বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ২২

🟢

গাড়িটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে একটা অভিজাত বাড়ির সামনে এসে থামলো।

পুরো রাস্তা জুড়েই মায়রার বকবকানি থামেনি।

“পাপা! গ্র্যান্ডমম কি আমাকে দেখেই কোলে নিবে?”

“হুম, অবশ্যই নিবে।” মুচকি হেসে বললো ঋদ্ধ।

“আর আমি তাকে গ্র্যান্ডমম বলে ডাকবো?”

“যেটা ইচ্ছে ডাকবে কিউটিপাই।”

মায়রা ঠোঁট গোল করে কিছুক্ষণ ভাবলো।

সবাই হেসে উঠলো।

কিন্তু সেই হাসির মাঝেও মেহেরিনের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। হাতের তালু বারবার ঘেমে উঠছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো সে।

“পাখি?”

ঋদ্ধর ডাকে চমকে তাকালো মেহেরিন।

“তুমি ঠিক আছো?”

“হ্যাঁ...”

ঋদ্ধ আলতো করে তার হাতটা চেপে ধরলো।

“আমার দিকে তাকাও।”

মেহেরিন তাকাতেই শান্ত গলায় বললো,

কি হয়েছে পাখি তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে আপসেট?

"" নাহ ঋদ্ধ তেমন কোনো বিষয় নয়।

পিটার গাড়ির দরজা খুলে দিলে ঋদ্ধ মায়রাকে কোলে নিয়ে নামলো পরপরই মেহেরিন নেমে পরলো।

এটা ঋদ্ধ দের বাসা।মেহেরিন পাঁচ বছর আগে বেশ কয়েকবার এসেছে এখানে।বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি বাড়িটার শুধু নতুন করে রঙ করা হয়েছে।

ঋদ্ধ র মম সকালেই ফিরেছে তার বোনের বাসা থেকে। এটা জানতে পারার পরপরই ঋদ্ধ মেহেরিন কে নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিলো।তাছাড়া বেশ কয়েকমাস ঋদ্ধ তার মম কে দেখেনি।সেও মম কে মিস করছিলো।

দরজার সামনে আসতেই হঠাৎই তিব্র বেগে একটা মেয়ে এসে ঋদ্ধ কে জরিয়ে ধরলো।

"" ওহ ঋদ্ধ আই মিস ইউ। কতোদিন পর তোমাকে দেখলাম।

মেয়েটার কন্ঠে তিব্র খুশি।

ঋদ্ধ আচমকা আক্রমণে হকচকিয়ে উঠলো। বুঝতে পারলো না তাকে জরিয়ে করা মেয়েটি কে।

তবে মেয়েটি তাকে স্পর্শ করে আছে বিষয় টা নিজের মস্তিষ্কে আসতেই ধাক্কা মেরে ছাড়িয়ে নিলো মেয়েটিকে।

“"হাও ডেয়ার ইউ টাচ মি!

কঠিন, বরফ শীতল কণ্ঠে বলে উঠলো সে।

মেয়েটা যেনো হতভম্ব হয়ে গেলো। চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলো ঋদ্ধর দিকে।

“ঋদ্ধ... আমি...

“স্টপ!”

ঋদ্ধ হাত তুলে থামিয়ে দিলো।

“তুমি কে?

কথাটা শুনে মেয়েটার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো।

“তুমি... তুমি আমাকে চিনতে পারছো না?

ঠিক তখনই ভেতর থেকে ঋদ্ধর মা এগিয়ে এলেন।

“আরে! তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে কেনো?

তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললেন

ঋদ্ধ তুমি ভুলে গেছো তানিশার কথা?

মূহুর্তের মধ্যে মনে পরে গেলো এটি তার খালাতো বোন তানিশা।

ঋদ্ধ র বরাবরই মেয়েটাকে পছন্দ নয়।

তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ মেয়েটাকে পরখ করলো ঋদ্ধ।

মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।

কিন্তু ঋদ্ধর মুখের বিরক্তি একটুও কমলো না।

“"সো? তাই বলে কাউকে না জিজ্ঞেস করে জড়িয়ে ধরতে হবে?

তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।

মেহেরিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলো।তার মুখে কোনো ভাবাবেগ দেখা না গেলেও। অজানা কারণে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মেয়েটার ঋদ্ধকে জড়িয়ে ধরা দৃশ্যটা বারবার চোখে ভাসছে।

আচমকাই নিজের হাতের মাঝে আরেকটি হাতের অস্তিত্ব খুজে পেলো মেহেরিন।

ঋদ্ধ একটানে মেহেরিনের হাত নিজের হাতে নিয়ে কাছে টেনে বললো—

"" আমাকে টাচ করার আগে পারমিশন নিবেন। আমি শুধু আমার ওয়াইফ আর মেয়ের কাছে কমফোর্টেবল।”

কথাটা শুনে মেহেরিন চমকে তাকালো ঋদ্ধর দিকে।

আর তানিশার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।

দূরে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধর মা গভীর দৃষ্টিতে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলেন।

তার চোখেমুখে যেনো অদ্ভুত এক ভাবনা...

পিটারের কোলে থাকা মায়রার তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে সেই মেয়েটির দিকে। পিটার ও বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে।

পিটার চিনে এই মেয়েটাকে ঋদ্ধ এতো বছর দেশে না আসলেও সে এসেছে বহুবার। মেয়েটা মাত্রা অতিরিক্ত ন্যাকা স্বভাবের।

ঋদ্ধ র মা পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য তানিশাকে ইশারা করতেই সে নিজের স্থান পরিবর্তন করলো।

যা স্পষ্ট মেহেরিন এর চোখে পরলো।

“মম, কেমন আছো তুমি?”

বলেই নিজের মাকে জড়িয়ে ধরলো ঋদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

আফিয়া চৌধুরীর মুখটা নরম হয়ে এলো।

“ছেলেকে কাছে পেয়েছি, এখন মা কি খারাপ থাকতে পারে বল?

বলেই ছেলের কপালে আলতো করে চুমু আঁকলেন তিনি।

ঋদ্ধ মুচকি হেসে মায়ের কাঁধে মাথা ঠেকালো।

কিন্তু ঠিক তখনই ছোট্ট, মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—

“তুমি আমাল গ্র্যানমম?

আদো আদো গলার কথাটা শুনেই থমকে গেলেন আফিয়া চৌধুরী।

ধীরে ধীরে নিচে তাকাতেই দেখতে পেলেন ছোট্ট একটা মেয়ে গোল গোল চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

মায়রা।

দুই হাত সামনে জোড়া করে দাঁড়িয়ে আছে সে। মুখে রাজ্যের কৌতূহল।

“তুমি কি সত্যি সত্যি আমার গ্র্যান্ডমম?

আফিয়া চৌধুরী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে।

কেন জানি বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।

এই চোখদুটো...

এই মুখের আদল...

কেমন যেনো পরিচিত লাগছে।

মায়রা আবারও গম্ভীর মুখ করে বললো—

“তুমি যদি গ্র্যান্ডমম হও, তাহলে আমাকে আগে কোলে নিতে হবে। কারণ গুড গ্র্যান্ডমমরা নাতনিকে কোলে নেয়।

কথাটা শুনে সবাই হেসে ফেললো।

আফিয়া চৌধুরীর ঠোঁটেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।

তিনি ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে মায়রার গাল ছুঁয়ে বললেন—

“ওমা! এতো সুন্দর পিচ্চিটা কে?

মায়রা গর্বিত মুখে বুক ফুলিয়ে বললো—

“আমি মায়রা!মাম্মার প্রিন্সেস আর পাপার কিউটিপাই !

“পাপা?

আফিয়া চৌধুরীর চোখ ধীরে ধীরে উঠে গেলো ঋদ্ধর দিকে।

ঋদ্ধ শান্ত গলায় বললো—

“মম... শি ইজ মাই ডটার।

এক মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস যেনো ভারী হয়ে গেলো।

তানিশা মেয়েটা দোতালা থেকে সবটা অবলোকন করছিলো।

মায়রার কথা মুখ শক্ত হয়ে এলো।

মেহেরিন অজান্তেই নিজের আঙুল শক্ত করে মুঠো করলো।

আর আফিয়া চৌধুরী...

তিনি স্থির চোখে একবার মায়রার দিকে, একবার মেহেরিনের দিকে তাকালেন।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন মেহেরিনের সামনে।

মেহেরিনের বুকের ধুকপুকানি যেনো বেড়ে গেলো।

হঠাৎ—

আফিয়া চৌধুরী আলতো করে তার মাথায় হাত রাখলেন।

"" মেহেরিন কেমন আছো তুমি?

"" জ,,জি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন আন্টি?

"" হুম ভালো।

উফ মম কি শুরু করলে তোমরা আমার কিউটিপাই বোরিং ফিল করছে ভেতরে চলো।

তারপর নাহয় তোমরা গল্প করো।

আফিয়া বেগম সরু চোখে চাইলো ছেলের দিকে আবার বাচ্চা টার দিকে।

হুম এসো তোমরা তারাতাড়ি।

পাপা আমি তোমাল বাসাটা ঘুলে দেকতে চাই?

"" তুমি ভুল বললে কিউটিপাই!

মায়রা কিছুই বুঝলো না।

"" এটা তো তোমার বাসা কিউটিপাই।

""এটা তোমার আমার মাম্মার গ্র্যান্ডমম আর গ্র্যান্ডপাপার বাসা।

"" ইয়ে,,,

"" কিউটিপাই, পাপা তোমাকে পুরো বাসাটা ঘুরে দেখাবে।

আফিয়া বেগমের কথায় ঋদ্ধ মায়রাকে নিয়ে বাড়িটা ঘুরে দেখাতে চলে গেল।

ওদের চোখের আড়াল হতেই আফিয়া বেগমের মুখের কোমলতা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ স্থির চোখে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরিয়ে মেহেরিনের দিকে তাকালেন। চোখেমুখে চাপা ক্ষোভ আর তাচ্ছিল্যের ছাপ স্পষ্ট।

তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন আফিয়া বেগম।

মেহেরিনের দিকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার তাকিয়ে কটাক্ষ মিশ্রিত স্বরে বলে উঠলেন—

"" বাহ! শেষমেশ আবারও আমার ছেলের গলায় ঝুলেই পড়লে বুঝি?

তোমাকে না বলেছিলাম ওর জীবন থেকে সরে যেতে? নাকি এতদিন পর বুঝলে, ঋদ্ধ ছাড়া তোমার চলেই না?

একটু থেমে ঠান্ডা হাসলেন তিনি।

"" অবশ্য তোমার মতো মেয়েদের জন্য এটাই স্বাভাবিক। সুবিধা বুঝে আবার ফিরে আসা। তবে একটা কথা মনে রেখো— তোমার উদ্দেশ্য সফল হতে দেবো না আমি।

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস