কানাডা থেকে খালাতো বোনের বিয়ে খেতে এসে নিজেরই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে শুনে থ হয়ে গেছে ইমরান । মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না তবে মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটছে।
এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ছোট খালার বাড়িতে এসেছে। আর আসার দশ মিনিট পরেই শুনছে বর পালিয়ে গেছে গার্লফ্রেন্ডের সাথে। বর ছাড়া বর যাত্রী কি করতে আসবে ? তারা কল করে তুলির বাবার কাছে মাফ চেয়েছেন । তুলির বাবা এখন কি করবেন ? তার মেয়ের কি হবে ? টেনশনে পেশার লো হয়ে নিচে পড়ে গেছেন। মাথায় পানি ঢেলে ওনাকে কিছুটা স্বাভাবিক করা হয়েছে । কিন্তু একটা কথাও বলছেন না তিনি । রাগে থরথর করে কাঁপছেন শুধু । আদরের মেয়ের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবেন তিনি ? কি জবাব দেবেন মেয়েকে ? ওই ছেলেকে সামনে পেলে জ*বাই করবেন তামিম ইকবাল। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে পালিয়েই যখন যাবি বিয়ের আগের দিন গেলি না কেনো ? বিয়ের দিন কেনো গেলি ? গার্লফ্রেন্ড আছে তাহলে বিয়েতে রাজী কেনো হয়েছিলি ? বিয়ের আগে বললি না কেনো ?
তুলির মা মিসেস ইয়ানা স্তব্ধ হয়ে রয়েছেন ।
তুলি এখনো এই সবের কিছুই জানে না , বাড়ির ভেতর রয়েছে এখনো , ওকে সাঁজানো হচ্ছে । বিয়ে বাড়ি পুরো শোকসভায় পরিণত হয়েছে । হই হই , রৈ রৈ , ডিজে গান সব থেমে গেছে ।
এমন এক মুহূর্তে ইমরানের বাবা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন ,
_ বিয়ে আজকে হবেই ।
তামিম ইকবাল চোখ তুলে তার দিকে তাকান ।
তারপর আর কি ? ইমরানকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে ।
বেচারা এই কথা শোনার পর থেকে সাপের মতো ফোস ফোস করছে । কোন দুঃখে বিয়ে খেতে এসেছিল ?
চ্যারার (কেঁচো) মত চিকন মেয়েকে বিয়ে করবে তাও ইমরান মাহমুদুল ? "সারহীন চিকন সাদা মুলা" বলে ডাকতো সবাই ছোট বেলায় তুলিকে । কেউ কেউ "ওয়েট লেস তুলা" বলে ডাকতো । আবার কেউ কেউ কেঁচো , কেইছা বা চ্যারা বলে ডাকতো । এতো চিকন ছিল ছোট বেলায়। তবে দেখতে পুতুলের মতো লাগতো। সারা দিন ফ্যার ফ্যার করে দৌড়ে বেড়াতো । দুই পাশের ঝুঁটি দুটো উচুঁ নীচু হতো কদম দেওয়ার সাথে সাথে । আর কেঁচো , কেইছা বা চ্যারা বলে ডাকার একটা কারণ আছে তা হলো তুলি ছোট বেলায় মাটি দিয়ে বেশি খেলতো। মাটিতে খেলতে না দিলে গলা ছেড়ে চিৎ*কার করে কান্না করতো। বলা যায় মাটির পোকা ছিল তুলি। এই কারণেই এমন অদ্ভুত অদ্ভুত নামে ডাকতো ওর কাজিনরা । সাথে বড়রাও ভালোবেসে ডাকতো। তুলিকে সবাই পছন্দ করলেও ইমরান করতো না ছোট থেকেই । মাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে খেলা ওর সবচেয়ে অপছন্দ । নিজে তো খেলবেই না অন্য কাউকে খেলতেও দেবে না । গ্রামে নানু বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর তুলিকে দেখে একশো হাত দূরে থাকতো। কারণ তুলি ইমরানকে দেখেই দৌড়ে যেতো ওর কোলে চড়ার জন্য । আর গিয়েই নিজের গায়ের ধুলো বালি মাটি ইমরানের গায়ে লাগিয়ে দিতো। তখন ইমরান না পারতো তুলিকে মা*রতে আর না পারতো সহ্য করতে। বেচারা সাপের মতো ফোস ফোস করে নিজেকে শান্ত করতো।
আর আজকে কিনা সেই তুলিকে বিয়ে করতে হবে ? যাকে ও দুই চোখে দেখতে পারে না । ওর কথা স্মরণ হলে রাগে মাথা ফেটে যায় । ছোট বেলায় নানু বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর কি জ্বালান জ্বালাতো ওকে । তখন থেকেই দুচোখে দেখতে পারে না ।
বিয়ের হৈ হৈ রৈ রৈ ডিজে গান আবার শুরু হয় ।
সবাই খুশি হলেও ইমরান কোনো ভাবেই খুশি হতে পারছে না । কিভাবে খুশি হবে ? ওর ত্রিশ বছরের সিঙ্গেল জীবনের ইতি ঘটতে চলেছে । তাও ওর অপছন্দের মেয়ের সাথে ।
ডাক্তারি পড়া শেষ করে কানাডা তেই ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। এক বছরের মধ্যে ওই দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। তার পর পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল গত তিন বছর আগে। তখন দুবার দেখেছিল তুলিকে । তার পর আর দেখা হয়নি ।
ইমরানকে একটা রুমে রেস্ট নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে । রুমে এসে মাকে কাছে ডাকে । মিসেস ইরানী কাছে আসতেই ইমরান রেগে রেগে বলে ,
_ এসব কি হচ্ছে আম্মু ? আসলাম বিয়ে খেতে , আর এখন নিজেরই বিয়ে!
_ বয়স তো কম হয়নি , বিয়ে তো করতেই হবে একদিন না একদিন । তাহলে আজকে করলে সমস্যা কোথায় ?
_ তুলিকে আমি বিয়ে করবো না ।
_ কেনো ? কি সমস্যা ? তুলি স্মার্ট সুন্দরী শিক্ষিত মেয়ে। তোর পাশে ওকেই মানাবে ।
_ তুমি বুঝতে পারছো না কিছু ?
_ নাহ্ আর বুঝতে চাই ও না । বিয়ে করতে বললেই তোর না না শুধু । বিয়ের কথা উঠলেই নানান বাহানা ।
_ বিয়ে করবো কিন্তু ওকে না । অন্য মেয়ে বিয়ে করবো।
_ এ দেখি ভূতের মুখে রাম রাম । মুডি বয় ইমরান মাহমুদুল বিয়ে করবে ? তাও নিজের মুখে বলছে ? স্বপ্ন দেখছি না তো আমি ?
_ মজা করছো আমার সাথে ?
_ একদমই না ।
_ আমি তুলিকে বিয়ে করবো না এটাই শেষ কথা ।
_ আমি তুলি কেই আমার বাড়ির বউ বানাবো ।
_ ওকেই কেনো বানাতে হবে ?
_ ওকে আমার পছন্দ হয়েছে ওকেই বউ বানাবো। ওকে আমার বাড়ির বউ না বানালে আমি ওই বাড়িতে আর ফিরবো না ।
কপাল ভ্রু কুঁচকে কিছু সময় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ইমরান । তারপর বলে ,
_ ওর বাড়ির বউ হওয়ার সাথে তোমার বাড়ি ফেরার কি সম্পর্ক ?
_ তুলিকে আমার পছন্দ হয়েছে, ওকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিয়েছি আমি । ওকেই বউ বানাতে হবে এটাই আমার শেষ কথা ।
_ আরেক ছেলে আছে তো তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। ওদের দুজনের স্বভাব চরিত্র এক ।
_ গিয়ে রাজি করা তোর ভাইকে ।
_ করাচ্ছি ।
_ হুম যা ।
ইমরান পকেট থেকে ফোন বের করে ওর মায়ের কাছ থেকে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে ওয়াইফাই কানেক্ট করে । তার পর ছোট ভাই কামরান মাহমুদুল এর ফোনে ম্যাসেজ পাঠায় ।
মিসেস ইরানী কে ডাক দেওয়ায় সে রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায় । ছেলের বিয়ে তার অনেক কাজ ।
একটু পরেই কামরান চলে আসে বড় ভাইয়ের কাছে ।
ইমরান গম্ভীর থমথমে হয়ে পায়চারি করছে ।
এতো রাস্তা জার্নি করে এই লোক ক্লান্ত হয়নি নাকি ? চিৎ পটাং হয়ে বিশ্রাম না নিয়ে এভাবে পায়চারি করছে কেনো ? একটু পরেই তো বিয়ে , এখন বিশ্রাম না নিলে বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাবে না তো আর ।
_ হ্যাঁ ভাইয়া বলো কি বলবে !
_ আমি এই বিয়ে করবো না ।
_ কেন?
_ করবো না মানে করবো না । এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না ।
কামরান বির বির করে বলে ,
_ খ্যাক খ্যাক করার স্বভাব যায়নি এখনো ।
তারপর বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ বিয়ে করবে না তো আমি কি করবো ?
_ তুই এই বিয়ে ক
মাঝ খানে থামিয়ে দেয় কামরান ।
_ জীবনেও না ভাই , আমার গার্লফ্রেন্ড আছে ।
_ তো কি হয়েছে ?
_ ওকে আমি অনেক ভালোবাসি । ওকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করলে বাসর করার আগেই আমার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে । তাছাড়া তুলার বস্তা কে আগে আমি বড় বোনের নজরে দেখতাম আর এখন ভাবী হিসেবে মেনে নিয়েছি। বড় বোন আর ভাবী মায়ের সমান । আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ এই কথা আর জীবনেও উচ্চারণ করবে না ভাইয়া । আল্লাহ তায়ালা পাপ দেবে ।
_ সর আমার চোখের সামনে থেকে ।
_ আমি এসেছি নাকি ? তুমিই তো ডেকেছো। কি সুন্দর গার্লফ্রেন্ডের সাথে প্রেমালাপ করছিলাম ।
_ তোর মধ্যে লজ্জা সরম বলতে কিছু কি আছে ?
_ নাহ্ , একদম নেই ।
ইমরান তেড়ে যায় কামরানের দিকে । কামরান দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ।
ভদ্র সভ্য ইমরান পারছে না ছোট ভাইকে একটা গালী দিতে । ওর আপন ভাই এমন হয়ে গেছে ভাবতেই অবাক লাগে । কেমন লাগাম ছাড়া কথা বলে বড় ভাইয়ের সামনে । লাজ লজ্জা কিচ্ছু নেই । বাড়িতে থাকলে একদম সোজা করে রাখতো ।
পুনরায় পায়চারি করতে শুরু করে । কিভাবে বিয়ে বন্ধ করা যায় । ছোট ভাইয়ের মত বাঁদর মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে করবে না ইমরান । এই মেয়েকে কেনো শুধু ! কোনো মেয়ে কেই বিয়ে করতে চায় না ইমরান । বিয়ে মানেই ঝামেলা , আর ঝামেলা মানে প্যারা । আর প্যারা থাকলে মনে শান্তি থাকে না । আর মনে শান্তি না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না । ঝামেলা প্যারা আর অশান্তি নিজের জীবনে চায় না ইমরান । একা একাই খুব সুখে শান্তিতে আছে ও । ওর একার জীবনে ব্যাঘাত ঘটতে দেবে না ইমরান । কিন্তু কি করবে ? ছোট ভাই তো বিয়ে করবে না বললো ।
______________________
বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় । তুলি রোবটের মতো বসে রয়েছে । পাশেই বসে রয়েছে আরেক রোবট ।
তুলি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ইমরানের মুখের দিকে তাকায় । ইমরান গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । কি ভাবছে মনে মনে কে জানে ।
ইমরানের ওই চাহনি দেখে মাথা ঘুরে ওঠে তুলির । এই রোবটের সাথে কিভাবে থাকবে ? এই রোবটের আদো কোনো অনুভূতি আছে কি না সন্দেহ আছে ।
দুলতে দুলতে স্টেজের উপরেই কাত হয়ে শুয়ে পড়ে ।
টেনশনে মাথা ঘুরছে ভন ভন । চোখে দেখছে সর্ষে ফুল।
দুনিয়ায় ছেলের অভাব পড়েছিল ? বিয়ে টা নাহয় আরো দুই চার দশ বছর পর করতো কোনো সমস্যা নেই তো তুলির ।