বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ৩৪

🟢

​ভোরের স্নিগ্ধ আলোটা যখন জানালার ভারী পর্দা ভেদ করে মেহেরিনের চোখের ওপর এসে পড়ল, তখন তার ঘুমের ঘোর ভাঙল।

চোখ মেলতেই তার পুরো শরীর জুড়ে এক তীব্র, মিষ্টি ক্লান্তি ভর করল।

গতরাতের সমস্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মেহেরিনের ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।

সে চট করে পাশে তাকাতেই দেখল বিছানার সেই জায়গাটা শূন্য। ঋদ্ধ সেখানে নেই।

​মেহেরিন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করতেই ব্যথায় তার মুখ থেকে একটা অস্ফুট শব্দ বের হলো।

​ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে গেল।

ঋদ্ধ চুল মুছতে মুছতে ভেজা শরীরে, স্রেফ একটা ট্রাউজার পরে বেরিয়ে এলো। তার সুঠাম শরীরে ভোরের আলো ঠিকরে পড়ছে।

​মেহেরিনকে জেগে উঠতে দেখে ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল।

সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিছানার একপাশে বসল। ঋদ্ধর উপস্থিতি টের পেয়ে মেহেরিন লজ্জায় কাঁথাটা গাল পর্যন্ত টেনে নিল।

​"কী ব্যাপার, পাখি?

চোখ মেলতেই এই চোরের মতো লুকিয়ে পড়ার মানে কী?

" ঋদ্ধর ভারী কণ্ঠস্বরে সকালের এক অদ্ভুত মাদকতা।

​মেহেরিন কোনো কথা না বলে কাঁথার ভেতর থেকেই চোখ বড় বড় করে তাকাল।

ঋদ্ধ আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে ঝুঁকে এসে এক ঝটকায় মেহেরিনের মুখের ওপর থেকে কাঁথাটা সরিয়ে দিল।

মেহেরিন দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করতেই ঋদ্ধ ওর দুটো হাত একসাথে ধরে মেহেরিনের মাথার দুপাশে লক করে দিল।

​"ঋদ্ধ, ছাড়ো...

সকাল সকাল কী শুরু করলে!

মায়রা অপেক্ষা করছে।

" মেহেরিনের গলার স্বর কাঁপছিল।

​"মায়রাকে সামলানোর জন্য অ্যানি, মম, ড্যাড, পিটার আছে। তাছাড়া নিজের বউয়ের সাথে দুষ্টুমি করছি, কারো ধার ধারি না,

" বলেই ঋদ্ধ তার ভেজা চুলগুলো আলতো করে ঝাঁকিয়ে দিল।

পানির কয়েকটা ঠান্ডা ফোঁটা মেহেরিনের মুখে আর গলায় পড়তেই সে শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

​ঋদ্ধ মেহেরিনের নাকের ডগায় নিজের নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,

"আজকের সকালটা বড্ড বেশি সুন্দর, মেহুপাখি।

ঠিক তোমার মতো।

​মেহেরিন আলতো করে ঋদ্ধর চওড়া বুকে নিজের হাত রেখে ওকে একটু দূরে সরানোর চেষ্টা করে বলল,

"অনেক হয়েছে, এবার ছাড়ো। নিচে সবাই অপেক্ষা করছে, আমায় ফ্রেশ হতে হবে।

​ঋদ্ধ মেহেরিনের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসল।

তারপর মেহেরিনের কপালে আর ঠোঁটে দুটো চটজলদি গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে ওকে ছেড়ে দিল। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,

"জলদি ফ্রেশ হয়ে নাও। নইলে রোমান্টিক মুড ফিরলে কিন্তু আজ আর ঘর থেকে বের হওয়া হবে না!

​ঋদ্ধর এমন স্পষ্ট দুষ্টুমিতে মেহেরিন বালিশটা ওর দিকে ছুড়ে মারল।

​একপর্যায়ে দুষ্টুমি ছেড়ে মেহেরিন ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেল।

------------------------------------

​চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির কর্পোরেট অফিসে এক চরম উত্তেজনা। তাহসিনের কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সাথে একটা বড় ড্রিম প্রজেক্টের ডিলের জন্য চেষ্টা করছিল। এই ডিলটা না পেলে তাহসিনের কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।

​মিটিং রুমে তাহসিন ফাইল হাতে অত্যন্ত নার্ভাস হয়ে বসে আছে। মূলত ঋদ্ধই আজ ডেকেছে তাদের, তাহসিন আসতে চায়নি কারণ তার জানা সে কখনোই ডিলটা পাবে না।

তারপরও শেষ আশায় একবার এসেছে সে। তার সাথে তার কোম্পানির কয়েকজন সিনিয়র মেম্বার।

​একটু পরেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরী।

তার রাজকীয় উপস্থিতি আর গম্ভীর ব্যক্তিত্ব পুরো রুমের আবহাওয়া বদলে দিল। কিন্তু তাহসিনের চমকের তখনও বাকি ছিল।

​ঋদ্ধর ঠিক পাশেই নেভি ব্লু রঙের একটা ফরমাল শাড়ি পরে, চুলে পারফেক্ট খোঁপা করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে রুমে ঢুকল মেহেরিন!

আজ সে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির নবনিযুক্ত ডিরেক্টর এবং ঋদ্ধর অর্ধাঙ্গিনী। বিয়ের পরেরদিনই নবদম্পতিকে অফিসে দেখে সবাই অবাক হলেও কিছু বলেনি।

​তাহসিন মেহেরিনকে এই রূপে দেখে নিজের আসন থেকে প্রায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল,

কিন্তু কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। মেহেরিন তাহসিনের দিকে একবার তাকালও না। সে ঋদ্ধর পাশের প্রধান চেয়ারটায় বসল।

​ঋদ্ধ তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,

"মি. তাহসিন, আপনাদের প্রজেক্ট প্রপোজাল আমি দেখেছি। আপনারা অনেক বেশি এফোর্ট দিয়েছেন ডিলটাতে আমি বিশ্বাস করি। তবে মার্কেট ভ্যালু অনুযায়ী আপনাদের কোম্পানি এখন ডুবন্ত প্রায়।

​তাহসিন শুকনো মুখে ঢোক গিলে বলল,

"মি. ঋদ্ধ, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছি। এই ডিলটা আমাদের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। প্লিজ, একটু বিবেচনা করুন।

​ঋদ্ধ এক চিলতে বাঁকা হাসল। সেই হাসিতে মিশে ছিল চরম তাচ্ছিল্য। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মেহেরিনের দিকে তাকাল।

ঋদ্ধর চোখ দুটো মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। সে মেহেরিনের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে সবার সামনেই বলল,

বিজ্ঞাপন

"আমি আগেই ঘোষণা করেছি, আমার যাবতীয় সম্পত্তির অর্ধেক যেমন মেহেরিনের, তেমনই এই কোম্পানির প্রতিটা বড় সিদ্ধান্তের মালিকও সে।

মি. তাহসিন, আপনার কোম্পানির ভাগ্য আজ আমার হাতে নেই।

এই ডিলটা সাইন হবে কি হবে না,

তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আমার স্ত্রী—

মিসেস মেহেরিন চৌধুরী।

​মিটিং রুমের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তাহসিনের মনে হলো তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে।

​তাহসিন কাঁপানো চোখে মেহেরিনের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন অনুনয়, ভিক্ষা পাওয়ার আকুতি।

​মেহেরিন শান্ত চোখে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনের কথা, তবে সেগুলোকে আমলে নিল না সে।

​মেহেরিন ফাইলটা হাতে নিল। পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখল, তার অঙ্গভঙ্গি বুঝিয়ে দিচ্ছে সে কতটা পারফেক্ট।

​সে তাহসিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বরফশীতল গলায় বলল,

"ব্যবসায়িক দিক থেকে দেখতে গেলে, প্রজেক্টে ভালো লাভ হবে তবে কোনো কারণে তা সফল না হলে চৌধুরী কোম্পানিও অনেকটা লসের মুখে পড়বে। আর আপনি যদি সেই দায় নিতে রাজি থাকেন তবে এই ডিলটা আপনাকে দেওয়া হবে।

​তাহসিন অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল, "মেহেরিন... তুমি..."

​মেহেরিন হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর আরও শক্ত হলো,

"মিসেস মেহেরিন।"

​থেমে গেল তাহসিন, নিজের ভুলটা বুঝতে পারল।

"সরি। আমি রাজি।"

তাহসিন জানে সে এই প্রজেক্টে সফল হবে, তাই সে কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই রাজি হয়ে গেল।

​দুই পক্ষের সম্মতিতে অবশেষে ডিল সাইন হলো।

কথা শেষ করে তাহসিন বেরিয়ে আসলো মিটিং রুম থেকে।

​হাঁটতে হাঁটতে তাহসিনের পা থেমে গেল। চোখ ভরে উঠল মমতায়—

একটু দূরেই অ্যানির সাথে মায়রা হেঁটে আসছে, চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। হাত নাড়িয়ে কিছু একটা বলছে সে। ধীর পায়ে এগোতে এগোতেই একদম কাছে চলে আসলো সে।

​পথে বাধা পেয়ে থেমে গেল অ্যানি, তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো সামনের লোকটার দিকে। চোখমুখ শক্ত হয়ে আসলো তার, মায়রার হাতটা আরেকটুখানি শক্ত করে চেপে ধরল সে।

​তাহসিন অনেকটা ইতস্তত করে বলে উঠল—

"আমি একটু কথা বলি ওর সাথে?

" তার কণ্ঠে আকুতি।

​অ্যানি একদমই কথা বলতে দিতে চায় না,

সে বারণ করতেই যাবে তার আগেই থেমে গেল সে। অদূরে দাঁড়ানো মেহেরিন চোখের ইশারায় বারণ করল তাকে। মেহেরিনের পাশেই ঋদ্ধ দাঁড়ানো।

ম্যামের ইশারা পেয়ে অ্যানি আর বারণ করল না। বিরক্ত নিয়েই মায়রার হাত ছাড়ল। মায়রার দিকে তাকিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল—

"বেবি, এই আঙ্কেল তোমার সাথে কথা বলতে চায়, তুমি কথা বলবে একটু?

​মায়রা কিছুই বুঝল না, তবে সামনের লোকটার দিকে একবার তাকাল। তারপর বলল,

"ওকে অ্যানি আন্টি।"

​অ্যানি দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

​তাহসিন ধপ করে বসে পড়ল মায়রার সামনে। তার গলা দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, চোখ টলমল করছে।

​ছোট্ট মায়রা এবার বিরক্ত হলো। এই আঙ্কেলটা তার সাথে কী কথা বলবে?

আর বলছে না কেন তাহলে! নিজের কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে বলেই বসল,

"তুমি কী বলতে চাও আঙ্কেল বলছ না কেন? মায়রা তার পাপার কাছে যাবে। পাপা তার জন্য অপেক্ষা করছে।

​তাহসিনের বুক ফেটে যেতে চাইল। তার সন্তান তাকে আঙ্কেল ডাকছে, তার সামনে অন্য কাউকে বাবা ডাকছে—এর থেকে বড় ব্যথা আর কী হতে পারে!

​অনেক কষ্টে সে অস্ফুটে বলে—

"তুমি মেহেরিনের মেয়ে প্রিন্সেস।

একদম মায়ের মতো হয়েছ—কোমল, সরল। মায়ের মতোই স্ট্রং আর কোমল মনের অধিকারী হবে। তবে কখনো নিজের অধিকার ছাড়বে না।

সে গভীরভাবে একটা চুমু খেল মায়রার কপালে। তবে এতে মায়রার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

অচেনা মানুষের স্পর্শ একদমই পছন্দ নয় মায়রার, যা বুঝল তাহসিন।

​এর মাঝেই ঋদ্ধ এসে দাঁড়াল। মায়রা নিজের পাপাকে দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ঋদ্ধ পরম মমতায় তাকে কোলে তুলে নিল, কপালে চুমু খেল। পরপরই মায়রাও তার গালে একটা চুমু দিল।

​তাহসিন ব্যথাভরা চোখে দেখল সবটা।

​"মি. তাহসিন কিছু মনে করবেন না, আসলে আমার মেয়ে অচেনা কারো স্পর্শে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।

​তাহসিন হাসার চেষ্টা করল কিছুটা।

"আ... আমি আসছি মি. চৌধুরী..."

​ঋদ্ধ মেয়ের সাথে কথায় মগ্ন হয়েই বলল, "হুম আসুন..."

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস