বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ৩৮

🟢

মেহেরিনরা আমেরিকায় এসেছে আজ তিন দিন হলো।

নিজেদেরকে ঠিকঠাক গুছিয়ে নিয়েই সবাই আবার আগের মতো নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

মেহেরিন ডুবে আছে নিজের অফিসের দায়িত্বে। মায়রাও গতকাল থেকেই আবার নিজের কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া শুরু করেছে। অ্যানি আগের মতোই মায়রা আর মেহেরিন—দুজনেরই যত্ন নিচ্ছে।

অন্যদিকে ঋদ্ধও ফিরে গেছে তার আগের ব্যস্ত জীবনে। রোগী দেখা, অফিসের জরুরি মিটিং আর প্রয়োজনীয় কাজ—এসব নিয়েই কেটে যাচ্ছে তার দিন। তবে এত ব্যস্ততার মাঝেও একটি অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আর সেটি হলো নিজের স্ত্রী মেহেরিনের আশপাশে ঘুরঘুর করা আর নিজের কিউটিপাই মায়রাকে সময় দেওয়া। পিটারও নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে।

তবে এই কয়েক দিনে একটি বড় পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে। মেহেরিনরা নিজেদের বাংলো ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঋদ্ধর বাড়িতে এসে উঠেছে। এ বিষয়ে মেহেরিনের মতামতের তেমন কোনো মূল্যই পায়নি। যদিও সে নিজেও বিশেষ আপত্তি করেনি। কারণ বিয়ের আগেই সে কথা দিয়েছিল—বিয়ের পর কোনো শর্ত ছাড়াই সে ঋদ্ধর বাড়িতেই থাকবে।

"মায়রাকে আজ চেকআপ করাতে নিয়ে যেতে হবে অ্যানি মনে আছে তোমার?

অফিসের ফাইলগুলো দেখতে দেখতেই বললো মেহেরিন।

" ইয়েস ম্যাম আর ঋদ্ধ স্যার নিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন।

মেহেরিন শান্ত হলো ঋদ্ধ আর সব দিকে ছন্নছাড়া বেপরোয়া ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখালেও মেহেরি আর মায়রার বেপারে সে বড্ড সেনসেটিভ এক চুল ও ছার দিতে রাজি নয় সে।আর যেখানে ঋদ্ধ নিজে একজন ডক্টর তাই মেহেরিন এই বিষয়টাতে নিশ্চিন্তই থাকে সবসময়।

-------------------------------

"বাংলাদেশে থাকার কারণে ঋদ্ধ তার একজন রোগীর নির্ধারিত ওপেন-হার্ট সার্জারিটি কয়েক দিন পিছিয়ে দিয়েছিল। দেশে ফিরে আসার পর আর দেরি করা সম্ভব ছিল না। আজ অপারেশনটি করার জন্য তাকে নিজেই হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তাই মায়রাকে আনতে পিটারকে পাঠিয়েছে।

মায়রাকে কিন্ডারগার্টেন থেকে নিয়ে আসার জন্য সে পিটারকে পাঠিয়েছে। অগত্যা কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ মিটিং মাঝপথে রেখেই মায়রাকে আনতে যেতে হলো পিটারকে।

বেশ অনেকক্ষণ ধরেই সে কিন্ডারগার্টেনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঋদ্ধ বারবার ফোন করে তাড়া দেওয়ায় ছুটি হওয়ার প্রায় তিরিশ মিনিট আগেই চলে এসেছিল।

ছুটি হওয়ার কিছুক্ষণ পর ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে এলো মায়রা। কিন্তু তাকে দেখেই পিটারের কপাল কুঁচকে গেল।

এ কী! মায়রা কাঁদছে কেন?

এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। পিটারকে সামনে দেখে মায়রা ভেবেছিল তার পাপাই এসেছে। পুরো মুখটা ভালোভাবে না দেখেই কান্নাজড়ানো কণ্ঠে ডেকে উঠল,

"পাপা...

মুহূর্তেই পিটার থমকে গেল। দ্রুত হাঁটু গেড়ে তার চোখের সমান হয়ে বসে কোমল স্বরে বলল,

"বেবি, হোয়াট হ্যাপেন্ড? আমি পিটার আঙ্কেল।

নিজের পাপার জায়গায় পিটারকে দেখে মায়রার ছোট্ট ঠোঁট ফুলে উঠল। পরক্ষণেই কান্না যেন আরও বেড়ে গেল।

মায়রার কান্না দেখে পিটার আর দেরি করল না। তাকে কোলে তুলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,

"বেবি, পাপার একটা জরুরি অপারেশন পড়ে গেছে। তাই আমাকে পাঠিয়েছে তোমাকে নিতে। আমার মায়রা বেবি তো অনেক বুঝদার। সে তো এভাবে কাঁদে না, তাই না?

কিন্তু কে শোনে কার কথা!

মায়রার কান্না যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। হেঁচকি তুলতে তুলতে সে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল,

"পাপা ছত্তি মায়লাকে ভালোবাতে না... পাপা ছত্তি মায়লাল স্টেপ ফাদাল...

কথাটা শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল পিটারের।

এতগুলো মাসে মায়রার মুখে এমন কথা সে একবারও শোনেনি। কত মানুষই তো এই নিষ্পাপ শিশুটার মনে বিষ ঢালার চেষ্টা করেছে, তার বাবার বিরুদ্ধে ভুল ধারণা তৈরি করতে চেয়েছে। কিন্তু মায়রা কখনোই সেসব বিশ্বাস করেনি। তার কাছে ঋদ্ধই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা।

তাহলে আজ হঠাৎ এমন কথা বলছে কেন?

ভাবতেই পিটারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঋদ্ধ স্যার আর মেহেরিন ম্যাম যদি এসব শুনতে পান, তাহলে কতটা ভেঙে পড়বেন!

না... যেভাবেই হোক, মায়রার ছোট্ট মনে জন্ম নেওয়া এই ভুল ধারণাটা দূর করতেই হবে।

" বেবি ,, তুমি তো গুড গার্ল তাইনা?

মায়রা কান্না করতে করতেই মাথা নাড়ালো।

"বেশ, তাহলে আঙ্কেলকে বলো তো, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?

পিটারের কোমল প্রশ্নে মায়রা ফুঁপিয়ে উঠল।

"লুসি বলেতে, আমাল পাপা আমায় বালোবাতে না...

কথাটা শেষ করতেই আদুরে ছোট্ট মেয়েটার দু'চোখ বেয়ে আবারও টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

"আবাল লুসিল মাম্মা বলেতে, আমাল পাপা শুধু মাম্মাকে বিয়ে কলাল জন্য আমায় মিথ্যে মিথ্যে বালোবাতে। আল বলেতে, আমাল মাম্মাল যখন আলেকটা বেবি হবে, তখন আমায় আল কেউ বালোবাতবে না...

শিশুসুলভ জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে আবারও কেঁদে ফেলল মায়রা।

পিটারের ভেতরটা রাগে জ্বলে উঠল। একজন মানুষের মানসিকতা কতটা নিচু হলে সে একটা নিষ্পাপ শিশুর মনেও এমন বিষ ঢুকিয়ে দিতে পারে!

বিজ্ঞাপন

তবু নিজের রাগটা এক মুহূর্তেই চাপা দিয়ে সে মায়রার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। খুব যত্ন করে ছোট্ট মুখটা নিজের দু'হাতের মাঝে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিল।

"কাঁদবে না, বেবি। তুমি তো জানো, তোমার পাপা একজন ডাক্তার। তাই না?

মায়রা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়ল।

"আর ডাক্তাররা কী করে?"

"মানুতের প্রাণ বাঁচায়...

"একদম ঠিক। আজ তোমার মতোই একটা ছোট্ট বেবি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই তোমার পাপা তাকে বাঁচাতে হাসপাতালে গেছে। এই কারণেই আজ তোমাকে নিতে আসতে পারেনি।

মায়রা চুপচাপ শুনতে লাগল।

পিটার মুচকি হেসে আবার বলল,

"আর জানো? তোমার পাপা আমাকে কী বলেছে?

"কী?

"বলেছে, আমার কিউটিপাই স্কুল থেকে বের হলে তাকে পার্কে নিয়ে যেতে, অনেকগুলো গেম খেলাতে আর বড় একটা আইসক্রিম খাওয়াতে। তবে একটা শর্তও দিয়েছে...

মায়রার বড় বড় চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল।

"কী শল্ত?

"মাম্মা আর অ্যানি আন্টি যেন কিছুতেই জানতে না পারে।

ছোট্ট মুখটায় মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল।

পিটার এবার নরম গলায় বলল,

"আচ্ছা বলো তো, তোমার পাপা যদি তোমাকে ভালোই না বাসত, তাহলে এতসব বলে আমাকে পাঠাত?

মায়রা এবার জোরে জোরে মাথা নাড়ল।

"না... না... মায়লাল পাপা আমায় অনেক বালোবাতে। ওই আন্টিটা পুতা আন্টি। মিথ্যে বলেছে!

পিটার স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অন্তত ছোট্ট মেয়েটার মন থেকে কষ্টটা কিছুটা হলেও দূর করতে পেরেছে।

"এই তো আমার ব্রেভ গার্ল। এবার চল, আমরা পাপার সিক্রেট মিশনে যাই!

"ইয়াই!

মায়রা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।

তারপর পিটার তাকে নিয়ে পার্কে গেল। দু'জনে একসঙ্গে দোলনায় চড়ল, স্লাইডে খেলল, ছোট ছোট গেম খেলতে খেলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না। শেষে দু'জনে পাশাপাশি বসে আইসক্রিম খেতে খেতে হাসিতে মেতে রইল।

এদিকে ঋদ্ধর অপারেশন, বরাবরের মতোই, সফল হয়েছে। অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ফ্রেশ হয়ে সবার আগে সে পিটারকে ফোন করল।

পিটার জানাল,

"কিউটিপাইকে নিয়ে বাসায় ফিরছি।

কথাটা শুনেই ঋদ্ধর মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ল।

------------------------------

মেহেরিন বেশ মনোযোগ সহকারে কয়েকটি ফাইলের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল। হুট করেই নিজেকে শূন্যে ভাসতে দেখে চমকে উঠে সামলে নেওয়ার তাড়নায় দ্রুত লোকটির গলা জড়িয়ে ধরল।

​"আহা, কী করছ ঋদ্ধ! আমি কাজ করছি তো!

​"বাট আই 'ম সো টায়ার্ড, পাখি! মাই বডি নিডস সাম এনার্জি...

ঋদ্ধর কণ্ঠে এক অদ্ভুত আবেশ।

​"আরে, শুনছ ঋদ্ধ ,,

​কিন্তু কে শোনে কার কথা! মেহেরিনের কেবিনের সাথেই লাগোয়া ছোট্ট একটা ঘর আছে;

কাজের ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য কিংবা মাঝে মাঝে মায়রা এলে যেখানে আড্ডা জমে। মেহেরিনকে কোলে তুলে সোজা সেই ঘরের নরম বিছানায় শুইয়ে দিল ঋদ্ধ। পরক্ষণেই তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে তার স্নিগ্ধ ঘাড়ে মুখ লুকাল।

​উষ্ণ ছোঁয়ায় মেহেরিনের পুরো শরীর কেঁপে উঠল এক অজানা শিহরণে। তার সেই মৃদু কম্পন টের পেয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল ঋদ্ধর। ওকে আরেকটু চঞ্চল করে তুলতে নিজের উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে মেহেরিনের নরম ঘাড়ে একে একে এঁকে দিতে লাগল আদরের আলতো ছাপ। প্রতিটি স্পর্শে মেহেরিন শিউরে উঠছিল বারংবার।

​বেশ কিছুক্ষণ পর ঘাড়ে ঋদ্ধর কোনো দোলাচল না পেয়ে মেহেরিন ধীর পায়ে পাতা বুজে আসা চোখ দুটি মেলল। পলক ফেলতেই আছড়ে পড়ল ঋদ্ধর গাঢ়, স্থির দৃষ্টির সীমানায়। মুহূর্তেই লজ্জার রক্তিম আভায় চোখ নামিয়ে নিল সে।

​ওর এই লজ্জা রাঙা রূপ দেখে ঋদ্ধর বুক চিরে বেরিয়ে এল এক মৃদু হাসির শব্দ।

তুমি এখনো এমন করে লজ্জা পাও, পাখি? অথচ তোমার লজ্জা তো আমি কত আগেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছি! যদি এখনো কিছুটা বাকি থেকে থাকে, তবে আবার শুরু করা যাক...

​ঋদ্ধকে কথাটি শেষ করতে দিল না মেহেরিন। চট করে তার ঠোঁটের ওপর নিজের নরম হাতটি চেপে ধরল। লাজুক অথচ মিষ্টি অনুযোগ মিশিয়ে বলল --

"একদম চুপ! অসভ্য একটা ছেলে...

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস