বেলকনির শান্ত বাতাসে মেহেরিনের নরম কণ্ঠ ভেসে আসতেই চমকে উঠলো ঋদ্ধ।
পেছনে ফিরে তাকাতেই থমকে গেল তার নজর।
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তার মেহুপাখি—পরনে কালো রঙের নকশাদার নাইটি, চোখে একরাশ স্নিগ্ধ ব্যাকুলতা।
ঋদ্ধ খুব বেশি সময় হয়নি বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে, মনের মধ্যে এক অজানা ঝড় নিয়ে।
"মায়রা ঘুমিয়েছে?
"হুম...
মেহেরিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। কোনো দ্বিধা ছাড়া ঋদ্ধর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলো পরম ভালোবাসায়। তারপর আলতো করে, খুব যত্নে চুইয়ে দিলো অনুরাগের ছোঁয়া।
ঋদ্ধ তার মেহুপাখির এই আদুরে স্পর্শে এক নিমিষে হারিয়ে গেল, আবেশে চোখ দুটো বুজে এলো তার।
মেহেরিনকে আরও নিবিড় করে নিজের বুকে টেনে নিয়ে তার ঘাড়ের খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিলো ঋদ্ধ, যেন এই স্পর্শেই পৃথিবীর সব শান্তি লুকিয়ে আছে।
মেহেরিন মৃদু শিউরে উঠেও নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে শুধালো,
"তোমার কি হয়েছে ঋদ্ধ? তুমি মায়রাকে ওমন কথা বললে কেন তখন?
মেহেরিনের নাকে নিজের নাক ঘষে ঘোর লাগা, বুঁদ হয়ে থাকা কণ্ঠে ঋদ্ধ বলে উঠলো, "কি হবে মেহুপাখি?
"বলবে না? কেন বললে ও কথা?
মুহূর্তেই ঋদ্ধর সেই আবেশ কেটে গেল। মেহেরিনের নরম বাঁধন থেকে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ তুলে তাকালো রাতের অসীম আকাশের দিকে। একপ্রকার নির্বিকার গলায় বলে উঠলো,
"আমার কোনো বেবি চাই না পাখি। কিউটিপাই-ই আমাদের একমাত্র সন্তান হয়ে থাকবে। আর কোনো বেবি লাগবে না আমাদের... মায়রারও কোনো বেবি ভাইয়া আনবো না আমরা।
কথাটা শোনামাত্রই মেহেরিনের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো।
হঠাৎ ঋদ্ধ এমন নিষ্পাপ একটা চাওয়াকে এভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছে কেন?
পৃথিবীর সব পুরুষই তো নিজের রক্তের একটা সন্তান চায়, নিজের বংশের প্রদীপ চায়। তবে ঋদ্ধ কেন নিজেকে বঞ্চিত করছে? হ্যাঁ, মেহেরিন খুব ভালো করেই জানে ঋদ্ধ মায়রাকে কতটা ভালোবাসে। মায়রার নিজের জন্মদাতা বাবাও হয়তো তাকে এতটা আগলে রাখতো না, যতটা ভালোবাসা দিয়ে ঋদ্ধ মায়রাকে নিজের বুকে ধরে রেখেছে। কিন্তু তাই বলে...?
মেহেরিন ঋদ্ধর চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরালো। ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
"কিন্তু মায়রার যে একটা বেবি ভাইয়া চাই ঋদ্ধ...
"ও তো অবুঝ বাচ্চা, মেহুপাখি! দুদিন পর নিজেই সব ভুলে যাবে। তুমি প্লিজ চিন্তা করো না।
"আর আমি?
মেহেরিনের গলায় অভিমানের সুর।
ঋদ্ধ থমকে গিয়ে অবাক চোখে তাকালো।
মেহেরিন ঋদ্ধর চোখের দিকে চেয়ে আলতো করে বললো,
"আমারও তো তোমার ভালোবাসার একটা মায়াবী রূপ দেখতে ইচ্ছে করে ঋদ্ধ। আমার কোলজুড়ে তোমার মতো একটা পুতুল চাই... দেবে না আমায়?
"প্লিজ, মেহুপাখি...
ঋদ্ধর চেহারায় এক চরম আকুতি আর যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠলো।
মেহেরিন এবার ঋদ্ধর বুকে হাত রেখে চেপে ধরলো,
"তাহলে বলো, কেন চাও না? কি গোপন করছো আমার কাছে? নিজের মেহুপাখিকেও বলবে না তুমি?
কথাটা শেষ হতেই ঋদ্ধর চোখের কোণে জল জমে উঠলো। রক্তিম চোখের সেই অশ্রুবিন্দু রাতের আলোয় চিকচিক করে উঠলো। মেহেরিনের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলো—
"আমি যে তোমাদের বড্ড ভালোবাসি পাখি! তোমাকে তো একপ্রকার হারিয়েই ফেলেছিলাম আমি... এই কিউটিপাই না থাকলে হয়তো তোমায় আর কোনোদিন ফিরে পেতাম না। আমি যে কোনো শর্তেই আমার কিউটিপাইকে কষ্ট পেতে দিতে পারি না মেহুপাখি!
মেহেরিন অবুঝের মতো চেয়ে রইলো। ঋদ্ধ তার ভেজা চোখে মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে চললো—
"যদি আমাদের নিজেদের সন্তান আসে... আর অজান্তেই যদি আমার ভালোবাসার ভাগ হয়ে যায়? যদি আমি মায়রাকে আগের মতো আগলে রাখতে না পারি? ও যদি মনে একটুও কষ্ট পায়, ও যদি কোনোদিন ভেবে বসে আমি ওর আসল বাবা নই, শুধুই একজন সৎ বাবা—আমি মরে যাবো মেহুপাখি! এই অপরাধবোধ আমি সহ্য করতে পারবো না। তাই আমাদের একটাই সন্তান থাকবে, আর সে শুধুই আমার কিউটিপাই! আর কেউ না... এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।
কথাগুলো শেষ করে ঋদ্ধ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। নিজের চোখের জলটুকু মেহেরিনের কাছ থেকে লুকিয়ে নেওয়ার জন্য দ্রুত রুমে চলে গেল। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট মায়রার পাশে শুয়ে পড়ে, তাকে পরম মমতায় নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
মেহেরিন তখনও বেলকনিতে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ঋদ্ধর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে। ঋদ্ধর ভালোবাসা আর ত্যাগের এই গভীরতা মেহেরিনের হৃদয়কে একেবারে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। সে কি বলবে, কীভাবে ঋদ্ধর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিদান দেবে—ভেবে পাওয়ার মতো কোনো ভাষা যেন তার জানা নেই!
---------------------------------
পেরিয়ে গেছে বেশ কিছু দিন। সম্পর্কের টানাপোড়েন আর জমে থাকা ব্যাকুল ভালোবাসার মাঝেই দিনগুলো গড়িয়ে গেছে। কিন্তু ঋদ্ধর মন থেকে অস্থিরতার মেঘ কাটে নাই।
ছোট্ট মায়রার অসুস্থতা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি। বারবার ইসিজি আর ইকো রিপোর্টগুলো দেখার পর ঋদ্ধর বুকের ভিতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠতো। দেশের শ্রেষ্ঠ কার্ডিয়াক সার্জন সে নিজেই; প্রতিদিন হাজারো মানুষের হৃদয়কে জীবন ফিরিয়ে দেয় যার হাত—আজ সেই ঋদ্ধর নিজের পুরো পৃথিবীটা আটকে আছে এই ৪ বছরের ছোট্ট শরীরটার ভেতরে।
সে জানে তার কিউটিপাই এর কিছু হলে নিজের মেহুপাখি কেও হারিয়ে ফেলবে সে।
তাইতো ঋদ্ধ মায়রাকে নিয়ে এক সেকেন্ডের জন্যও কোনো রিস্ক নিতে চায়নি। নিজের সমস্ত শিডিউল বাতিল করে, হাসপাতালের ওটি (Operation Theatre) থেকে শুরু করে পুরো মেডিক্যাল টিমকে প্রস্তুত করেছে সে নিজেই।
আগামীকাল মায়রার ওপেন হার্ট সার্জারি।
হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে মায়রা অচেতন ঘুমিয়ে আছে।
মেহেরিন তার সোনা পাখির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর চোখ দিয়ে নিঃশব্দে অনবরত জল ঝরছে। পাশেই দাড়িয়ে আছে অ্যানি সে নিজেও চোখে জল নিয়ে মেহেরিনকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
ঋদ্ধ এসে মেহেরিনের পাশে দাঁড়ালো। মেহেরিনকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে চেপে ধরলো সে।
মেহেরিন ঋদ্ধর শার্টের কলার চেপে ধরে আকুল হয়ে কেঁদে উঠলো,
"ঋদ্ধ, আমার খুব ভয় করছে! এত বড় অপারেশন... ও তো বড্ড ছোট! আমার মেয়েটাকে তুমি ভালো করে দাও ঋদ্ধ, ও তো তোমারই কিউটিপাই!
ঋদ্ধ মেহেরিনের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গম্ভীর কিন্তু ভীষণ দৃঢ় কণ্ঠে বললো, "মেহুপাখি, শান্ত হও। আজ তোমার সামনে দেশের শ্রেষ্ঠ সার্জন দাঁড়িয়ে নেই, আজ দাঁড়িয়ে আছে মায়রার বাবাই। আর এই বাবাই বেঁচে থাকতে ওর গায়ে কোনো আঁচ আসতে দেবে না। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।
পরদিন সকাল।
অপারেশন থিয়েটারের বাইরের লাল বাতিটা জ্বলে উঠলো।
মেহেরিন ওটির বাইরে জায়নামাজ বিছিয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত ধরেছে।একই সাথে অ্যানিও আছে পিটার নিজেও হসপিটালেই আছে বাংলাদেশ থেকে মেহেরিন ও ঋদ্ধ র পরিবারের সকলে এসেছে তবে তারা বাসায়।সবাইকে হসপিটালে আসতে বারন করেছে ঋদ্ধ।
কান্নায় মেহেরিনএর গলা বুজে আসছে, প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে একেকটা যেন পাহাড়সম যুগ।
ওটির ভেতরের আবহাওয়া থমথমে। চারপাশের যান্ত্রিক যন্ত্রপাতির মাঝে শুধুই মনিটরের 'বীপ... বীপ...' শব্দ।
নীল রঙের সার্জিক্যাল ড্রেস, মুখে মাস্ক, হাতে স্টেরাইল গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে আছে ঋদ্ধ। তবে আজ সে শুধু কোনো পেশাদার চিকিৎসক নয়; আজ সে এক অসহায় অথচ লড়াকু বাবা।
ওটি টেবিলে শুয়ে থাকা ছোট্ট তুলতুলে শরীরটার দিকে তাকিয়ে ঋদ্ধর বুকের গহীনে একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠলো। আজ এই নরম বুকটার ওপর নিজের হাতে ধারালো স্ক্যালপেল চালাতে হবে তাকে! ঋদ্ধর কপাল ঘেমে উঠলো। হাতটা মুহূর্তের জন্য মৃদু কেঁপে উঠলো।
পাশে থাকা জুনিয়র সার্জন চিন্তিত গলায় বলে উঠলেন,
"ডক্টর ঋদ্ধ, আপনি কি শিওর? আবেগের জায়গায় দাঁড়িয়ে এত ক্রিটিকাল একটা ওটি হ্যান্ডেল করা রিস্কি হতে পারে। আমরা কি অন্য কোনো সিনিয়র...
"নো!" ঋদ্ধ থামিয়ে দিলো তাকে। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাস্কের ওপর নিজের চোখ দুটোকে পাথরের মতো শক্ত করে নিলো।
"আই অ্যাম হার ফাদার, এন্ড আই অ্যাম দ্যা বেস্ট। স্টার্ট দ্যা প্রসিডিউর।
"স্ক্যালপেল...
ঋদ্ধ হাত বাড়ালো।
নার্স ধারালো ছুরিটা ঋদ্ধর হাতে তুলে দিতেই ওটির সবাই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললো। অতি সূক্ষ্মভাবে ঋদ্ধ কাজ শুরু করলো। মায়রার বুকের নরম চামড়া কেটে কার্ডিওপুলমোনারি বাইপাস মেশিনের সাথে তার শরীরকে যুক্ত করা হলো। অর্থাৎ, মায়রার নিজের হার্ট বিট বন্ধ রেখে মেশিনের সাহায্যে শরীরে রক্ত চলাচল রাখা হলো।
ঋদ্ধ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মায়রার হার্টের ত্রুটিযুক্ত অংশটি মেরামত করতে লাগলো। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছিল, ওটির ভেতর জটিলতা তত বাড়ছিল। অপারেশনের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করে মনিটরের গ্রাফ এলোমেলো হতে শুরু করলো!
"স্যার! পেশেন্টের ব্লাড প্রেসার মারাত্মক ড্রপ করছে! ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে!
সিস্টারের আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
ঋদ্ধর চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এলো। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে গিয়ে দেখা গেল ত্রুটিযুক্ত ভালভটি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ঋদ্ধর কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, নার্স বারবার গামছা দিয়ে তা মুছে দিচ্ছে। কিন্তু ভেতরের রক্তক্ষরণ থামছিলই না!
"অক্সিজেন লেভেল ডাউন হচ্ছে স্যার! হার্ট বিট ধসে পড়ছে!
পুরো অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম প্যানিক করে উঠলো। এক জুনিয়র ডাক্তার অস্ফুটে বলে উঠলো, "স্যার... উই আর লুজিং হার!
কথাটা ঋদ্ধর মাথায় বাজ হয়ে বিঁধলো। 'উই আর লুজিং হার?' না! এটা হতে পারে না! ঋদ্ধর ভেতরটা চিৎকার করে উঠলো।
সে পাগলের মতো এক হাতে ব্লিডিং সোর্সটা চেপে ধরে অন্য হাতে দ্রুত স্টিচ দিতে শুরু করলো। কিন্তু মনিটরের শব্দ আরও দ্রুত হয়ে 'বীপ-বীপ-বীপ' থেকে হঠাৎ একটা দীর্ঘ নিঃশব্দ লাইনে পরিণত হলো—
‘বী—ই—ই—ই—প...
মায়রার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে! কার্ভ একদম ফ্ল্যাট!
ওটির পুরো টিম স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রধান অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন মাথা নিচু করে ফেললেন,
"আই অ্যাম সরি স্যার...
হার্ট রেসপন্স করছে না।