আদ্রের সম্মোহীনি

পর্ব - ৪৬

🟢

আদ্রদের বাড়িতে ফিরতেই আরিফা সোহাকে জরিয়ে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো,,,,সোহাও মন খুলে কাদলো,,,উপস্থিত সবাই-ই কেদেছে,,,উহুম,,,দুঃখে নয়,,এ যে সুখের কান্না।,,,,,,,ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এসেছে যেন।,,,অনেকক্ষণ সবার সাথে থাকার পর,,আদ্র সোহাকে খাইয়ে দিয়ে রুমে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলে সেই আগের মতো,,,সোহাও যেন কতযুগ পর একটু শান্তির ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো,,,,ঘুমোতেই সোহার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে উঠে এলো আদ্র।,,,এগিয়ে গেলে আরিফা আর শরিফের রুমে,,,,

"আসবো বাবাই?"

দরজায় আদ্রকে দেখে সরিফ খাটে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায়ই বললো..

"অনুমতি নিচ্ছিস কেন বাবা?,,,আয়,,,,"

ভেতরে ঢুকলো আদ্র,,,গিয়ে বাবার পাশে বসলো,,,

"কিছু বলবি বাবা?"

আরিফার কথায় আদ্র বললো...

"হ্যা মাম্মাম।,,,পুতুলকে নিয়ে,,, "

আরিফা বললো..

"তো দেরি করছিস কেন বাবা,,,বল?"

"মাম্মাম,,,,পুতুলকে কলেজ ভর্তি করাতে হবে,,আমি ২-৩ দিনের মধ্যেই সব করবো।,,,"

সরিফ বললো..

"হুন,,,তা তো ভালোই,,,আবার পড়াশোনা শুরু করুক মামনি,,,,"

"আরও একটা কথা বাবাই..."

শরিফ বুঝলো,,,তার ছেলে সিরিয়াস কিছি বলতে চাইছে।তাই একটু চুপ থেকে সরিফ বললো..

"বল বাবা?"

আদ্র থেমে একনাগাড়ে বললে..

"আমি আর পুতুলকে আমার থেকে দুরে রাখতে চাই না বাবাই,,,,আমি ওকে এবার নিজের কাছে আনতে চাই।যতটা কাছে থাকলে আর কেউ আমার পুতুলের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না।,,,"

সরিফ আরিফা একে অপরের দিকে তাকালো,,,, এরপর আরিফা বললো...

"তুই কি কোনো ভাবে বিয়ের কথা বলতে চাইছিস?"

আদ্র সাথে সাথেই বললো...

"হ্যা মাম্মাম।,,,,আমি আর দেরি করতে চাই না। ওর বয়স এখনো ১৮ হয়নি,, আর মাত্র কয়েক মাস বাকি,,,,আমি চাই এখন ধর্ম মতে বিয়েটা হোক,,,তারপর পর ১৮ হলে পরে রেজিস্ট্রি করা যাবে,,,,। "

সরিফ কিছুক্ষণ ভাবলো,,,তারপর বললো..

"বেশ,,,তোমরা যদি রাজি থাকো,,তাহলে আমার আর কি বলার?,,,তুমি যা বলছো তাই হবে,,,,আমি সব ব্যবস্থা করবো।,, "

কথা শেষ করে আদ্র চলে এলো।,,,,,

পরদিন দুপুরের খাবারের পর আদ্র জোর করে সোহাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়,,,, সেই ঘুম ভাঙে তার রাত ৮:৩০ এ।,,,,এরপর সারাটা সময় সোহা,, শারমায়া,রিসব, রুসা,সায়মান,ইমুর সাথে মজা করে কাটিয়েছে।,,,নিডোও এসেছে,,সাথে সোহার চাচাতো ভাইও।,,,৯ টার দিকে বিহান বাড়ি ঢুকলো।এসেই তাদের সাথে জয়েন করলো।,,,, কিছুক্ষন পর আদ্র নিজের রুম থেকে ড্রয়িংয়ে আসতেই বিহান কথার ফাঁকে বললো...

"আদ্র?"

"বল,,,খবর কি?"

"হুম,,,,,তুই যেমনটা বলেছিস,,তেমনই হয়েছে।,,,,তানিশা আর তিয়াশের ভবলিলা সাঙ্গ।,,,"

আদ্র বাকা হাসলো,,,আরো দুটো খুন,,,শেষ করে দিবে তাদের,,,,যে তার পুতুলের দিকে চোখ তুলে তাকাবে,,,,

"""""" রাত ২:৫৬,,,,,,

সোহার চোখে ঘুম নেই। থাকবে কি করে... আজ সারাদিন যে মরার মতো ঘুমিয়েছে।,,,বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে,,,তখনই হঠাৎ কেউ রুমে ঢুকলো।সোহা পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো আদ্র।সোহা উঠে বসলো।কম্বলটা আরেকটু জরিয়ে নিলো গায়ে,,,অগ্রহায়ণের প্রথম দিক,,,শীত আছেই মোটামুটি।,আদ্রের পরনে পান্জাবি,,,

"এতো রাতে,,,কোথাও যাচ্ছেন?"

আদ্র হাতে থাকা প্যাকেটটা খুলতে খুলতে বললো...

"হুম,,,এটা পরে দ্রুত রেডি হয়ে নাও পুতুল,,,"

সোহা অবাক হয়ে বললো...

"শাড়ি?তাও এই সময়?"

"হুম,,,,কারনটা পরে দেখবে,,, এখন আর প্রশ্ন নয় পুতুল।এই নাও,,,এগুলো ওয়াশরুম থেকে পড়ে আসো।,,,আমি শাড়ি পরিয়ে দেবো।"

সোহা আদ্রের হাত থেকে শাড়ি সহ বাকি সব কিছু নিতে নিতে বললো....

"আপনি কিছুক্ষণ বাইরে দাড়ান,,,আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি।"

"তুমি তো শাড়ি পড়তে পারো না ডল,,, "

"শিখেছি,,,,এখন পারি।"

আদ্র শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো সোহার দিকে। তারপর এগিয়ে এসে সোহার দু গাল আলতো করে ধরলো,,,

"অনেক বড় হয়ে গেছে আমার পুতুল,,,,তাই না?"

সোহা তাকালো,,,,তবে কিছুই বললো না।,,,কিছুক্ষণ চুপ থেকে আদ্র বললো...

"রেডি হয়ে নাও,,,আমি বাইরে ওয়েট করছি হুম?"

সোহা মাথা দুলালো।,,,আদ্র বেরিয়ে গেলো।,,,,,সাদার উপর আকাশি রঙের শারিটার ভেতরে দারুন কারুকাজ,,,সেটা পরেই বেরিয়ে এলো সোহা,,,আদ্র তাকে দেখে ভাবলো,,,,"সত্যিই পুতুল বড় হয়েছে,।"

সোহার হাত আকড়ে ধরে বাড়ির বাইরের দিকে হাটা ধরলো।,,,সোহারা বের হতেই চোখে পড়লো হ্যান্ডেল চালিত একটা রিক্সা।চালকও আছে।,,,আদ্র প্রথমে সোহাকে তুললো,,তারপর নিজে উঠে সোহার পাশে বসলো,,,,

"চলুন চাচা,,,"

রিক্সা চলতে শুরু করেছে।সোহা এখনো জানে না সে কোথায় যাচ্ছে,।।তবে এই সময়টাকে সে খুব করে অনুভব করছে।পাশে যে আদ্র আছে,,সোহা মাথাটা এলিয়ে দিলো আদ্রের কাধে,,আদ্রও এক হাতে সোহাকে জড়িয়ে ধরলো।

"আমরা যাচ্ছি টা কোথায়? "

"বলেছি না?গেলেই দেখবে?,,,"

আর কিছু বললো না সোহা,,,,অনেকক্ষণ পর আদ্র রিক্সা থামাতে বললো,,,তারপর নেমে সোহার হাত আকড়ে ধরলো। সোহা কিছুই বললো না,,,তার কিশোরী মনেও যে এক সুখানুভব হচ্ছে।,,,, হাটছে তারা,,,একটা রাস্তার ফুটপাত দিয়ে,। হাটতে হাটতেই আদ্র বললো...

"আইসক্রিম খাবে পুতুল?"

সোহা অবাক হলো,,,এই সময় আইসক্রিম?,,

সোহার মৌনতাকে সম্মতি ধরে আদ্র বললো..

"একটা যাস্ট,,,,শীত পরছে,,, বেশি খেলে ঠান্ডা লেগে যাবে।ওকেয়?"

"ওকেয়,,"

কিছুটা সামনে এগোতেই সোহার চোখে পড়লো একটা সাজানো আইসক্রিম পার্লার,,,,একটা লোক সম্পুর্ন জোকারদের মতো করে সাজা।,,,,সেই হয়তো আইসক্রিম বিক্রেতা,,,,

সোহা খুশি হলো,,,ঠোট প্রসারিত করে হাসলো,,,মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো..

"ওয়াও,,,,"

আদ্র সোহার হাতে টান লাগিয়ে বললো..

"চলো,,"

এগিয়ে গেলো তারা আইসক্রিম পার্লারের দিকে,,,,,আইসক্রিম খেলোও সোহা,,,আবার হাটা ধরলো,,,,সোহার মন ফুরফুরে হয়ে উঠেছে,,,,,সে মহা খুশি এমন একটা পরিবেশ পেয়ে।,,,,,

দুজন মানব মানবী হাটছে রাস্তার পাশ দিয়ে,,, আর একটা প্রানিও নেই,,,নির্জন চারদিক,,,ল্যামপোস্টের আলোয় রাস্তাও আলোকিত,,,কিছুক্ষণ এগোতেই সোহা চোখ সরু করে আদ্রের দিকে তাকিয়ে বললো..

"এই,,এটা শিউলি ফুলের সুভাস না?"

আদ্র উত্তর দিলো..

",হুম,,,"

সোহা যেন খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলো,,,,লাফাতে লাফাতে বলে উঠলো...

"তারমানে সামনে শিউলি ফুল আছে,,,ইয়েএএ"

,,,আদ্র দেখছে তার পুতুলের বাচ্চামো,,, একটু এগিয়ে গিয়েছে সোহা,,,হাটছে,, সব দেখছে৷,দু হাত প্রসারিত করে গভীর শ্বাস ফেলছে,,, আবার একটু পর পর লাফাচ্ছেও হেসে হেসে,,, আদ্র আপন মনে তার সম্মোহীনির সম্মোহন রুপ দেখতে ব্যাস্ত,,,

একটু পরই শিউলি ফুলের গাছ পড়লো,,,পায়ের নিচে কিছু তাজা শিউলি পেলো,,,,গাছের দিকে তাকালো,,,,একটা দুটো ছাড়া তেমন ফুল পড়ছে নাহ।

তখনই আদ্র সোহার হাত ধরে পাশের একটা গেইট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললো..

"চলো পুতুল,,,"

সোহা ঢুকলো,,,,বিস্তৃর্ণ বাগান,,,উহুম,,,ফুল বাগান,,,,সারা বাগান জুরে চারপাশে নানা রকম ফুল গাছ,,,,কলি ফুটেছে অনেক,,,হয়তো ভোরের আলো পড়লেই তারা ফুল হয়ে ফুটবে,,,,আদ্র সোহাকে নিয়ে একটা বড় শিউলি ফুল গাছের নিচে বসলো,,,সোহা খুশিতে চার দিক দেখতে লাগলো,,,

"এত্তো সুন্দর,,,আমি আগে কখনো দেখিনি,,,,"

আদ্র বসলো সোহার পাশ ঘেসে,,

"এখন থেকে এই জায়গাটা তোমারই পুতুলরানি,,,"

"সত্যিই?,,,আমি চাইলেই এখানে আসতে পারবো??"

"হুম সত্যি,,,"

()()()()()()()

শিউলি গাছটার নিচে সটান হয়ে শুয়ে আছে দুজনে,,,,দৃষ্টি নিবদ্ধ উপরের খোলা আকাশে।হালকা ভোরের আলো ফুটছে,,,সাথে ঝরে পরছে অসংখ্য শিউলি,,,সারা শরীর ভরে যাচ্ছে থোকায় থোকায় শিউলিতে,,,,,,,

"তুমি কি একান্ত আমার হবে সম্মোহীনি?"

সোহা মাথাটা ঘোরালো আদ্রের দিকে,,,অপলক চেয়ে রইলো,,,আদ্রও ফিরলো,,,

"বলো?,,,, বিয়ে করবে আমায় সম্মোহীনি?"

সোহা নিজের হাত দিয়ে ফুলের উপর থাকা আদ্রের হাতটা আকড়ে ধরলো,,,মাথাটা বাকিয়ে আদ্রের কাধে রাখলো,,,,

"বলো না?,,,,হবে আমার একান্ত ব্যক্তিগত তুমি?"

"হতে চাই,,,,আপনার,,,আমি শুধু এই উষ্ণ #আদ্রের_সম্মোহীনি হতে চাই।"

আদ্রের সম্মোহীনি পর্ব ৪৬