দীর্ঘ ফ্লাইটের পর অবশেষে বাংলাদেশে নামলো তারা।
সকালবেলার নরম রোদে পুরো এয়ারপোর্টটা যেনো অন্যরকম লাগছে।
মায়রার উত্তেজনা যেনো আর ধরছেই না।
“"পাপা আমরা নানু বাসায় যাই? মামা কি আমায় অনেক ভালোবাসবে?”
ঋদ্ধ হেসে মেয়ের নাকে আলতো চাপ দিলো।
“"অবশ্যই ভালোবাসবে। আমার কিউটিপাইকে কে না ভালোবাসে?
মেহেরিন চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত কাঁপছে তার।
পাঁচ বছর পর... এই শহর... এই দেশ... এই মানুষগুলো...
সবকিছু কেমন অপরিচিত লাগছে আবার ভীষণ পরিচিতও।
এয়ারপোর্টের বাইরে বের হতেই হঠাৎ
“"মেহু!”
চেনা কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ালো মেহেরিন।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তার বড় ভাই আর ভাবি।
মুহূর্তেই চোখ ভিজে উঠলো মেহেরিনের।
“"ভাইয়া ভাবি ,,
পরের মুহূর্তেই ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে।
পাঁচ বছরের জমে থাকা কষ্ট, দূরত্ব
সব যেনো এক মুহূর্তে ভেঙে পড়লো।
যে ভাই তাকে পুতুলের মতো আগলে রাখতো তাকে ছাড়া সে পাচটি বছর দুরে ছিলো ,,
“"বাহ ভাইকে পেয়ে ভাবিকে ভুলে গেলে ,,
মেহেরিন ভাইয়ের বুক থেকে মাথা তুললো পাশেই রুপসা ঠোঁট উল্টে তার দিকে চেয়ে আছে যেনো সে সত্যি রাগ করেছে ,,
তা দেখে মেহু ও মৈনাক উভয়ই হেসে ফেললো
"" মেহেরিন রুপসা কে গিয়ে জরিয়ে ধরলো ,,
তোমায় কিভাবে ভুলে যেতে পারি আমি ভাবি
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ভাই চোখ মুছলো চুপচাপ।
তারপর হঠাৎ নজর গেলো ছোট্ট মায়রার দিকে।
মায়রা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে।
সে মূলত বুঝতে চেষ্টা করছে এরা দুজন কারা ভিডিও কলে দেখলেও সামনা সামনি চিনতে পারছে না মায়রা।তার চিন্তা এখন তার মাম্মা কে নিয়ে তার মাম্মা কেন কাদছে?
"" হঠাৎই পাপার দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট উল্টো কেদে দিলো ,, ঋদ্ধ নিজের কিউটিপাই এর কান্না দেখে অস্থির হয়ে উঠলো ,, তারাতাড়ি তাকে কোলে তুলে নিলো ,,
"" কী হয়েছে আমার বাচ্চাটার কে কষ্ট দিয়েছে আমার কিউটিপাই কে পাপা কে বলো সোনা৷
"" মাম্মা কাঁদছে পাপা ,,
মেহেরিন তারাতাড়ি মেয়ের কাছে গেলো ,,
"" মাম্মা কাদছি না তো সোনা আসো তোমাকে মামা আর মামির সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো ,, মায়রার কান্না থেমে গেলো ,,
বলে উঠলো,,
"" মামা ,, মামি
"" হ্যা তো সোনা ,,
মৈনাক এতক্ষণ ঋদ্ধর দিকে চেয়েছিলো কতো সুন্দর ভাবে মমতা দিয়ে সে মায়রার কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলো মায়রাকে কান্না করতে দেখে কিভাবে অস্থির হয়ে উঠেছিলো ঋদ্ধ ,,
তার ভাবনার মাঝেই মেহেরিন মায়রা কে তার সামনে নিয়ে আসলো ,,
এই যে দেখো মা এটা তোমার মামা রুপসা কে দেখিয়ে বললো এটা মামি৷
“"তুমি কি আমার মামা?
কথাটা শুনেই সবাই থমকে গিয়ে হেসে উঠলো।
মৈনাক হাঁটু গেড়ে বসে বললো
“"হ্যাঁ মামুনি। আমি তোমার মামা।
মায়রা একটু ভেবে বললো
“"তুমি আমাকে আইসক্রিম কিনে দিবা?
সবাই এবার হেসে উঠলো জোরে।
“"অবশ্যই দিবো।
“"তাহলে তুমি ভালো মামা।
ঋদ্ধ পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলো।
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে মেহেরিনের দিকে।
আজ মেয়েটাকে কেমন অন্যরকম লাগছে।
চোখে পানি... তবুও একরাশ শান্তি।
----------------------------
"" মির্জা ম্যানশনে পৌছাতে তাদের বেশ খানিকটা সময় লাগলো ,, পথিমধ্যে রুপসার কোলে ঘুমিয়ে পরেছে মায়রা ,, বাচ্চাটা একদিনে মামা মামির নেওটা হয়ে গেছে।
"" ঋদ্ধ আর রিফাত ও এই বাসায় থাকবে তাদের রুম দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঋদ্ধ তখনও মৈনাক এর সাথে কথা বলেনি যদিও মৈনাক চেয়েছে কথা বলতে ঋদ্ধ তাকে এড়িয়ে গেছে।
আপাতত তারা সবাই বিশ্রাম নিতে যার যার রুমে অবস্থান করছে।
"" মেহেরিনের ভেতর অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে এতোগুলো বছর পর নিজের বাড়ি নিজের ঘর যেখানে নিজের শৈশব কেটেছে বাবা ভাই এর প্রিন্সেস সে। মেহেরিনের রুমটা এখনো আগের মতোই আছে খুব সিম্পল তার রুমটা হালকা পিংক কালার। খুব সুন্দর করে সাজানো।বেলকনি থেকে বাগানটা পুরোটা দেখা যায়..এই বাগানেই সে তার ভাই ঋদ্ধ র অনেক স্মৃতি। সবটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেহেরিন। গোসল সেরে ঘুমে তলিয়ে গেলো।
বিকেলের নরম আলোটা ধীরে ধীরে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
মেহেরিনের ঘুম ভাঙলো হালকা শব্দে।
চোখ খুলতেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। যেনো বুঝতেই পারছে না কোথায় আছে।
পরমুহূর্তেই চোখ বুলালো পুরো রুমে।
হালকা পিংক দেয়াল... জানালার পাশে ছোট্ট বুকশেলফ... ড্রেসিং টেবিলের কোণে এখনো রাখা সেই পুরোনো মিউজিক বক্সটা...
সবকিছু এতটা চেনা যে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো।
পাঁচ বছর...
একটা দীর্ঘ সময়।
কিন্তু তার রুমটা যেনো এখনো অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।
ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো মেহেরিন।
নিচে বাগানটা আগের মতোই আছে।
সাদা গোলাপ... জুঁই ফুল... দোলনা...
মুচকি হেসে ফেললো সে।
এই দোলনাতেই কত বিকেল কেটেছে তার।
ভাইয়ার সাথে ঝগড়া... বাবার সাথে গল্প... আর
হঠাৎ থেমে গেলো সে।
ঋদ্ধ...
একসময় এই বাগানেও তার স্মৃতি ছিলো।
মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠলো।
“মেহু?”
চেনা কণ্ঠে পেছনে তাকালো মেহেরিন।
রুপসা হাতে ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে।
""ঘুম ভাঙছে ম্যাডামের?”
মেহেরিন মুচকি হেসে বললো
“"ভাবি…”
রুপসা এগিয়ে এসে কপালে আলতো টোকা দিলো।
“"তোকে দেখে মনে হচ্ছে এখনো ছোট্ট মেয়েই রয়ে গেছিস।
ট্রে টেবিলে রেখে বললো
“চা নিয়ে এলাম। আর নিচে আয়। আব্বু অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শুনতেই মেহেরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো।
আব্বু...
হঠাৎ বুকের ভেতরটা ধুকপুক শুরু হয়ে গেলো।
পাঁচ বছর ধরে বাবার সাথে সম্পর্কটা কেমন দূরে সরে গেছে।
ভিডিও কলে কথা হলেও সেই আগের মতো সম্পর্ক আর হয়নি।
“"কি হলো?”
রুপসা তার হাত ধরলো।
“"ভয় পাচ্ছিস?
মেহেরিন ছোট্ট করে মাথা নেড়ে বললো
“"জানি না আব্বু কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে...
রুপসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার মাথায় হাত রাখলো।
“তোর আব্বু তোকে ভীষণ মিস করেছে মেহু। মানুষটা শুধু প্রকাশ করতে পারে না।
আর তোর পরিনতির জন্য উনিনিজেকে দায়ি করেন।
মেহেরিন কিছু বললো না।
চুপচাপ নিচে নামলো।
ড্রইংরুমে পা রাখতেই থেমে গেলো সে।
সোফায় বসে আছেন তার বাবা।
চুলে পাক ধরেছে অনেকটাই।
মুখেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
লোকটাকে কেমন যেনো ক্লান্ত লাগছে।
হঠাৎ বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো মেহেরিনের।
এই মানুষটাই একসময় তার সব আবদারের জায়গা ছিলো।
“"আ... আব্বু…
কাঁপা কণ্ঠে ডাকলো সে।
লোকটা ধীরে ধীরে তাকালো।
চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইলো মেয়ের মুখে।
তারপর উঠে দাঁড়ালেন।মুহূর্তের নীরবতা।
মেহেরিন মাথা নিচু করে ফেললো।
“"রাগ করে আছো আমার উপর?”
কথাটা বলতেই গলা কেঁপে উঠলো তার।
পরের মুহূর্তেই শক্ত দুটো হাত জড়িয়ে ধরলো তাকে।
“"পাগলি মেয়ে…”
ভাঙা গলায় বলে উঠলেন তিনি।
“"বাবারা মেয়ের উপর রাগ করে থাকতে পারে?
মেহেরিন আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।
“"সরি আব্বু…তুমি আমায় অনেকবার দেশে ফিরতে বলেছো কিন্তু আমি ফিরিনি
“অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমায়…
লোকটা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
"" তুই যে ঋদ্ধ কে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিস এতেই আমি খুশি আমাকে ভুল সুধরানোর সুযোগ তো দিলি।
পাশে দাঁড়িয়ে মৈনাক চুপচাপ চোখ মুছলো।
রুপসাও মুচকি হেসে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই ছোট্ট একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
“"মামি... আমি পড়ে গেছি!
সবাই ঘুরে তাকালো।
মায়রা মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আর তার পাশে পুরো অসহায় চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে পিটার।
“আমি কিছু করিনি। ও নিজেই দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেছে!
মায়রা সঙ্গে সঙ্গে বললো
“মিথ্যা! আনতেল আমাকে ধরেনি!”
সবাই হেসে উঠলো।
পিটার অসহায় মুখ করে বললো
“বাহ! এখন সব দোষ আমার?
মায়রা দৌড়ে গিয়ে মেহেরিনের পা জড়িয়ে ধরলো।
"" আনতেল ব্যাড ,,
মেহেরিন চোখ মুছে হেসে ফেললো।
অনেকদিন পর...
এই হাসিটা যেনো সত্যিকারের লাগছে।
কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মৈনাকের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ঋদ্ধর দিকে।