অযাচিত প্রণয়

পর্ব - ৭

🟢

পরের দিন তুলি ঘুম থেকে ওঠে বেলা এগারোটায়। শান্তির ঘুম ঘুমিয়েছে আজ। গত রাতে যতটা খারাপ লেগেছে এখন ঠিক ততটাই ভালো লাগছে। বেড থেকে নেমে হেলে দুলে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে ড্রেস নিয়ে।

একে বারে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে।

ভেজা চুল গুলো টাওয়েল দিয়ে মুছে নেয়। তার পরও এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে টুপ টাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে না শুকালে হবে না। ওর হেয়ার ড্রায়ার টা নিয়ে আসেনি। এখন ইমরানের টা দিয়ে কাজ চালাতে হবে। পরে শপিং মলে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব কিনে নিয়ে আসবে।

চুল গুলো মুক্ত করে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ক্লান্তি আর ঘুমের কারণে ফ্ল্যাট টা দেখা হয়নি গত কাল ভালো ভাবে।

ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে আশে পাশে নজর বুলায়। ফ্ল্যাটে দুটো বেড রুম, দুই রুমেই এটাচ বাথরুম আছে। ড্রইং রুম আর কিচেন। তুলির রুমে বেলকনি নেই, ইমরানের রুমে হয়তো আছে। বেশ সুন্দর করে সাঁজানো গোছানো ড্রইং রুম টা। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের রুমের দিকে তাকায়। ডোর খোলাই রয়েছে। এগিয়ে যায় সেদিকে। ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। তবে ইমরানকে দেখা গেলো না। হাত দিয়ে ডোর নক করে, ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না।

_ ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি জেগে আছো ? কথা বলছো না কেনো ?

গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। পরনে রয়েছে টু কোয়ার্টার প্যান্ট। ফর্সা লোমশ ঠ্যাং দুটো বেরিয়ে আছে। গায়ে কোনো পোশাক নেই , উদাম গা। ভেজা চুল গুলো কপাল ময় ছড়িয়ে রয়েছে। চোখ দুটো প্রায় ঢেকে রেখেছে ভেজা চুল গুলো।

টাওয়েলের এক পাশ দিয়ে চুল মুছতে মুছতে তুলির সামনে এসে দাঁড়ায়। তুলি ইমরানের পা থেকে মাথা অব্দি পরখ করে নিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি স্থির করে দাঁড়িয়ে রইলো। এই লোক বাংলাদেশ থেকে আসতে না আসতেই নিজের রূপ বদল করে নিলো ! অর্ধ ন গ্ন হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নি/র্ল/জ্জে/র মতোন।

এক দিনেই লজ্জা সরম সব শেষ। বাংলাদেশে সাধু সেজে থেকেছে আর এখানে এসেই এই রূপ।

_ কি হয়েছে চিল্লাচ্ছিস কেনো এভাবে ? জানিস না এটা ভদ্র সভ্য লোকের ফ্ল্যাট ? এই ফ্ল্যাটে চিৎকার চেঁচামেচি করা নিষেধ। চিৎকার চেঁচামেচি করে নিজেকে অস/ভ্য অভ/দ্র প্রমাণ করবি না।

ফট করে ইমরানের মুখের দিকে তাকায় তুলি। চোখে মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে বলে ,

_ আমি নিজেকে অস/ভ্য অভ/দ্র প্রমাণ করছি ? তুমি নিজেই তো একটা নির্ল/জ্জ্ব পুরুষ মানুষ। একটা মেয়ের সামনে এভাবে আসতে লজ্জা করে না ?

ইমরান নিজের দিকে তাকিয়ে আবার তুলির দিকে তাকায়। গম্ভীর স্বরে বলে,

_ কিভাবে এসেছি আমি ? আমার পরনে কি ড্রেস নেই ? আমি কি ড্রেস ছাড়া নাকি ? লজ্জা কেনো করবে ? আশ্চর্য্য। কি জন্য ডাকছিস সেটা বল।

_ হেয়ার ড্রায়ার টা দাও।

_ তোর হেয়ার ড্রায়ার আমার কাছে নেই।

_ আমার টা না , তোমার টা।

_ আমার টা কেনো দেবো ?

_ কারণ আমার নেই তাই।

_ কেনো নেই ?

তুলি রাগে গজগজ করতে করতে ইমরানের সামনে থেকে চলে যায়। নিজের দেশ ছাড়তে না ছাড়তেই

পা/গ/ল হয়ে গেছে এই লোক। অর্ধ ন্যাং/টা হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আবার একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। পেছন থেকে ইমরান গলা ছেড়ে বলে,

_ টেবিলে খাবার রাখা আছে খেয়ে নিস অলস মেয়ে কোথাকার।

তুলি কোনো কিছু না বলে সোজা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে চেয়ার টেনে খাবার খাওয়ার জন্য। ঢাকনা তুলে খাবার দেখে নাক মুখ কুঁচকে নেয়। একটা আপেল, দুটো সিদ্ধ ডিম, পাউরুটির দুটো পিস, জ্যাম আর একটা কলা। ভেবেছিল ইমরান ভালো মন্দ খাবার রান্না করেছে। যাই হোক যা রেডি করে রেখেছে তাই খাবে এখন। কষ্ট করে আর রান্না করতে হলো না। ভালোই হলো ওর জন্য , খিদেও পেয়েছে ভীষণ।

খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। প্লেট বাটি গুছিয়ে রেখে সোফায় এসে বসে আরাম করে।

ইমরান হেয়ার ড্রায়ার আর নিজের ফোন টা হাতে নিয়ে এসে বসে তুলির পাশে দূরত্ব বজায় রেখে।

_ নাও ধরো।

ঘাড় কাত করে তাকায় তুলি। গিরগিটি একটা, মিনিটে মিনিটে রূপ বদলায়।

_ তাকিয়ে তাকিয়ে চেহারা কি দেখছো ? ফোন টা নিয়ে বাংলাদেশে কথা বলো।

হাত বাড়িয়ে ফোন টা হাতে তুলে নেয় তুলি। লক দেওয়া নেই ফোনে। প্রথমে মায়ের ফোনে কল করে। বাবা মা ভাই এর সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে। কথা বলতে বলতে বেশ ইমোশনাল হয়ে যায় তুলি। কান্না পাচ্ছে ভীষণ সকল কে ছেড়ে এসে।

তারপর কল করে শাশুরি মায়ের ফোনে। সকলের সাথে কথা বলে অনেক টা সময়। ওদের এখানে বেলা বারোটা বাজলেও বাংলাদেশে তখন রাত প্রায় দশ টা।

সকলের সাথেই কথা বলে। ইমরান ও কথা বলে। ইমরান গত রাতেও বাবা মা আর শাশুরি মায়ের সাথে কথা বলেছিল। তুলি তখন ওয়াশরুমে ছিল যার কারণে কথা বলতে পারেনি। বাড়ির কেউ আর ওদের ডিস্টার্ব ও করেনি।

ইমরান হেয়ার ড্রায়ার টা তুলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,

_ তোমার ফোন টা নিয়ে আসো ওয়াইফাই কানেক্ট করে দেই।

_ ওয়াইফাই আছে ?

_ থাকবে না কেনো ?

_ তাহলে গত কাল কেনো বলোনি ?

বিজ্ঞাপন

_ মনে ছিল না।

সোফা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় তুলি। আগে চুল গুলো শুকিয়ে বেঁধে নেয়। তারপর ফোন টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রইং রুমে এসে দেখে সোফায় লিয়াম বসে আছে ইমরানের পাশে। কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে দুজন। তুলি লিয়াম এর সামনে যেতে চায় না, পরমুহুর্তেই কিছু একটা ভেবে এগিয়ে যায় ওদের দুজনের সামনে। তুলিকে দেখতেই লিয়াম এর চোখে মুখে খুশির ঝিলিক খেলে যায়। ছেলে টা এমনিতেও হাসি খুশি স্বভাবের। অন্য সব ডাক্তার দের মত গুরুগম্ভীর না। হাসি মুখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তুলির দিকে হাত বাড়িয়ে বলে ,

_ হাই তুলিকা।

তুলি নিজেও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে হেঁসে বলে বলে ,

_ হ্যালো।

_ কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপনি কেমন আছেন ?

_ হুম ভালো। তোমার কথাই ইমরানকে জিজ্ঞেস করছিলাম এতক্ষণ।

_ কেনো ?

_ এমনি, বসো সোফায়।

_ হুম।

তুলি ইমরানের পাশে বসে নিজের হাতের ফোন টা এগিয়ে দেয় ইমরানের দিকে।

ইমরান ফোন টা হাতে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বাংলায় বলে ,

_ অন্য পুরুষের সাথে কেনো এতো হেসে হেসে কথা বলতে হবে ? হ্যান্ডসেক কেনো করতে হবে ?

তুলি অবাক হওয়ার ভান ধরে বলে,

_ অন্য পুরুষ কোথায় ? বরের বন্ধু মানে আমারো বন্ধু। বন্ধুর সাথে সবাই হেঁসে হেসেই কথা বলে। আর হ্যান্ডসেক করলে সমস্যা কোথায় ?

_ আমার বন্ধু বলে ও তোরো বন্ধু ?

_ হ্যাঁ অবশ্যই।

_ এখন ও যদি বলে , "বন্ধুর বউ মানে আমারো বউ"। তাহলে তুই ওর বউ হয়ে গেলি ?

_ হ্যাঁ অবশ্যই।

ইমরানের শক্ত চোখ মুখ আরো শক্ত হয়ে যায়। তুলি কি বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে তাড়াহুড়ো করে বলে ,

_ এই না না আস্তাগফিরুল্লাহ , আস্তাগফিরুল্লাহ , আস্তাগফিরুল্লাহ একদম না। ওর বউ হতে যাবো কেনো আমি ?

_ প্রথমে তো স্বীকার ঠিকই করলি।

তুলি দাঁত কপাটি বের করে বলে,

_ জেলাসী ফিল হচ্ছে ?

_ জেলাসী হবে কেনো ?

_ তুমি তো আমাকে তোমার বউ হিসেবে মানোই না। সেখানে ও আমাকে নিজের বউ বলে দাবি করবে কিভাবে ? উল্টো বলবে "বন্ধুর বোন মানে আমারো বোন"।

লিয়াম ওদের দুজনের কথপোকথন বুঝতে না পেরে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দুজনের মুখের দিকে। নিজস্ব ভাষায় কি বলছে দুজন ? দেখে মনে হচ্ছে ইমরান কিছুটা রেগে আছে। রেগে গেলে ইমরানের কপাল আর ঘাড়ের রোগ গুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। এখনো তাই হয়েছে।

তুলির ফোনে ওয়াইফাই কানেক্ট করে দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায় ইমরান।

লিয়াম তুলির মুখের দিকে তাকায়। হেসে বলে,

_ তোমার এখানে আসার কারণ কি ? স্টাডি নাকি অন্য কিছু ?

তুলি কিছু বলবে তার আগেই ইমরানের গলার স্বর ভেসে আসে।

_ লিয়াম চা নাকি কফি কোন টা খাবে ?

_ চা।

চুলায় পানি গরম হতে দিয়ে সোফায় বসে থাকা তুলি আর লিয়াম এর দিকে তাকায় ইমরান। লিয়াম এর পরনে ওর মতোই টু কোয়ার্টার প্যান্ট। শ্বেতাঙ্গ ঠ্যাং দুটো বেরিয়ে আছে। গায়ে ঢিলে ঢালা হোয়াইট টিশার্ট। ব্ল্যাক কালার চুল গুলো তুলনামূলক একটু বড়। নিঃসন্দেহে ইমরানের থেকে লিয়াম বেশি হ্যান্ডসাম। লিয়াম এর চোখের মণি দুটো নীলচে বর্ণের। যার জন্য লিয়ামকে আরো বেশি ভালো লাগে। লিয়াম যখন হাসে তখন আরো বেশি ভালো লাগে দেখতে।

তুলির সাথে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে হাসছে লিয়াম, সাথে তুলিও হাসছে। রাগ হয় ইমরানের।

তাড়াতাড়ি চা কফি বানিয়ে নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। লিয়াম এর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে দুজনের মাঝ খানে বসে পড়ে ইমরান।

তুলির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে বলে,

_ ওর সাথে এত কিসের হাসাহাসি ? ও ডক্টর হলেও এক নাম্বারের প্লে বয়। ফ্লাটিং করতে এক্সপার্ট। তাই ওর সাথে কম কথা বলবে।

_ তো কি হয়েছে ? ভারী মিষ্ট স্বভাবের একজন মানুষ। কি সুন্দর করে কথা বলে , তোমার মতো খ্যাপা স্বভাবের হবে নাকি ? যে কিনা কথায় কথায় খ্যাক খ্যাক করবে ? জীবন সঙ্গী হলে তো লিয়াম এর মতোই হওয়া উচিত। একদম পার্টনার ম্যাটেরিয়াল।

গরম চোখে তুলির দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান।

বিজ্ঞাপন
অযাচিত প্রণয় গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক লাভস্টোরি