বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ২১

🟢

ঋদ্ধ,,,!

মৈনাক এর ডাকে পেছন ফিরে তাকালো ঋদ্ধ। বরাবরের মতোই এড়িয়ে যেতে চাইলো। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগেই মৈনাক ঋদ্ধ র হাত ধরে ফেললো।

"" এবারের মতো প্লিজ ক্ষমা করে দে।আমি বুঝিনি তুই মেহেরিনকে এতোটা ভালোবাসিস যে ,,

"" যে মায়রা সহ তাকে মেনে নিবো তাইতো?

হাতঝাড়া মেরে বলে উঠলো ঋদ্ধ।

যে মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে সাত-আট বছর এই দেশের মাটিতে পা রাখিনি আমি… আজ তার ডিভোর্স হয়েছে, একটা মেয়ে আছে।তাই ভাবলি আমি তাকে মেনে নেবো না?

মৈনাক মাথা নিচু করে নিলো।

"" আমার ভালোবাসা তোর কাছে এতো ঠুনকো মনে হয়েছে আমি জানতাম না।

একপর্যায়ে মৈনাক এর চোখ ছলছল করে উঠলো।

সে কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে গেলো।

"" ভাইয়া৷

রূপসা ধির পায়ে এগিয়ে এলো তাদের দিকে।

"" ঋদ্ধ তাকালো রুপসার দিকে ,,

ভাইয়া আমি আপনাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কে জানি এবং নিজের চোখে আপনাদের দুজনের বন্ডিং দেখেছি।তবে আমি এটা জানতাম না আপনি মেহুর কারনে দেশ ছেড়েছিলেন। মৈনাক কে যতোবার আপনার বিষয় এ জিজ্ঞেস করেছি ততবার তার চোখে আমি ব্যাথা দেখতে পেয়েছি অপরাধ বোধ দেখতে পেয়েছি।

উত্তর হিসেবে পেয়েছি ,, সে নাকি আপনার বন্ধু হওয়ার যোগ্য না।

সে আপনাকে অনেক ভালোবাসে ভাইয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে অনেক আগেই তবে আপনার সামনে যাওয়ার মতো মুখ তার ছিলো না। আর তখন মেহুর একটা মেয়ে ছিলো আপনার সামনে মেহুকে তখন নিয়ে গেলে তখন আপনি মৈনাক কে সার্থপর ভাবতেন এ কারনেই সে কখনো আপনার সামনে যায় নি।

""যেদিন আপনি তাকে প্রথম কল করেছিলেন সেদিন সে একটা বাচ্চার মতো ফুপিয়ে কেঁদেছিলো ভাইয়া।

"" ঋদ্ধ তখনো স্থির।

রূপসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ,,

আপনার বন্ধু আপনার ইচ্ছে। তবে ভেবে দেখবেন সেও কিন্তু তার দিক থেকে ঠিক ছিলো।

রুপসাও আর দাঁড়ালো না।

ঋদ্ধ চোখ তুলে চাইতেই সামনে মেহেরিনকে দেখতে পেলো।

"" তুমিও নিজের ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কিছু বলে যাও।

তার তো কোনো দোষ নেই সব দোষ তো আমার।

মেহেরিন ঋদ্ধ র কাছে এগিয়ে এলো। ঋদ্ধ র মুখটা হাতের আজলায় নিয়ে বললো।

"" আমি এতকিছু জানিনা তবে তুমি যেমন ঠিক ভাইয়াও তেমন ভাইয়ার দিক থেকে ঠিক। তাই প্লিজ ভাইয়ার ওপর রাগ করে থেকো না।

ঋদ্ধ নিজের হাত থেকে মেহেরিন এর হাতটা টেনে একটা চুমু খেলো। তার কোমর জরিয়ে আরেকটু নিজের কাছে টেনে আনলো।

"" আমার মেহুপাখি যখন বলেছে তখন তো মাফ করতেই হয়।

মেহেরিন এর মুখে হাসি দেখা দিলো।সে জানতো ঋদ্ধ তার কথা ফেলবে না কখনোই। তাছাড়া ছোটবেলায় তো সে দেখেছে ঋদ্ধ আর মৈনাক এক আত্মা এক প্রাণ। সেখনে তার জন্য দুজন আলাদা হয়ে গেছে এটা মানতেও মেহেরিন এর কষ্ট হয়।

"" মায়রা কোথায়?

"" বাবার সাথে খেলছে। নানুকে পেয়ে যেনো দুনিয়া পেয়ে গেছে সে।

অ্যানি আর পিটারেরও একি অবস্থা। মায়রার সাথেই খেলছে তারা।

"" আচ্ছা শোনো।

"" হুম।

"" আগাম আমরা মম এর সাথে দেখা করতে যাবো।

থমকে গেলো মেহেরিন অজান্তেই মুখে ঘন কালো কুয়াশারা হানা দিলো তার কোমল মুখে।

"" অ্যানি প্রবলেম পাখি? তোমাকে আপসেট দেখাচ্ছে।

"" মেহেরিন হাসার চেষ্টা করলো৷

আব,,না কি প্রবলেম হবে আন্টি এখন কোথায় আছে?

"" উমম,,ড্যাড তো বললো মম তার বোনের বাসায় আছে।

"" ওহ ,, ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো মেহেরিন।

আ,আংকেল কবে দেশে ফিরবে?

"" ড্যাড দুএকদিন এর মধ্যে ফিরে আসবে হয়তো।

আরে পাখি তুমি কেন এতো ভয় পাচ্ছো মম তো সবটাই জানে তাছাড়া আগেও তো মম তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো ভুলে গেলে পাখি।

"" নাহ,,ভয় পাচ্ছি না তো।

আব,,আচ্ছা চলো বাবা তোমার সাথে কথা বলতে চান। নিচে বসে আছেন।

"" ওকে।

মেহেরিন থম মেরে রইলো কিছুক্ষণ তারপর নিজের ভাবনাকে তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে নিচে চলে গেলো।

বিজ্ঞাপন

---------------------------------

"" বউমা ,, দেখো না বাচ্চাটা কখন থেকে কাদছে ওকে একটু ফিডিং করানো দরকার।

"" শাশুড়ির কথায় প্রচন্ড বিরক্ত হলো তুলি।এই একটা বাচ্চা তার ক্যারিয়ার,তার ফিগার সব কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে। তাহসিন কে কতোবার বললো তাদের কোনো বাচ্চার দরকার নেই কিন্তু কে শোনে কার কথা। যেমন তাহসিন তেমন তার মা।তার জীবনটা ঝালাপালা করে দিলো একদম। এই বুড়ি মহিলাও যে কেন তার স্বামীর সাথে মেয়ের বাড়ি আলে যায়নি।

"" উফ মা আমি আপনাকে কতোবার বলবো ওকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ান আমি ওকে ফিডিং করাতে পারবোনা।এতে আমার ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে।

"" তাহসিন এর মা হায় হায় করে উঠলেন যেনো ,,

এসব তুমি কি বলছো গো বউমা পাঁচ বছর পর একটা সন্তানের মুখ দেখেছো তুমি তার প্রতি এতোটা অবহেলা।

""তুলির যেনো ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো প্রচন্ড আক্রোশ নিয়ে সামনে রাখা গ্লাসটা ছুড়ে মারলো শাশুড়ির দিকে।

মহিলা তৎক্ষনাৎ সেখান থেকে স্বরে দারালেন একটুর জন্য গ্লাসটা তার মাথায় লাগেনি।দুরে গ্লাসটা পড়ে চুর্ণ হয়ে গেলো।

ভাঙা গ্লাসের শব্দে শিশুটাও আরও জোরে কেঁদে উঠলো। মহিলা কাঁপা হাতে চোখের পানি মুছলেন। একসময় যে সংসারে তার কথাই শেষ কথা ছিল, আজ সেখানে তিনি যেনো বোঝা।

"" আমি আপনাদের মা ছেলেকে নিয়ে জাস্ট অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আর একদম আমার মাথা খেতে আসবেন না বলে দিলাম। ভুলে যাবেন না এই সংসার এখন আমার টাকায় চলে।

"" তাহসিন এর মা মাথাটা নিচু করে নিলেন।চোখ দিয়ে টপটপ পানি পরছে তার।তিনি কী করবেন ভেবে পাননা।মেহেরিন এর মতো শান্তশিষ্ট শোনার টুকরো মেয়ের সংসার ভেঙেছিলেন বলেই হয়তো আজ তার কোনো সংসার নেই স্বামী মেয়ে দুজনেি তার সাথে কথা বলেনা।আর ছেলে সে তো বিজনেস এ লস খেয়ে এখন বউয়ের নেওটা হয়ে গেছে কিছু বললেই বলবে মেনে নাও মা।সংসারটা এখন ওর টাকায় চলে।

---------------------------------

সকাল-------

ঋদ্ধ নিচে আসতেই মায়রার দেখা পেলো।

মায়রা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,

“"আমি তোমাকে খুঁজতেছিলাম। তুমি ছিলে না কেনো?

ঋদ্ধ মুচকি হেসে এগিয়ে এলো। মায়রার গাল টেনে বললো

“"সরি কিউটিপাই। পাপা তো মাম্মার সাথে ছিলো।

মায়রা হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই চোখদুটো বড়ো বড়ো করে বললো

“"পাপা! আমরা কি আজ গ্র্যান্ডমম এর কাছে যাবো?

ঋদ্ধ একটু অবাক হয়ে হাসলো।

“"কে বলেছে তোমাকে?

“"মাম্মা বলছিলো রাতে। আর আমি গ্র্যান্ড মম সাথে দেখা করবো! অনেক গল্প করবো!

বলেই হাতদুটো নেড়ে উত্তেজিত হয়ে উঠলো সে।

“"গ্র্যান্ডমম কি আমার জন্য গিফট আনবে? তার কি বড়ো বাসা? সে কি আমাকে পার্কে নিয়ে যাবে?”

এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নগুলো করে ফেললো ছোট্ট মায়রা।

ড্রইংরুমে থাকা সবাই হেসে উঠলো।

ঋদ্ধ তার নাকটা আলতো চেপে ধরে বললো

“"এইটুকু পিচ্চি মেয়ের এতো প্রশ্ন! আগে গ্র্যান্ডমম এর সাথে দেখা তো করো।

মায়রা গম্ভীর মুখ করে বললো,

“"হ্যাঁ! আর আমি গ্র্যান্ডমম কে বলবো বাবা আমাকে অনেক আদর করে। কিন্তু মাম্মা মাঝে মাঝে বকা দেয়।

মেহেরিন নাটকীয়ভাবে ভ্রু কুঁচকে বললো

“"আমি বকা দেই?

“"একটু একটু।” দু'আঙুল দেখিয়ে ফিসফিস করলো মায়রা।

সবাই আবারও হেসে উঠলো।

ঋদ্ধর বাবা চুপচাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কেন জানি বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে এলো। এই ছোট্ট মেয়েটার ভেতর অদ্ভুত একটা টান আছে—যেনো বহুদিনের শূন্যতা এক নিমিষেই ভরে দিতে পারে।

কখন যাবো আমলা পাপা। তালাতালি কলো তো।

“"আমি কিন্তু সুন্দর ড্রেস পরবো। গ্র্যান্ডমম যদি আমাকে ভালোবেসে কিস দেয়?

বলেই নিজের গাল দুটো চেপে ধরলো মায়রা।

ঋদ্ধ হেসে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলো।

“"আমার প্রিন্সেসকে কে না ভালোবাসবে বলো তো?”

মায়রা গর্বিত মুখে বললো,

“"কারণ আমি গুড গার্ল!”

তার কথা শুনে সবাই আবারও হেসে উঠলো।

কিন্তু মেহেরিনের হাসির আড়ালে কোথাও যেনো অজানা মুখটা মলিন রয়ে গেলো। মায়রা তো ছোট ভালোবাসা পেলেই গলে যায়। কিন্তু ঋদ্ধর মা কি সত্যিই এই পরিচয় কি সুফল বয়ে আনবে।

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস