অযাচিত প্রণয়

পর্ব - ৮

🟢

ইমরান না পারছে কিছু বলতে আর না পারছে কিছু করতে। রাগে ফোস ফোস করতে করতে কফির মগে চুমুক দেয়। সাথে সাথেই আবার মুখের কফি ফেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। জিহ্ববা টা বোধহয় পু/ড়ে গেছে। লিয়াম আর তুলি ও দাঁড়িয়ে যায়। ইমরান দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়।

কফির মগ রেখে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে পানি খায়।

কফির মগ হাতে নিয়ে কফি বেসিনে ঢেলে ফেলে দেয়। এখন আর কফি খাওয়ার মুড নেই।

তুলি এগিয়ে আসে কিচেনে।

_ জিহ্ববা পু/ড়ে গেছে ?

_ যা সামনে থেকে।

_ ভালো কথা জিজ্ঞেস করলাম তাতেও ভালো লাগছে না ?

_ তোকে জিজ্ঞেস করতে বলেছি ?

_ মানবতার খাতিরে জিজ্ঞাসা করলাম।

_ তোর মানবতা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখা।

_ চেনা জানা হলে দেখাবো ইনশা আল্লাহ।

_ তুই যাবি সামনে থেকে ?

_ নাহ্।

ইমরান নিজেই কিচেন থেকে বেরিয়ে যায়। অসহ্যকর মেয়ে একটা।

তুলি ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। দুপুরে খাওয়ার জন্য রান্না করতে হবে। দুপুর প্রায় হয়েই এসেছে।

ফ্রিজ খুলে টাটকা টাটকা সবজি, মাছ দেখতে পায়। ইমরান মার্কেটে গিয়েছিল ? কখন গেলো ? তুলি ঘুম থেকে ওঠার আগেই গিয়েছিল ? যখনই যাক তাতে ওর কি ? সব কিছু যখন আছে তখন রান্না করবে আর খাবে। ডাক্তার জামাই কে ফকির জামাই বানিয়েই ছাড়বে। খেয়ে খেয়েই ইমরানের ব্যাংক ব্যালেন্স জিরো করে দেবে। কথা গুলো ভেবেই মুচকি হাসে।

ফ্রিজ থেকে গরুর মাংস, মাছ আর সবজি বের করে

রান্নার জন্য সব কিছু গুছিয়ে নিতে শুরু করে।

ইমরান সোফায় এসে বসে আবার। এখন আরাম লাগছে। জিহ্ববা টা পু/ড়ে গেছে বোধহয়। কেমন যেন হয়ে গেছে এখন।

_ ইমরান তুলিকা তোমার কি হয় ?

_ বউ।

বুঝতে পারে না লিয়াম কারণ বউ শব্দ টা ইমরান বাংলায় বলেছে। কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে ,

_ কি ?

_ আমার ওয়াইফ।

"আমার ওয়াইফ" বাক্য গুলো শুনে চমকে ওঠে লিয়াম। বিশ্বাস করতে পারছে না ইমরান বিয়ে করেছে।

_ সত্যি বলছো নাকি মজা করছো ?

_ সত্যি কথা , মিথ্যে কেনো বলবো ?

_ তুমি বিয়ে করলে আর আমাকে জানালেও না !

_ তোমাকে জানানোর মত পরিস্থিতি ছিলো না।

_ কেনো ?

কিভাবে বিয়ে টা হয়েছে খুলে বলে ইমরান। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে লিয়াম এর কাছে। সব শুনে খুশি হয় লিয়াম। যাই হোক শেষমেষ ওর রসকষ হীন কাঠখোট্টা নিরামিষ বন্ধুটা বিয়ে করেছে তাহলে। মেয়ে মানুষে তো এর এলার্জি ছিল। মেডিকেলে পড়া কালীন সময়ে বেশ কয়েক জন বাঙ্গালী মেয়ে ইমরানের প্রেমে পড়েছিল। প্রোপোজ ও করেছিল কিন্তু এই মুডি বয় রসকষহীন মানবের মনে প্রেম জাগেনি কখনো। সব সময় নিজের স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টায় থেকেছে। প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে , মেয়ে এই সবের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না ইমরানের। ওর কথা প্রেম, ভালোবাসা , বিয়ে , মেয়ে এসব বড় একটা ঝামেলা। আর এই ঝামেলা কোনো দিন নিজের জীবনে টেনে আনবে না , জায়গা দেবে না নিজের জীবনে। সারা জীবন একা একাই পাড় করে দেবে। বেঁচে থাকলে বিয়ে করতেই হবে এরকম কিছু না। তাহলে কেনো শুধু শুধু এসব করতে যাবে ? একা একা কত সুখে আছে , বিন্দাস লাইফ, কোনো ঝামেলা নেই , প্যারা নেই।

ইমরানের এই কথা গুলো প্লে বয় ফ্লাটিং মাস্টার লিয়াম যখন শুনতো তখন নিজের মতো করে ইমরানকে বোঝানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু ইমরান বুঝতো না কিছু। ওর মাথায় ও অনেক বুদ্ধি আছে। কেনো শুধু শুধু নিজের জীবনে ঝামেলা টেনে নিয়ে আসবে ?

ইমরান লিয়াম অনেক টা সময় ধরে গল্প করে। তারপর লিয়াম চলে যায় নিজের ফ্ল্যাটে। আগামী কাল থেকে হসপিটালে জয়েন করবে ইমরান। আজকে লিয়াম এর সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। আগামী কাল লিয়াম নিজেও হসপিটালে জয়েন করবে।

__________________

মাঝ খানে অনেক গুলো দিন পেরিয়ে যায়।

ইমরান নিজের কাজ নিজে করে। তুলির কাজ তুলি নিজে করে। দুজন একসাথে কখনোই কিচেনে রান্না করতে যায় না। ইমরান রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আগে রান্না করে।

তুলি ঘুম থেকে দেরি করে ওঠে। রান্না করে ইমরান চলে যাওয়ার পর।

একে অপরের সাথে দেখা হয় ইমরান হসপিটাল থেকে ফিরে আসলে। সকাল বেলা খুব একটা দেখা হয় না দুজনের। আর দুপুরে ইমরান ফ্ল্যাটে আসে না।

এর মধ্যে প্রায় সময় সন্ধ্যার পর লিয়াম ওদের ফ্ল্যাটে আসে। তুলির সাথে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। দুজনের সাথে গল্প স্বল্প করে চলে যায়।

এখন সন্ধ্যা সাত টা বাজে। আজকে এখনো ফেরেনি ইমরান। অন্য দিন এর আগেই চলে আসে।

তুলি কিচেনে এগিয়ে যায় রান্না করার জন্য।

ফ্রিজ থেকে মাছ মাংস বের করে ভিজিয়ে রাখে। চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। রান্নার জন্য পেঁয়াজ মরিচ কুচি করতে শুরু করে।

এর মধ্যে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ইমরান। তুলি কিচেন থেকে উঁকি দিয়ে দেখে ইমরান কে। কিন্তু মুখ দেখতে পায় না তুলি, ইমরান নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

তুলি পুনরায় রান্নায় মনোযোগ দেয়।

তুলি একবার তরকারি রান্না করে দুদিন খায়। শুধু ভাত প্রত্যেক দিন দুবার রান্না করে।

ঘণ্টা খানিক পর ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা কিচেনে চলে আসে। তুলিকে দেখে কপাল ভ্রু কুঁচকে যায়। তুলি একবার ইমরানের দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।

_ তুমি এখন কেনো কিচেনে ?

_ রান্না করতে।

_ সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। এখন আমি রান্না করবো জানো না ? বিকেলে কি করেছো যে রান্না করো নি তখন !

_ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

_ এত ঘুম কোথায় থাকে তোমার ?

তুলি চোখ দুটো বড় বড় করে ইমরানকে দেখিয়ে বলে ,

_ এখানে।

_ বের হও এখান থেকে।

_ আর দশ মিনিট।

তুলি একটু থেমে আবার বলে ,

_ আমি বেশি করে রান্না করেছি আজ তুমি চাইলে আমার রান্না করা খাবার খেতে পারো।

বিজ্ঞাপন

ইমরান গম্ভীর গলায় বলে,

_ নো নিড।

তুলি চোখ উল্টে , মুখ ভেংচি কে/টে , ঢং করে শরীর দুদিকে নাড়িয়ে বলে,

_ নো নিড।

বিরক্ত হয় ইমরান। তবে মুখে কিছু বলল না।

তুলি দ্রুত নিজের কাজ শেষ করে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে রুমে চলে যায় হাত মুখ ধোয়ার জন্য। ঘামে চিটচিটে হয়ে গেছে হাত মুখ শরীর।

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে আসতেই কলিং বেল বেজে ওঠে। তুলি জানে নিশ্চই লিয়াম এসেছে।

লিয়াম জবের সূত্রে অটোয়া শহরে থাকে। ওর পুরো ফ্যামিলি থাকে টরন্টো শহরে। এখানে ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড ইমরান। ইমরান আর লিয়াম এর পার্সোনালিটি আলাদা হলেও দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্ক। সময় পেলে লিয়াম ইমরানের সাথেই সময় কা/টায়। তবে আগে ইমরানের ফ্ল্যাটে আসতো খুবই কম। বাইরেই ঘুরতে যেতো বেশি। তবে তুলি আসার পর থেকে বাইরে ঘুরতে বের হয় না বোধহয়। সময় পেলে ইমরানের ফ্ল্যাটে চলে আসে।

ডোর খুলে দিতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লিয়াম এর হাস্যোজ্বল চেহারা। ছেলে টা কি সুন্দর করে যে হাসে। সৌজন্য মূলক তুলিও হাসে।

_ কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন ?

_ ভালো।

সাইট হয়ে দাঁড়ায় তুলি। ভেতরে প্রবেশ করে লিয়াম।

সোজা গিয়ে বসে সোফায়। ইমরান কিচেন থেকেই দেখে লিয়াম এসেছে। নিজের নুডুলস রান্নায় মনোযোগ দেয়। চিকেন নুডুলস রান্না করছে।

তুলি এসে পাশের সোফায় বসে।

_ ইমরান কোথায় ?

_ কিচেনে।

_ এখন কিচেনে কি করে ?

_ রান্না।

লিয়াম ভ্রু কুঁচকে কিচেনের দিকে তাকায়। কিছু একটা ভেবে বলে ,

_ তোমরা আলাদা আলাদা খাবার রান্না করে খাও নাকি ?

_ হুম।

_ হাসবেন্ড ওয়াইফ হয়ে , এক ফ্ল্যাটে থেকেও আলাদা আলাদা খাও ?

_ হুম ।

_ তুমি বাঙ্গালী খাবার খাও ?

_ হ্যাঁ।

_ ইমরানকে তো কখনো বাঙ্গালী খাবার রান্না করে খেতে দেখিনি। আমাদের মতই ঘাস পাতা আর নুডুলস রান্না করে খায় সব সময়। মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টে বাঙ্গালী খাবার খেতে দেখেছি।

তুলি চুপ করে শোনে লিয়াম এর কথা। মনে মনে বলে,

_ বাঙ্গালী হয়েও বাঙ্গালী দের খাবার রান্না করে খাওয়ার মুরোদ নেই।

লিয়াম আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করে,

_ কি কি রান্না করলে তুমি ?

_ মাছ ভাজা, মাংস ভুনা, আর চিংড়ি মাছের ঝোল। সাথে গরম গরম ভাত।

_ ইমরান এসব খায় না কেনো ? তোমার রান্নাই তো খেতে পারে, তাহলে আর হসপিটাল থেকে ফিরে কষ্ট করে রান্না করতে হয় না।

তুলি লিয়াম এর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলে,

_ আপনার ফ্রেন্ড একজন মুডি বয় , ইগো ওয়ালা সেটা তো জানেন নিশ্চই !

_ হুম।

_ তার এই মুড আর ইগোর জন্য খায় না।

_ ওওও।

তুলি কিছু একটা ভেবে বলে,

_ আপনি কখনো বাঙ্গালী খাবার খেয়েছেন ?

_ ইমরানের সাথে একবার খেয়েছিলাম ভালো লাগেনি তাই আর পরবর্তীতে খাইনি কখনো।

_ আজকে আমার রান্না খেয়ে দেখেন কেমন হয়েছে।

তুলির অফার শুনে চুপ করে রইলো লিয়াম। লিয়াম এর মুখের ভাব ভঙ্গি দেখে তুলি আবার বলে,

_ টেস্ট করে দেখতে পারেন আগে। ভালো লাগলে খাবেন , না লাগলে খাবেন না।

_ ওকে।

যেহেতু তুলি রান্না করেছে সেহেতু খাওয়াই যায়। অন্য কেউ অফার করলে জীবনেও খেতো না।

লিয়াম সব সময় বাইরের খাবার খায়। নিজে রান্না করে খায় না কখনোই। ইমরান খাওয়ার অফার করলেও খায় না।

তুলি লিয়ামকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে যায়। তখনই নুডুলসের বাটি নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে কপালে। তুলির পাশে লিয়ামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সরু চোখে তাকায় ইমরান।

নুডুলসের বাটি টা টেবিলের উপর রেখে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে নেয়। তারপর চেয়ার টেনে বসে। তুলি একটা প্লেটে মাংস আর চিংড়ি তুলে দেয় একটু একটু করে। দাঁড়িয়ে থেকেই চামচের সাহায্যে প্লেট থেকে এক পিস মাংস মুখে পুরে চিবুতেই চোখ বন্ধ করে নেয়। আহা কী স্বাদ।

একটু সময়ের মধ্যে প্লেট ফাঁকা করে লিয়াম। তুলির দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্বল মুখে বলে ,

_ তুমি তো দারুন রান্না করো তুলি। অসম্ভব ভালো হয়েছে তোমার রান্না।

_ আপনি একটু বেশি বেশিই বলেছেন ভাইয়া।

_ একদম না, আমি ঠিকই বলছি। অনেক দিন পর এমন রান্না খেলাম। সত্যিই অনেক ভালো রান্না করো তুমি।

_ ধন্যবাদ। ভাত দিয়ে খান আরো ভালো লাগবে।

লিয়াম এর খেতে ইচ্ছে করলো। তাই আর না করলো না। একটা চেয়ার টেনে বসে। তুলি নিজেও একটা চেয়ার টেনে বসে। দুটো প্লেটে ভাত বেড়ে নেয়। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ নুডুলস আর কত খাবে ? আমাদের সাথে ভাত খাও।

_ এমন ভাবে বলছো যেনো আমি শত বছর ধরে ভাত খাই না। যাকে খাওয়াতে বসেছো তাকেই খাওয়াও আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।

তুলি আর ইমরান বাংলায় কথা বলায় লিয়াম কিছুই বুঝতে পারে না। ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ ইমরান ভাত খাও , রান্না টা অনেক ভালো হয়েছে।

_ তুমি খাও আমি খাবো না।

লিয়াম ও আর কিছু বলে না।

তিন জনেই খাওয়া শুরু করে। ইমরান চুপ চাপ খেলেও তুলি আর লিয়াম কথা বলতে থাকে। ইমরানের রাগ হলেও চুপ করে থাকে। খাওয়ার সময় কেনো এত কথা বলতে হবে ? চুপ চাপ খাওয়া যায় না ? কোনো দিকে না তাকিয়ে বাটির দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে খেয়ে যায় এক মনে। তারপর মনে মনে বলে,

_ চা কফি বাদে অন্য কিছু খেতে বললে তো খায় না। আর এখন তুলি রান্না করে খেতে বলেছে অনমি গপগপ করে গিলছে শুধু। রা/ক্ষ/স একটা বেশি বেশি খা তেল মসলা দেওয়া খাবার । তারপর খেয়ে খেয়ে অল্প দিনেই ভুরি বড় কর।

বির বির করে নিজের সামনে বসে থাকা দুজনের দিকে তাকায়। দুজন এখনো হেঁসে হেঁসে কথা বলছে।

বিজ্ঞাপন
অযাচিত প্রণয় গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক লাভস্টোরি