বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ৪৩

🟢

ঋদ্ধ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখের কোল বেয়ে একফোঁটা গরম জল গড়িয়ে মাস্ক ভিজিয়ে দিলো। কিন্তু সে হার মানলো না। নিজের জাদুকরী গ্লাভস পরা হাত দিয়ে মায়রার নিস্তেজ হয়ে যাওয়া ছোট্ট হার্টটাকে ওপেন মেসেজ করতে লাগলো সে।

​"না! কিউটিপাই... তুমি এভাবে তোমার পাপাকে ফাঁকি দিয়ে যেতে পারো না! ঋদ্ধর কণ্ঠ ওটির শান্ত পরিবেশ ভেদ করে হাাহাকার করে উঠলো।

"খোলো চোখ! শোনো আমার কথা কিউটিপাই! তোমার মাম্মা বাইরে অপেক্ষা করছে... কাম অন, ফাইট!

​পাগলের মতো মায়রার ছোট্ট বুকে হাতের তালু দিয়ে ম্যাসাজ করে চললো ঋদ্ধ। বারবার ইলেকট্রিক প্যাক দিয়ে ইন্টারনাল শক দেওয়া হলো—একবার, দু'বার, তিনবার!

​কিন্তু মনিটর তখনও নিথর! সোজা সাদা দাগ ফুটেই আছে!

​টিমের সবাই আশা ছেড়ে দিয়ে ঋদ্ধর দিকে করুণ চোখে তাকালো। ঋদ্ধ হাঁপাতে হাঁপাতে মায়রার মুখের দিকে তাকালো। তার মেহুপাখির নিষ্পাপ কোলটা কি আজ সত্যি খালি হয়ে যাবে? তার ভালোবাসা কি হেরে যাবে?

সে কি বাবা হিসেবে ব্যার্থ?

​"প্লিজ আল্লাহ, আমার প্রাণটা নিয়ে নাও... কিন্তু আমার কিউটিপাইকে ফিরিয়ে দাও! ঋদ্ধ অশ্রুসিক্ত চোখে মায়রার কপালে হেলে পড়ে অস্ফুটে ডাকলো,

"সোনা পাখি... মাম্মা পাপাকে ছেড়ে যেও না...

​ঠিক তখনই, চারপাশের নিস্তব্ধতা চিরে অলৌকিক কিছুর মতো একটা ক্ষীণ আওয়াজ হলো—

​'...বীপ!

​মনিটরের ফ্ল্যাট লাইনটা মৃদু কেঁপে উঠলো!

​ঋদ্ধর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে ব্যাকুল হয়ে মনিটরের দিকে তাকালো।

​'...বীপ... বীপ... বীপ...

​সোজা রেখাটা আবার তরঙ্গের রূপ নিল! মায়রার নিজস্ব হার্ট স্পন্দন ফিরে পেয়েছে! আস্তে আস্তে পাল্স রেট স্বাভাবিকের দিকে এগোতে লাগলো, রক্তক্ষরণও ঋদ্ধর নিখুঁত সেলাইয়ের কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে!

​ওটির জুনিয়র ডাক্তাররা আনন্দে চিৎকার করে উঠলো,

"মিরাকল স্যার! হার্ট বিট ব্যাক করেছে! পেস মেকার রেসপন্স করছে!

​ঋদ্ধ ধপ করে ওটির পাশের একটা বেঞ্চে বসে পড়লো। তার হাত দুটো তখনও কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক স্বর্গীয় স্বস্তি। এক চরম পরাজয়ের মুখ থেকে সে তার মেয়েকে ছিনিয়ে এনেছে! মাস্কটা খুলে ঋদ্ধ মায়রার রক্তিম কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল,

"ধন্যবাদ আমার সোনা পাখি আমার কিউটিপাই... পাপাকে জিতে নেওয়ার জন্য।

​দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে যখন ওটির ভারী দরজাটা খুললো, মেহেরিন ছুটে এলো। ঋদ্ধর ক্লান্তি মাখা, কিন্তু চোখে আনন্দের জল দেখে মেহেরিন থমকে গেল।

​ঋদ্ধ এগিয়ে এসে মেহেরিনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গাল বেয়ে হেসে উঠলো—

"আমাদের কিউটিপাই জিতে গেছে মেহুপাখি! তোমার ঋদ্ধ তার কথা রেখেছে। আমাদের মায়রা একদম সেফ!

​মেহেরিন আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না, ঋদ্ধর বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।

আর ঋদ্ধও নিজের ক্লান্ত দুই বাহু দিয়ে পরম ভালোবাসায় আগলে নিলো তার জীবনের দুটো অমূল্য রতনকে।

----------------------------------

​দেখতে দেখতে আর একটা মাস পেরিয়ে গেছে।

​সময়ের গতিতে মায়রার অপারেশনের সেই থমথমে, ভীতিকর দিনগুলো এখন শুধুই এক অতীত স্মৃতি। মেহেরিন এবং ঋদ্ধ র পরিবারের সবাই বাংলাদেশে ফিরে গেছে।

চার বছরের মিষ্টি মায়রা এখন আলহামদুলিল্লাহ পুরোপুরি সুস্থ! তার গালের সেই লালচে আভা আর খিলখিল হাসির শব্দে পুরো বাড়িটা আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আগের মতোই প্রতিদিন সকালে ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে অ্যানির সাথে চঞ্চল পায়ে স্কুলে চলে যায় সে। মায়রাকে এভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখতে পারাটা যেন তাদের পুরো পরিবারের কাছে এক পরম নিয়ামত।

​মেহেরিনের দিনগুলোও এখন বেশ ব্যস্ততায় কাটে।

একাধারে পিটারের সাথে অফিশিয়াল কাজের তদারকি, অন্যদিকে সংসার আর ঋদ্ধ-মায়রার খেয়াল রাখা—সবটাই সে সামলে নেয় দক্ষ হাতে।

মেহেরিন যখন ল্যাপটপে কাজের মাঝেই ডুব দেয়, কিংবা মায়রার জন্য কিছু তৈরি করতে রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকে, তখনই শুরু হয় আসল নাটক!

​কারণ, ডাক্তার ঋদ্ধর দিনরাতের একটাই মূল কাজ—তার মেহুপাখিকে নানা বাহানায় জ্বালানো!

​আগেও যেমন মেহেরিনকে পাগল করে রেখে ভালোবাসার আবেশে ভাসিয়ে রাখতো, এখনো তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।

কাজ থেকে ফিরেই মেহেরিনকে পেছনে জড়িয়ে ধরে চিবুকে মুখ ঘষা, মেহেরিন যখন গম্ভীর মুখে ফাইল দেখতে থাকে তখন আচমকা ল্যাপটপ বন্ধ করে মেহেরিনের কোলে মাথা গুঁজে দেওয়া, কিংবা রান্নাঘরে কাজের মাঝে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আবদার জুড়ে দেওয়া—এসব যেন ঋদ্ধর নিত্যদিনের খেলা।

​মেহেরিন হয়তো কিছুটা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে ওঠে,

"ঋদ্ধ, ছাড়ো না! কাজের প্রেসার আছে তো, বুঝছো না কেন?

​ঋদ্ধ তখন তার মেহুপাখির চোখে চোখ রেখে দুষ্টুমি ভরা এক গাল হেসে উত্তর দেয়, "তো তোমার কাজের মাঝে বাধা দেওয়াটাই তো আমার প্রাইম ডিউটি, মেহুপাখি!

এই ডাক্তারকে সুস্থ রাখতে হলে তোমাকে শুধুই আমার দিকে খেয়াল দিতে হবে, অন্য কোনো কাজে নয়।

বিজ্ঞাপন

​মেহেরিন চাইলেও আর রাগ করে থাকতে পারে না। ঋদ্ধর এই পাগলামি, এই আবদার আর ভালোবাসার তীব্রতা তার হৃদয়কে তোলপাড় করে দেয়। সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে গিয়ে মেহেরিনের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ভালোবাসার মিষ্টি হাসি। ঝগড়া, অভিমান আর অনুরাগের এই চেনা গণ্ডিতে তাদের ছোট্ট সংসারটা এখন স্বর্গের চেয়েও বেশি সুন্দর।

ঠিক তেমনি আজকের রাতটা। হালকা নীলচে আলোয় ঘরের পরিবেশটা বেশ শান্ত আর মায়াময়।

মেহেরিন ল্যাপটপে নিজের অফিশিয়াল কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিল, কিন্তু ঋদ্ধ কি আর তা হতে দেয়?

সে এখন মেহেরিনের কোলজুড়ে মেজাজ ছড়িয়ে শুয়ে আছে, যেন মেহেরিনের কোলটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক বিছানা।

মেহেরিনের নরম আঙুলগুলো ঋদ্ধর ঘন চুলের মাঝে বিলি কেটে দিচ্ছে।

​"শোনো না ঋদ্ধ?

মেহেরিন হালকা নিচু গলায় ডাকলো।

​"হুম, বলো পাখি...

বেশ আদুরে আর নেশাক্ত কণ্ঠে জবাব দিল ঋদ্ধ। চোখ দুটো বুজেই মেহেরিনের হাতের পরশ উপভোগ করছে সে।

​"আচ্ছা, অ্যানি আর পিটারের কি হয়েছে বলো তো?

​ঋদ্ধ এক চোখ একটু খুলে তাকালো,

"কি হবে?

​"না মানে, আমি সেই মায়রার সার্জারির আগে থেকেই খেয়াল করছি...

দুজন দুজনকে কেমন যেন এড়িয়ে চলে! আগের মতো সেই খুনসুটি নেই, এক টেবিলে বসলেও চোখ তুলে তাকায় না। বিষয়টায় কেমন একটা দূরত্ব এসে জমেছে, যা আমার একদম ভালো লাগছে না। তুমি কিছু একটা করো না ঋদ্ধ!

​ঋদ্ধ মেহেরিনের পেটে মুখ ঘষে একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললো,

"উমমম... আমার মেহুপাখি যখন বলেছে, তখন তো কিছু একটা করতেই হয়!

​মেহেরিন বেশ খুশি হয়ে উঠলো। ঋদ্ধর গালে একটা হালকা চিমটি কেটে বললো,

"কি করবে তুমি?

​ঋদ্ধ সোজা হয়ে বসে একদম স্বাভাবিক গলায় বলে উঠলো,

"ওদের বিয়ে দিয়ে দেবো।

​"হোয়াট!"

একপ্রকার চিৎকার করে উঠলো মেহেরিন। "কিসব বলছো তুমি, ঋদ্ধ? মাথা ঠিক আছে তোমার?

​ঋদ্ধ মেহেরিনের গাল দুটো হাত দিয়ে ধরে শান্ত গলায় বললো,

"ঠিকই তো বললাম, পাখি! ওরা আসলে এক মারাত্মক 'প্রেম রোগে' ভুগছে, কিন্তু বোকাদুটো নিজেরাই সেটা বুঝতে পারছে না। এড়িয়ে চলাটা তো ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ!

​মেহেরিন এবার মুখটা বেশ গম্ভীর করে ফেললো। হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে সন্দেহী চোখে তাকালো,

"তা তুমি কিভাবে জানলে ওরা প্রেম রোগে ভুগছে? কই, আমি তো কিছু বুঝলাম না! তুমি কি অন্তর্যামী?

​ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক দুষ্টুমি ভরা চতুর হাসি। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আচমকা মেহেরিনকে একদম পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলো!

​মেহেরিন চমকে উঠে ঋদ্ধর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,

"আরে! আরে! করছোটা কি, ঋদ্ধ? পড়ে যাবো তো আমি! ছাড়ো!

​ঋদ্ধ মেহেরিনের ভীতিমাখা চঞ্চল মুখের দিকে চেয়ে থোড়াই পরোয়া করলো। এক পা, দু পা ফেলে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে নিচু গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো—

​"ডক্টর কে?

​মেহেরিন চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে অস্ফুটে বললো,

"তুমি...

​"তাহলে কোন রোগের কি লক্ষণ, সেটা কি ডক্টর ছাড়া অন্য কেউ বেশি জানবে, বলো?

বলেই ঋদ্ধ মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপ মারলো!

​মেহেরিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঠাঁই হলো বিছানার নরম তুলতুলে বালিশে। এক মুহূর্তের ব্যবধানে ঋদ্ধ নিজের পুরো ভার মেহেরিনের ওপরে ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়লো। দুই পাশে হাত রেখে মেহেরিনকে একপ্রকার বন্দী করে ফেললো তার ভালোবাসার আবেষ্টনীতে। মেহেরিনের বুকের ধুকপুকানি তখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, ঋদ্ধর গভীর দৃষ্টি মেহেরিনের ঠোঁটে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে...

ঋদ্ধর উন্মাদের মতো ভালোবাসার ভালোবাসায় মেহেরিন নিজেকে সমর্পণ করে দিল। ঘরের হালকা নীলচে আলোয় ঋদ্ধর উন্মুক্ত চওড়া বুকের উত্তাপ মেহেরিনের পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়লো।

ঋদ্ধ পরম আদরে মেহেরিনের নগ্ন কাঁধে ও গলায় নিজের কামুক ঠোঁটের ছোঁয়া দিতেই মেহেরিনের কামাবেশে এক তীব্র শিহরণ জেগে উঠলো।

​সে লাজুক হেসে ঋদ্ধকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ঋদ্ধ তার মেহুপাখির শরীরের প্রতিটি ভাঁজে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এক মাতাল ভালোবাসায় মেতে উঠলো।

মেহেরিনের মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস আর ঋদ্ধর তৃষ্ণার্ত ভালোবাসার মিলনে আবারও সাক্ষী হয়ে রইল তাদের স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র ভালোবাসার বন্ধন।

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস