জমকালো আলোয় ঝলমল করছে পাঁচতারা হোটেলের বিশাল রিসেপশন হলরুম। দেশের নামী-দামী ব্যবসায়ী, মিডিয়ার মানুষ আর অভিজাত শ্রেণির উপস্থিতিতে চারদিক মুখরিত। আজ চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র উত্তরাধিকারী অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরীর বিয়ের রিসেপশন।
হলের এক কোণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল তাহসিন, তার মা এবং তুলি। তাহসিনের পরনে সাধারণ একটি ব্লেজার, মুখে কিছুটা সংকোচের ছাপ। এই বড় বড় মানুষদের ভিড়ে সে নিজেকে বড্ড বেমানান আবিষ্কার করছে।
তবে তুলির চোখে-মুখে উপচে পড়ছে উত্তেজনা। তার নজর চারিদিকের রাজকীয় সাজসজ্জার দিকে।
সে মনে মনে এক কুৎসিত আনন্দ উপভোগ করছে—আজ তাহসিনে কীভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়, তা দেখার জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
তাহসিন এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে খুঁজতে লাগল। এমন সময় স্টেজের ওপর আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চারদিকের গুঞ্জন ছাপিয়ে ফিসফাস শুরু হলো,
"ঐ যে, নবদম্পতি আসছেন!
তাহসিনও কৌতূহলবশত স্টেজের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার বুকের ভেতরের স্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল সে।
স্টেজের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে এক অপরূপা নারী। পরনে গাঢ় লাল আর সোনালী কাজের লেহেঙ্গা, গলায় হিরের নেকলেস, আর মুখে এক স্বর্গীয় স্নিগ্ধ হাসি। এ তো অন্য কেউ নয়! এ যে মেহেরিন! সেই সাধারণ, শান্ত মেহেরিন, যার সাথে সে প্রতারণা করেছিল। আজ সে যেন কোনো এক রাজ্যের রানি!
মেহেরিনের হাত শক্ত করে ধরে পাশে হেঁটে আসছেন সুপুরুষ ঋদ্ধ চৌধুরী। ঋদ্ধর চোখে মেহেরিনের জন্য উপচে পড়া ভালোবাসা আর গর্ব।
তাহসিনের পায়ের নিচের মাটি যেন কেঁপে উঠল। তার চিবুক বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ল। সে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল, "মেহেরিন...!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুলি বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বলল,
"কী হলো তাহসিন? চিনতে পারছ তোমার প্রাক্তনকে? তোমার ফিলিংস কী এখন?
বেশ ব্যঙ্গ করে কথাটা বলল তুলি।
তাহসিন তুলির কথার উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তার বুকটা ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তীব্র এক অপরাধবোধ আর অনুশোচনা তার গলা টিপে ধরল।
সে বেশ বুঝতে পারছে, কেন তুলি এই রিসেপশনে আসতে এত সহজে রাজি হয়েছিল।
ঠিক তখনই স্টেজে এক মিষ্টি ঘটনা ঘটল। মেহেরিনের শাশুড়ি মুচকি হেসে মেহেরিনের কোলে এক পরিচ্ছন্ন, পরীর মতো সুন্দর ৪-৫ বছরের বাচ্চাকে তুলে দিলেন। বাচ্চাটার পরনেও মেহেরিনের লেহেঙ্গার সাথে মিলিয়ে ছোট একটা লাল ফ্রক।
বাচ্চাটা স্টেজে উঠেই ঋদ্ধর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আধো-আধো বোলে ডাকল, "পাপা! কোলে নাও!
ঋদ্ধর পুরো মুখটা এক নিমেষে এক বুক ভালোবাসায় ভরে উঠল। সে পরম যত্নে মেহেরিনের কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নিল। তারপর বাচ্চাটার গালে একটা গভীর চুমু খেয়ে মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
কাজি আর বিয়ের রেজিস্ট্রির জন্য উকিল এসে বসল তাদের দুজনের পাশে। মায়রা গোল গোল চোখে সবটা পর্যবেক্ষণ করছে, যেন তার চোখে হাজারো কৌতূহল।
কাজি সাহেব বড় চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরী, কনে মেহেরিন মির্জাকে তার যাবতীয় সম্পদের অর্ধেক মালিকানা দেনমোহরে আপনার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার এই অফিসিয়াল ম্যারেজ রেজিস্ট্রি ফরমে সই করুন।
ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী হাসি। সে টেবিলের ওপর রাখা কলমটা হাতে নিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য মেহেরিনের দিকে তাকাল। লাল লেহেঙ্গায় মেহেরিনকে আজ কোনো এক রাজ্যের রানি লাগছে। ঋদ্ধ মনে মনে বলল,
"অবশেষে তুমি পুরোপুরি আমার হলে, পাখি।" পরম শ্রদ্ধায় সে রেজিস্ট্রারে নিজের সইটা বসিয়ে দিল
'অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরী'।
চারপাশে উপস্থিত সবাই একসাথে বলে উঠল, "আলহামদুলিল্লাহ!
মেহেরিন বেশ অবাক হলো। কারণ, তাদের কাবিন নিয়ে আগে কোনো কথা হয়নি।
তাছাড়া তার নিজের সম্পত্তিও তো কম নয়; তবে ঋদ্ধ কেন এমন করল? সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ঋদ্ধ হয়তো তার মনোভাব বুঝে ফেলল।
সে চোখ দিয়ে ইশারা করতেই মেহেরিন থেমে গেল।
এবার কাজি সাহেব খাতাটি নিয়ে এগিয়ে গেলেন মেহেরিনের দিকে। মেহেরিনের হাতটা সামান্য কাঁপছিল। পুরোনো জীবনের ভাঙন, সমাজের লাঞ্ছনা আর একা একটা মেয়ে সন্তান বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই
সবকিছু আজ এই একটা সইয়ের মাধ্যমে মুছে যেতে চলেছে।
শুধু নিজের মেয়েকে বাবার পরিচয় আর আদর দেওয়ার জন্যই সে আজ এই বিয়েটা করছে। মেহেরিন একা নিজের মেয়েকে মানুষ করতে পারত,
কিন্তু তার মেয়েটা সবসময় বাবার শূন্যতা অনুভব করত। মেয়ের সেই ইচ্ছার দাম দিতেই তার এই সিদ্ধান্ত।
মেহেরিন চোখের কোণের এক ফোঁটা জল লুকিয়ে শক্ত হাতে সই করল --
মেহেরিন মির্জা।
সই শেষ হতেই চারপাশ হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল। ঋদ্ধ সবার সামনেই মেহেরিনের সেই সই করা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
মেহেরিনের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। মায়রাও খুশি হয়ে নিজের পাপা আর মাম্মাকে চুমু দিল।
তার খুশি যেন আর ধরে না। এক পারফেক্ট সুখী পরিবারের প্রতিচ্ছবি!
মেহেরিন বারবার মেয়ের উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকাচ্ছিল।
দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে তাহসিনের কলিজা যেন কেউ টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলল। ওই বাচ্চাটা... ওই তো মায়রা! তার নিজের র/ক্ত, তার নিজের মেয়ে! যাকে সে কোনোদিন দেখেনি, যার নামটাও সে জানত না। আজ তার নিজের সন্তান অন্য এক পুরুষকে 'পাপা' বলে ডাকছে, আর সেই পুরুষের বুকেই নিজের আসল বাবার ওম খুঁজে পেয়েছে।
তাহসিনের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। নিজের করা সব পাপের শাস্তি সে আজ জীবন্ত দেখতে পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে অতিথিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে করতে ঋদ্ধ আর মেহেরিন তাহসিনদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে তাহসিনের মা-ও মেহেরিনকে চিনতে পেরেছেন। লজ্জায় তিনি চোখ তুলে তাকাতে পারছেন না। নিজের ছেলের মনের অবস্থাও তিনি বুঝতে পারছেন।
ঋদ্ধ একপর্যায়ে মেহেরিনকে তাহসিনের সামনে দাঁড় করালে তাহসিন যেন জমে গেল। মেহেরিন এতক্ষণ তাহসিনকে খেয়াল না করলেও,
এখন সামনে দেখে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।
পুরোনো অন্যায়ের ক্ষতগুলো এক মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল তার চোখে।
কিন্তু পরক্ষণেই সে পাশে থাকা ঋদ্ধর দিকে তাকাল,
যে মায়রাকে কোলে নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মেহেরিনের হাত ধরে আছে। ঋদ্ধর এই স্পর্শ মেহেরিনকে এক অদ্ভুত শক্তি দিল।
মেহেরিন নিজেকে সামলে নিল। তার চোখে এখন আর তাহসিনের জন্য কোনো রাগ, ক্ষোভ বা কান্না নেই
"আছে কেবল এক মহাসমুদ্রের মতো উপেক্ষা। সে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভদ্র ও শীতল গলায় বলল
"আপনারা এসেছেন, খুব ভালো লাগল। অনুষ্ঠান উপভোগ করুন।
মেহেরিনের এই শান্ত অবহেলা তাহসিনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তাহসিন কিছুই বলতে পারল না।
তুলি নির্লজ্জের মতো মেহেরিনের সামনে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানাল।
তারপর মায়রার দিকে চোখ যেতেই বলে উঠল, "এটা তো তোমার সেই মেয়ে মেহেরিন? মানে তোমার আর...
"মায়রা চৌধুরী।
মিসেস মেহেরিন চৌধুরী ও অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরীর মেয়ে।
"তুলি কথা শেষ করার আগেই ঋদ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল।
তুলি দমে গেল, আর কিছু বলার সাহস পেল না সে।
তাহসিনের মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি মাথা নিচু করেই বলে উঠলেন,
"সুখী হও মা!
মেহেরিনের ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি খেলে গেল। সে কোনো কথা বলল না। তবে তাহসিন আর তার মা সেই হাসিতে স্পষ্ট তাদের জন্য তাচ্ছিল্য দেখতে পেল।
মেহেরিন পুরোটা সময় এমন আচরণ করল যেন তাহসিন বা তার পরিবারকে সে চেনেই না। তার এই অচেনা মানুষের মতো ব্যবহার তাহসিনকে বুঝিয়ে দিল
"মেহেরিনের জীবনে এখন তাহসিন নামের কোনো অধ্যায়ের অস্তিত্বই নেই। সে পুরোপুরি অতীত। আর তাহসিন এটা ভালো করেই জানে,
মেহেরিনের মতো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে কখনো অতীত নিয়ে পড়ে থাকবে না।
ঋদ্ধ তাহসিনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বিজয়ী হাসি হাসল, যেন নীরবে বুঝিয়ে দিল
"তুমি যাকে অবহেলা করেছ, সে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন।
তারা দুজনে মায়রাকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল তাহসিন। একরাশ শূন্যতা আর জীবন্ত নরকের কষ্ট বুকে নিয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। যে বসন্তের আশায় তাহসিন মেহেরিনকে ধোঁকা দিয়েছিল, সেই বসন্ত তাহসিনের জীবনে আসেনি।
সেই বসন্ত মেহেরিনের জীবনে এসেছে—তবে তাহসিনের জীবনকে চিরতরে মরুভূমি করে দিয়ে।