বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন

পর্ব - ২৫

🟢

তাহসিন নিজের পাঁচ মাস বয়সী ছেলেটাকে ঘুম পারানোর চেষ্টায় ব্যাস্ত।তবে বরাবরের মতোই সে ব্যার্থ হচ্ছে। এতো ছোট একটা বাচ্চা মা ছাড়া কিভাবে শান্ত হবে।নিজেকে বেশ অসহায় লাগলো তার।

এখন রাত দশটা অথচ তুলির বাসায় ফেরার নাম নেই। ইদানীং মেয়েটা এমন করছে কখনো কখনো রাত বারোটা পেরিয়ে যাচ্ছে তারপর বাসায় ফিরছে।তাহসিনের মা বিষয় টা তাহসিন কে জানিয়েছেন। সাথে তার মনের ভেতর থাকা সঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। তবে তাহসিন কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।বছর দুয়েক হবে তুলি নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে।কি বা বলবে সে কিছু বলতে গেলেই তুলির কাছে অপমান হতে হবে তার।নিজের ব্যাবসায় লস খাওয়ার পর থেকে তুলি সংসার টা দেখছে।তাহসিন নিজে সংসারের জন্য এখন কিছু করতে পারে না।যা জমানো টাকা ছিলো চেষ্টা করছে ব্যাবসাটাকে আবার দার করানোর।তার বাবাও সেই যে মেহেরিন কে ডিভোর্স দেওয়ার পর মুখ ফিরিয়েছিলো আজও মুখ তুলে চায়নি তার দিকে। এত বছরেও মেয়ের বাড়ি থেকে এবাড়ি আসেন নি তিনি। তার মায়ের সাথেও যোগাযোগ করে নি।

আজকাল তাহসিন এর বড্ড আফসোস হয় মেহেরিনকে ডিভোর্স দেওয়া নিয়ে। তুলি বিয়ে হওয়ার পরও ভালো ছিলো এতগুলো বছর। কিন্তু যখন থেকেই তাহসিন ব্যাবসায় লস খায় তখনই সে পাল্টে যেতে থাকে।

এতসব ভাবনার মাঝেই আবারও বাচ্চার তিব্র কান্নার শব্দ পায় তাহসিন।

এর মাঝে তার মা ঘরে আসে।

"বউমা এখনো ফিরেনি তাহসিন?

বলতে পালতে নিজের নাতিকে কোলে নিলেন তিনি।ফর্মুলা দুধ বানিয়ে এনেছেন তিনি।বাচ্চাটা অনেক্ক্ষণ কান্নার ফলে চোখমুখ লাল হয়ে গেছে।

" নাহ।

"আমি বড্ড ভুল করেছি রে?

" তাহসিন মায়ের দিকে মুখ তুলে চাইলো।

"মেহেরিন কে অপছন্দ করার কোনো কারন ছিলো না তারপর ও ওমন লক্ষি মেয়েকে আমি সহ্য করতে পারতাম না।ফলস্বরূপ তার সংসার টা ভাংলাম সেই সাথে নিজের সংসার টাও ভেঙে ফেলেছি।

বলেই তিনি আচলে চোখ মুছলেন।

সময়ের সাথে সাথে মা ছেলে দুজনেই আজ বুঝতে পারে মেহেরিনকে ঠকিয়ে তারা ঠিক কতোটা ভুল করেছেন।কিন্তু তাদের করার কিছুই নেই।

" আহ মা যাও তো।ভালো লাগছে না এসব।

তাহসিন এর মা আর কিছু বললেন না কাদতে কাদতে নাতিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

"তাহসিন বেলকনিতে গিয়ে দারালো হাতে সিগারেট। কিছুক্ষণ পরই একটা গাড়ি এসে দারালো বাড়ির সামনে। একটা লোক গাড়ি থেকে বেড়িয়ে দরজা খুলে দিলো আধবয়সী একটা লোক।পরনে কোর্ট প্যান্ট। তাহসিন চেনে লোকটাকে তুলির অফিসের বস।

তুলি বেড়িয়ে আসলো।পরনে তার স্লিভলেস ব্লাউজ আর জরজেট শাড়ি। পিঠের বেশিরভাগ অংশই উন্মুক্ত।

গাড়ি থেকে নেমেই লোকটা তুলিকে জরিয়ে ধরলো। তুলিও অশ্লীল ভঙ্গিতে লোকটাকে জরিয়ে ধরলো। তারপর ই লোকটা চলে গেলে তুলি ভেতরে ঢুকলো। এ দৃশ্য দেখেই তাহসিনের মাথায় যেনো রক্ত উঠে গেলো।

" তাহসিন এর মা নাতিকে ড্রাইংরুমে খাওয়াচ্ছিলেন আর হাটছিলেন।

তুলি বাড়ির ভেতরে ঢুকলো এমন সময়।নিজের শাশুড়ী কে দেখলো তবে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো না। আর না নিজের সন্তানের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলো।

তাহসিন থম মেরে বিছানায় বসে আছে। তুলি কোনো কথা না বলেই ওয়াসরুমে চলে গেলো।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর বের হলেও তাহসিন কে একি অবস্থায় দেখে কপাল কুচকে গেলো তার।

"কি সমস্যা তাহসিন?

আচমকাই তাহসিন উঠে দারালো শক্ত করে চেপে ধরলো তুলির কব্জি।

" আহ ,,কি করছো এতো জোরে ধরেছো কেন ব্যাথা পাচ্ছি আমি।

তাহসিন রক্ত লাল চোখে তাকালো আরও শক্ত করে চেপে ধরলো তার হাত।

"এতো রাত পর্যন্ত বাহিরে কি করছিলি তুই? আর তোর বসের সাথে কি সম্পর্ক তোর?

তদাতে দাত পিষে হিসহিসিয়ে বললো তাহসিন।

তুলি কিছুটা ভয় পেলো এতো বছরেও তাহসিন কে এমন রেগে যেতে দেখেনি সে।

___________________________

"আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই মেহেরিন?

বিজ্ঞাপন

" মেহেরিন অবাক চোখে চাইলো আফিয়া চৌধুরীর দিকে।

কি বলবেন আন্টি?আর আপনি আমায় কিছু বলবেন এটার জন্য আবার জিজ্ঞেস করতে হবে।

হাসি মুখে বললো মেহেরিন।

সে মূলত কিছুক্ষণ আগেই নিজের ভাইয়ের সাথে ঋদ্ধ দের বাসায় এসেছে।অবশ্য সে মাঝে মাঝেই আফিয়ার সাথে সময় কাটাতে এখানে আসে।আফিয়া তাকে বড্ড ভালোবাসে।সাথে মৈনাককেও বেশ আদর করে।তাইতো অল্পবয়সি মেহেরিন আফিয়া বেগমের কাছে আসলেই বেশ হাসিখুশি থাকে।কেমন মা মা ফিল পায়।

"আফিয়া বেগম তাকালে মেহেরিন এর হাসি মাখা মুখের দিকে।মেহেটা খুব সুন্দর মায়া মায়া ভাব আছে মুখে।তিনি নিজেও বড্ড ভালোবাসেন মেহেরিন কে।

হঠাৎই তিনি চোখমুখ শক্ত করে ফেললেন --

"আমি চাই তুমি ঋদ্ধ র থেকে দুরে থাকো।

হঠাৎ এমন শক্ত গম্ভীর গলায় এমন অদ্ভুত কথা শুনে অবাক হলো মেহেরিন।আফিয়া চৌধুরী কখনো এমন গলায় তার সাথে কখনো কথা বলেনি।

সে কিছুটা হাসার চেষ্টা করলো।

" আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আন্টি?

"আমি কি বলতে চাইছি তা যে তুমি বুঝতে পারছো না এমন বোকা তো তুমি নও মেহেরিন।

" মেহেরিন এর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আসলো।ঋদ্ধ র প্রতি তার ভালোবাসা আছে কি না তা সে বোঝে না।তবে তার প্রতি যে কোনো একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে তা কিশোরী মেহেরিন বুঝতে পারে।ঋদ্ধ তার আশেপাশে থাকলে তার ভালোলাগে।হঠাৎ কিছুদিন দেখতে না পেলে তার সবকিছু ফাকা ফাঁকা লাগে এটা সে ইদানীং বুঝে।

"আমি আমার ছেলের অন্যকোথাও বিয়ে ঠিক করেছি তাই আমি চাই তুমি ঋদ্ধ র থেকে দুরে চলে যাও।

" মেহেরিন এর চোখ টলমল করে উঠলো।আন্টি আপনি ভুল ,,

ভুল না ঠিক তা আমি জানতে চাই না মেহেরিন।শুধু এটা যেনে রাখো ঋদ্ধ কখনো তোমার হবে নাআমি হতে দিবো না।কথাগুলো বেশ শক্ত কন্ঠে বললো আফিয়া।

"মেহেরিন এর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরলো।

আফিয়া চৌধুরীর বেশ খারাপ লাগলো তিনি জানেন মেহেরিন এর সাথে তিনি খারাপ ব্যাবহার করছেন। কিন্তু তার কিছু করার নেই তিনি ইদানীং বুঝতে পারছে তার ছেলে মেহেরিনকে ভালোবাসে। যদিও মেহেরিন এর দিক থেকে তিনি এখনো তেমন কিছু দেখেননি কিন্তু তবুও কোনো রিস্ক নিতে চাননা তিনি।নিজের বোনকে কথা দিয়েছেন ছেলেকে তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিবেন।আর তিনি এটা করেই ছারবে।তাইতো মেহেরিনকে এমন শক্ত কথা শুনাচ্ছেন।

" মেহেরিন ছোটবেলা থেকেই তুখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন একটা মেয়ে।তাইতো সে সহ্য করতে পারে নি আফিয়া বেগমের কথাগুলো।

ক্ষমা করবেন আন্টি আপনি কিসের ভিত্তিতে কথাগুলো বলছেন আমি জানিনা।তবে আপনার ছেলের সাথে আমার এমন কোনো সম্পর্ক নেই আর ভাবিষ্যতেও হবে না।এবিষয়ে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।কথাগুলো বেশ শক্ত কন্ঠে বললো মেহেরিন।তারপর ই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো সে।

আফিয়া চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বার ফেললেন।

"মম!

চমকে উঠলো আফিয়া।ঋদ্ধ কি সবটা শুনে নিলো।

" কি হলো মম কোন ভাবনায় পরলে?

"আব,, নাহ,,কিছুনা।

"মেহু কোথায় গেলো মম?

" আব,,ও তো বাসায় চলে গেলো বললো জরুরি কাজ আছে।

"ঋদ্ধ র মুখটা মলিন হয়ে আসলো।

চলে গেলো নিজের রুমে।

আফিয়া চৌধুরী হাফ ছেড়ে বাচলেন যেনো।

সেই ঘটনার পর প্রায় ছয়মাস মেহেরিন ঋদ্ধ র থেকে দুরে দুরে থেকেছে তাকেই এড়িয়ে চলেছে।তার কিছুদিন পরই তাহসিন এর সাথে তার বাবা বিয়ে ঠিক করলে সে রাজি হয়ে যায়।

অতীত এর কথা ভাবতে ভাবতে বিরবিরালো মেহেরিন।

আমিও তোমায় ভালোবাসতাম ঋদ্ধ তবে আত্মসম্মান এর থেকে আবেগ কখনোই বড়ো হতে পারে না।আর আমার কাছে আত্মসম্মান টা অনেক বড়ো ছিলো।

বিজ্ঞাপন
বিবশ হৃদয়ে বসন্তের আগমন গল্পটি জান্নাতী আক্তার সিমি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক উপন্যাস