লাফিয়ে বেড থেকে নেমে দাঁড়ায় ইমরান। দুই হাতে ভালো ভাবে চোখ কচলে আবার তাকায় বেডের দিকে। ফোলা ফোলা চোখ মুখ, এলোমেলো চুল-পরনের কাপড়। ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। আবার নিজের দিকে তাকায় ইমরান। আবার বেডে বসে থাকা তুলির দিকে তাকায়।
ডান হাত উচু করে আঙ্গুল তুলে তুলির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে ,
_ এই তুই এখানে কি করছিস ? কখন এসেছিস এই রুমে ? আমার বুকের উপর শুয়ে কি করছিলি ?
তুলির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। ও ইমরানের বুকের উপর উঠে শুয়ে ছিল ? সিরিয়াসলি ?
_ কিরে কথা বলছিস না কেনো ?
_ আমি কখন তোমার বুকের উপর উঠে শুয়ে ছিলাম ? আমি তো বেডের এই কিনার ঘেঁষে শুয়ে ছিলাম।
_ আমি মিথ্যে বলছি ? হাতির মতো শরীর টা নিয়ে তো আমার বুকের উপরেই শুয়ে ছিলি।
_ একদম মিথ্যে দোষারোপ করবে না আমাকে। আর আমার শরীর হাতির মতোও না , মাত্র চল্লিশের উপর আট কেজি ওজন আমার। আর তোমার বুকের উপর উঠে শুয়ে থাকার কোনো সখ বা ইচ্ছে আমার নেই। নিশ্চই তুমি নিজেই আমাকে তোমার বুকের উপর তুলেছিলে আর এখন আমার দোষ দিচ্ছো। কোন বদ মতলবে আমাকে তোমার বুকের উপর তুলেছিলে ?
তুলির কথা শুনে ইমরানের রাগ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে ,
_ আম্মু আম্মু আম্মুউউউউ ।
মিসেস ইরানী রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছিলেন। বড় ছেলের হাক ডাক শুনে বুয়া কে খাবার সাজাতে বলে দ্রুত ইমরানের রুমের দিকে এগিয়ে যান।
ইমরানের গলা ছেড়ে ডাক শুনে কামরান আর মুস্তাফিজুর রহমান ও রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
তিন জন একসাথে এসে দাঁড়ায় ইমরানের রুমের সামনে।
ডোরের দিকেই তাকিয়ে ছিল ইমরান।
_ ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছো ? ভেতরে আসো।
তিন জন একসাথে ভেতরে প্রবেশ করে।
মিসেস ইরানী বলেন ,
_ কি হয়েছে ? এভাবে চিৎ/কার করছিস কেন?
_ তুলি এই রুমে কি করছে ?
_ তো কোন রুমে থাকবে ?
_ কোন রুমে থাকবে সেটা আমি কিভাবে জানবো ?
_ তুই জানবি না কেনো ? তোর বউ তোর রুমে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
_ না ও আমার রুমে থাকবে না।
_ ও এই রুমেই থাকবে।
_ বলছি তো থাকবে না।
_ বলছি তো থাকবে।
_ ওকে নিয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। ওই বের হ আমার রুম থেকে।
_ একদম বের হবি না তুলি। এই রুমে ইমরানের যতটা অধিকার আছে, তোরো ঠিক ততটাই অধিকার আছে। মনে রাখবি এখন এই রুম তোরো। এই বাড়িও এখন তোর। এই বাড়ির সব কিছুতেই তো অধিকার আছে এখন। কারো কথা শুনে কিছুতেই এই রুম থেকে বের হবি না। গত কাল থেকে ইমরান ও তোর , ওকে কিছুতেই ছাড়বি না।
"গত কাল থেকে ইমরান ও তোর , ওকে কিছুতেই ছাড়বি না"। এই কথা গুলো তুলির কানে রিপিট রিপিট হয় কয়েক বার। অদ্ভুত শিহরন বয়ে যায় পুরো শরীর জুড়ে।
অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। শরীর জুড়ে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
মায়ের কথা গুলো শুনে ফুঁসে ওঠে ইমরান। খ্যাপাটে কন্ঠে বলে,
_ একদম না। তুলি কিছুতেই এই রুমে থাকবে না। আর ও যদি থাকে তাহলে আমি থাকবো না।
_ না থাকলি।
_ আম্মু।
_ চিৎ/কার করছিস কেনো ? কানে শুনতে পাই তো আমি। আমার কানে কোনো সমস্যা নেই, আস্তে কথা বল। কানের পর্দা ফাটিয়ে দিবি নাকি ?
_ ওকে নিয়ে যাও আমার রুম থেকে।
_ দুনিয়া উল্টে গেলেও না। বিয়ে করেছিস এখন থেকে ওর দায়িত্ব তোর।
_ জোর করে বিয়ে করিয়েছো তোমরা। আমার ঝামেলাহীন জীবনে ঝামেলা জুটিয়ে দিয়েছো তোমরা সবাই মিলে।
_ জীবনে ঝামেলা না থাকলে জীবনের আনন্দ বোঝা যায় না। ভালো থাকতে হলে জীবনে ঝামেলার প্রয়োজন আছে। জঞ্জাল ভালো কাঙ্গাল ভালো না। তাই ঝামেলা নিয়ে জীবন যাপন কর। অকারণে চিৎ/কার চেঁচা/মেচি করবি না। রান্না শেষ হয়েছে ফ্রেশ হয়ে দুজন খেতে আয় অনেক বেলা হয়ে গেছে।
তারপর ছোট ছেলে আর স্বামীর দিকে তাকান।
_ চলো খাবার খাবে।
রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার বলেন,
_ তারাতারি আসবি দুজন , খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে নয়তো।
চলে যায় তিন জন।
তুলির দিকে খ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকায় ইমরান।
_ বের হ আমার রুম থেকে।
কেনো যেনো আজ তুলির একটুও ভয় করছে না ইমরান কে, আবার আগের মত রাগ ও উঠছে না। আগে দেখলেই ভয় কাজ করতো, রাগ উঠতো। ইমরানের চুল গুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করতো। রাগে ওর সামনেই আসতো না।
গত কাল রাতেও ভয় কাজ করলো এই রুমে আসতে। যদি রেগে আবারো চড় দেয় ছোট বেলার মত ! অথচ আজকে সেসব কিছুই হচ্ছে না। উল্টো ইমরানের উপর শোধ তুলতে ইচ্ছে করছে। ভয়ের চেয়ে ইমরানের উপর রাগ বেশি জমে আছে। ছোট বেলায় ওর সাথে যা যা করেছে সেসবের শোধ তুলবে আস্তে আস্তে সুধে আসলে। তুলিকে তো চেনেনা। হাড় মাংস জ্বা/লিয়ে খাবে ওর। এখন আর আগের সেই তুলি নেই।
_ কি বলছি কানে যাচ্ছে না ? বের হ আমার রুম থেকে।
আয়েশ করে হাত পা ছড়িয়ে বেডে শুয়ে পড়ে তুলি। ইমরানের দিকে তাকিয়ে গা জ্বা/লা এক হাসি ফুটিয়ে বলে ,
_ যা বো না। তোমার যেতে ইচ্ছে করলে তুমি যাও।
ধমক দিয়ে বলে,
_ যা আমার চোখের সামনে থেকে।
_ ঠ্যাকা পড়েনি আমার কারো কথা শুনতে।
মৃদু চিল্লিয়ে বলে,
_ তুলিকা।
_ জি ভাইয়া।
_ বের হতে বলেছি আমি।
_ খালামণি কি বলে গেলো মনে নেই ?
ইমরান গজগজ করতে করতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফোস ফোস করছে। কত বড় সাহস ওর মুখে মুখে তর্ক করে ! আগে দেখলে তো ভয়ে হাঁটু কাপতো। ওর সামনেই আসতো না।
আয়নার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা যায়।
তুলি বেড থেকে নেমে এলোমেলো বেড গুছিয়ে রাখে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো ব্রাশ করে নেয়। সুটকেস থেকে টুথব্রাশ বের করে হাতে নিয়ে ঘুরে ফিরে রুম টা দেখতে শুরু করে।
এই রুমে খুব কমই আসা হয়েছে ওর। ইমরানের উপর রাগ করেই এই রুমে প্রবেশ করতো না।
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। তুলিকে দেখেও কিছু বলে না। তুলি একবার ইমরানের দিকে তাকিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
তুলি ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই ইংরেজিতে কয়েক টা বকা দেয় ইমরান।
এক'টা মাস কোনো রকমে সহ্য করতে পারলেই হয়।
এক টেবিলে বসেই সকালের খাবার শেষ করে পাঁচ জন।
খাওয়া শেষে তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ইমরান। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাবে। সারা দিন আর ফিরবে না বাড়িতে।
আশ্চর্য্য তুলিকে দুই চোখে দেখতে ইচ্ছে করছে না।
তুলিকে দেখলেই রাগ বেড়ে যাচ্ছে তরতর করে। ছোট বেলায় দেখলে যতটা রাগ হতো , তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রাগ হচ্ছে এখন। ইচ্ছে তো করছে এক আছাড়ে তুলির ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে।
ইমরান বেরিয়ে যেতেই মুখ ভেংচি কা/টে তুলি।
দেখলেই ইচ্ছে করছে মাথা ফাটিয়ে দিতে।
তুলি নিজেকে দেখে নিজেই আশ্চর্য্য হচ্ছে সকাল থেকে। ওর ভেতরে এত সাহস কোথা থেকে আসলো ? সাহস ওয়ালা জ্বীন ভর করেনি তো ওর উপর ? না হলে এত সাহস তো হওয়ার কথা ছিল না। নানান টেনশানে গত কাল বিয়ে শেষ হওয়ার পর যেখানে মাথা ঘুরে স্টেজেই শুয়ে পড়েছিল সেখানে আজ ইমরানের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত বুদ্ধি ওর মাথায় কিলবিল করছে।
সত্যি সত্যিই বোধহয় জ্বীন ভর করেছে।
বেডে শুয়ে পড়ে। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ, ক্লান্ত ও লাগছে। বিয়ের চক্করে পরে কয়েক দিন ধরে ঘুমোতে পারেনি। শপিং মল , পার্লার দৌড়াদৌড়ি করতে করতেই
আধম/রা অবস্থা। এখন ঘুমোতে পারলে একটু ভালো লাগবে। গত রাতেও ঘুমোতে পারেনি টেনশনে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছিল একটু ।
________________
রাতে বাড়ি ফেরে ইমরান। কোনো কিছুই বলে না চুপ চাপই থাকে। ঝামেলা করে কাজ নেই মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
রাতের খাবার টাও একসাথেই খায় পাঁচ জন।
খাওয়া শেষ করে আগে আগে রুমে চলে আসে তুলি। কে জানে শ*য়*তা*ন ইমরান আগে রুমে এসে যদি ডোর লক করে দেয় ? তাহলে তুলি ওকে শায়েস্তা করবে কিভাবে ?
রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ে তুলি। একটু পর রুমে আসে ইমরান। ডোর লক করে বেডের দিকে তাকাতেই মেজাজ তুঙ্গে।
_ বেড থেকে নাম।
_ কেন?
_ তোর সাথে এক বেডে ঘুমাবো না আমি। তুই নিচে ঘুমাবি।
বেড থেকে একটা বালিশ তুলে ছুঁড়ে দেয় ইমরানের দিকে। বালিশ টা ক্যাচ ধরে ইমরান।
তুলি বলে ,
_ "সারওয়ালা সাদা মুলা" তুমি নিচে ঘুমাও।
রেগে তুলির দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। ওর ডাক ওকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে ! ছোট বেলায় সকলের সাথে সাথে ইমরান নিজেও মাঝে মধ্যে তুলিকে "সারহীন সাদা মুলা" বলে ডাকতো। তার শোধ তুলতে আজ ওকে "সারওয়ালা সাদা মুলা" বলে ডাকছে।
চিৎকার করে বলে ,
_ তুলির বাচ্চা।
_ সবে মাত্র গত কাল বিয়ে হলো , এখনই বাচ্চা কোথা থেকে আসবে ? পাগল হয়েছো নাকি তুমি ?
তুলির দিকে তেড়ে যায় ইমরান।