অযাচিত প্রণয়

পর্ব - ৬

🟢

লম্বা এক জার্নি শেষে কানাডায় এসে পৌঁছায় ইমরান আর তুলি। এয়ারপোর্টে থেকে বেরিয়ে আসতেই নজরে আসে লাল রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লিয়াম এর দিকে। ইমরানকে নেওয়ার জন্যই এসেছে লিয়াম। লিয়াম কানাডিয়ান। ইমরান আর লিয়াম খুব ভালো বন্ধু। দুজন একই সাথে ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে। এখন একই হসপিটালে কর্মরত আছে দুজন। দুজন থাকেও একই ভবনে তবে আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে।

ইমরান এগিয়ে আসে লিয়াম এর কাছে। ওর সাথে সাথে এগিয়ে আসে তুলি। ইমরানের দুই হাতে দুটো সুটকেস, একটা ওর আরেক টা তুলির।

ইমরানের পাশে মেয়ে মানুষ দেখে চোখ দুটো ছোট ছোট হয় লিয়াম এর। কে এই মেয়ে ?

তুলির পা থেকে মাথা অব্দি নজর বুলিয়ে নেয় লিয়াম। তুলির পরনে ব্ল্যাক কালার গাউন বোরকা। মুখে মাস্ক সাথে ব্ল্যাক হিজাব বাধা। মুস্তাফিজুর রহমান তুলির জন্য বোরকা হিজাব কিনে এনেছিলেন। এমনিতেও তুলি বাড়ির বাইরে বের হলে বোরকা হিজাব পরেই বের হতো সব সময়। যদিও সেভাবে পর্দার নিয়ম পালন করে না। তার পরও বোরকা হিজাব পরেই বের হতো।

লিয়াম এর দৃষ্টি অনুসরণ করে ইমরান নিজেও তুলির দিকে তাকায়। তারপর আবার লিয়াম এর মুখের দিকে তাকায়।

_ কেমন আছো লিয়াম ?

_ ভালো , তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ।

_ ও কে হয় তোমার ?

_ ও তুলিকা জান্নাত , আর তুলি ও আমার কানাডিয়ান ফ্রেন্ড লিয়াম।

লিয়াম হাত বাড়ায় তুলির দিকে হ্যান্ডসেক করার জন্য।

তুলি হাত বাড়ানোর আগেই ইমরান নিজেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে। তারপর বলে ,

_ দ্রুত চলো আমরা ভীষণ ক্লান্ত।

লিয়াম কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু বললো না। তুলির সাথে হ্যান্ডসেক করতে চাইল কিন্তু বাধ সাধলো ইমরান। বেচারার খুশি খুশি মনটা ফুড়ুৎ করে অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে গেলো।

কারে উঠে বসে তিন জন। পেছনে বসে তুলি আর ইমরান। ড্রাইভিং সিটে লিয়াম। কার স্টার্ট করে ছুটে চলে অটোয়ার দিকে।

রাতের সুন্দর পরিবেশ আর রাস্তা দেখে মুগ্ধ তুলি। অবাক হয়ে শুধু বাইরের পরিবেশ দেখে যায়।

ইমরান কারের সিটে হেলান দিয়ে বসে লিয়াম এর সাথে কথা বলতে থাকে।

,

লিয়াম এর কার এসে দাঁড়ায় একটি বহুতল ভবনের সামনে। কারের ভেতর থেকে বেরিয়ে ভবনের উপরের দিকে তাকায় তুলি। এই ভবনে কয়টা ফ্লোর আছে ?

ইমরান কারের ভেতর থেকে সুটকেস দুটো বের করে নেয়। লিয়াম কার পার্ক করতে চলে যায়।

তিন জন একসাথে ভেতরে প্রবেশ করে। লিফটে চড়ে নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে থামে। তারপর এগিয়ে যায় নিজ নিজ ফ্ল্যাটের দিকে।

লিয়াম এর অনেক কিছু জানার আগ্রহ থাকলেও এখন প্রকাশ করলো না। পরে জিজ্ঞেস করবে ইমরান কে।

নিজের ফ্ল্যাটে এসে ড্রইং রুমে দাঁড়ায় ইমরান। আশে পাশে নজর বুলায় তুলি। ইমরান তুলির সুটকেস তুলির দিকে ঠেলে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

_ তুমি ওই রুমে থাকবে। আর ওটা আমার রুম, ভুলেও আমার রুমে প্রবেশ করবে না। যা যা প্রয়োজন হবে বলবে আমি এনে দেবো। নিজের রান্না নিজে করে খাবে, আমি কাউকে রান্না করে খাওয়াতে পারবো না। আমার জন্যও রান্না করতে হবে না তোমার , আমি নিজের রান্না নিজে করেই খাবো। তোমার যা ইচ্ছে করতে পারো, আমার কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে আসবে না। একদম বউয়ের অধিকার ফলাতে আসবে না। তুমি তোমার মতো, আমি আমার মতো।

তুলি তো ভেবেছিল ইমরান ওকে আলাদা ফ্ল্যাটে রাখবে। ওর মুখও দেখবে না কোনো দিন। সেই প্রথম দিন গুলোর মতোই খ্যাক খ্যাক করে কথা বলবে। যাই হোক ইমরান যা যা বলেছে তুলি তাই মেনে নিয়ে বলে,

_ ঠিক আছে। তুমিও আমার রুমে আমার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করবে না। আমার কোনো বিষয়ে নাক গলাতে আসবে না। স্বামীর অধিকার ফলাতে তো একদমই আসবে না।

নিজের রুমের দিকে চলে যায় ইমরান। তুলি নিজেও পাশের রুমে চলে আসে। রুম টা তুলির বেশ পছন্দ হয়েছে। খুব বেশি বড়ও না আবার ছোটও না। মজার ব্যাপার হচ্ছে সব কিছুর রঙ অফ হোয়াইট আর ধূসর রঙের। যার জন্য রুমের সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে।

খুব বেশি কিছু নেই রুমে , বেড , ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, দুটো সিঙ্গেল সোফা, একটা ছোট কেবিনেট, আর ছোট একটা গোল টেবিল। ছিমছাম সাজের রুম টা দেখতে চমৎকার।

বোরকা হিজাব খুলে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ফ্রেশ হয়ে এসেই উপুর হয়ে বেডে শুয়ে পড়ে।

মনে পড়ে বাবা , মা, ভাই , শশুর , শাশুরি আর কামরানের কথা।

বেডের উপর রাখা ফোন টা হাতে তুলে মুখ উচু করে ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। কল করবে কিভাবে ? ওর কাছে তো এই দেশের সিম কার্ড নেই। ইমরানের ফোন থেকে কল করতে হবে। কিন্তু এখন মোটেও বেড থেকে উঠে ইমরানের রুমে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার ইমরান তুলিকে ওর রুমে যেতেও নিষেধ করেছে। ইমরান রুম থেকে বের হলে কথা বলবে সিদ্ধান্ত নেয়। এখন একটু ঘুমাবে , ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।

ফোন টা রেখে উপুর হয়ে শুয়েই চোখ বন্ধ করে নেয়।

ইমরান ফ্রেশ হয়ে বেডে হেলান দিয়ে বসে। তারপর ফোন হাতে নিয়ে খাবার অর্ডার করে দুজনের জন্য। এখন আর রান্না করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই। তুলির ও হয়তো সেম অবস্থা। রাতের খাবার টা অর্ডার করেই খাবে। সকালে না হয় রান্না করা যাবে।

ফ্ল্যাট মেড পরিষ্কার করে রেখে গেছে আগেই। সপ্তাহে একদিন ফ্ল্যাট পরিষ্কার করায় মেড কে দিয়ে। বাকি সব নিজেই করে। ফ্ল্যাটের চাবি লিয়াম এর কাছে দিয়ে গিয়েছিল , ওই মেড কে দিয়েছিল আবার।

বিজ্ঞাপন

খাবার অর্ডার করার বিশ মিনিটের মধ্যেই কলিং বেল বেজে ওঠে। রুম থেকে বেরিয়ে খাবার রিসিভ করে। খাবারের প্যাকেট আর প্রয়োজনীয় সব কিছু ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে তুলির রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েও থেমে যায়।

হাত বাড়িয়ে ডোর নক করে। কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেলেও তুলির সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। আবার নক করে, গলা উঁচিয়ে ডাকে কয়েক বার। তবে তুলির কোনো সাড়াশব্দ নেই। কপাল ভ্রু কুঁচকে কিছু সময় পর ডোর হাত দিয়ে ঠ্যালা দেয়। বরাবরের মতই খুলে যায় ডোর। এই তুলি জীবনেও ডোর লক করে না , সেটা হোক রাতে বা দিনে। ভেতরে প্রবেশ করে বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে তুলি উপুর হয়ে শুয়ে আছে। কুঁচকে যাওয়া কপাল ভ্রু আরো কুঁচকে যায়। তুলি কি এভাবে শুয়ে শুয়ে কাদঁছে ? কিন্তু কাদার তো শব্দ আসছে না। নীরবে কাদঁছে বোধহয়। যাই হোক তাতে ওর কি ? অনুভূতিহীন হার্টলেস মানুষ একটা। অন্যের কথা ভাবার সময় আছে নাকি ওর ? একা একা থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে গেছে একা থাকার। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জীবনে বিয়ে করবে না একা একাই পাড় করবে বাকি জীবন। কিন্তু হলো টা কি ? ওর স্বপ্নের একলা থাকার জীবনে দোকলা জুটে গেছে। ওর মনের শান্তি গায়েব হয়ে গেছে। ভালো লাগে না কিছু। সব কিছু মেনে নিতে চাইলেও পারে না। একটু একটু অনুভূতি জন্ম নিলেও কিছু সময় পর আবার

ম/রে যায় সেই অনুভূতি।

বেশি কিছু না ভেবে তুলির শিয়রে দাঁড়ায়। ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখে এই মেয়ে তো বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে। ভারী শ্বাস ফেলার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ইমরান। কোনো মানুষ আরামে বিভোর হয়ে ঘুমালেই এভাবে শ্বাস নেয়।

_ তুলি এই তুলি ওঠো, তুলি।

কোনো সাড়া শব্দ নেই। এতক্ষণ নরম গলায় মিষ্টি স্বরে ডাকলেও এবার রসকষহীন কর্কশ গলায় ডাকতে শুরু করে। শুধু শুধু মেজাজ গরম হচ্ছে।

ইমরানের রসকষহীন কর্কশ গলার স্বর শুনে পিটপিট করে তাকায় তুলি। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের মুখের দিকে তাকায়। চোখের পাতা টেনে তুলতে চাইলেও পারছে না। চোখ বন্ধ করে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

_ কি হয়েছে ? চ্যাচাচ্ছো কেনো এভাবে ?

_ আমি চ্যাচাই ?

_ নাহ্ , ডক্টর ইমরান মাহমুদুল চ্যাচায়।

ইমরান রেগে ডেকে ওঠে,

_ তুলি।

_ সরো তো ঘুমোতে দাও।

_ উঠে খাবার খেয়ে তারপর ঘুমাও।

_ এখন আমি রান্না করতে পারবো না।

_ রান্না করতে হবে না, খাবার অনলাইন থেকে এনেছি।

_ তুমি খাও আমি খাবো না।

_ কেনো ?

_ খিদে নেই আমার।

_ খিদে নেই কেনো ?

_ ফ্লাইটে খেয়েছি না। ডিস্টার্ব করবে না আমাকে, যাও এখান থেকে।

_ খাবার খেয়ে তার পর জন্মের ঘুম ঘুমা, এখন ওঠ।

তুলি চোখ বন্ধ রেখেই কর্কশ গলায় বলে ,

_ খাবো না বলছি তো, যাও এখান থেকে। শুধু শুধু আমার আরামের ঘুম হারাম করতে এসেছে।

ইমরানের গরম মেজাজ আরো গরম হয়। শোয়া থেকে টেনে তুলে বসিয়ে দেয় তুলি কে। বিকেলে ফ্লাইটে দুবার মুখে দিয়েছিল খাবার। তারপর আর কিছু খায়নি। ওই টুকু খাবার খেয়ে নাকি ওর পেট এখনো ভরা আছে !

যা বলবে তাই বিশ্বাস করবে ইমরান ! ওতো ছোট মানুষ না ?

টেনে বসিয়ে দেওয়ায় পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ইমরানের দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ঘাড় কাত করে বলে,

_ এ্যাই তুমি আমার অনুমতি ছাড়া আমার রুমে এসেছো কেনো ? আবার আমার উপর জোর খাটাচ্ছো।

_ খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর। না খেয়ে ম/রে গেলে তোর বাপ মা তো তখন আমার গলায় দড়ি ঝুলিয়ে দেবে। তাদের মেয়েকে কানাডায় এনে না খাইয়ে রেখে খু/ন করেছি আমি। তোর শশুর শাশুরি তো গুলি করে

মা/র/বে আমাকে। এখন উঠে কটা গিলে তারপর ঘুমা।

_ এ্যাই তোমার সমস্যা কি হ্যাঁ ? এবার তুই আরেক বার তুমি। যে কোনো একটা বলে সম্বোধন করবে।

কোনো কথা না বলে তুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সোজা ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তুলিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজেও বসে পাশে। তারপর দুজনের জন্য খাবার বেড়ে নেয়। একটা প্লেট তুলির সামনে এগিয়ে দেয় , অন্যটা নিজে নেয়। কোনো কথা না বলে হাত ধুয়ে খাওয়া শুরু করে তুলি। ইমরান নিজেও খাওয়া শুরু করে।

এই টুকু সময়ের মধ্যেই তুলির উপর ভীষণ বিরক্ত ইমরান। এই মেয়ে তো রান্না করার আলসেমিতে না খেয়েই ম/র/বে বোধহয়। শেষ পর্যন্ত না আবার ওকেই রান্না করে খাওয়াতে হয়। টাকা খরচ করে ঝামেলা বয়ে এনেছে এত দূর।

খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে কয়েক বার তাকায় তুলির দিকে। তুলি একমনে খেয়ে চলেছে। যত দ্রুত খাওয়া শেষ হবে তত দ্রুত ঘুমাতে পারবে।

খাওয়া শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে রুমের দিকে চলে যায় তুলি। হা করে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। প্লেট বাটি না গুছিয়ে, না ধুয়েই চলে গেলো ? এসব এখন ওকেই করতে হবে।

একা একা বকবক করতে করতে প্লেট বাটি গুছিয়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায় ধুয়ে রাখার জন্য।

বিজ্ঞাপন
অযাচিত প্রণয় গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক লাভস্টোরি