বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ৪০

🟢

পিটপিট করে নিজের চোখ খুলতেই আবারও চোখের পাতা বন্ধ করে নিলো অ্যানি।কিছুটা সময় নিয়ে আবারও নিজের চোখ খুললো সে।

হঠাৎই কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে আসতেই ভয় পেয়ে গেলো শোয়া থেকে ধপ করে বসে পরলো।

সাথে সাথে মেহেরিন তাকে ধরে মাথায় হাত রাখলো।

"কুল কুল ,, অ্যানি ভয় পাওয়ার কিছু নেই দেখো আমি তোমার ম্যাম তোমার সাথে আছি।

কিছুটা স্থির হলো অ্যানি নিজের অবস্থান বুঝতে পেরেই নিজেকে ধাতস্থ করলো সে। সেই সাথে অবাক ও হলো নিজেকে রুমে দেখে।

" আ ,, আমি এখানে কিভাবে আসলাম?

"পিটার নিয়ে এসেছে তোমাকে।

" পিটার এর নাম শুনতেই চমকে উঠলো আবারও পাশে তাকাতেই দেখলো পিটার দারিয়ে আছে সাথে ঋদ্ধ ও আছে।

"তুমি নাকি বাগানে অজ্ঞান হয়ে পরেছিলে। পিটার বেলকনি থেকে তোমায় দেখতে পেয়েই রুমে নিয়ে এসেছে।

তুমি তো সহজে ভয় পাও না অ্যানি তাহলে আজ কি হলো?

অ্যানি একটা ঢোক গিললো --

" আব ম্যাম জানিনাহ হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠলো আরকি তাই হয়তো ,,

"হুম তুমি বরং রেস্ট করো।

আমি আছি তোমার পাশে ঋদ্ধ পিটার তোমরা ঘুমিয়ে পরো।

" না ম্যাম আমার জন্য শুধু শুধু হয়রানি হলো আপনাদের।

"এসব কি বলছো অ্যানি তুমি তো আমার ছোট বোনের মতো।

তোমার জন্য এটুকু করতেই পারি আমি।

অ্যানিকে মেডিসিন খাইয়ে শুইয়ে দিলো মেহেরিন।বেশ কিছুক্ষন পর অ্যানিকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে কাথা টেনে এসি লো করে দিলো তারপর সে নিজের রুমে চলে গেলো।

মেহেরিন রুম থেকে বেরোতেই অ্যানি ধপ করে উঠে পরলো শোয়া থেকে। এখনো তার শরীর কাপছে পাশে রাখা গ্লাস থেকে একগ্লাস পানি খেলো সে।

আবারও শুয়ে পরলো কিছুক্ষণ পরেই চোখ থেকে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো নির্বিশেষে তা মুছে ফেললো সে।

---------------------------------

সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিক দিনের মতোই অ্যানি গেলো সবার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করতে।কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হলো পিটার।

পিটারকে দেখেই হাত থেমে গেলো অ্যানির টেরা চোখে তাকালো তার দিকে দেখলো পিটারও তার দিকেই চেয়ে আছে সাথে সাথে চোখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো সে।

" কফি ,,

পিটার বলার সাথে সাথেই ফ্লাক্স থেকে একটা গ্লাস এ কফি ঢেলে দিলো অ্যানি তবুও একবারো তার দিকে তাকালো না।

পিটার কফির কাপ নিয়ে সোফায় বসলো তবে তার দৃষ্টি তখনও অ্যানির দিকে।কিছুক্ষণ পর আবারও সে রান্নাঘরে উপস্থিত হলো।

আবারও অ্যানির হাত থেমে গেলো।

"পা ,, পানি ,,

অ্যানি গ্লাসে পানি দিলো ,, পিটার বেশ অসহায় বোধ করলো।

" আমার তোমার সাথে কথা আছে।

অ্যানি এবার সোজাসুজি পিটার এর দিকে তাকালো চোখমুখ শক্ত করে বলে উঠলো --

"একজন খুনির সাথে আমার কোনো কথা থাকতে পারেনা।

আহত চোখে তাকালো পিটার অ্যানির দিকে।

তবে অ্যানি সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকালো না চোখ নামিয়ে নিজের কাজ করতে থাকলো।

" প্লিজ অ্যানি একবার আমার কথাটা শোনো।

তবে অ্যানি কোনো প্রতিক্রিয়া জানালো না।

"ওকে তোমার আমার কথা শুনতে হবে না। তবে আমার এসব কাজে স্যার এর কোনো হাত নেই তাই স্যারকে ভুল বুঝোনা তুমি।আর ম্যামকে বলার দরকার নেই তিনি কষ্ট পাবেন ভুল বুঝবেন স্যারকে।

পিটার আর একমুহুর্ত দারালো না চলে গেলো সেখান থেকে।

সে চলে যেতেই অ্যানির হাত আবারও থেমে গেলো তার চোখ ভিজে উঠলো কিছুটা।

পাঁচজন একসাথে ব্রেকফাস্ট করে নিলো।মেহেরিন এসেই অ্যানিকে বকলো কারন সে অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্না করেছে।তার কথা একটা দিন আমাকে ডেকে দিলেই তো হতো।

তবে অ্যানি সেসব কানে তুললো না।

ব্রেকফাস্ট করে মেহেরিন নিজের অফিসে চলে গেলো।অ্যানি গেলো মায়রাকে নিয়ে তার কিন্ডারগার্টেন এ।ঋদ্ধ আজ বাসাতেই থাকবে কারন তার আজ কোনো অপারেশন নেই হয়তো সারাটাদিন গেম খেলেই কাটাবে সে আর পিটার অফিসের কাজে বাহিরে গেলো।

---------------------------------

অ্যানি মায়রাকে স্কুলে পাঠিয়ে আবারও ফিরে আসলো কারন মেহেরিন একটা ফাইল রেখে গেছে।

সে ফাইল নিয়ে বেড়িয়ে আসতেই ঋদ্ধ তাকে ডাকলো।

" অ্যানি!

অ্যানি দারিয়ে পরলো,

"জী স্যার কিছু বলবেন?

" হুম বসো।

"অ্যানি বসলো।

বিজ্ঞাপন

"দেখো, মেহেরিন তোমাকে নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসে।

আমিও ঠিক তেমনই তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আর পিটার—তোমরা দুজনই আমার আর মেহেরিনের কাছে ছোট ভাই-বোনের মতো। আর মায়রার কাছে তো তুমি তার আরেক মা।

ঋদ্ধ একটু থেমে অ্যানির দিকে তাকাল।

"তাই আমাদের জীবনে তোমার গুরুত্ব অনেক বেশি। আর ঠিক একইভাবে পিটারেরও।

অ্যানি বেশ অবাক হয়ে ঋদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইল।

এতদিনে ঋদ্ধের সঙ্গে তার যত কথা হয়েছে, প্রায় সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল মায়রা কিংবা মেহেরিন। অথচ আজ হঠাৎ করে ঋদ্ধ কেন তাদের দুজনের গুরুত্বের কথা বলছে, কেনই বা পিটারকে এভাবে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে—অ্যানি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না।

ঋদ্ধের কথাগুলোর আড়ালে যেন অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।

কিন্তু সেই অর্থটা কী, অ্যানি কিছুতেই ধরতে পারল না।

"পিটার তোমায় হয়তো বলেছে তার এই অপরাধের পেছনে আমার কোনো হাত নেই তবে তা সম্পুর্ন মিথ্যা বরং এর সবকিছুই আমার জানা।

চমকে উঠলো অ্যানি বিস্ময় নিয়ে ঋদ্ধ র দিকে চেয়ে আছে।

ঋদ্ধ হাসলো ,

" চলো তোমায় একটা গল্প শোনাই।

"একটা ছেলের বয়স তখন সবে সতেরো। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে একটা দশ বছরের ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে তার দেখা হতো। প্রথমদিকে শুধু দেখা-সাক্ষাৎই ছিল, কিন্তু একদিন হঠাৎ তাদের মধ্যে কথা হয়ে গেল।

তারপর থেকেই যেন একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল দুজনের মধ্যে। নিয়ম করে প্রতিদিনই তাদের দেখা হতো, কথা হতো। ছেলেটা ছোট্ট মেয়েটাকে নিজের বোনের মতোই দেখত। স্কুলে যাওয়ার সময় কখনো চকলেট নিয়ে গেলে সেটা মেয়েটার জন্যই থাকত। আর মেয়েটাও তাকে ভীষণ ভালোবাসত—একেবারে নিজের ভাইয়ের মতো।

প্রতিদিন দেখা হলেই কতশত গল্প জমা থাকত তার! কখনো স্কুলের গল্প, কখনো বান্ধবীদের গল্প, আবার কখনো একেবারেই অর্থহীন কোনো ছোট্ট কথা—তবুও মেয়েটার কাছে সেসব গল্প বলার জন্য তার প্রিয় ভাইয়াটাই ছিল সবচেয়ে আপন মানুষ।

এভাবেই কেটে গেল প্রায় তিন মাস। প্রতিদিনের সেই ছোট্ট দেখা আর কথাগুলো দুজনেরই অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ একদিন মেয়েটাকে আর দেখা গেল না।

প্রথম দিন ছেলেটা তেমন কিছু ভাবল না। মনে হলো, হয়তো অসুস্থ হয়েছে কিংবা কোনো কারণে স্কুলে যায়নি।

কিন্তু পরের দিনও যখন মেয়েটাকে দেখা গেল না, তখন একটু অস্বস্তি হলো তার। এরপর একে একে সাতটা দিন কেটে গেল।

মেয়েটা আর এলো না।

এবার ছেলেটার মনটা সত্যিই অস্থির হয়ে উঠল। প্রতিদিন যে ছোট্ট মেয়েটা তাকে দেখলেই ছুটে এসে কত কথা বলত, সে হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল—এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে সামলাতে পারল না সে।

মেয়েটা একদিন গল্প করতে করতে তার বাসার কথা বলেছিল। সেই কথাগুলো মনে করে ছেলেটা এক বিকেলে তার বাসার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।

মনের ভেতর তখন একটাই চিন্তা—

মেয়েটার কী হয়েছে? কেন সে সাতদিন ধরে আর আসছে না?

তারপর --

" তারপর?

অ্যানি সরল চোখে জিজ্ঞেস করলো।

"বাসায় গিয়ে ছেলেটা যা জানতে পারল, তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

মেয়েটা আর নেই।

মাত্র দশ বছরের ছোট্ট মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে।

কথাটা শুনে ছেলেটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে মেয়েটা প্রতিদিন হাসিমুখে তার কাছে ছুটে আসত, কতশত গল্প করত, চকলেট পেলে আনন্দে চোখ দুটো চকচক করে উঠত—সেই মেয়েটাই আজ আর নেই!

ধীরে ধীরে সে জানতে পারল, মেয়েটা দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে ভয়াবহ বুলিংয়ের শিকার হচ্ছিল। স্কুলের কয়েকজন বাচ্চা তাকে নানাভাবে অপমান করত, কটু কথা বলত। এমনকি তাদের কিছু অভিভাবকও মেয়েটাকে নিয়ে নানা ধরনের কথা বলত।

মেয়েটার একজন সৎ মা ছিলেন, যিনি তাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। মেয়েটাও একসময় তাকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু স্কুলের অন্য বাচ্চারা তাকে নানা কথা বলে ভুল বোঝাতে শুরু করেছিল। তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে ছোট্ট মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের সৎ মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে শুরু করে।

অথচ সেই মানুষটাই হয়তো তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।

দিনের পর দিন অপমান, কটু কথা আর মানসিক চাপ সহ্য করতে করতে একসময় মেয়েটা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত সেই ছোট্ট হৃদয়টা আর এতটা কষ্ট সহ্য করতে পারেনি।

সে নিজের জীবন শেষ করে দেয়।

সবকিছু জানার পর ছেলেটা যেন পাথরের মতো হয়ে গেল। অনেকক্ষণ একই জায়গায় নিঃশব্দে বসে রইল সে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল ছোট্ট মেয়েটার হাসিমুখটা।

সেদিন আর কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেনি সে। নিঃশব্দে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

তারপরই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট কান্না হয়ে বেরিয়ে এলো।

অঝোরে কাঁদতে লাগল ছেলেটা।

তার নিজের কোনো ভাই-বোন ছিল না। অথচ এই ছোট্ট মেয়েটাকে সে কখন যে নিজের আপন বোনের মতো ভালোবেসে ফেলেছিল, নিজেও বুঝতে পারেনি।

মেয়েটার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত, তার বলা প্রতিটা ছোট্ট কথা, হাসিমুখ—সবকিছুই বারবার মনে পড়ছিল।

এভাবেই প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল।

ধীরে ধীরে ছেলেটা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল। স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা—সবই আগের মতো চলতে লাগল।

শুধু একটা জিনিস আর কখনো আগের মতো হলো না।

প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সেই জায়গাটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেটা একবার হলেও থেমে যেত।

যেখানে একসময় দাঁড়িয়ে থাকত একটা ছোট্ট মেয়ে—

আর তাকে দেখলেই মিষ্টি হেসে বলত,

"ভাইয়া!

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস