তাহসিন রাত দশটায় বাসায় ফিরলে তখনও তুলি ফেরেনি।
তার মা তার পাচ মাস বায়সি বাচ্চাটাকে ঘুম পারানোর চেষ্টা করছে আর কাউকে কল করছে।
"কি করছো মা?
চমকে উঠলেন তিনি।
" মলিন কন্ঠে বললেন তোর বাবাকে কল করছিলাম কিন্তু ,,
"ধরলো না তাইতো?
ছলছল করে উঠলো তাহসিন এর মায়ের চোখ এই পাঁচটা বছরে তার স্বামী তার সাথে একটা কথাও বলেননি আর না তার মেয়ে বলেছে খোজ অবদি নেননি।তিনি ভেবেছিলেন তাহসিন এর বাবা রাগ করে চলে যাচ্ছেন হয়তো কিছুদিন পর রাগ পরলে ফিরে আসবেন তবে তার ধারনা ভুল ছিলো তিনি ফেরেন নি তিনি ঘৃণা করেন তাকে আর তার ছেলেকে।
তাহসিন মায়ের চোখ দেখে সব বুঝতে পারলো ভেতরে ভেতরে তার ও কষ্ট হয় তার ছোট বোনটাও তার সাথে কথা বলেনা। আজকাল খুব আফসোস হয় মেহেরিন কে ছারার জন্য তার যে একটা মেয়ে হয়েছিলো যাকে সে চোখের দেখাও দেখেনি নামটাও জানেনা সেই বাচ্চাটার কথাও অদ্ভুত ভাবে মনে পরে তার।
আচ্ছা মেহেরিন কী আবার বিয়ে করেছে!তার মেয়েটাও তো এখন প্রায় চার-পাঁচ বছর বয়সী হবে সে কি অন্য কাউকে বাবা বলে ডাকে।বড়ো হয়ে যখন জানতে পারবে তার জন্মদাতা পিতা এতো জঘন্য ছিলো তখন সে নিশ্চয় বাবাকে ঘৃণা করবে।
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসলো তার।পরমূহুর্তেই মায়ের কোলে থাকা শিশুটির দিকে চাইলো এগিয়ে গিয়ে মায়ের কোল থেকে নিজের কোলে নিলো।
" তুমি ঘুমাও মা।
"সে কি খাবি না তুই?
" খেয়ে এসেছি।
"ডিলটার কি হলো?
" পরশু একটা রিসিপশন এ যেতে হবে আমাদের কোম্পানির মালিকের ছেলের রিসেপশন সেখানেই বাকি কথা হবে।
তবে ,,
"তবে ,,
মানে আমার পুরো পরিবাকে নিয়ে যেতে বলেছে।
" তাহসিন এর মা হতাশ হলেন
তুলি কি রাজি হবে?
"আমি কথা বলবো।
তার মা সায় জানিয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো।
-------------------------------
" মেহেরিন আজ হঠাৎ করেই নিজের পুরোনো জীবনের কথা মনে পরছে। নিজের পুরনো সংসার কতো সুখি ছিলো তিনটা বছর তাহসিন এর সাথে। তাহসিন তার কতো খেয়াল রাখতো তার সুবিধা অসুবিধা সবটা দেখতো।তার শশুর ননদ তাকে অনেক ভালোবাসতো।
বিয়ের শুরুতে সে ঋদ্ধ কে অনেক বেশি ভাবতো তবে সেটা কখনো বাইরে আসতে দেয়নি।
নিজের সুপ্ত অনুভুতি কে তাহসিন এর নামে কবুল বলে ওই মূহুর্তে দাফন করেছিলো সে।আর বিষয় টা আরও সহজ হয়েছিলো কারন ঋদ্ধ কে সে আর দেখেনি তার বিয়ের পর আর না তাদের মাঝে সেভাবে কোনোদিন প্রণয়ের সম্পর্ক হয়েছে।তারপর নিজের সংসার নিয়ে সে অনেক ব্যাস্ত হয়ে পরে আর একটা সময় ঋদ্ধ কে ভুলেই যায় সে। হ্যা এটা সত্যি ঋদ্ধ র প্রতি যে অনুভুতি ছিলো তাহসিন তার ভালোবাসা দিয়ে সবটা ভুলিয়ে দিয়েছিলো।
তারপর ,,
তারপর হঠাৎ একটা ঝর সব শেষ করে দিলো।মেহেরিন মাঝে মাঝে ভাবে একটা মেয়ে কি করে একটা মেয়ের সংসার নষ্ট করতে পারে। আর নষ্ট করে কি তারা সুখি হয় কিজানি।
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে মেহেরিন।পাশে শুয়ে আছে তার মায়রা তার জীবন।মেহেরিনের আফসোস হয় না তার সেই ভেঙে যাওয়া সংসার নিয়ে কারন সেই সংসার থেকেই তো তার এই ছোট্ট অংশকে পাওয়া।তাহলে কেন সে আফসোস করবে তার সতো আফসোস এই বাচ্চাটার দিকে তাকালেই মুছে যায় নিজেকে সবথেকে সুখি মনে হয় যখন মায়রা তাকে মাম্মা ডাকে।
মেহেরিন ছোট্ট চুমু খেলো ঘুমন্ত মায়রার কপালে।বাচ্চাটা ঘুমের মাঝেই হালকা হেসে উঠলো।
মাম্মার জান তুমি তোমার জন্য মাম্মা সব করতে পারে প্রিন্সেস ,,
নিজের ফোন বেজে উঠলেই মেহেরিন দেখতে পেলো ঋদ্ধ র কল।
তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। সে জানে ঋদ্ধ র কল ধরলেই এখন তাকে নানারকম কথা শুনিয়ে লজ্জা দিবে।
কল কেটে যাওয়ার আগেই কানে ধরলো সে।
-------------------------------
রাত বারোটা ,,
সবে তুলি বাসায় ফিরলো।গোসল শেষ করে শুয়ে পরার প্রস্তুতি নিলেই ঘরের দরজা ফট করে খুলে গেলো।
তুলি বিরক্ত হলো বেশ।বেশ ঝাঁজ নিয়েই বললো --
"এসব কি তাহসিন ভদ্রতা শেখোনি তুমি!একজনের রুমে আসতে গেলে যে নক করে আসতে হয় তা ভুলে গেছো!
তাহসিন আহত দৃষ্টিতে তাকালো। পরমুহূর্তেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো। তুলি কে সে যেমন ভাবতো তেমন তো সে নয়। মূলত তুলি টাকার জন্য তাহসিন কে বিয়ে করেছিলো টাকা শেষ তুলির তাহসিনের প্রতি নম্রতা ভদ্রতা রেসপেক্ট শেষ।
" তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো?
"বিরক্ত যেনো বাড়লো তুলির।আজকাল তাহসিনকে সে সহ্য করতে পারে না। একটা মেরুদণ্ডহীন পুরুষ। সত্যি তো যে পুরুষের টাকা নেই সে মেরুদণ্ডহীন ই।তবে সে অনেক টায়ার্ড তাই ঝামেলা বাড়াতে চাইলো না।
" বলো?
"আগামীকাল একটা রিসেপশন পার্টিতে যেতে হবে তোমায় আমার সাথে। আমার কোম্পানির ডিলের জন্য এটা ভীষণ জরুরী।
" উফ তাহসিন আমার এতো সময় নেই যে তোমার সাথে আমি এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াবো।বেশ রাগ নিয়ে বললো।আর তুমি ভাবলে কি করে তোমার ওই কোম্পানি তো এমনিতেই ডুবে আছে সে আর কিসের ডিল পাবে।আমার অফিস আছে তোমার সাথে আমি কোথাও যেতে পারবো না।
তুলি কথাগুলো এতোটাই তাচ্ছিল্য নিয়ে বললো যে তাহসিন আর কিছু বলতে পারলো না।হাতের কার্ডটা সেখানে রেখে চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে।
তাহসিন কে যেতে দেখে তুলি কিছুটা শান্ত হলো।তার কাল বসের সাথে আউটিংএর প্ল্যান আছে সেখানে তাকে তার বস নতুন কার গিফট করবে বলেছে সে কিছুতেই এটা হাতছাড়া করবে না।
এসব চিন্তা করতে করতে তার নজর পরলো তাহসিন এর রেখে যাওয়া খামটার ওপর।যেখানে বড়ো বড়ো অক্ষর এ চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির নাম খোদাই করা।তুলির চোখ চকচক করে উঠলো চৌধুরী কোম্পানির নাম শুনেছে সে বাংলাদেশের বড়ো ইন্ডাস্ট্রি গুলোর মধ্যে একটা এটা।কৌতুহল দমাতে না পেরে খামটা খুললো সে।খুমটা খোলার সাথে সাথে চোখজোড়া কোটর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। কারন তাতে লেখা --
Aaron Riddho Choudhury
Weds
Meherin Mirza
তার নিচে অবশ্য বাকি সব ডিটেইলস ও দেওয়া আছে।তুলির মেহেরিন মির্জা নাম চিনতে এতোটুকোও ভুল হলো না।
তবে সে ভাবছে
তাহসিন তাকে বললো কোম্পানির ডিলের কথা এদিকে সেখানে তার এক্স ওয়াইফ এর বিয়ে।তাহসিন কি তাকে মিথ্যা বললো নাকি সে খামটা খুলে দেখেনি।
হঠাৎই তার মুখে বাকা হাসি খেলে গেলো।সে খামটা রেখে চলে গেলো তাহসিন এর রুমে।
"তাহসিন চিন্তায় আছে মি,চৌধুরী তাকে পুরো পরিবার নিয়ে যেতে বলেছে কিন্তু সেখানে তার ওয়াইফ না থাকলে বিষয় টা খুবি খারাপ হবে পাশাপাশি তার ইমেজ নষ্ট হবে।তাহসিন কোনোভাবে চায় না তার ইমেজের জন্য ডিল ক্যান্সেল হোক।
" আসবো?
"তুলির কন্ঠ পেয়ে চোখ তুলে চাইলো সে ,,
আমি তোমার সাথে যেতে রাজি।
কপালে ভাজ পরলো তাহসিন এর মাত্র তো বললো যেতে চায় না এখন আবার বলছে যাবে।
তবে সে ঘাটলো না রাজি হয়েছে এটাই অনেক।
তুলি আর কিছু বললো না দরজার সামনে গিয়ে আবারও থামলো সে --
বিয়েটা কার তুমি জানো তাহসিন?
" হুম চৌধুরী কোম্পানির মালিকের ছেলের ,,
"আর মেয়ে,,
"এটা আমার জানা নেই..
তুলির মুখের হাসি আরও একটু চওড়া হলো।
--------------------------------
" কি বেপার এতো রাতে ঘুমাওনি কেন?
"তুমিও তো ঘুমাওনি পাখি!আমার কথা ভাবছিলে বুঝি?
দুষ্ট স্বরে কথাটা বললো ঋদ্ধ ,,
মেহেরিন এর গালে লজ্জার ছাফ পরলো।
"আমার বয়ে গেছে তোমার কথা ভাবতে!আমি তো কাজ করছিলাম।
" উফ পাখি তুমি আজকেও কাজ করছো কাল না তোমার বিয়ে!
"মেহেরিন হাসলো।হুম তো?
" তো মানে কী পাখি!
"আচ্ছা এটা বলো তুমি ঘুমাওনি কেন?
" আমি তো আমার মেহুপাখির কথা ভাবছিলাম।
বেশ হাস্কি টোনে ফিসফিসিয়ে বললো সে
ঠান্ডা শীতল ঢেউ খেলে গেলো মেহেরিন এর শরীর দিয়ে।
"ক ,, কি ভাবছিলে?
" এই তোমাকে কখন কাছে পবো কখন সকাল হবে তারপর তুমি পুরোপুরি আমার হবে পাখি।
লজ্জার পরিমাণ যেনো আরও বাড়লো মেহেরিনের।
ঋদ্ধ ঠোট কামড়ে হাসলো সে জানে তার মেহুপাখি লজ্জা পাচ্ছে। আর সে ইচ্ছাকৃত তাকে লজ্জা দিচ্ছে।