ইমরানের বাহু বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা ধস্তা ধ্বস্তি করে যায় তুলি। মুখ দিয়েও সমানে বলে যায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। একজন শক্তিশালী যুবকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কি এতই সহজ ? ইমরান তো ছাড়ছেই না ওকে। নিজের সব শক্তি দিয়ে বুকে চেপে ধরে রয়েছে।
নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে ইমরানের বুকের সাথে লেপ্টে রইলো তুলি। শক্তি ফুরিয়ে গেছে এখন।
দুজনেই চুপ , পুরো রুম নিশ্চুপ। কোনো শব্দ নেই রুমে শুধু শোনা যাচ্ছে দুজনের দ্রুত ফেলা শ্বাসের শব্দ।
চুপ থাকতে থাকতে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তুলি।
হকচকিয়ে যায় ইমরান। দ্রুত হাতের বাঁধন আলগা করে বলে,
_ সরি আমি এত শক্ত করে ধরতে চাইনি। ব্যাথা পেয়েছো ?
কিছু বলে না তুলি। ওর কান্নার জোর বাড়ে। ইমরান তুলির বাহু ধরে বুক থেকে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দেখে ও নিজে তুলিকে ছেড়ে দিলেও তুলি নিজেই ওকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। বুক থেকে সরানোর চেষ্টা করলেও পারে না। তাই নিজেও আবার জড়িয়ে ধরে। তুলিকে জড়িয়ে ধরার পর থেকে কেমন যেন ভালো লাগছে ইমরানের। বুকের ভেতর কেমন শান্তি শান্তি লাগছে। এত দিন ধরে লাগা অশান্তি এক নিমিষেই গায়েব হয়ে গেছে। যদি আগে থেকে বুঝতে পারতো তুলিকে জড়িয়ে ধরলে এত ভালো লাগবে , এত শান্তি শান্তি লাগবে তাহলে সারা দিন জড়িয়ে ধরেই বসে থাকতো।
তুলির কান্না না কমে উল্টো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
তুলির চোখের পানিতে ইমরানের টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে। ভেজা ভেজা অনুভব হচ্ছে বুকে।
_ কাদঁছো কেন ? কি হয়েছে ? অনেক ব্যাথা পেয়েছো ? ভুল হয়ে গেছে এত শক্ত করে ধরতে চাইনি আমি। কোথায় ব্যাথা পেয়েছো দেখি।
তুলি তবুও কিছু বলে না। ইমরানের বুক থেকে মুখ ও তোলে না।
কত শক্ত করে ধরেছে যে মেয়ে টা ব্যাথা পেয়ে কেঁদেই দিল ! রাগের মাথায় এত শক্ত করে ধরা উচিত হয়নি।
ইমরান তুলির পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পুনরায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
_ কান্না বন্ধ করো তুলি।
তুলির কান্না বন্ধ হয় না, কান্নার জোর বাড়ে আরো। হাতের বাঁধন শক্ত হয়। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে ইমরানকে , যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।
ইমরান বুঝতে পারে না কিভাবে তুলির কান্না বন্ধ করবে। তাই কিছু সময় চুপ চাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
আস্তে আস্তে তুলির কান্নার বেগ কমে আসে। কিন্তু এখনো আগের মতোই শক্ত করে ধরে রয়েছে ইমরান কে। মুখ গুজে রয়েছে ইমরানের বুকে।
কান্নার বেগ কমে আসতেই আবার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
_ কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছো দেখি।
তুলি বুক থেকে মুখ তোলে। মুখ উচু করে তাকায় ইমরানের মুখের দিকে। ফর্সা চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।
ইমরান তুলির চোখের পানি মুছে দেয়। কিন্তু তখনই আবার গড়িয়ে পড়ে গাল দুটো ভিজে যায়। আবার পানি মুছতে মুছতে বলে,
_ কি হয়েছে ?
_ তুমি ভীষণ খারাপ।
_ আমি জানি আমি খারাপ। এখন বলো কোথায় ব্যাথা পেয়েছো।
তুলি নিজের বুকের বা পাশে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলে,
_ এখানে।
_ আমি এত শক্ত করে চেপে ধরতে চাইনি।
_ আরো শক্ত করে চেপে ধরো। পারলে তোমার বুকের ভেতর পুরে নাও। তুমি শক্ত করে চেপে ধরাতেই তো ব্যাথা কমেছে।
বলেই আবার ইমরানের বুকে মুখ গোজে। রসকষ হীন ইমরান থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছু সময়। তুলির কথা গুলো বুঝতে সময় লাগে ওর। যখন বুঝতে পারে তখন চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। তবে জড়িয়ে ধরে থাকতে ওরো মন্দ লাগছে না। অনেক বেশিই ভালো লাগছে এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকতে।
দুই হাতে আবার জড়িয়ে ধরে তুলি কে।
এভাবে জড়িয়ে ধরে থেকেই অনেক টা সময় পেরিয়ে যায়। কতটা সময় পেরিয়ে গেছে জানা নেই দুজনের।
তুলি এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছে। কেন কাদঁছে তুলি জানে না কিন্তু ওর কান্না পাচ্ছে ভীষণ। ইমরান জড়িয়ে ধরার পর প্রথমে রাগ উঠলেও শান্ত হয়ে ওর বুকে লেপ্টে থাকার কিছু সময় পর থেকে ভালো লাগছিল। আর হঠাৎ করে ভীষণ কান্নাও পাচ্ছিল। এখনো কান্না পাচ্ছে। নিজেকে থামাতেই পারছে না।
ইমরান তুলিকে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে বেডে বসায়। সেন্টার টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে তুলিকে খাওয়ায়। তুলির হাত সহ পুরো শরীর থরথর করে কাপছে। পানির গ্লাস টাও ঠিক ভাবে ধরতে পারছে না।
ইমরান নিজেও পানি খায়। তারপর তুলির পাশে বসে।
_ তুলি।
ইমরানের দিকে তাকায় তুলি। দুই চোখ বেয়ে এখনো গড়িয়ে পড়ছে পানি। ইমরানের কেমন মায়া হচ্ছে ভেজা চোখ দুটো দেখে।
_ তুমি সত্যি সত্যিই আগামী কাল চলে যাবে ?
_ কি মনে হচ্ছে ?
নাক টেনে ভেজা গলায় কথা গুলো বলে তুলি।
_ আমি তো কারো মনের কথা বুঝতে পারি না। এই ক্ষমতা আমার নেই। বোঝার চেষ্টা করলে হয়তো বুঝতে পারবো, তবে কখনো বোঝার চেষ্টাও করি না। আমি নিজের মনের কথাই তো বুঝতে পারি না সেখানে তোমার মনের কথা কিভাবে বুঝবো ?
কিছু বলে না তুলি।
_ লিয়াম এর কাছ থেকে তুমি সত্যি সত্যিই টাকা চেয়েছো ?
এখনো চুপ রইলো তুলি।
_ কথা বলো।
_ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো কেন ?
_ এটা আমার প্রশ্নের উত্তর না।
_ আমি তোমাকে এই প্রশ্ন টা আগেই করেছিলাম। আমি আমার রুমে ঘুমিয়ে ছিলাম। তুমি ঘুমন্ত আমি কে কেন তুলে নিয়ে এসেছো ?
_ আমার সাথে রাখার জন্য।
_ মানে ?
_ এখন থেকে তুমি আমার সাথে এই রুমেই থাকবে।
_ হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত !
বেড থেকে নেমে তুলির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ইমরান। তুলির দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,
_ আমি চাই না তুমি আমার থেকে দূরে যাও। আমি জানি আমার উপর রেগে আছো তুমি। আর রেগে থাকা টাও স্বাভাবিক। হাসবেন্ড হওয়া সত্ত্বেও আমি তোমার কোনো দায়িত্ব পালন করিনি। তোমার হক আদায় করিনি। তুমি তো ছোট থেকেই জানো আমি কেমন স্বভাবের মানুষ। অন্যের মন বোঝার চেষ্টা আমি কখনোই করিনি, আর এই ক্ষমতা আমার নেই ও। আমার যা মনে হয়েছে , যেমন মনে হয়েছে তাই করেছি , তেমনই করেছি। অন্যের কথা খুব কমই শুনেছি আমি। জোর করে বিয়ে টা দেওয়ার কারণে আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। আর আমার এখন বিয়ে করার ও কোনো ইচ্ছে ছিল না। রাগ আর জেদের কারণেই তোমাকে মেনে নিতে পারছিলাম না।
_ এখন মেনে নিয়েছো ?
কিছুক্ষণ চুপ রইলো ইমরান। তারপর ঢোঁক গিলে বলে,
_ মেনে নিয়েছি কিনা জানিনা তবে এখন থেকে তুমি আমার সাথেই থাকবে। এই রুমে থাকবে আমার সাথে ঘুমাবে।
_ আজকে হঠাৎ এগুলো বলছো কেন ? মাথা খারাপ হয়েছে ? নাকি নেশা করেছো ?
_ কিছু হয়নি আমি একদম ঠিক আছি।
_ কিন্তু আমি তোমার সাথে আর থাকবো না।
_ কেন ?
_ আমি তোমাকে মেনে নিতে পারিনি আর পারবোও না।
_ বিয়ে করার সময় মনে ছিল না ? তখন বিয়ে করলি কেন ? বিয়ে যখন করেছিস তখন আমার সাথেই থাকতে হবে। আমাকেই মেনে নিতে হবে।
_ দুজন কেই জোর করে বিয়ে টা দেওয়া হয়েছিল। তখন তুমি কেন আটকাওনি বিয়ে ? তুমি কেন বিয়ে করেছো ? তুমি মেনে নিতে পেরেছো আমাকে ? তাহলে আমি কেন মেনে নেবো ?
_ গলার জোর বেড়েছে এখন ?
_ আগে কম ছিল নাকি ?
_ আমার বুকে মুখ গুঁজে কাদলি কেন ?
_ তুমি বুকে চেপে ধরেছিলে কেন ?
_ আমি ধরবো বলেই তোর কাদতে হবে ? আমার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে নিজের কষ্ট কমালি আর এখন আমাকে ছেড়েই চলে যাবি !
_ আমি নিজে থেকে এসেছিলাম তোমার বুকে মুখ গুঁজে কাদার জন্য ? তুমি জোর করে তুলে নিয়ে এসেছো। জোর করে জড়িয়েও ধরে ছিলে।
_ মুখে মুখে তর্ক করবি না তুলি।
_ একশো বার করবো, হাত ছাড়ো আমার।
ছারে না ইমরান , আরো শক্ত করে ধরে রাখে।
_ যত দ্রুত পারো ডি/ভো/র্স পেপার পাঠিয়ে দিও।
ডি/ভো/র্স না হলে তো দ্বিতীয় বিয়ে করতেও পারবো না।
অবাক হয়ে তুলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। তুলির মুখ দেখে মনে হচ্ছে না মজা করছে। একদম সিরিয়াস মনে হচ্ছে।
_ দ্বিতীয় বিয়ে করার কথাও ভেবে ফেলেছিস ?
_ ভাববো না ? তোমার জন্য কি সারা জীবন এভাবেই পাড় করে দেবো নাকি ? সামনে আমার সুন্দর একটা ফিউচার পড়ে আছে, সেটা কেন তোমার জন্য নষ্ট করবো আমি ? যত তাড়াতাড়ি পারো ডি/ভো/র্স দিয়ে দেবে।
_ আমি ডি/ভো/র্স দেবো না।
_ আমি তোমার সাথে থাকবো না। আর যাই হোক এভাবে সংসার হয় না। এক ছাদের দিকে থাকলেই ভালো থাকা যায় না। ভালো থাকার জন্য অনেক কিছু করতে হয় , তুমি কখনো করেছো আমার জন্য ? আমি কেন থাকবো তোমার সাথে ? ও নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে সেজন্য তাই না ? আমি বাংলাদেশে ফিরে খুব তাড়াতাড়ি আবার বিয়ে করবো। বিয়ে তে তোমাকে দাওয়াত ও দেবো , ছুটি নিয়ে যেও বিয়ের দাওয়াত খেতে। পারলে বাসর ঘর টাও সাজিয়ে দিয়ে আসবে। দোয়া করবো তোমার জন্য যেন খুব শীগ্রই তুমিও বিয়ে করতে পারো, আর এক হালি বাচ্চা জন্ম দিতে পারো। তুমিও দোয়া করো আমাদের জন্য যেনো আমাদের এক ডজন বাচ্চা হয়।
ইমরানের মুখের রঙ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আচমকা তুলির হাত ছেড়ে কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। দুজনের মধ্যে চুল পরিমাণ ফাঁকা নেই। তুলি ইমরানের বাহু তে ধাক্কা দিয়ে বলে,
_ কি করছো ছাড়ো, অন্যের হবু বউ কে এভাবে কেন ধরছো ? লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছো নাকি ?
_ আমি ছাড়া কেউ ছুঁতে পারবে না তোকে। তোকে ছোঁয়ার অধিকার শুধু আমার। তুই আমার বউ , তুই অন্যের বউ হতে যাবি কেন ? বিয়ে আর ছোঁয়া তো দূরে থাক তোর আশে পাশে যে আসবে তাকে ধরে ধরে আইসিইউ তে পাঠাবো আমি। তুই আমার শুধু আমার।
_ অ্যাহ্ আসছে আমার ওয়ালা, ছাড়ো।
_ তিন কবুল বলে বিয়ে করেছি, রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করেছি। তিন শতাধিক মানুষের সামনে বিয়ে করেছি তোকে। তুই আমার, তুই আমার বউ , আর তুই সারা জীবন আমারি থাকবি।
_ থাকবো না। ভোর হলেই চলে যাবো আমি। তখন সারা জীবন আমার আমার করে হেদিয়ে ম/রলেও লাভ নেই।
ছাড়ো এখন ব্যাগ প্যাক করতে হবে। শান্তি মতো একটু ঘুমতেও পারলাম না। এত গুলো দিন জ্বালিয়েও শান্তি হয়নি শেষ রাত টাও জ্বালিয়ে মা/র/ছে।
বলেই কোনো রকমে ইমরানের হাত আলগা করে বেড থেকে উঠে দাঁড়ায়। ডোরের দিকে পা বাড়াতেই ইমরান তুলির দুই পা জাপটে ধরে।
_ আমাকে ছেড়ে যাবি না তুলি, আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তুই যা বলবি যেই শাস্তি দিবি সব মাথা পেতে নেবো আমি কিন্তু তুই আমাকে ছেড়ে যাস না। আমি নিজেকে পরিবর্তন করবো, তুই যেভাবে বলবি সেভাবেই চলবো। আমি তোকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারবো না , আমি ম/রে যাবো তুলি। তুই অন্য কারো হলে আমি সত্যি সত্যিই ম/রে যাবো।