মেহেরিন ফ্রেশ হয়ে আসলেই ঋদ্ধ ওয়াশরুমে ঢুকলো।
ঋদ্ধ ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হতেই মেহেরিনের চোখ গিয়ে পড়লো ওর ওপর।
মেহেরিন তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছছিল। ড্রয়ার থেকে হালকা পারফিউম নিয়ে গলায় ছিটিয়ে দিতেই ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল এক মাদকতাময় সুবাস।
ঋদ্ধ তোয়ালে দিয়ে নিজের চুল মুছতে মুছতে মেহেরিনের পেছনের দিকে এগিয়ে এলো।
আয়নার কাঁচে দুজনের চোখাচোখি হতে মেহেরিন একটু হেসে চোখ নিচু করে ফেলল।
"এভাবে ভেজা চুলে দাঁড়ালে পুরো ঘর তো জলে ভেসে যাবে, পাখি ,,
" নরম কণ্ঠে বলল ঋদ্ধ।
মেহেরিন ঘুরে দাঁড়িয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল, "জলে ভাসলে সাঁতার কাটবে,
সমস্যা কী?
ঋদ্ধ তোয়ালেটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে এক পা এগিয়ে এসে একদম মেহেরিনের কাছে এসে দাঁড়ালো।
মেহেরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে মেহেরিনকে নিজের দিকে আরও একটু টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"সাঁতার তো এমনিতেও কাটি...
তোমার এই গভীর চোখে হারিয়ে গেলে যে সাঁতারটাও ভুলে যাই!
মেহেরিন সামান্য লজ্জা পেয়ে ঋদ্ধর বুকে হাত রেখে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ঋদ্ধ মেহেরিনের ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে ওর ঘাড়ে কানের কাছে মুখ ঘষে বলল, "আজ আর পালানোর কোনো রাস্তা নেই পাখি ,,
" উফ ,, ঋদ্ধ কি শুরু করলে মায়রা উঠে যাবে তো ,,
"আমার কিউটিপাই ঘুমাচ্ছে আর উঠে পরলেও সে তার মাম্মা পাপার রোমান্স এ কখনো বাধা দেবে না পাখি ,,
বলে নিজের মুখটা মেহেরিন এর কম্পিত ঠোটের দিকে এগিয়ে নিতেই , ,
মেহেরিন ওই অবস্থায় নিজের মুখটা সরিয়ে নিলো ,,
" কি শুরু করলে আন্টি নিচে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য ভুলে গেলে ,,?
"ম্যাম ,,
অ্যানির কণ্ঠ শুনে তড়িঘড়ি করে নিজেকে ঋদ্ধের কাছ থেকে সরিয়ে নিল মেহেরিন।
ঋদ্ধও এক পা পিছিয়ে এলো। তবে তার মুখভঙ্গি স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল, সে ভীষণ বিরক্ত। তা দেখে মেহেরিন ঠোঁট টিপে মৃদু হেসে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে ঋদ্ধ কটমট করে তাকাল তার দিকে।
"ম্যাম, বেবিকে নিতে এসেছি।
মায়রা ছোটবেলা থেকেই অ্যানির সঙ্গেই বেশি থাকে। কারণটাও খুব স্বাভাবিক। মেহেরিন দিনের অধিকাংশ সময় নিজের কাজেই ডুবে থাকত। ফলে মেয়েকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সবসময় সম্ভব হতো না। অবশ্য সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো পুরোপুরি মায়রার জন্যই রাখত সে।
তবে মায়রার তিন বছর বয়স থেকে রাতের বেলা সে অ্যানির কাছেই ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে। কারণ মেহেরিন গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের আলো জ্বালিয়ে কাজ করত। গত দেড় বছর ধরে প্রায় প্রতিরাতই মায়রা অ্যানির সঙ্গেই ঘুমায়। অবশ্য মাঝে মাঝে, নিজের ইচ্ছায় কিংবা মায়রার জেদের কাছে হার মেনে, মেহেরিন তাকে নিজের কাছেই রেখে দিত।
মেহেরিন শান্ত গলায় বলল,
"হুম, অ্যানি। নিয়ে যাও তোমার বেবিকে। অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
"ওকে, ম্যাম।
অ্যানি পরম মমতায় ঘুমন্ত মায়রাকে কোলে তুলে নিল। তারপর ধীর স্বরে বলল,
"ম্যাম, স্যার ,,
আপনাদের নিচে ডাকছেন।
মেহেরিন নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
---------------------------------------------------------------------
নিচে নেমেই মেহেরিন দেখতে পেল, ডাইনিং টেবিলে বাসার সবাই উপস্থিত।
অ্যানি আর পিটার আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিজেদের রুমে চলে গেছে। এখন টেবিলে আছেন মি. রিচার্ড, আফিয়া চৌধুরী, ঋদ্ধ আর মেহেরিন।
খাবার খেতে খেতেই আফিয়া চৌধুরী বিরক্তির সুরে বললেন,
"কী দরকার ছিল বিয়ের একটা দিনও না পেরোতেই মেহেরিনকে নিয়ে অফিসে যাওয়ার? নতুন বউদের খুব সহজেই নজর লাগে। তাই তো বিয়ের পর কয়েকটা দিন তাদের বাড়ির বাইরে যাওয়া বারণ।
ঋদ্ধ হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
"উফ, মম! তুমিও না!
একেবারে পুরোনো যুগের মানুষের মতো কথা বলা শুরু করেছ। এখন আর এসব কেউ মানে নাকি?
"হ্যাঁ, সেই তো!
তুমি না মানলেও আমি মানি।
আফিয়া চৌধুরী গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন।
মেহেরিন আর মি. রিচার্ড মা-ছেলের কথোপকথনের মাঝে একদমই নাক গলালেন না। দুজনেই নীরবে নিজেদের খাবার খেতে ব্যস্ত রইলেন।
হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই ঋদ্ধ বলল,
"ওহ, মম! একটা কথা বলতে ভুলেই গেছি।
তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই তাকাল তার দিকে।
মেহেরিনও বিস্মিত চোখে ঋদ্ধের দিকে চাইল। ঠিক কোন কথার কথা বলতে যাচ্ছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
ঋদ্ধ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল,
"বেশ কিছুদিন হলো আমরা বাংলাদেশে আছি। এবার আমার মনে হয় আমেরিকায় ফিরে যাওয়া উচিত। কিউটিপাইয়ের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। আমি চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর অপারেশনটা করিয়ে ফেলতে। আর মেহেরিনের অফিসেও বেশ কিছু সমস্যা চলছে। ওকেও নিজের কোম্পানির দায়িত্ব সামলাতে হবে।
" উপস্থিত সকলে সায় জানালো কারন মায়রাকে নিয়ে কেউ কম্প্রোমাইজ করতে রজি না।
ঋদ্ধের কথা শুনে মেহেরিন বিস্ময়ে থমকে গেল।
তার কোম্পানিতে যে সমস্যা চলছে, সে বিষয়ে তো সে ঋদ্ধকে কিছুই বলেনি। এমনকি মায়রার অপারেশন নিয়েও এই সপ্তাহে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি তাদের। অথচ ঋদ্ধ সবকিছুই নীরবে খেয়াল রেখেছে।
এসব ভাবতেই অজান্তেই মেহেরিনের চোখ জলে ভরে উঠল।
সেই মুহূর্তে তার মনে হলো,
মায়রার বাবা হিসেবে ঋদ্ধর চেয়ে যোগ্য মানুষ হয়তো আর কেউ হতে পারে না।
--------------------------------
তাহসিন কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা তুলির বসের অফিস কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে তুলি আর তার বস নিজেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তে মগ্ন ছিল।
কোনো রকম পূর্ববার্তা ছাড়াই তাহসিন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দুজনই অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
তুলি আর তার বস তাড়াহুড়ো করে নিজেদের পোশাক ঠিক করতে লাগল।
লোকটি রাগে গর্জে উঠল --
"হোয়াট ননসেন্স!
এত বড় সাহস!
আমার পার্সোনাল রেস্টরুমে আমার অনুমতি ছাড়া কে ঢুকতে দিল তোমাকে? গার্ডস! গার্ডস!
তাহসিনকে দেখে তুলির মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল --
"এ কী, তাহসিন! তোমার লজ্জা করে না? আমার পিছু পিছু এখান পর্যন্ত চলে এসেছ? ডিভোর্স পেপার পাঠানোর পরও তোমার এতটুকু আত্মসম্মান জাগল না?
তাহসিন বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল --
"স্টপ! তুই একটা বেশ্যা। আর তোর মতো একজনের পেছনে ঘোরার মতো রুচি তাহসিন আহমেদের কোনোদিন ছিল না। পাঁচ বছর আগে যদি তোর এই লোভী আর কুৎসিত চেহারাটা দেখতে পেতাম, তাহলে কোনোদিনও মেহেরিনের মতো নিষ্পাপ একটা মেয়েকে আর আমার দুধের শিশুকে ঠকাতাম না!
কথা শেষ করেই হাতে থাকা কাগজগুলো ছুড়ে মারল তুলির মুখের ওপর।
"এই নে, তোর ডিভোর্স পেপার। আজ থেকে আমার জীবনে তোর কোনো অস্তিত্ব নেই। আর কোনোদিন এই নোংরা মুখ নিয়ে আমার সামনে আসবি না।
এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না তাহসিন। ঘুরে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
তুলি হতভম্ব হয়ে শুধু তাহসিনের চলে যাওয়া দেখল। তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল --
যে মানুষটা এতদিন চুপচাপ সব সহ্য করেছে, সে হঠাৎ এত সাহস পেল কোথা থেকে?
অন্যদিকে তুলির বসও বুঝে গেছে, এই লোকটাই তুলির স্বামী ছিল।
ব্যক্তিগত মুহূর্তে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা পড়ে যাওয়ায় তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল।
----------------------------------
তাহসিন আবারও হাসপাতালের দরজায় এসে দাঁড়াল। দৃঢ় কণ্ঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
"চলো, আম্মা।
তাহসিন এর মা তখন নাতিকে কোলে তুলপ আদর করছিলেন।
অবাক হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন তিনি।
"কোথায় যাব, বাবা?
তাহসিন গভীর শ্বাস নিয়ে উত্তর দিল,
"বাবা আর বোনের কাছে।
কথাটা শুনে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন।
"কী বলছিস, বাবা?
তোর বাবা আর বোন তো আমাদের মুখই দেখতে চায় না। কোন মুখে যাব তাদের সামনে?
তাহসিন মায়ের হাত শক্ত করে ধরে শান্ত স্বরে বলল,
"তুমি একদম চিন্তা করো না, আম্মা। তুলিকে আমি ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছি।
আর দরকার হলে বাবার পায়ে পড়ে থাকব, তবুও তাঁর ক্ষমা নিয়ে তবেই ফিরব।
আমার শুধু নিজের পরিবারকে ফিরে চাই।
ছেলের চোখের অনুশোচনা আর দৃঢ়তা দেখে মায়ের বুকটা হালকা হয়ে এলো।
তিনি আর কোনো কথা বললেন না। নাতির সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন।
তারপর দু'জনে একসঙ্গে হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে রওনা দিলেন
একটি ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর আশায়।