কি করছো তাহসিন লাগছে আমার!
তাহসিনের কানে যেন তুলির কোনো কথাই পৌঁছাচ্ছিল না।
"বল, তোর বসের সঙ্গে এত কিসের ঘনিষ্ঠতা? বল!
বলেই সে জোরে ধাক্কা দিল। তুলি গিয়ে বিছানার ওপর পড়ে গেল।
তুলি কোনো উত্তর না দেওয়ায় তাহসিনের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। আবার তাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল
"এই নষ্ট মেয়ে! তোর বিবেকে একটুও বাধে না? বাসায় তোর একটা দুধের শিশু আছে, আর তুই রাত বারোটা পর্যন্ত অফিসে বসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াস!
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না তুলি। ঝটকা মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল,
"বেশ করি! দুই টাকার মুরোদ নেই, সে আবার আমাকে জ্ঞান দিতে আসে! যে নিজের বউকে সুখী রাখতে পারে না, তার বউ অন্যদিকে তাকালে অভিযোগ করারও অধিকার থাকে না।
আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমার বাচ্চা চাই না। কিন্তু তুমি আমার কথা শোনোনি। এখন বাচ্চা হয়েছে, এবার সামলাও। ফকিরের মতো জীবন নিয়ে আমাকে শাসন করতে আসবে না!
তাহসিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার চোখেমুখে লজ্জার লেশমাত্র নেই। অথচ এই মেয়েটাকেই একদিন সে ভালোবেসেছিল। একসময় তার সাজানো সংসার ছিল, স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল যা সে এই মেয়েটার জন্য ধ্বংস করেছিলো।
তখন তুলির ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে সে ভাবত
এই মেয়েটাই তার পৃথিবী।
তবে কি নিয়তি আজ তার কাছ থেকে সব হিসাব বুঝে নিচ্ছে?
মানুষ হয়তো ভুলে যায়, কিন্তু জীবনের নিয়ম কখনও কিছু ভোলে না।
তবে কি আজ তাহসিনকেও সেই একই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে, যে যন্ত্রণা একসময় মেহেরিন সহ্য করেছিল?
চোখের কোণে জমে থাকা কষ্ট নিয়ে সে ধীরে বলল,
"তুমি না আমাকে ভালোবাসতে, তুলি?
প্রশ্নটা করতে গিয়েও কণ্ঠ কেঁপে উঠল তাহসিনের। চোখে-মুখে জমে থাকা কষ্টটা যেন আর লুকিয়ে রাখতে পারছে না সে।
তুলি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
"ভালোবাসা? রাখো তোমার ভালোবাসা। আমি ভালোবাসতাম তোমার টাকাকে, তোমাকে নয়। টাকা ছিল, তাই তোমার পাশে ছিলাম। এখন তোমার কাছে কিছু নেই, তাই আমারও তোমার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই।
কথাগুলো যেন ধারালো ছুরির মতো এসে বিঁধল তাহসিনের বুকে।
তুলি আবারও বলল,
"আর একটা কথা মনে রেখো। বেশি বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করবে না। আমার গায়ে হাত তোলার কথা ভাবলেও আমি তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। তখন তোমার এই বাচ্চা আর তোমার মাকে নিয়ে কী করবে, সেটা দেখার জন্য আমি বসে থাকব।
কথাগুলো বলে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ঘরে নেমে এল অদ্ভুত এক নীরবতা।
তাহসিন স্থির চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, এই মেয়েটাই একসময় তার পৃথিবী ছিল। যার হাসির জন্য সে সবকিছু করতে পারত, আজ সেই মেয়েই তার সমস্ত ভালোবাসাকে উপহাস করে চলে গেল।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার।
হঠাৎই মনে পড়ল অতীতের কিছু দৃশ্য
একটা সাজানো সংসার,মেহেরিন এর খুনশুটি, প্রেগ্ন্যাসির আনন্দ, আর ভালোবাসায় ভরা কিছু দিন।
" মেহেরিন তো বড়োলোক বাড়ির রাজকন্যা ছিলো তবুও তার কোনো ঔধ্যত্ব ছিলো না।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছিলেন তাহসিনের মা। কোলে ঘুম জড়ানো নাতি।
চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা জল।
নিজের ছেলেকে এতটা অসহায়, এতটা ভাঙা তিনি আগে কখনও দেখেননি।
একটা নিস্পাপ মেয়ে আর শিশুকে পায়ে ঠেলে কষ্ট দেওয়ার ফলেই হয়তো আজ তাদের মা-ছেলের এই পরিনাম।
---------------------------------
হঠাৎ ই মায়রার শরীর খারাপ করেছে।
ঋদ্ধ বরাবরই বলেছে মায়রার যেনো অতিরিক্ত দৌড় ঝাপ না করে।কিন্তু বাচ্চাটা এখানে এসে যেনো খুশি ধরে রাখতে পারছে না ছোটাছুটি করছে।
ফলস্বরূপ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তার।
মেহেরিন এ নিয়ে একদফা কেদেছে। ঋদ্ধ কে জানালে সে বলেছে আসছে।
ঋদ্ধ আসতেই দেখলো মায়রা ঘুমিয়ে পরেছে। ঋদ্ধ কে দেখে বাকি সবাই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো।
নেহেরিন কান্নার ফলে কেমন চোখমুখ ফুলে উঠেছে। তার বাচ্চার কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না।
ঋদ্ধ ধীর পায়ে মেহেরিন এর কাছে বসতেই মেহেরিন ঝাপিয়ে পরলো তার বুকে।ফুপিয়ে উঠলো।ঋদ্ধ র বড্ড অসহায় ফিল হয়।এই কয়েকদিনে ছোট্ট মায়রা যেনো তার প্রাণে পরিনত হয়েছে। মেহেরিন এর মতো মায়রাও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
"আমার বাচ্চাটাকে ঠিক করে দাও ঋদ্ধ! তুমি অ্যামেরিকার বেস্ট হার্ট সার্জন বলো।আমার বাচ্চাটা কতো কষ্ট পায়।
একটা ঢোক গিললো ঋদ্ধ।
" শান্ত হও পাখি।আমরা অ্যামেরিকা ফিরলেই মায়রার অপারেশন করাবো মায়রার ইচ্ছে রাখতেই তো আমরা দেশে এসেছি বলো।
"তুমি তারাতাড়ি করো ঋদ্ধ বিয়ের কি ঝামেলা আছে সবটা শেষ করো আমার বাচ্চাটাকে সুস্থ করে দাও শুধু।
" আমি সব ব্যাবস্থা করছি পাখি।তুমি প্লিজ কেঁদো না তুমি তো অনেক সাহসী বলো!
ঋদ্ধ র আদুরে কন্ঠে মেহেরিনের ঠোট ভেঙে আসতে চায়।তবুও কান্না থামানোর প্রয়াস চালাচ্ছে।
হ্যা সে স্ট্রং জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তেও সে ভেঙে পরেনি বরং নিজেকে শক্ত রেখেছে।তাহসিন যখন তাকে ঠকিয়েছিলো এটা মানা মেহেরিন এর জন্য সহজ ছিলো না। তার ভিষণ কষ্ট হতো।বার বার মনে হতো যে মানুষটা তাকে তিনটা বছর ভালেবাসায় মুড়িয়ে রেখেছিলো সেই মানুষ কিভাবে পারলো তাকে ঠকাতে।কখনো কখনো মনে হতো সবটা হয়তো সপ্ন এখনি সপ্নটা ভেঙে যাবে সবটা মিথ্যা হয়ে যাবে।কিন্তু তা হয়নি তাহসিন তাকে ঠকিয়েছে তারপর ডিভোর্স। মেহেরিন বাহ্যিক দিক থেকে বাবা ভাই ভাবির কাছে নিজেকে শক্ত রাখলেও ভেতরে ভেতরে ছিলো ভাঙা।তনে তার মেয়ে ছিলো তার বড়ো শক্তি। অথচ এখন সেই মেয়ের জীবনেই বিপর্যয়। সে একজন মা আর মা কখনো সন্তানের কষ্টে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না।মেহেরিন ও পারছে না নিজেকে শক্ত রাখতে।তার ওই চার বছর এর বাচ্চা মেহেটার যখন অপারেশন করা হবে না-জানি কতো কষ্ট হবে তার প্রান পাখিটার।
মেহেরিন ঋদ্ধ র বুকে অনবরত চোখের পানি ঝরাচ্ছে।
ঋদ্ধ নিজেও চিন্তিত মায়রাকে নিয়ে।
"প্লিজ স্টপ ক্রায়িং পাখি। ইউ নো তুমি কান্না করলে আমার কিছু-মিছু করতে মন চায়।
বেশ ধীর কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো ঋদ্ধ।
এমন আবেগঘন মুহূর্তে ঋদ্ধের কথায় খানিকটা হতবাক হয়ে গেল মেহেরিন। ইদানীং ছেলেটা সুযোগ পেলেই তাকে লজ্জা দেয়। কখনো কথার ছলে খোঁচা দেয়, কখনো আবার এমন কিছু বলে বসে যে মেহেরিনের গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে।
"তুমি কি ভুলে যাচ্ছ, ঋদ্ধ? আমরা এখনো অবিবাহিত।
"আরে, অবিবাহিত হওয়ার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?
দুষ্টু হেসে বলল ঋদ্ধ।
"এসব বাদ দাও। তার চেয়ে তুমি কাঁদো, আর আমি—"
বাকিটা আর শেষ করতে পারল না সে।
মুখটা মেহেরিনের দিকে এগিয়ে আনতেই চট করে সরে গেল মেহেরিন। তারপর কটমট করে তাকাল তার দিকে।
"অসভ্য!"
চোখ রাঙিয়ে বলে উঠল সে।
মেহেরিনের এমন ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল ঋদ্ধ। আসলে তার কান্না থামানোর জন্যই ইচ্ছে করে এমনসব কথা বলছিল সে। আর তাতে কাজও হলো। মেহেরিনের চোখে তখন আর কান্নার ছায়া নেই, বরং লাজুক বিরক্তিতে ঝিলমিল করছে তার দৃষ্টি।
---------------------------------
ড্যাড-মম তুমি তারাতাড়ি বিয়ের ব্যাবস্থা করো আমি খুব তারাতাড়ি অ্যামেরিকা ব্যাক করতে চাই।
ঋদ্ধ র কথায় আফিয়া চৌধুরী কপাল কুচকে তাকালেন।তানিশাও খাওয়া অফ করে তাকালো।
"বিয়ের জন্য এতো তারা কেন?এতো তাড়াতাড়ি কেন ফিরতে চাও?
" মায়ের কথায় কিছুটা বিরক্তি দেখা গেলো ঋদ্ধ র চোখে মুখে।
মম তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো মেহু আমার অনেক কষ্টের অনেক অপেক্ষার পর পাওয়া। তাকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও যখন ছিলো না তখন শুধুমাত্র আমার মেয়ের জন্য আমি আবারও আমার জীবন আমার মেহুপাখি কে ফিরে পেয়েছি।
সেই বাচ্চা আমার অসুস্থ তাই যতো তারাতাড়ি সম্ভব আমি ফিরতে চাই।
"আফিয়া কপাল কুচকে ফেললেন মূলত ঋদ্ধ মায়রাকে এমন করে নিজের মেয়ে দাবি করাটা তার পছন্দ নয়।বাচ্চাটা তো তাদের রক্তের কেউ না। মায়রার অসুস্থতার কথা তিনি জানেন না।তবে মায়রার মাধ্যমেই যে ঋদ্ধ র সাথে মেহেরিন এর আবার দেখা হয়েছে এটা তার জানা।বাচ্চাটা একদিনেই তার সাথে বেশ মিসে গিয়েছিল আর অমন আদুরে বাচ্চার প্রতি চাইলেও বিরক্ত হতে পারেন নি তিনি।
" কি হয়েছে মায়রার?
বেশ চিন্তা নিয়েই প্রশ্ন করলেন তিনি।
"মায়রার হার্ট এর প্রবলেম মম ওর হার্ট এ ছোট্ট একটা ফুটো আছে।