অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৬৩

🟢

ইনায়া রুমে এসে দেখল আরিশ নিজের বাইকের হেলমেট পরে ডান্স করছে। দরজা খোলা ছিল বিধায় ইনায়া দরজা না নক করেই ঢুকে পরেছিল। নিচের থেকে কত কিছু ভাবতে ভাবতে উপরে আসছিল।সে তো ভেবেছিলা্ হয়তো আরিশ রাগ দেখাবে বা মুড অফ করে বসে থাকবে। কিন্তু এখন তো দেখছে যে আরিশ নিজের বাইকের হেলমেট পরে নাচছে।আর যেই সেই নাচ না একদম প্রোফেশনাল ড্যান্সার দের মতন নাচছে।ইনায়ার মুখ আপনা আপনি হা হয়ে গেল।সে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের স্বামীর নাচ দেখতে লাগল।তার বরাবরই বাইকার দের প্রতি ইন্টারেস্ট ছিল। থাকবে না বাই কেন তার প্রিয় সালার সিকান্দারও তো বাইকার। এখন তার স্বামীও বাইকার।সে আরিশের নাচ দেখে মুচকি মুচকি হাসছে এবং ব্লাশ করছে।আরিশের পরনে কালো পেন্ট, সাদা হুডি তার উপর আবার কালো কোর্ট। মাথায় কালো রঙের হেলমেট,সাদা রঙের সু জুতা, হাতে সাদা ও কালো রঙের মোটরসাইকেল গ্লাভস হাতে। ইনায়া তো নিজের নিজের স্বামী কে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে।আরিশ নাচতে নাচতে পিছনে ফিরতেই দেখতে পেল তার ইনু দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সে নিজের নাচ বন্ধ করার বদলে ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে ইনায়ার হাতের কব্জি ধরে নিজের কাছে টেনে নিল‌।ইনায়া এমন আকস্মিক ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না বিধায় নিমিষেই এসে পরলো আরিশের বুকে।আরিশও কম কিসের ইনায়ার কোমরে নিজের এক হাত রেখে অন্য হাত দিয়ে ইনায়ার হাত ধরে কাপল ডান্স করতে শুরু করল।ইনায়া কেবল হা হয়ে চেয়ে রইলো আরিশের পানে।সে ভাবতো বিয়ের আগে সে বাচ্চামি করার করেছে বিয়ের পর আর করতে পারবে না।অথচ এখন তার স্বামীই তাকে নিয়ে বাচ্চামি করছে ভাবা যায়।ইনায়া হাসতে হাসতে আরিশের সাথে তাল মিলাতে লাগলো। দুজন মিলে অনেক নেচে ক্লান্ত হয়ে উঠল।আরিশ ইনায়াকে অল্প কিছুক্ষণের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজের মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেলল।ইনায়ার সামনে দৃশ্যমান হলো তার সবথেকে কাছের মানুষ।তার স্বামী।আরিশের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।চুল থেকেও ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।ধূসর মিশ্রিত গভীর বাদামী চোখ দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে। ইনায়ার নিজের পরনের ওড়নার নিচের অংশ দিয়ে আরিশের কপালের ঘাম মুছে দিল।আরিশ চোখ বন্ধ করে নিজের ঘোমটা ওয়ালির যত্ন অনুভব করছে।

_________________

ইরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সাদমান।আর ইরিন অবাকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাদমানের দিকে।ইরিন বুঝতে পারছে না সাদমান কি করতে চাচ্ছে। কারণ সাদমান যদি প্রপোজ করতো তাহলে হাতে ফুল বা রিং নিয়ে বসে থাকত। কিন্তু সাদমান কানে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার মানে সে সরি বলার জন্য তাকে ডেকেছে।আবার পুরো ছাদ এমন ভাবে ডেকোরেট করেছে যেন সে প্রপোজ করবে।ইরিন আর বেশি কিছু ভাবতে পারছে না। সাদমান ইরিন কে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসল।ইরিন বুঝতে পারল না সাদমানের হাসির কারণ। সাদমান ইরিন কে চিন্তামুক্ত করতে বলতে শুরু করল ____

এত চিন্তা ভাবনায় তো কিছু নেই কান ধরে বসে আছি সরি বলার জন্য ঠিকই কিন্তু এত কষ্ট করে ডেকোরেশন করেছি কেবল তোমাকে প্রপোজ করার জন্য।

সাদমানের বলা কথা শুনে ইরিধ যেন অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল‌।সে যেন নিজের কান দিয়ে শোনা কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই সাদমানের ব্যবহার তার কাছে খুব অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে তার সকল স্বপ্ন যেন পূরণ হয়ে যাচ্ছে।হে এইসব কিছু তো তার স্বপ্ন।সে সবসময় চাইতো সাদমান তার খেয়াল রাখুক।তার কথা ভাবুক।আর যখন এইসব কিছু ঘটতে তখশ সে বিশ্বাস করতে পারছে না। ইরিনের ভাবনায় ছেদ পরে সাদমানের কন্ঠে। সাদমান বলল___

"আর কতক্ষন এইভাবে কান ধরে থাকব ইরু? এইবার তো ক্ষমা করে দাও। হ্যাঁ জানি আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি কিন্তু তার থেকে বেশি কষ্ট আমি পেয়েছি। প্লিজ ফরগিভ মি ইরু প্লিজ।"

বিজ্ঞাপন

সাদমানের এমন আকুতি ইরিন কি করে ফেলবে? যত যাই হোক না কেন তার সামনে বসা মানুষটিকে তো সে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল এবং এখনো বাসে।আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাবে। ইরিন সবোর্চ্চ চেষ্টা করল শক্ত থাকার। তারপর শান্ত কন্ঠে বলল___

আপনাকে তো কবেই বলে দিয়েছি যে আমার আপনার উপর কোনো অভিযোগ নেই।আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি বিশ্বাস করুন।এখন দয়া করে কান ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।

ইরিনের কথা শুনে সাদমানের ঠোঁট স্মিত হাসি ফুটে উঠল। সে কান থেকে হাত নামিয়ে ইরিনের চোখে চোখ রেখে

বলল ___

ধন্যবাদ মাপ করে দেওয়ার জন্য কিন্তু উঠে পরলে তো চলবে না ইরু। তোমাকে তো প্রপোজ করা এখনো বাকি।

সাদমানের বলা শেষ কথা শুনে ইরিনের চক্ষু চড়কগাছ।সে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে সাদমানের দিকে। সাদমান বাঁকা হেসে পকেটে থাকা একটি বক্স বের করে ইরিনের সামনে ধরল। তারপর কমল কন্ঠে বলতে শুরু করল _____

ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমি। তোমার কাছে থেকে লুকানোর মতন আমার কিছুই যে নেই ইরু। আমার অতীত, আমার বর্তমান সকল কিছু সম্পর্কে তুমি অজ্ঞাত নও।মা বাবা জীবিত থাকতেও তাদের কাছে কখনো ভালোবাসা পাই নি। ভেবেছিলাম আমি ভালোবাসা পাবার যোগ্য না। কিন্তু আপন মানুষ থেকে যা পাই নি তা তোমার পরিবার থেকে পেয়েছি।আমার নিজের জীবনের থেকে বেশি মূল্যবান জিনিস আমার কাছে হলো তুমি এবং তোমার পরিবার। বরাবরই আমি খুব চুপচাপ এবং লাজুক স্বভাবের ছেলে। নিজের অনুভূতি কখনোই প্রকাশ করতে সক্ষম নই। কিন্তু জানি না করি তুমি আমকে বুঝে ফেলতে। নিজেকে তো আমি কখনো কোনো কাগজের টুকরোও মনে করতাম না অথচ তুমি আমাকে বোঝালে যে আমি খোলা বই যা তুমি বিনা বিরক্ত এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ে ফেলতে পার। আমার জন্য তোমার করা পাগলামি, যত্ন, রাগ, অভিমান, দুষ্টুমি সকল কিছুই আমার মন অনেক আগে কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু ভয় পেতাম যে পরিবার থেকে এত ভালোবাসা পেয়েছি সে পারিবারের বিশ্বাস কি করে ভাঙি। তোমার পরিবার তো তোমার জন্য আমার থেকেও অনেক ভালো ছেলে খুঁজে আনতে পারবে। কারণ ইউ ডিজার্ভ বেস্ট। কিন্তু যখন তুমি আমার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া শুরু করলে তখন উপলব্ধি করতে পারলাম আমার জীবনে তোমাকে কতটা প্রয়োজন। তারপর আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম যে তুমি কেবল আমায় প্রয়োজন না যে মিটে গেলেই শেষ। তুমি আমার ভালো থাকার উপায় যা কখনো মানুষ হারাতে চায় না। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব এমন মিথ্যা কথা বলব না তোমায়। কিন্তু হ্যাঁ তোমাকে নি পেলে আমি কখনো ভালো থাকতে পারব না ইরু।আর আমি বড্ড স্বার্থপর ইরিন। নিজের ভালো থাকার জন্যে হলেও তোমাকে আমার করব। নিজেকে তোমার জন্য বেস্ট তৈরি করব।জানো আমার মনে অনেক ভালোবাসা জমে আছে।যা আমি কখনোই কাউকে দিতে পারি নি। তোমাকে আমি আমার হৃদয়ে জমে থাকা সকল ভালোবাসা উজাড় করে দিতে চাই। তোমাকে নিজের করতে চাই। তোমাকে কোনো ক্রমেই আমি হারতে পারব না ইরিন। অনেক অনেক ভালোবাসি তোমাকে।আর কোনো ভয় নেই আমার মাঝে। আমি পরোয়া করি না অন‌্য করোর।আমি শুধু এতটুকু জানি যে আমার ইরিন আমার হতে না পেরে কষ্ট পাচ্ছে আর আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে কষ্ট পেতে দিতে পারি না‌। শুধু একবার বলো তুমি কেবল আমার হবে। কেবল আমাকে ভালো বাসবে‌। কেবল আমায় তোমাকে ভালোবাসর অধিকার দিবে।আই লাভ ইউ ইরিন।আইইইইইই লাভভভভভভভ ইউউউউউউউউউউউউউ।

শেষ বাক্যটি সাদমান অনেক জোরে চিৎকার করে বলল। ইরিনের চোখে পানি। এমন দিন তার দেখার সৌভাগ্য হবে সে কখনো ভাবতে পারেনি।সে কেবল কল্পনা করে গিয়েছে।আজ তার সকল কল্পনা, স্বপ্ন সত্যি হয়ে গিয়েছে।সে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী ভাবছে। কয়জন মানুষের এক তরফা পূর্ণতা পায়? কিন্তু তার পেয়েছে। এই হয়তো তার সব থেকে বড় প্রাপ্তি। সাদমান বক্স থেকে একটা ডায়মন্ডের আংটি বের করল। তার ইরিনের চোখে চোখ রেখে আংটি সমেত হাত বাড়িয়ে দিল ইরিনের দিকে। ইরিন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সাদমানের চোখও ছলছল করছে পানিতে। ইরিন কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিল সাদমানের দিকে। সাদমান নিজের বাম হাত দিয়ে ইরিনের হাত ধরল। এইটা তাদের প্রথম স্পর্শ ছিল। তারপর ডান হাত দিয়ে আংটি পরিয়ে দিল ইরিনের হাতে। পূর্ণতা পেল আরেক জোড়া ভালোবাসার।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস