কনে বিদায় হয়। যাওয়ার সময় তুলির সে কি কান্না। সে কিছুতেই যাবে না। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে , ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে ওকে যেন না পাঠানো হয়। কিন্তু বিয়ে যখন হয়েছে তখন শশুর বাড়িতে তো যেতেই হবে , এটাই নিয়ম।
পুরোটা সময় নিশ্চুপ থেকেছে ইমরান। বেচারা লং জার্নি করে এসেছে বাংলাদেশে। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে আছে, বিশ্রাম প্রয়োজন । কিন্তু কিসের বিশ্রাম ? কিসের কি ? আসতে না আসতেই একটা বউ জুটিয়ে দিয়েছে বাবা মা চৌদ্দ গুষ্টি মিলে।
বাড়িতে ফিরে কোনো কথা না বলে নিজের সুটকেস টা নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে আসে ইমরান ।
বউ আর বাসর গোল্লায় যাক। সুটকেস থেকে টাওয়েল ট্রাউজার আর টিশার্ট বের করে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ক্লান্ত থাকলেও বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নেয়।
ড্রেস চেঞ্জ করে রুমে আসে, তারপর রুম অন্ধকার করে বেডে শুয়ে পড়ে। বাকি চিন্তা ভাবনা আগামী কাল করা যাবে এখন ঘুমোনো যাক।
,
তুলি সোফায় বসে আছে। নড়ছেও না চরছেও না। বেচারির মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো এখনো বুঝতে পারছে না।
শিহাব কে সামনে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবে তুলি।
বিয়ে ঠিক হওয়ার আগে দুজন যখন দেখা করেছিল তখন তুলি বার বার জিজ্ঞেস করেছিল বিয়ে তে কোনো সমস্যা বা অমত আছে কি না ! শিহাব বার বার বলেছিল কোনো সমস্যা নেই , অমত ও নেই।
ব্যাটা এক নাম্বারের লু*চ্চা বদ*মায়েশ শ*য়*তা*ন ।
বিয়ের আগে খুব তো দাঁত কপাটি বের করে বলেছিল প্রেমও করেনি কোনো দিন। আর আজকে বিয়ের দিন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে পালিয়ে গেলো।
একমাত্র ওই শ*য়*তা*ন শিহাবের জন্য ওর বিয়ে ইমরানের সাথে হয়েছে। সামনে পেলে টুকরো টুকরো করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।
মিসেস ইরানী এক গ্লাস ওরেঞ্জ জুস নিয়ে আসেন তুলির জন্য। তুলি খেতে না চাইলেও জোর করে খাইয়ে দেয়।
_ রুমে যা লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে হালকা ড্রেস পরে নিস।
_ আচ্ছা ।
বলেই তুলি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ভঙ্গুর হয়ে এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে।
মিসেস ইরানী দেখেন তুলির সুটকেস টা নিচেই রয়ে গেছে। তিনি সুটকেস টা হাতে নিয়ে তুলির পেছন পেছন যান।
তুলিকে গেস্ট রুমে প্রবেশ করতে দেখে ডেকে ওঠেন।
_ তুলি ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস ?
_ রুমে ।
_ সেটা তো দেখতে পাচ্ছি , কিন্তু ওই রুমে কেনো ?
_ তাহলে কোন রুমে যাবো ?
_ ইমরানের রুমে ।
_ জীবনেও না খালামণি ।
_ কেনো ? এখন তোরা দুজন স্বামী স্ত্রী । দুজন এক রুমেই থাকবি আজ থেকে। তাড়াতাড়ি এই রুমে আয়।
_ না আমি ওই রুমে যাবো না। তোমার ছেলে দেখলেই খ্যাক খ্যাক করে উঠবে আগের মতোই।
_ কিচ্ছু বলবে না এখন। এখন কি তোদের সম্পর্ক আগের মত নাকি ?
তুলি গেস্ট রুমে ঢুকে যায়। ও জীবনেও ইমরানের রুমে যাবে না। ক্লাস থ্রীতে থাকতে একবার ওর রুমে ঢুকেছিল। ভুল করে একটা সো পিস ভেঙে ফেলেছিল , সেজন্য কি জোড়ে চড় মে*রে*ছিল ওর গালে ভলেনি তুলি । তার পর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর জীবনেও ওই নাক উচু , অহংকারী , গম্ভীর বদ মেজাজী ইমরানের রুমে আর সামনে কোনো দিন যাবে না। রাইটার সানা শেখ। তারপর থেকে তুলিও ইমরানকে পছন্দ করে না। ওর সামনেও যায় না সহজে। অতি প্রয়োজন হলে তখনই যেতো।
মিসেস ইরানী গেস্ট রুমে প্রবেশ করেন।
_ তুলি চল এখান থেকে।
_ এখানেই ঠিক আছি আমি।
_ তুই ঠিক থাকলেও এভাবে কোনো দিন তোদের দুজনের সম্পর্ক ঠিক হবে না। নিঃসন্দেহে তুই একজন ভালো মেয়ে। আমার ছেলে ও ভালো একজন ছেলে। ছোট বেলায় কি হয়েছে, না হয়েছে সেসব নিয়ে এখনো রেষারেষি করবি দুজন ? এখন তোরা দুজন স্বামী স্ত্রী। হালাল সম্পর্ক তোদের। তোরা এখন একে অপরের পরিপূরক। দুজনেরই চেষ্টা করতে হবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার। এভাবে দূরে দূরে থাকলে তো হবে না মা । বোঝার চেষ্টা কর ।
তুলি কিছু না বলে চুপ করে রইলো। ভালো লাগছে না, বেশি কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করছে না। নিজে থেকেই গেস্ট রুম থেকে বেরিয়ে ইমরানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। সুটকেস টা হাতে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
পুরো রুম অন্ধকারে নিমজ্জিত। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
বুক ধড়ফড় করছে তুলির। ইমরান ওকে এখানে দেখে কেমন রিয়েক্ট করবে ? কিছু বলবে কি ? যদি রাগারাগি করে ? যা করবে , করবে সেটা পড়ে দেখা যাবে।
অন্ধকারে খুঁজে খুঁজে রুমের লাইট অন করে। সাথে সাথেই পুরো রুম সাদা আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে উপুর হয়ে শুয়ে আছে ইমরান। ইমরানের সাথে একই রুমে থাকতে হবে ভাবতেই হার্ট বিট বেড়ে যায়। পুরো শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায়। মৃদু কাঁপতে থাকে পুরো শরীর। সুটকেস খুলে ভেতর থেকে জামা পায়জামা আর ওড়না নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে নেয়। মেকআপ রিমুভ করে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। তারপর লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। লেহেঙ্গা সোফার উপরে রেখে হাত মুখ মুছে নেয়। ড্রিম লাইট অন করে বড় লাইট অফ করে দেয়।
রুমের ডোর লক করে একটু একটু করে বেডের দিকে এগিয়ে যায়। আর একটু একটু করে ওর হার্টের শব্দ বাড়তে থাকে। হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে রইলো যেন শব্দ না হয়। কিন্তু অবাধ্য হৃদযন্ত্র থরথর করে কাঁপতেই থাকে। কাঁপতে কাঁপতেই বেডে উঠে শুয়ে পড়ে কিনার ঘেঁষে। বেডের মাঝ বরাবর শুয়ে আছে ইমরান। ওর ভারী শ্বাসের শব্দ তুলির কানে ভেসে আসছে। সেই সাথে ইমরানের গা থেকে ভেসে আসছে পুরুষালি ঘ্রাণ।
দম আটকে নেয় তুলি। কেমন হাসফাঁস লাগছে এই মুহূর্তে। ইমরানের পাশে শুয়ে থাকতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে।
চোখ বন্ধ করে নেয়। সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইমরানের চেহারা। ধপ করে চোখ খুলে তাকায় আবার। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের দিকে তাকায়। ড্রিম লাইটের নীল আলোয় বোঝা যাচ্ছে না ইমরানের চেহারা। ইমরানের দিকে ঘুরে চোখ বন্ধ করে নেয় আবার। অনুভব করার চেষ্টা করে ওরা দুজন হাসবেন্ড ওয়াইফ। বিয়ে হয়ে গেছে দুজনের। আজকের পর থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ওর সাথেই থাকতে হবে।
,
সকালে ঘুম হালকা হয়ে আসে ইমরানের। কাত থেকে চিৎ হয়ে শোয়। অনুভব করে বুকের উপর অনেক ভারী কিছু রয়েছে । কোলবালিশের ওজন তো এত বেশি না । এটা কি লোহার কোলবালিশ নাকি ? না হলে এত বেশি ওজন কেনো ? মুখের উপর সুরসুরি লাগায় নাক মুখ কুঁচকে একটু চোখ খুলে তাকায়। মুখের উপর থেকে হাত দিয়ে চুল গুলো সরিয়ে দেয়। ওর চুল তো এত লম্বা নয়। রাইটার সানা শেখ।
চুল গুলো থেকে অসাধারণ ঘ্রাণ ভেসে আসছে। কোন শ্যাম্পুর স্মেইল এটা ? ও তো এই শ্যাম্পু ব্যবহার করে না। ভালো ভাবে বুকের দিকে তাকাতেই দেখে ওর বুকের উপর তো কোলবালিশ নয় আস্ত একটা মানুষ শুয়ে আছে। তাও মেয়ে মানুষ ।
এক ঝটকায় বুকের উপর থেকে তুলিকে বেডে ফেলে দেয়। ধড়ফড়িয়ে নিজেও শোয়া থেকে উঠে বসে। তুলি নিজেও লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে।
দুজনের দৃষ্টি আটকায় একে অপরের মুখের দিকে।
দুজনেরই পূর্বের ঘটনা স্মরণ হতে কিছুটা সময় লাগলো।