রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।
ঘুমিয়ে পড়েছে পুরো বাড়ি। কিন্তু আফিয়া চৌধুরীর চোখে আজ ঘুম নেই।
বিছানার এক কোণে বসে আছেন তিনি।
বারবার কানে ভেসে আসছে ঋদ্ধর বলা কথাগুলো—
"যদি কোনোদিন আমাকে বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় ওদেরই বেছে নেবো...
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
রিচার্ড পাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"এখনো সময় আছে আফিয়া। নিজের ভুলটা শুধরে নাও।
আফিয়া চৌধুরী চোখ মুছলেন।
"আমি কি সত্যিই এতটা ভুল করেছি?
"হ্যাঁ।তোমার ছেলেকে তার ভালোবাসা থেকে আলাদা করতে চেয়েছো।
আফিয়া কিছু বললেন না।
আজ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, হয়তো তিনি সত্যিই অন্যায় করেছেন।
-------------------------------
মায়রা দুই হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।
ঘুমের মাঝেও মুখে মিষ্টি হাসি লেগে আছে।
মেহেরিন পাশে বসে মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিলো।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ আসতেই স্ক্রিনের দিকে তাকালো সে।
ঋদ্ধ।
"ঘুমাওনি এখনো?
মেহেরিনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।
"না। তুমি?
সাথে সাথে রিপ্লাই এলো।
"তোমাদের কথা ভাবছি।
মেহেরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
"এত রাতে?
"হুম। তোমাদের ছাড়া আমার পৃথিবীটা অসম্পূর্ণ লাগে।"
মেহেরিন কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সাত বছর আগে এই ছেলেটাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কতটা ভুল ছিলো,
আজকাল খুব অনুভব করে সে।
চোখ দুটো ভিজে উঠলো।
-----------------------------------
সেদিনের ঝগড়ার পর থেকে তুলি তাহসিন এর মুখ ও দর্শন করে না।সে তার মতো অফিস যায় বসের সাথে টাইমস্পেন্ড করে,বসও খুশি হয়ে তাকে দামি দামি গিফট এটাসেটা রোজ দিয়েই থাকে।
তাহসিন ও তুলির সাথে কথা বলার চেষ্টা করে না। দুজনে এক রুমে থাকেও না সেদিনের পর থেকেই তুলি অন্য রুমে থাকে।
তাদের পাঁচ মাসের ছেলেটাকে তাহসিন এর মা সামলায়।ইদানীং বাচ্চাটা অনেক বেশি অসুস্থ থাকে।
এখন সকাল ছয়টা ,,
সবাই গভীর ঘুমে থাকলেও বাচ্চাটা সেই ভোর রাত থেকে অনবরত কেদে যাচ্ছে।
" উফ মা একটা বাচ্চাকে সামলাতে পারেন না বয়স তো কম হয়নি সারাটা রাত চিৎকার করে আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে।
প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে শাশুড়ী কে কথাটা বলে উঠলো তুলি --
অসহায় চোখে তাকালো তিনি তুলির দিকে একজন মা কতোটা পাষাণ হতে পারে তা আমি তোমাকে না দেখলে বুঝতাম না তুলি।বাচ্চাটার জ্বর সারাটা রাত মা ছাড়া থাকে যেই বয়সে বাচ্চারা মায়ের ছায়াতলে থাকে সেই বয়সে তুমি তাকে কাছেও নাওনা।
শাশুড়ির কথা যেনো তুলির কানেই ঢুকলো না।
দেখুন নাতিনাতনির শখ তো আপনার ছিলো পেয়েগেছেন এখন সামলান অসুস্থ হলে ডক্টর দেখান।
সে চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেলো নিজের কফি করতে।
মাথাটা ধরেছে বেশ তাকে আবার অফিস যেতে হবে।
তাহসিন এর মা আর কিছু বললো না।বলে লাভ টাই বা কি এ মেয়ে তো কানেই তোলে না।
"কোথায় যাচ্ছিস বাবা?
মায়ের কথায় তাহসিন থেমে গেলো।নিজের ছেলের দিকে তাকালো চোখমুখ কেমন শুকিয়ে গেছে বাচ্চাটার হতাশ শ্বাস ফেললো।
নতুন একটা কোম্পানি সাথে ডিলের কথা চলছে মা।কোনোভাবে ডিলটা হাতে পেলে কোম্পানি টা বেচে যাবে।
" ওহ তুমি এখনো ওই নষ্ট কোম্পানির পেছনে সাফার করছো কতোবার বললাম একটা চাকরি দেখো কিন্তু যতো শুখ তো তোমারি বউয়ের টাকায় খাচ্ছো ঘুরছো।
তাচ্ছিল্যের সাথে বললো কথাগুলো তুলি।
তাহসিন কিছু বলতে গিয়েও বললো না আজকাল এই মেয়েটার ওপর তার ঘৃণা হয় সাথে নিজের প্রতিও।
তবে সে হাল ছারবে না তার বাবার হাতে গড়া অনেক শখের কোম্পানি এটা তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলো বাবা তার সাথে কথা না বললেও অনেক আগেই কোম্পানি টা তার দায়িত্বে দিয়েছিলো তার বাবা পরে আর ফেরত নেননি।
"আসছি মা৷
তুলি নিজের কথার কোনো জবাব না পেয়ে মুখ ভেংচালো।সে যতো তারাতাড়ি সম্ভব তাহসিন কে ডিভোর্স দিতে চায় তাহলেই নিজের কোম্পানির বসের সাথে বিয়ে করতে পারবে তার বস প্রচুর টাকাপয়সার মালিক।
যদিও বিবাহিত দুইটা মেয়েও আছে।তবে এতে তুলির কোনো সমস্যা নেই সে টাকা পেলেই হলো।সাথে তাকে শারীরিক সুখ ও দেয় তাই এসব নিয়ে তার ভাবনা নেই। নিজের সন্তান তার কাছে উটকো ঝামেলা ছাড়া কিছু নয়।
তাহসিন দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিশাল এক বিল্ডিং এর সামনে দাড়ালো। বিল্ডিংটা আনুমানিক পনেরো তলা হবে।পুরোটাই একটা কোম্পানির।বিল্ডিংয়ের গায়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা
"চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি"
সে লিফট দিয়ে দশ তলায় পৌঁছালো। সেখানেই কোম্পানির মালিকের কেবিন।রিসেপশনিস্ট এর সাথে কথা বললে তাকে জানানো হলো অপেক্ষা করতে তার সাথে এটাও জানানো হলো কোম্পানির মালিকের ছেলের সাথে তার ডিল হবে।
এতে অবশ্য সে কিছুটা নার্ভাস কারন তার ছেলেকে চেনা নেই তাহসিনের।
--------------------------
"কী ব্যাপার ঋদ্ধ হঠাৎ অফিসে যাওয়ার জন্য লাফাচ্ছ কেন?
" হোয়াট৷আমি কখন লাফাইলাম আজব ড্যাড তোমার কি চোখ গেছে। ফোনের দিকে তাকিয়ে গেম খেলতে খেলতেই কথাটা বললো ঋদ্ধ ,,
"ছেলের এমন অবান্তর উত্তরে বেশ বিরক্ত রিচার্ড চৌধুরী এই ছেলের মাথায় কখন কি ঢোকে।
পাশে দাড়িয়ে থাকা পিটার এর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন তিনি। সাথে সাথে পিটার অসহায় চোখে তাকালো।তার এই তাকানোর মানেটা খুব ভালো করে জানা রিচার্ড এর।
এর মানেটা হলো পিটার মুখ খুলবে না।
তিনি রাগ নিয়ে বলে উঠলেন --
যা পারো করো সব তোমারি।হনহনিয়ে বেড়িয়ে যেতেই ঋদ্ধ ফোন থেকে নিজের মাথা তুললো।এতক্ষণ মূলত নিজের ড্যাড এর যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলো সে।
তিনি যেতেই পিটার কে বলে উঠলো --
যার অপেক্ষায় আছি সে কি এসেছে পিটার?
" জী স্যার দীর্ঘ এক ঘন্টা হলো সে অপেক্ষা করছে বাহিরে।
"ভেতরে পাঠিয়ে দাও!
পিটার সায় জানালো।
" মে আই কামিং স্যার?
"ইয়েস কাম ,,
গুরুগম্ভীর কন্ঠের ব্যাক্তির দিকে চোখ তুলে তাকাতেই জমে গেলো তাহসিন অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসলো --
"মি. অ্যারন ঋদ্ধ চৌধুরী"
মৈনাক মির্জার প্রাণের বন্ধু।
তাহসিন এর এমন জমে যাওয়া দেখে বিশেষ ভাবান্তর হলো না ঋদ্ধর।
"কি হলো মি, তাহসিন আহমেদ।
তাহসিন নিজের ঘোর থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক হলো।
ঋদ্ধ র সামনের চেয়ারটাতে বসে পরলো সে।
-------------------------------
পুরো বাড়ি সরগরম।
বিয়ের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি।
বিয়ে বলতে মূলত তাদের রিসেপশন হবে অনেক বড়ো করে যেখানে মির্জা পরিবার ও চৌধুরী পারিবারের আত্মীয় স্বজনরা সাথে বিজনেস পার্টনার আর কাছের বন্ধুরা আমন্ত্রিত। মেহেরিন চায়না খুব বেশিকিছু হোক তাই ঋদ্ধ এটাই ঠিক করেছে তাদের রেজিস্ট্রিম্যারেজ হবে।
মেহেরিন ও এতে সন্তুষ্ট। যদিও অ্যানি রুপসা একটু আপত্তি করেছিলো তবে পরে তারাও রাজি হয়েছে।
ড্রয়িংরুমে বসে সবাই বিয়ের কেনাকাটার তালিকা নিয়ে ব্যস্ত।
মায়রা ছোট্ট একটা খাতা হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে।
অ্যানি অবাক হয়ে বললো,
"কী লিখছো বেবি?
মায়রা গম্ভীর মুখে বললো,
"মাম্মাল আর পাপাল বিয়েল লিস্ট।
সবাই হেসে উঠলো।
"আচ্ছা? সেখানে কী কী আছে শুনি?
মায়রা খাতাটা খুলে পড়তে শুরু করলো—
"এক নম্বল... অনেক ফুল।
দুই নম্বল... বড় কেক।
তিন নম্বল... পাপাল জন্য সাদা শেলওয়ানি।
চাল নম্বল... মাম্মাল জন্য পিন্সেস ড্লেস।
মেহেরিন মাথায় হাত দিয়ে বললো,
"হে আল্লাহ!
সবাই আবারও হেসে উঠলো।
ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠলো।
অ্যানি গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো বাইরে আফিয়া চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন।
মেহেরিন অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালো।
"আন্টি! আপনি?
আফিয়া চৌধুরী মৃদু হাসলেন।