আফিয়া চৌধুরী কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল মেহেরিন।
বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছে।
তবুও মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটতে দিলো না সে।
পাঁচ বছর আগেও এই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে সে অপমানিত হয়েছিল। আজও হচ্ছে।
কিছু কিছু ক্ষত সময়ের সাথে শুকিয়ে যায়, কিন্তু দাগটা থেকে যায় আজীবনতাকিয়ে বললো,
"আন্টি, কাউকে জোর করে নিজের জীবনে আনিনি।
আফিয়া বেগম ঠান্ডা হাসলেন।
"সত্যি? তাহলে আমার ছেলে হঠাৎ করে তোমাকে আর এই বাচ্চাটাকে নিয়ে হাজির হলো কীভাবে?
মেহেরিন উত্তর দেওয়ার আগেই উপর থেকে তানিশার কণ্ঠ ভেসে এলো।
"খালামণি, সবাই বসার রুমে আসছে।
আফিয়া বেগম নিজের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে ফেললেন।
যেন কিছুই হয়নি।
"এসো মেহেরিন।
বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
মেহেরিন কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল।
আজ সে আর আগের সেই দুর্বল মেহেরিন নয়।
এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মায়রা।
সাত বছর আগে এনার জন্য ঋদ্ধ কে ছেড়ে তাহসিন কে বিয়ে করেছিলো মেহেরিন। কিন্তু এখন ঋদ্ধ র সাথে মায়রা আছে মায়রা ঋদ্ধ ছাড়া এক মূহুর্ত নিজেকে কল্পনা করতে পারে না।তাই আগের বারের মতো নিজের ভালোবাসা ছেড়ে দিবে না সে।
----------------------------
ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই হাসি-আড্ডার পরিবেশ।
মায়রা সোফার উপর দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে গল্প করছে।
ঋদ্ধ পাশেই বসে মেয়ের কান্ডকারখানা দেখে হাসছে।
মেহেরিনকে দেখেই মায়রা চিৎকার করে উঠলো,
"মাম্মা! দেখো আমি গ্র্যান্ডমমের সাথে ফ্রেন্ড হয়ে গেছি!
আফিয়া বেগম মুখে হাসি এনে বললেন,
"তোমার মেয়েটা কিন্তু ভীষণ মিষ্টি।
"জানি।
আত্মবিশ্বাসী গলায় বললো ঋদ্ধ।
আর মম তুমি ভুলে যাচ্ছো মায়রা আমারও মেয়ে সাথে তোমার গ্র্যান্ড ডটার।
আফিয়া বেগম হাসার চেষ্টা করলেন।
ঋদ্ধ মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে আবার বললো,,
মায়রা ঠিক ওর মায়ের মতো।
মুহূর্তেই মেহেরিনের চোখ ঋদ্ধর চোখে আটকে গেল।
ছেলেটা কিছুই জানে না।একদম কিছুই না।
তবুও প্রতিটা মুহূর্তে তাকে আগলে রাখছে।
আফিয়া বেগমের মুখের হাসিটা কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল।
তবে পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে গেলেন।
তিনি কোনোভাবেই অন্যের সন্তান কে নিজের ছেলের সন্তান হিসেবে মেনে নিবেন না।দরকার হলে আগের বারের মতো আবারও আলাদা করে দিবেন দুজনকে।
-----------------------
বিকেলের দিকে সবাই একসাথে বসে চা খাচ্ছিল।
মেহেরিন ফিরে যেতে চেয়েছে তবে ঋদ্ধ বলেছে রাতে রেখে আসবে তাদের। কারন সে এতোক্ষণ নিজের বউ বাচ্চা রেখে দুরে থাকবে না।
তানিশা বারবার সুযোগ খুঁজে ঋদ্ধর পাশে বসার চেষ্টা করছে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবারই মায়রা এসে মাঝখানে বসে পড়ছে।
একবার তো সরাসরি বলেই দিল,বিষয় টা মেহেরিন পিটার দুজনেই খেয়াল করছে।
তানিশা আবারও ঋদ্ধ র কাছ ঘেঁষে বসতে চাইলেই মায়রা তিব্র প্রতিবাদ করে বলে উঠলো,,
আমার পাপার পাশে শুধু আমার মাম্মা বসবে।
তানিশার মুখটা বিব্রত হয়ে গেল।কিছু না বলে দাতে দাত পিষে আফিয়া চৌধুরী র পাশে গিয়ে বসলো।
ঋদ্ধ মুচকি হেসে মেয়ের নাক টিপে দিল।
তাহলে তোমার জায়গা কোথায় কিউটিপাই?
"আমি তো তোমাদেল প্রিন্সেস তাই আমি সবার মাঝে বসবো।
আবারও হাসির রোল উঠলো।মেহেরিন শুধু তার মেয়ের হাসিখুশী মুখের দিকেই চেয়ে থাকে।সে চায়না কেউ তার মেয়ের খুশিতে নজর লাগাক।
----------------------------
রাতের খাবারের সময়ও পরিবেশ স্বাভাবিকই রইলো।
আফিয়া বেগম যেন ইচ্ছে করেই বিয়ের বিষয়ে কোনো কথা তুললেন না।মেহেরিনকেও আর তেমন কিছু বলেননি।
বরং মেহেরিনের প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বললেন,
"এটা খাও মা।
তুমি আগে খুব পছন্দ করতে।মেহেরিন অবাক হয়ে তাকালো।
কয়েক ঘণ্টা আগের সেই মানুষটার সাথে এই মানুষটার কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঋদ্ধ খুশি গলায় বললো,
"দেখলে পাখি? মম এখনও তোমার পছন্দগুলো মনে রেখেছে।
আফিয়া বেগম মৃদু হাসলেন।
"কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।
কথাটা শুনে মেহেরিনের বুকটা কেমন যেন করে উঠলো।
কথাটার ভেতরে যেন অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।
---------------------------------
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
আফিয়া চৌধুরীর বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও মায়রার মুখে হাসি লেগে আছে।
গাড়িতে উঠেই সে ঋদ্ধর কোলে বসে গল্প শুরু করে দিল।
"পাপা, আজকে আমি গ্র্যান্ডমমের সাথে অনেক মজা করেছি।
ঋদ্ধ মুচকি হেসে মেয়ের কপালে চুমু খেলো।
"সত্যি? তাহলে তো আমার প্রিন্সেসের দিনটা খুব ভালো কেটেছে।"
"হুম। কিন্তু মাম্মা একদম চুপচাপ ছিল।"
মায়রার কথা শুনে মেহেরিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
ঋদ্ধ আড়চোখে তার দিকে তাকালো।
সত্যিই তো, পুরো সন্ধ্যাটা মেহেরিন যেন নিজের ভেতরেই গুটিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর মায়রা ঋদ্ধর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।
গাড়ির ভেতর নেমে এলো নীরবতা।
বাইরে রাস্তার আলো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে।
ঋদ্ধ স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে বললো,
"মম কিছু বলেছে তোমাকে?"
মেহেরিন চমকে তাকালো।
"কেন বলছো?
"কারণ আমি তোমাকে চিনি, পাখি। তুমি যখন কোনো কিছু নিয়ে ভাবো, তখন এমন চুপ হয়ে যাও।"
মেহেরিন মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকালো।
"তুমি এসব কি বলছো ঋদ্ধ আন্টি অনেক ভালো আমাকে অনেক ভালোবাসেন তিনি।
ঋদ্ধ এক হাত বাড়িয়ে মেহেরিনের হাতটা নিজের মুঠোয় নিল।
তুমি কি তানিশার আচরণের জন্য মন খারাপ করছো পাখি?
"মেহেরিন শীতল চোখে চাইলো,,
তারপর মুচকি হাসলো ,,
আমার তোমার ওপর বিশ্বাস আছে ঋদ্ধ।
" ঋদ্ধ র শরীর জুরে শান্তির বাতাস বয়ে গেলো নিশ্চিন্ত হলো সে। তাছাড়া ঋদ্ধ জানে মেহেরিন অবুঝ নয়।যথেষ্ট বুঝদার। বলতে গেলে প্রয়োজনের থেকে বেশি।
" অন্তত এটুকু জানো পখি,পৃথিবী তোমার বিরুদ্ধে গেলেও আমি তোমার পাশে থাকবো।
মেহেরিনের চোখ ভিজে উঠলো।ঋদ্ধ র কাধে মাথা রাখলো সে।
পিটার ড্রাইভ করছে।
"মেহেরিন মনে মনে ভাবছে
এই মানুষটাকে সে যতবার দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছে, ততবারই সে আরও বেশি করে কাছে এসেছে।
"কেন এত ভালোবাসো আমাকে?
খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলো সে।
ঋদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
"কারণ তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ পাখি।
মেহেরিন আরেকটু ভালোভাবে ঋদ্ধ কে জরিয়ে নিলো।
ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো প্রশান্তির হাসি।
মনে হলো বহু বছরের অপেক্ষার পর যেন নিজের পৃথিবীটাকে আবার ছুঁতে পেরেছে।
-------------------------
গাড়ি এসে থামলো মেহেরিনের বাসার সামনে।
ঋদ্ধ ঘুমন্ত মায়রাকে কোলে তুলে নিল।
মেয়েটা আধো ঘুমের মধ্যেই বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো।
"পাপা... যেও না..."
ঋদ্ধর চোখ নরম হয়ে এলো।
"যাবো না, কিউটিপাই।বরং সারাজীবন তোমাদের দুজনকে আগলে রাখবো আমি।
তিনজন একসাথে বাসার ভেতরে ঢুকলো।
বাসার সবাই এখন ঘুমে হয়তো।তারা আর কাউকে ডাকলো না।
মায়রাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ে কম্বল টেনে দিল ঋদ্ধ।
মেয়েটার কপালে আলতো চুমু খেয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
মেহেরিন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল।
তার অদ্ভুত ভালো লাগছিল।
হঠাৎ ঋদ্ধ পিছন ফিরে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
ঘরটা নিঃশব্দ।
শুধু মায়রার শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে।
ঋদ্ধ ধীরে ধীরে মেহেরিনের দিকে এগিয়ে এলো।
"কি দেখছো?
মেহেরিন চোখ নামিয়ে ফেললো।
" মুচকি হেসে বললো। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ঋদ্ধ!
"কপাল কুচকে গেলো ঋদ্ধ র।
কেন?
" এই যে আমার মেয়ের জীবনের অসম্পূর্ণ সুন্দর একটা অধ্যায় তুমি পূর্ন করে দিলে।
"ঋদ্ধ আচমকাই মেহেরিন এর অনেকটা কাছে চলে এলো
মেহেরিনের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো।
"ঋদ্ধ..."
"হুম?"
"এভাবে তাকিও না।"
ঋদ্ধ মৃদু হেসে তার কানের পাশে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল।
"তাহলে কীভাবে তাকাবো?
মেহেরিনের গাল লাল হয়ে উঠলো।
ঋদ্ধ আলতো করে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
একটা দীর্ঘ, শান্ত চুম্বন।
যার মধ্যে ছিল অপেক্ষা, ভালোবাসা আর না বলা হাজারো অনুভূতি।
মেহেরিন চোখ বন্ধ করে নিল।
মুহূর্তটাকে নিজের ভেতরে গেঁথে নিতে চাইলো।
ঋদ্ধ তাকে বুকে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"আর কোথাও যেতে দেবো না তোমাকে, পাখি।
মেহেরিন তার বুকের উপর মাথা রেখে আস্তে করে বললো,
"আমিও আর যেতে চাই না।"
দুজনের অজান্তেই নতুন করে শুরু হলো তাদের ভালোবাসার গল্প।