বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ৩৭

🟢

দেখতে দেখতে আরও এক সপ্তাহ কেটে গেল। এই এক সপ্তাহে মায়রা তার মাম্মা-পাপা, গ্র্যানি আর দাদুর সঙ্গে দারুণ আনন্দে সময় কাটিয়েছে। আজ রাত ১০টার ফ্লাইটে তারা আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।

"গ্র্যান মম, মায়রা তোমাকে অনেক মিস কলবে...

আফিয়া চৌধুরীর চোখ জলে ভরে উঠল। মাত্র কয়েকদিনেই ছোট্ট মেয়েটার প্রতি তার অদ্ভুত এক মায়া জন্মেছে।তিনি ভাবতেই পারেন না এই বাচ্চা টাকে তিনি তার ময়ের কাছ থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। তিনি মায়রাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন।

"গ্র্যানিও তার মায়রা বেবিকে অনেক মিস করবে।

কথাটা বলেই তিনি পরম মমতায় মায়রার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলেন।

"বাহ! মায়রা কি শুধু তার গ্র্যানিকেই মিস করবে? তার দাদুকে মিস করবে না নাকি?

মন খারাপের ভান করে বললেন মি. রিচার্ড।

সঙ্গে সঙ্গে আফিয়া চৌধুরীর কোল থেকে নেমে পড়ল মায়রা। গুটি গুটি পায়ে হেঁটে সোফায় বসে থাকা মি. রিচার্ডের কাছে গিয়ে তার দুই গালে টুপ করে চুমু খেল।

"মায়লা তো তাল দাদুকে আলও বেশি মিচ কলবে!

মায়রার আধো আধো কথায় ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। মি. রিচার্ডও হেসে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলেন।

আজ তারও আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঋদ্ধর কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ঋদ্ধের কোনোদিনই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল না। গত দুদিন সে নিজের ইচ্ছায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিল অ্যাটেন্ড করায় মি. রিচার্ড ভেবেছিলেন, হয়তো এবার ছেলে ব্যবসার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু সেটা ছিল তার ভুল ধারণা।

আসলে তাহসিনকে নিজের অবস্থানটা বোঝাতেই এই কদিন অফিসে গিয়েছিল ঋদ্ধ।ঋদ্ধ হয়তো তাহসিনের ক্যারিয়ার তার কোম্পানি ধ্বংস করে দিতো যদি না মেহেরিন তাকে আটকাতো।মেহেরিন চায়নি প্রতিশোধ নিতে তবে ঋদ্ধ প্রতিশোধ নিয়েই ছেড়েছে অন্য উপায়ে। বাহ্যিক দিক থেকে হয়তো তাহসিনের কোনো ক্ষতি হয়নি কিন্তু ভেতর থেকে সে পুরোটা ভেঙে গেছে নিজের করা ভুল আর মেহেরিন এর সাথে কতোটা অন্যায় করেছে তা বুঝেছে।

উদ্দেশ্য পূরণ হতেই আবারও ব্যবসা থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিয়েছে ঋদ্ধ । ফলে সমস্ত দায়িত্ব আবারও এসে পড়েছে পিটার আর মি. রিচার্ডের কাঁধে।

তাই আপাতত তার বাংলাদেশেই থেকে যেতে হবে। তবে তিনি ইতোমধ্যেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন—সব দায়িত্ব গুছিয়ে নিয়ে একসময় স্ত্রীকে নিয়ে স্থায়ীভাবেই বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। কারণ ঋদ্ধ আর মেহেরিন তো আমেরিকাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।

শুধু দাদু আর গ্র্যানিকেই মিস করবে আমাদের করবে না মায়রা বেবি ,,

বলতে বলতে ভেতরে প্রবেশ করল মৈনাক, রূপসা আর মিহির মির্জা। তাদের দেখে মায়রার খুশি যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল।

ততক্ষণে মেহেরিন ঋদ্ধ, অ্যানি পিটার তাদের লাগেজ গুছিয়ে নিয়েছে।সেগুলো পরপর গাড়িতে তোলা হলো।

আজ সবাই এসেছে একটাই কারণে -- মেহেরিনদের সঙ্গে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাবে। বিদায়ের মুহূর্তটুকু একসঙ্গে কাটানোর জন্য কেউই এই শেষ সময়টা মিস করতে চায়নি।

--------------------------------

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে তাহসিনের জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন।

সেদিন বাবা আর বোনের পা ধরে ক্ষমা চাইলেও তাহসিনের বাবা এত সহজে তাকে ক্ষমা করতে রাজি হননি। অতীতের ক্ষতগুলো যে এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

কিন্তু সবকিছু বদলে যায়, যখন তাহসিন তার পাঁচ মাস বয়সী সন্তানটিকে বাবার কোলে তুলে দেয়। কাঁপা গলায় নিজের পরিণতির কথা, তুলির করা সব কুকীর্তির কথা এবং নিজের অনুতাপের কথা একে একে খুলে বলে। ছেলের চোখের অনুশোচনা আর নিষ্পাপ শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত আর মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেননি তিনি।

অন্যদিকে, তাহসিনের বোনেরও কোনো সন্তান ছিল না। তাই সে শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতো করে মানুষ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তবে তাহসিন দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দেয়, সে আর নতুন করে জীবন শুরএ করার কথা ভাববে না। নিজের সব ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে বাকি জীবন সে এই সন্তানকেই সঠিক মানুষ করে গড়ে তুলতে চায়।

---------------------------------

এদিকে তুলির জীবনও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি হয়েছিলো।

যে মানুষটিকে বিয়ে করে বিলাসবহুল জীবন কাটানোর স্বপ্ন সে দেখেছিল, পরে জানতে পারে লোকটি আগে থেকেই দুইবার বিবাহিত। শুধু তাই নয়, দুই সংসারে তার চারটি সন্তানও রয়েছে।

সেদিন তাহসিন যখন ডিভোর্সের কাগজ তুলির মুখের ওপর ছুড়ে মেরে তাকে ঘৃণাভরে অপমান করেছিল, সেই অপমান কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি তুলি। জেদ আর অন্ধ লোভে সে নিজের বসকে মাত্র দুদিনের মধ্যে তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে। প্রথমে লোকটি নানা অজুহাতে এড়িয়ে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়।

দুদিন পর তারা কাজি অফিসে পৌঁছায়। বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন। তুলির চোখে তখন নতুন জীবনের লোভ আর জয়ের উচ্ছ্বাস। কিন্তু তার বসের চোখে ছিল স্পষ্ট আতঙ্ক। আর সেই আতঙ্ক হিসেবে হাজির হয় তার দুই স্ত্রী আর সন্তানেরা।

কবুল বলার ঠিক আগমুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হন লোকটির দুই স্ত্রী।

তুলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথম স্ত্রী তার চুলের মুঠি ধরে একের পর এক চড় মারতে শুরু করেন। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী এগিয়ে এসে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করে সাথে তার পেটে প্রচন্ড জোরে লাথি মারে। চারপাশের মানুষের সামনে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তুলির সমস্ত অহংকার।

কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে অন্য জায়গা থেকে। তুলি জানতে পারে, যে কোম্পানির ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখে সে মোহগ্রস্ত হয়েছিল, তার কিছুই ওই লোকটির নিজের নয়। সব সম্পদ, ব্যবসা আর প্রভাব তার দুই স্ত্রীর।

রাগে-ক্ষোভে তুলি যখন লোকটির দিকে তেড়ে যায়, তখন সেও সবার সামনে তাকে একটি চড় মেরে বলে,

"বে*শ্যা,মা'গি কে বলেছিল আমার সঙ্গে এই সম্পর্ক করতে? নিজের স্বার্থের জন্য তুইও এসেছিলি, আমিও সুযোগ নিয়েছি। এখন নিজের পথ নিজে দেখ।

কথাগুলো বলেই তারা সবাই তাকে সেখানে ফেলে চলে যায়।

শূন্য হাতে, ভাঙা স্বপ্ন আর চরম অপমান নিয়ে কাজি অফিসের এক কোণে বসে থাকে তুলি। জীবনে প্রথমবারের মতো সে নিজের ভুলগুলোর গভীরতা উপলব্ধি করে। তবুও তাহসিনের কাছে ফিরে যাওয়ার সাহস তার হয়নি। কারণ সে জানত, তাহসিনের জীবনে তার জন্য আর কোনো ক্ষমা বা জায়গা অবশিষ্ট নেই।

তাহসিন তাকে দেখলে হয়তো নিজের হাতে খুন করবে।

তুলির নিজের বলতেও কেউ ছিলো না এক ছিলো মা সেও বেশকিছু বছর আগে মারা গেছে।তার কোনো ভাইবোন ও ছিলো না।তাই তাদের কাছে যাওয়ার ও কোনো উপায় ছিলো না তার।

সেদিনের পর থেকে তুলিকে আর কোথাও দেখা যায়নি। সে কোথায় গেছে, কী করছে কেউ জানে না। আর তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টাও কেউ করেনি।

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস