথা জানালো তা শুনে অ্যানি মৈনাক আর রুপসা বেশ হাসলো।
তবে মায়রা তখনও তার জেদে অটুট উপায় না পেয়ে ঋদ্ধ কে কল লাগালো মেহেরিন।
ভিডিও কল দিতেই ভেষে উঠলো ঋদ্ধ র মুখ।
"পাপা,,
মায়রা উচ্ছসিত গলায় বললো।
" ঋদ্ধ নিজেও ছটপট করছিলো এতোক্ষণ মায়রা মেহেরিন দুজনকেই বড্ড মিস করছিলো সে।
কিউটিপাই কি করছো তুমি?
"মায়রা সাথে সাথে মুখটা বেজার করে নিলো।
ঋদ্ধ মায়রার মুডের হঠাৎ পরিবর্তন এর কারনটা বুঝলনা।
কি হয়েছে আমার কিউটিপাই এর পাপা কি কোনো ভুল করেছি সোনা?
" আমি তোমাল ওপল রেগে আছি পাপা।
"ঋদ্ধ চিন্তিত হলো সে তো কোনো ভুল করেনি তবে মেয়ে তার রাগ কেন করলো।
কেন কিউটিপাই?
" টুমি আমায় লেকে চলে গেলে কেন?
"ঋদ্ধ এবার বুঝলো মেয়ের অভিমান এর কারনটা।মনে মনে ফিচেল হাসলো।
আমি খুবই দুঃখীত সোনা তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে তাি পাপা তোমায় বলে আসনি।প্লিজ এবারের মতো মাফ করে দাও?
নিজের দুি কানে হাত রেখে ইনোসেন্ট ফেস করে বললো ঋদ্ধ।
" মায়রা কিছুক্ষণ ভাবুক হয়ে বললো --
ঠিকাছে ঠিকাছে।তবে টুমি সাতচুন্নির থেকে দুরে থাকবে।
ঋদ্ধ অবাক হলো সাতচুন্নি মানে?
এর মাঝেই মেহেরিন মায়রার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিলো।
ঋদ্ধ প্লিজ তোমার মেয়েকে খাবার খেতে বলো তোমার ওপর রাগ করে বাড়ির সবগুলো মানুষকে চিন্তায় পাগল করছে খাবেনা বলে জানাচ্ছে।
"ঋদ্ধ মেহেরিন এর অভিযোগ শুনে হাসলো।আবারও মায়রার সাথে কথা বলতে শুরু করলো।
" মৈনাক,মিহির মির্জা বেশ সন্তুষ্ট হলো। ঋদ্ধ র মায়রার প্রতি এতো টান দেখে।