অযাচিত প্রণয়

পর্ব - ১৫

🟢

সকাল সাত টায় ঘুম থেকে ওঠে ইমরান। চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। ঘুমে দুই চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। জোর করেই শোয়া থেকে উঠে বসে। অসুস্থ থাকার কারণে দুই তিন দিন ঘুমোতে পারেনি রাতে ঠিক মত। আর গত রাতেও ঘুমোতে পারেনি। শেষ রাতে ঘুমিয়েছিল।

এলোমেলো চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে নেয়। আলসেমি ভঙ্গিতে দুই হাত দুদিকে মেলে দেয়। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে ঘুমিয়ে থাকা তুলির দিকে তাকায়।

বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে আছে।

ঝুঁকে গিয়ে তুলির কপালে চুমু খায়। তারপর বেড থেকে নেমে দাঁড়ায়।

দশ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর দ্রুত কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়। কিচেনে এসে আগে একটা সসপ্যানে পানি গরম হতে দেয়। কেবিনেট খুলে নুডুলস বের করে। ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে।

এক মগ কফি বানায় আগে। কফি খেতে খেতে নুডুলস রান্না করতে শুরু করে।

নুডুলস রান্না করে খেতে খেতে আটটা বেজে যায়। দ্রুত রুমে এসে হসপিটালের জন্য তৈরি হয়ে নেয়।

তৈরি হয়ে প্রয়োজনীয় সব কিছু নিয়ে বেডের কাছে এসে দাঁড়ায়।

_ তুলি, তুলি।

ঘুম ঘুম চোখের পাতা টেনে তুলে তাকায় তুলি। ইমরানকে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ কচলে আবার তাকায়।

_ আমি হসপিটালে যাচ্ছি তুমি উঠে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর নুডুলস ঢেকে রাখা আছে খেয়ে নিও। ঠান্ডা হয়ে গেলে কিন্তু ভালো লাগবে না। ওঠো এখন খেয়ে আবার ঘুমিও।

তুলির রাতের কথা স্মরণ হয়। লজ্জায় বন্ধ বন্ধ চোখ দুটো একে বারে বন্ধ হয়ে যায়। গাল দুটো ও লাল হয়ে ওঠে। চাদর টেনে মাথা মুখ ঢেকে নেয়।

তুলির হঠাৎ কি হলো ইমরান বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। কিছু সময় পর যখন বুঝতে পারে তখন ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। চাদর টেনে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে বলে,

_ আরে লজ্জা পাচ্ছো কেন এভাবে ? ওঠো।

_ তুমি যাও আমি পরে খেয়ে নেবো।

_ না আমি তোমার মুখ দেখবো বের হও চাদরের নিচ থেকে।

তুলি বের তো হয় না উল্টো শক্ত করে চাদর ধরে রাখে।

_ আচ্ছা আমি যাচ্ছি দ্রুত উঠে খেয়ে নিও।

বলেই চাদর ছেড়ে দিয়ে সরে যায় ইমরান। ইমরানের সাড়া শব্দ না পেয়ে চাদরের নিচ থেকে মাথা বের করে ডোরের দিকে তাকায় তুলি। ইমরানকে দেখতে না পেয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। এলোমেলো আদোভেজা চুল গুলো হাত খোঁপা করে নেয়। বেড থেকে নামার জন্য উদ্যত হয়। নিজের বাম পাশে তাকাতেই চমকে উঠে লাফিয়ে পিছিয়ে যায়। বুকে হাত দিয়ে বেডে উপুর হয়ে বসে পড়ে। ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া। ইমরান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। না গিয়ে বেডের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তুলি হঠাৎ দেখে ভয় পেয়ে গেছে।

একটু পর সোজা হয়ে বসে তুলি। বুকে থু থু দিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ মা/রতে চাও নাকি ? না গিয়ে এভাবে ভূ/তের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন ?

হাতের জিনিস গুলো বেডের পাশে রেখে তুলির পা ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। গম্ভীর গলায় বলে,

_ বউ থাকতে বউ কে আদর না করে কীভাবে চলে যাই? যাওয়ার আগে বউ কে একটু আদর করবো না।

চোখ নামিয়ে নেয় তুলি। তুলির দুই গালে হাত রেখে বলে,

_ এত লজ্জা কোথায় থাকে ?

তুলি বলে না কিছু। ইমরান ঝুঁকে গিয়ে তুলির পুরো মুখে অসংখ্য চুমু এঁকে দেয়। খোঁপা করা চুল গুলো খুলে দিয়ে বলে,

_ তোমাকে খোলা চুলে বেশি সুন্দর দেখায়।

ইমরানের চোখে চোখ রাখে তুলি। লজ্জায় পুনরায় চোখ নামিয়ে নেয়। ইমরান জড়িয়ে ধরে বলে,

_ থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার। আসছি আমি ফ্রেশ হয়ে দ্রুত খেয়ে নিও কিন্তু।

_ আচ্ছা।

_ আমার পাওনা কিন্তু দাওনি তুমি।

বুঝতে না পেরে ইমরানের মুখের দিকে তাকায় তুলি।

_ কি পাও তুমি আমার কাছে ?

ইমরান ঝুঁকে এসে তুলির কানে কানে ফিসফিস করে বলে,

_ একটা চুমুও দাওনি তুমি। সব শুধু আমিই দেবো তুমি দেবে না ?

তুলি ফট করে ইমরানের দুই গালে হাত রাখে। টপাটপ কয়েক টা চুমু খেয়ে দ্রুত ইমরানের বুকে মুখ লুকায়। কি লজ্জা কি লজ্জা। মুচকি হাসে ইমরান। তুলির এলোমেলো চুল গুলো আরো এলোমেলো করে দেয়।

_ লেট হয়ে গেলো আসছি আমি , বাই।

তুলিকে ছেড়ে বেডে রাখা জিনিস গুলো হাতে তুলে নিয়ে ডোরের দিকে এগিয়ে যায়। বেড থেকে নেমে তুলিও যায় পেছন পেছন। ইমরান ফ্ল্যাটের বাইরে গিয়ে ডোর লাগানোর সময় তুলিকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে ভেতরে এসে তুলিকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খায়। তারপর আবার দৌড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,

_ বাই , ডোর ভেতর থেকে লক করে দাও।

বলতে বলতে চোখের আড়ালে চলে যায়। ইমরানের পাগলামি দেখে মুচকি হাসে তুলি। এক দিনে এত পরিবর্তন ? স্বপ্নের মতো লাগছে তুলির কাছে। মনে হচ্ছে ঘুম ভেঙে গেলে সব মিথ্যে হয়ে যাবে। আগের ইমরান ফিরে আসবে , এই ইমরান হারিয়ে যাবে।

স্বপ্ন হলে তুলি চায় এই স্বপ্ন শেষ না হোক। আর যদি বাস্তব হয় তাহলে এই ইমরান আর কোনো দিন পরিবর্তন না হোক।

ডোর লক করে নিজের রুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।

,

খাবার খেয়ে উঠতেই তুলির ফোন বেজে ওঠে। হাতে নিয়ে দেখে মিসেস ইরানী কল করেছেন। ফোন টা হাতে নিয়ে সোফায় এসে বসে। তারপর কল রিসিভ করে সম্মুখে ধরে।

_ কেমন আছিস তুলি ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি। কি করছিস ? খেয়েছিস ?

_ মাত্র খেয়ে উঠলাম।

_ ওহ , ইমরান কোথায় ? হসপিটালে চলে গেছে ?

_ হুম।

_ তোকে আজকে খুশি খুশি মনে হচ্ছে। কোনো কারণে খুশি নাকি ?

তুলির চোখে মুখে লজ্জারা এসে ভিড় জমায়।

_ আবার দেখি লজ্জাও পাচ্ছিস। ব্যাপার কি বল তো।

তুলি কিছু না বলে কল কেটে দেয়। ভীষণ লজ্জা করছে। রাতের ঘটনা স্মরণ হলেই লজ্জাবতীর ন্যায় নুইয়ে যাচ্ছে।

মিসেস ইরানী আবার কল করেন। তুলি কে/টে দিয়ে অডিও কল করে।

_ কিছু না বলে কল কে/টে দিলি কেন ?

_ কি বলবো ?

_ তোকে খুশি খুশি মনে হচ্ছে আবার লজ্জাও পাচ্ছিস। আমি যা ভাবছি তাই সত্যি নাকি ?

_ কি ভাবছো ?

_ ইমরান তোকে মেনে নিয়েছে ?

_ হুম।

আস্তে করে বলে।

_ তোরা রাতে একসাথে ছিলি ?

_ হুম।

এবারেও আস্তে করেই বলে। মিসেস ইরানী যে আন্দাজ করতে পেরে যাবেন ভাবেনি তুলি।

মিসেস ইরানী স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়েন। তুলি আর ইমরানের চিন্তায় কত রাত তিনি নির্ঘুম পাড় করেছেন সেটা তিনি আর আল্লাহ তায়ালা জানেন। সারাক্ষণ টেনশনে থাকতেন দুজনের কি হবে ? সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে ? দুজনের ভবিষ্যৎ কী ? নানান টেনশানে খেতে পারেন না , ঘুমোতে পারেন না। নামাজে বসে কত চোখের পানি ফেলেছেন। আল্লাহ কে বার বার বলেছেন তার ছেলেকে সুবুদ্ধি দেওয়ার জন্য। ইমরানের মনে তুলির প্রতি মায়া ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিতে। আজ যেন তার সেই সব টেনশন উধাও হয়ে গেলো। আল্লাহ তায়ালা ওনার দোয়া কবুল করেছেন। প্রাণ ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে বলেন ,

_ এই মীরাক্কেল টা হলো কিভাবে ?

তুলি খুলে বলে সব কিছু। সব শোনার পর মিসেস ইরানী এক প্রকার তব্দা ধরে থাকেন। তার মুখ টা কিঞ্চিৎ হা হয়ে গেছে। অবাক হয়ে বলেন ,

_ কি বলছিস তুলি ? শেষ পর্যন্ত তোকে আটকানোর জন্য তোর পা ধরে বসে ছিল !

_ হুম , শুধু পা ধরেনি কেঁদেছেও তোমার ছেলে।

_ আরো একটু শিক্ষা দেওয়া উচিত ছিল। তোকেও তো অনেক কষ্ট দিয়েছে।

_ আমাকে কষ্ট দিলেও আমি তো তাকে তার মতো করে কষ্ট দিতে পারলাম না মা।

_ যাই হোক যা হয়েছে ভালো হয়েছে। আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া।

মিসেস ইরানী একটু চুপ থেকে আবার বলেন,

বিজ্ঞাপন

_ শোন না মা তোদের দুজনের তো বেশ বয়স হয়েছে। বাচ্চা নিয়ে নে। ম/রা/র আগে যেন নাতি পুতি দেখে যেতে পারি।

_ ম/র/বে কেন ? আল্লাহর কাছে দোয়া করি আরো শত বছর বেঁচে থাকো তোমরা।

_ আচ্ছা তোকে পরে কল করছি। এখন ইমরানকে কল করে একটু জ্বা/লাই। বউ মানিনা মানবনা , বিয়ে মানিনা মানবনা করে করে মুখে ফ্যানা তুলে এখন বউ কে আটকানোর জন্য বউয়ের পা ধরে বসে থাকা !

দুই চার টা কথা শুনিয়ে আসি।

_ না থাক মা এখন আর এসব বলার দরকার নেই। এমনিতেই বলে মেয়েদের পেটে কথা হজম হয় না। এখন তুমি কিছু বললে বলবে আমার পেটে কথা হজম হয়নি সব বলে দিয়েছি তোমাকে।

_ আমি কি এমন কিছু বলবো নাকি ? আমি বলবো তোকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো আমাদের কাছে। তারপর ভালো ছেলে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দেবো।

_ স্ট্রোক করবে তোমার ছেলে।

_ দেখি কি করে।

_ না কিছু বলতে হবে না। কিছু বললে হয়তো সিরিয়াস ভাবে নেবে। রাতে কেমন করছিল তুমি তো জানো না। দেখলে বুঝতে পারতে। আর এখন হসপিটালে রয়েছে কিছু বলে বিভ্রান্ত করার দরকার নেই। কাজে মন বসাতে পারবে না, ভুল ভাল কিছু করে ফেলবে।

,

তুলির জিনিস পত্র সব কিছু ইমরানের রুমে নিয়ে আসে। এখন থেকে ও যখন এখানে থাকবে তখন ওর জিনিস গুলো কেন ওই রুমে থাকবে ? সব কিছু এনে সুন্দর করে পুরো রুম গোছায়। যদিও ইমরানের রুম সব সময় গোছানোই থাকে।

দুপুরে হালকা খাবার রান্না করে খায়। বিকেলে রান্না করবে যেন ইমরান গরম গরম টাটকা খাবার খেতে পারে।

বিকেলে বসে বসে টিভি দেখছিল। আজকে যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে রয়েছে। কিছুতেই সময় পেরিয়ে যাচ্ছে না।

অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।

হঠাৎ ফোনের ম্যাসেজ টোন বেজে ওঠে। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে ইমরানের ম্যাসেজ। ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। এর মধ্যে সময় বের করে দুবার কল করেছিল ইমরান।

ম্যাসেজ ওপেন করে দেখে লেখা আছে।

"রাতের খাবার রান্না করতে হবে না,বাইরে খাবো আজ"

এত টুকুই ম্যাসেজ। তবুও তুলির ভালো লাগে। আজকে যে ওর কত খুশি লাগছে। ডানা মেলে আকাশে উড়তে ইচ্ছে করছে।

,

দ্রুত ফিরতে চাইলেও ইমরানের ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে।

কলিং বেল চেপতেই তুলি ডোর খুলে দেয়। হাসি মুখে ভেতরে প্রবেশ করে ইমরান। তুলি ডোর লক করে দেয়। ইমরান তুলির দিকে তাকিয়ে বলে,

_ এখন তো হাগ দিতে পারবো না, হসপিটাল থেকে ফিরলাম।

তুলি হেসে বলে,

_ মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি ডাক্তার ?

_ একটু তো হয়েছেই।

_ সেটা রাতেই বুঝতে পেরেছি। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।

_ তুমিও ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নাও। আজ তোমাকে নিয়ে অটোয়ার রাস্তায় হাটবো। তোমার হাত ধরে হাটা হয়নি এখনো। মন খুলে কথা বলা হয়নি তোমার সাথে। আজ একে অপরের হাত ধরে হাটবো, একে অপরের মনের কথা শুনবো। সেই সাথে করবো জোস্না বিলাস।

তুলি ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইমরান তুলির হাত ধরে টেনে রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,

_ চলো রাত শেষ হয়ে যাবে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে।

ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নেয় দুজনেই। তুলি অফ হোয়াইট কালারের একটা গাউন পড়েছে সাথে ম্যাচিং হিজাব। ইমরান ক্যাজুয়াল শার্ট প্যান্ট পড়েছে তুলির সাথে ম্যাচিং করে।

দুজনেই আয়নার সামনে দাঁড়ায়। বেশ সুন্দর মানিয়েছে দুজন কে। ইমরান তো তুলির দিক থেকে চোখ ফেরাতেই পারে না। তুলির এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে বলে,

_ যাওয়া যাক ?

_ হুম।

দুজন এক সাথে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে।

লিয়াম দুপুরের দিকে টরন্টো শহরে ফিরে গেছে। দুদিন পর ফিরে আসবে। ওর এঙ্গেজমেন্ট ঠিক হয়ে গেছে। এঙ্গেজমেন্ট সেরেই চলে আসবে। ইমরান আর তুলি কেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল তবে ইমরানের ছুটি নেই বলে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু বিয়ের সময় ঠিকই নিয়ে যাবে।

সময় তখন সন্ধ্যা সাত টা। অটোয়ার রাস্তা নিয়ন আলোয় আলোকিত। অনেক কাপল ওদের দুজনের মতোই নিরিবিলি শান্ত রাস্তায় একে অপরের হাত ধরে হাঁটছে। কেউ কেউ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ আবার একে অপর কে কিস করছে রাস্তায় দাঁড়িয়েই খোলা মেলা ভাবে। এসব দেখে তুলি নাক মুখ কুঁচকে বলে ,

_ এরা এত নির্লজ্জ্ব কেন ? লজ্জা শরম নেই ? এদের ঘর বাড়ি নেই নাকি ? মানুষ কে দেখিয়ে দেখিয়ে এসব করতে হয় ?

ইমরান হেসে এক হাতে তুলিকে আগলে নিয়ে বলে,

_ এসব এখানে সাধারণ বিষয়। অহরহ এসব দেখা যায় রাস্তায়। এরা এর চেয়েও বেশি কিছু করে ফেলে রাস্তায়।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক টা পথ চলে আসে দুজন। হাঁটতে ভালো লাগছে। হঠাৎ তুলি ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ তুমি আমাকে চড় মেরেছিলে।

_ মনে আছে এখনো ? এই চড়ের জন্যই আমাকে অপছন্দ করতে নাকি ?

তুলি মাথা নাড়ায়। এই কারণেই অপছন্দ করতো।

তুলি ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইমরান সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে হাঁটতে বলে,

_ সেদিন যখন তুমি সোপিস টা ভাঙলে তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলে। সামনেই সোপিসের ভাঙ্গা খণ্ড গুলো পড়ে ছিল। আমি সামনে আগাতে নিষেধ করছিলাম বার বার কিন্তু তার পরেও তুমি সামনে এগিয়ে ভাঙ্গা খণ্ড গুলোর উপর পা দিয়েছিলে। তখন তোমার পা কে/টে গিয়েছিল। আমার কথা না শুনে পা কে/টে ফেলেছিলে তাই রেগে একটা চড় মে/রে/ছিলাম। মে/রে/ছিলাম সেটা মনে রেখেছো অথচ আদরও যে করেছিলাম সেটা ভুলে গেছো।

লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নেয় তুলি। আসলেই তো

মে/রে/ছিল সেটা মনে রেখেছে অথচ আদরও যে করেছিল সেটা ভুলে গেছে।

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশের একটা দোকানে হাওয়াই মিঠাই দেখতে পায় তুলি। এই দেশে হাওয়াই মিঠাই পাওয়া যায় ?

তুলির চোখ অনুসরণ করে তাকায় ইমরান।

_ তুমি দাঁড়াও আমি আসছি এক্ষনি।

_ কোথায় যাচ্ছো ?

_ দুই মিনিট।

তুলি আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। ইমরানকে রাস্তা পাড় হতে দেখে বুঝতে পারে কোথায় যাচ্ছে।

তুলি অবাক হয়, ও কিছুই বললো না অথচ ইমরান বুঝতে পেরে গেলো ! কিভাবে বুঝলো ? চোখ দেখে মন পড়ে ফেললো ? কিন্তু ওর চোখ ও তো দেখেনি।

ইমরান দুটো হাওয়াই মিঠাই নিয়ে ফিরে আসে। একটা পিঙ্ক অন্য টা কালার ফুল। দুটোই তুলির হাতে ধরিয়ে দেয়।

_ একটা তুমি খাও।

_ এসব খাই না, তুমি খাও।

_ দুটো দুই হাতে থাকলে কিভাবে খাবো ?

_ একটা আমার হাতে দাও।

তুলি একটা ইমরানের হাতে দিয়ে অন্য টা খুলে একটু ইমরানের মুখে পুরে দেয় জোর করে। তারপর নিজে খায়। দুজন একসাথে এগিয়ে যায় আবার। কত দূর যাবে জানে না দুজন। কয়েক টা রেস্টুরেন্ট পেছনে ফেলে এসেছে। ইমরান দেখে তুলির হাত ধরে হাঁটতে পারছে না। কিছু সময় তুলির দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকা তুলিকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়।

_ আরে কি করছো পড়ে যাবো তো।

_ আমি ধ্বংস না হলে তুমি পড়বে না।

তুলি ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইমরান ঝুঁকে তুলির কপালে চুমু আকে।

_ কি করছো ? পাবলিক প্লেস এটা।

_ কেউ দেখছে না। তুমি খাও।

তুলিকে কোলে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তুলির বেশ ভালো লাগছে ইমরানের কোলে চরে রাতের রাস্তায় এভাবে চলতে।

ইমরান সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে হাঁটতে বলে,

_ আমার কাছ থেকে তুমি এ যাবত যত টুকু কষ্ট পেয়েছো সেই সব কষ্ট আমি বিলীন করে দেবো অল্প সময়ে। আমার কাছ থেকে চুল পরিমাণ কষ্ট পাবে না তুমি আর হঠাৎ যদি কখনো আমি বেশি রেগে যাই তুমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে। তোমার জড়িয়ে ধরায় শান্তি আছে, রাগ বিলীন হয়ে যায়। তোমার ছোঁয়ায় যাদু আছে যা আমাকে শান্ত করবে। তোমার একটু ছোঁয়ায় আমার হৃদয় শীতল হয়। তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না আমি "তুমি পুরোটাই যাদু"। চব্বিশ ঘণ্টা ও হয়নি আমি তোমাতে হারিয়ে গিয়েছি। তোমাকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছি না। হসপিটালের একেক টা মিনিট আমার কাছে ঘণ্টার মতো মনে হয়েছে। তোমার কাছে ছুটে আসার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। আমদের প্রণয় অযাচিত হলেও এটা যেন হওয়ারই ছিল। সারা জীবন আগলে রাখবো তোমায় এই বুকের মাঝে শুধু তুমি থেকো এই বদরাগী বদমেজাজি ইমরানের পাশে।

আবেগে আপ্লুত হয় তুলি। শুধু শুধু চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এসেছে। এরকম কথা শুনে কারো চোখ দিয়ে পানি বের হয় ? কিন্তু তুলির হচ্ছে কারণ , এই কথা গুলো কোনো দিন ইমরানের মুখ থেকে শুনবে কল্পনাও করেনি, দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। অপ্রত্যাশিত, অকল্পনীয়, অযাচিত এই বাক্য গুলো তুলির মন দুলিয়ে তুলছে।

না চাইতেও চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে।

ডান হাতে ইমরানের পিঠ জড়িয়ে ধরে বুকের বা পাশে মাথা ঠেকায়। ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলে,

_ তুমি অনেক ভালো ডাক্তার সাহেব।

_ তুমিও।

বিজ্ঞাপন
অযাচিত প্রণয় গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক লাভস্টোরি